শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের সম্বন্ধে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আর তা করতে গিয়ে নানান প্রসঙ্গ এসে যাচ্ছে – ফলে সেগুলোরও একটু-আধটু আলোকপাত করা হোচ্ছে ! এইভাবেই এগিয়ে চলেছে আমাদের – “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা”!
আমরা ছিলাম গুরুমহারাজের অন্যতম একজন ত্যাগী সন্ন্যাসী সন্তান স্বামী ভাগবতানন্দ মহারাজ বা বাউলবাবার কথায়। ভাগবতানন্দ যেদিন প্রথম বনগ্রাম আশ্রমে পা রেখেছিলেন – সেইদিনই ঘটে গিয়েছিল একটা বিরাট অঘটন ! গুরুমহারাজ বনগ্রামেই তাঁর কুটিয়ায় নির্বিকল্পের জন্য সংকল্প করে বসে পড়েছিলেন, কিন্তু কোনো কারনে দু-তিনদিন পরেই তাতে বিঘ্ন ঘটে যায় এবং তিনি কুটিয়ার বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন। এই কথা শুনে সকলে গ্রাম থেকে দৌড়ে আশ্রমে গিয়ে দেখেছিলাম যে, গুরুমহারাজ নিঃস্পন্দ অবস্থায় শুয়ে রয়েছেন – তাঁর পা-দুটো ছিল হিমশীতল ঠান্ডা ! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আধঘণ্টার মধ্যেই গুরুমহারাজ সুস্থ হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন – কিন্তু যেন তাঁর মনোজগৎ এই স্থূলজগৎ থেকে অনেক ঊর্ধ্বে বিরাজ করছিল। অনেকেই অনেক কথা তাঁকে বলার চেষ্টা করছিল – কিন্তু গুরুমহারাজ তেমন করে কারো কথার কোনো উত্তর-ই দিচ্ছিলেন না, যেটাও দিচ্ছিলেন_ সেটা যেন মা জগদম্বার প্রতি অভিমানী সন্তানের সুর !
কিন্তু ভাগবতানন্দ মহারাজ যখন তাঁর নিজের দোষের কথা অকপটে গুরুমহারাজের কাছে গিয়ে নিবেদন করেছিলেন, তখন তিনি প্রথমে মহারাজের দিকে গট্-মট্ করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। তারপরই যেন উনি স্বাভাবিক ভূমিতে নেমে এসে, মায়ের স্নেহমাখা সুরে ভগবতানন্দ মহারাজের সাথে কিছু কথা বলেছিলেন, তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন_তারা ধাত্রিগ্রাম থেকে আসছে কি না ! তারপর মধুর কন্ঠে সস্নেহে বলেছিলেন – “গ্রামের মায়ের মন্দিরে(বর্তমান করূনাময়ী মন্দিরে) গিয়ে গান-বাজনা করো, ওখানেই আমাদের দেখা হবে।” এরপর মহারাজ গ্রামের কালীমন্দিরে এসে গান-বাজনার তোড়জোড় শুরু করেছিলেন। গ্রামের বহুলোক সেদিন মুখার্জিদের কালীমন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় জমিয়েছিল। তখনকার দিনে গ্রামের মধ্যে এই ধরনের আসর খুবই কম বসতো – তাই মানুষের এতো কৌতুহল ! তাছাড়া আরও একটা কৌতূহলও গ্রামের মানুষের ছিল, সেটা হোলো – নতুন রবীন-সাধুকে দেখার ! গ্রামবাসী সকলেই জানতো যে, রবীন সাধু মাঠের মধ্যে একটা ছোট্ট কুটিয়ায় দীর্ঘদিন (গ্রামের মানুষের সকলে তো আর জানতো না যে, নির্বিকল্পের জন্য অন্তত একুশ দিন ধরে একই আসনে ধ্যানের অন্তর্লীন গভীরতায় ডুবে থাকতে হয়) ধরে সাধনা করার জন্য দরজা বন্ধ করে বসেছিল – কিন্তু রাখাল বালকেরা কোনো উৎপাত করায় (এইরকমই একটা প্রচারও ছিল! অন্যান্য দু-একটা কারণ ঘটেছিল বলেও প্রচার ছিল)–ওনার ধ্যান ভেঙে গেছে, ফলে এই অবস্থায় রবীন-সাধুকে দেখারও একটা তাগিদ ছিল গ্রামবাসীর !
সেইজন্যেই সেদিন বৈকালীন গানের আসরে মুখার্জিদের কালীমন্দির প্রাঙ্গণে বহু মানুষের ভিড় হয়েছিল। গান-বাজনা যখন খুব জমে উঠেছে – ঠিক তখনই গুরুমহারাজ একেবারে প্রায় স্বাভাবিক অবস্থাতে সেখানে এসে হাজির হয়েছিলেন এবং বাউলবাবা ভাগবতানন্দের একেবারে পাশটিতে এসে বসে পড়েছিলেন। বাউলবাবার কন্ঠে দু’চারটে বাউল গান শোনার পর, গুরুমহারাজ তাঁর অন্য পাশে বসে থাকা এবং বাউল গানে সঙ্গত করতে থাকা গোবিন্দ-দা(ধাত্রীগ্রামের গোবিন্দ প্রামাণিক)-কে অনুরোধ করেছিলেন দু-একটা মায়ের গান (শ্যামাসংগীত) গাইতে ! যথারীতি সেদিন গোবিন্দদা পরপর দুটি শ্যামাসংগীত গেয়ে শুনিয়েছিলেন গুরুমহারাজকে ! সেই গান দুটি শোনার পর গুরুমহারাজ ওনাদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,- “তোমরা এখানে বসেই আরও আনন্দ করো (অর্থাৎ আরো কিছুক্ষণ গান-বাজনা করো), আমার একটু অন্য কাজ রয়েছে !” এই কথাগুলি বলে গুরুমহারাজ সেই সংগীতের আসর ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন !
মহারাজরা আরও কিছুক্ষণ সংগীতের আসর চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে কালীমন্দির সংলগ্ন টিনের ঘরগুলির একটাতে ওনাদের চার-পাঁচজনের (যারা ধাত্রীগ্রাম থেকে এসেছিলেন) রাত্রির বিশ্রামের ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল। ফলে, ওনারা সকাল সকাল রাতের খাবার খেয়ে ঐ ঘরটিতে বিশ্রামের জন্য চলে গিয়েছিলেন। এদিকে গুরুমহারাজ ন’কাকা সহ মুখার্জি বাড়ির অন্যান্য গুরুস্থানীয়দের কাছে – ৺রীমা জগদম্বার এই কার্যের (গুরুমহারাজের নির্বিকল্প সমাধিতে বিঘ্ন ঘটা) জন্য ভীষণভাবে নিজেকে দায়ী করেছিলেন এবং ভীষণভাবে দুঃখপ্রকাশ করে যাচ্ছিলেন ! এমনকি তিনি একথাও বলেছিলেন যে, যদি তাড়াতাড়ি কোন নিরুপদ্রব স্থানে তাঁর নির্বিল্পের ব্যবস্থা না করে দেওয়া হয়__ তাহলে হয়তো তিনি তাঁর শরীর-ই ছেড়ে দেবেন (মৃত্যুবরণ করবেন) ! সেইকথা শুনে বাড়ির বড়রা_ তখনকার অবস্থার মা জগদম্বার শিশুবৎ রবীনকে চরমভাবে সান্তনা দিতে শুরু করেছিলেন ! আর তৃষাণ মহারাজের মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিলো, আর সেটা হোলো__গুরু মহারাজের নির্বিকল্পের জন্য উপযুক্ত স্থানের সন্ধান করা ! … [ক্রমশঃ]
আমরা ছিলাম গুরুমহারাজের অন্যতম একজন ত্যাগী সন্ন্যাসী সন্তান স্বামী ভাগবতানন্দ মহারাজ বা বাউলবাবার কথায়। ভাগবতানন্দ যেদিন প্রথম বনগ্রাম আশ্রমে পা রেখেছিলেন – সেইদিনই ঘটে গিয়েছিল একটা বিরাট অঘটন ! গুরুমহারাজ বনগ্রামেই তাঁর কুটিয়ায় নির্বিকল্পের জন্য সংকল্প করে বসে পড়েছিলেন, কিন্তু কোনো কারনে দু-তিনদিন পরেই তাতে বিঘ্ন ঘটে যায় এবং তিনি কুটিয়ার বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন। এই কথা শুনে সকলে গ্রাম থেকে দৌড়ে আশ্রমে গিয়ে দেখেছিলাম যে, গুরুমহারাজ নিঃস্পন্দ অবস্থায় শুয়ে রয়েছেন – তাঁর পা-দুটো ছিল হিমশীতল ঠান্ডা ! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আধঘণ্টার মধ্যেই গুরুমহারাজ সুস্থ হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন – কিন্তু যেন তাঁর মনোজগৎ এই স্থূলজগৎ থেকে অনেক ঊর্ধ্বে বিরাজ করছিল। অনেকেই অনেক কথা তাঁকে বলার চেষ্টা করছিল – কিন্তু গুরুমহারাজ তেমন করে কারো কথার কোনো উত্তর-ই দিচ্ছিলেন না, যেটাও দিচ্ছিলেন_ সেটা যেন মা জগদম্বার প্রতি অভিমানী সন্তানের সুর !
কিন্তু ভাগবতানন্দ মহারাজ যখন তাঁর নিজের দোষের কথা অকপটে গুরুমহারাজের কাছে গিয়ে নিবেদন করেছিলেন, তখন তিনি প্রথমে মহারাজের দিকে গট্-মট্ করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। তারপরই যেন উনি স্বাভাবিক ভূমিতে নেমে এসে, মায়ের স্নেহমাখা সুরে ভগবতানন্দ মহারাজের সাথে কিছু কথা বলেছিলেন, তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন_তারা ধাত্রিগ্রাম থেকে আসছে কি না ! তারপর মধুর কন্ঠে সস্নেহে বলেছিলেন – “গ্রামের মায়ের মন্দিরে(বর্তমান করূনাময়ী মন্দিরে) গিয়ে গান-বাজনা করো, ওখানেই আমাদের দেখা হবে।” এরপর মহারাজ গ্রামের কালীমন্দিরে এসে গান-বাজনার তোড়জোড় শুরু করেছিলেন। গ্রামের বহুলোক সেদিন মুখার্জিদের কালীমন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় জমিয়েছিল। তখনকার দিনে গ্রামের মধ্যে এই ধরনের আসর খুবই কম বসতো – তাই মানুষের এতো কৌতুহল ! তাছাড়া আরও একটা কৌতূহলও গ্রামের মানুষের ছিল, সেটা হোলো – নতুন রবীন-সাধুকে দেখার ! গ্রামবাসী সকলেই জানতো যে, রবীন সাধু মাঠের মধ্যে একটা ছোট্ট কুটিয়ায় দীর্ঘদিন (গ্রামের মানুষের সকলে তো আর জানতো না যে, নির্বিকল্পের জন্য অন্তত একুশ দিন ধরে একই আসনে ধ্যানের অন্তর্লীন গভীরতায় ডুবে থাকতে হয়) ধরে সাধনা করার জন্য দরজা বন্ধ করে বসেছিল – কিন্তু রাখাল বালকেরা কোনো উৎপাত করায় (এইরকমই একটা প্রচারও ছিল! অন্যান্য দু-একটা কারণ ঘটেছিল বলেও প্রচার ছিল)–ওনার ধ্যান ভেঙে গেছে, ফলে এই অবস্থায় রবীন-সাধুকে দেখারও একটা তাগিদ ছিল গ্রামবাসীর !
সেইজন্যেই সেদিন বৈকালীন গানের আসরে মুখার্জিদের কালীমন্দির প্রাঙ্গণে বহু মানুষের ভিড় হয়েছিল। গান-বাজনা যখন খুব জমে উঠেছে – ঠিক তখনই গুরুমহারাজ একেবারে প্রায় স্বাভাবিক অবস্থাতে সেখানে এসে হাজির হয়েছিলেন এবং বাউলবাবা ভাগবতানন্দের একেবারে পাশটিতে এসে বসে পড়েছিলেন। বাউলবাবার কন্ঠে দু’চারটে বাউল গান শোনার পর, গুরুমহারাজ তাঁর অন্য পাশে বসে থাকা এবং বাউল গানে সঙ্গত করতে থাকা গোবিন্দ-দা(ধাত্রীগ্রামের গোবিন্দ প্রামাণিক)-কে অনুরোধ করেছিলেন দু-একটা মায়ের গান (শ্যামাসংগীত) গাইতে ! যথারীতি সেদিন গোবিন্দদা পরপর দুটি শ্যামাসংগীত গেয়ে শুনিয়েছিলেন গুরুমহারাজকে ! সেই গান দুটি শোনার পর গুরুমহারাজ ওনাদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,- “তোমরা এখানে বসেই আরও আনন্দ করো (অর্থাৎ আরো কিছুক্ষণ গান-বাজনা করো), আমার একটু অন্য কাজ রয়েছে !” এই কথাগুলি বলে গুরুমহারাজ সেই সংগীতের আসর ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন !
মহারাজরা আরও কিছুক্ষণ সংগীতের আসর চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে কালীমন্দির সংলগ্ন টিনের ঘরগুলির একটাতে ওনাদের চার-পাঁচজনের (যারা ধাত্রীগ্রাম থেকে এসেছিলেন) রাত্রির বিশ্রামের ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল। ফলে, ওনারা সকাল সকাল রাতের খাবার খেয়ে ঐ ঘরটিতে বিশ্রামের জন্য চলে গিয়েছিলেন। এদিকে গুরুমহারাজ ন’কাকা সহ মুখার্জি বাড়ির অন্যান্য গুরুস্থানীয়দের কাছে – ৺রীমা জগদম্বার এই কার্যের (গুরুমহারাজের নির্বিকল্প সমাধিতে বিঘ্ন ঘটা) জন্য ভীষণভাবে নিজেকে দায়ী করেছিলেন এবং ভীষণভাবে দুঃখপ্রকাশ করে যাচ্ছিলেন ! এমনকি তিনি একথাও বলেছিলেন যে, যদি তাড়াতাড়ি কোন নিরুপদ্রব স্থানে তাঁর নির্বিল্পের ব্যবস্থা না করে দেওয়া হয়__ তাহলে হয়তো তিনি তাঁর শরীর-ই ছেড়ে দেবেন (মৃত্যুবরণ করবেন) ! সেইকথা শুনে বাড়ির বড়রা_ তখনকার অবস্থার মা জগদম্বার শিশুবৎ রবীনকে চরমভাবে সান্তনা দিতে শুরু করেছিলেন ! আর তৃষাণ মহারাজের মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিলো, আর সেটা হোলো__গুরু মহারাজের নির্বিকল্পের জন্য উপযুক্ত স্থানের সন্ধান করা ! … [ক্রমশঃ]
