জিজ্ঞাসু :– বৈষ্ণব সমাজের বিভিন্ন মানুষদেরকে বলতে শুনেছি_ কলিযুগে “সংঘশক্তি” ছাড়া কিছু করা যাবে না ! আচ্ছা_এটা কি মহাপ্রভুর শিক্ষা ?
গুরুমহারাজ :– না_ না, মহাপ্রভু এমন কথা বলেন নি । মহাপ্রভুর নিজের মুখের কথা তো বিশেষ পাওয়াই যায় না ! বৈষ্ণবগ্রন্থে কিছু কিছু ওনার মুখের কথার উল্লেখ রয়েছে(শিক্ষাষ্টকম্), কিন্তু সেই গ্রন্থগুলিরও বেশিরভাগই মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের বহু পরে রচিত । মহাপ্রভূর সমসাময়িকদের মধ্যে স্বরূপ দামোদর, রায় রামানন্দ, বাসুদেব ঘোষ, নরহরি, মুরারি গুপ্ত – ইত্যাদিরা কিছু কিছু লিখে গিয়েছিলেন, সেইগুলি authentic ! কিন্তু তাঁদের গ্রন্থগুলি খুবই ছোট ছোট সংকলন । এঁদের মধ্যে একমাত্র বাসুঘোষ-ই মহাপ্রভূর বাল্যলীলা থেকে শুরু করে তাঁর জীবনীর অনেকটা অংশই লিখেছিলেন কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বইটি পরবর্তীতে সেভাবে পাওয়া যায়নি । গবেষকগণ অবশ্য চেষ্টা করছে_এগুলো উদ্ধার করার !
যাইহোক, এইসব কারণে গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তিন-চার generation পরে লিখিত__ পূর্ণাঙ্গ চৈতন্যবিষয়ক পুস্তক হিসাবে বৃন্দাবন দাসের “চৈতন্য ভাগবত” এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থ দুটিকে মান্যতা দিয়েছে ৷ গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের কাছে এই দুটিই আকরগ্রন্থ ৷ কিন্তু “চৈতন্যভাগবত” গ্রন্থটি শ্রীচৈতন্যের 3rd generation এবং “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থটি 4th generation -এর ব্যক্তির দ্বারা লিখিত । সুতরাং ঠিক ঠিক মহাপ্রভুর মুখের ভাষা পাওয়াটা খুবই মুস্কিল, তবে দেখা যায় ওনাদের লেখায় মহাপ্রভুর ভাবটি অবিকৃত রয়েছে ! বৃন্দাবন দাস এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজ দুজনেই মহাজন এবং মহাপ্রভুর কৃপাপাত্র ও আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তা নাহলে শতশত গৌরাঙ্গ বিষয়ক গ্রন্থের মধ্যে এই দুটি গ্রন্থই বা এতো মহত্ত্ব পাবে কেন ? ঈশ্বরের আশীর্বাদ না থাকলে কখনই এমনটি হোতো না ৷ শোনা যায় বৃন্দাবন দাস তার মা নারায়ণীর গর্ভে যখন ছিল, তখন মহাপ্রভু স্বয়ং তার জন্মরহস্য, তার মায়ের কাছে বর্ণনা করেছিলেন ! হয়তো এই কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে তাঁকে ‘মহত্ত্ব’-দানের চেষ্টাও হোতে পারে_কিন্তু লীলার জগতে সবকিছুই হওয়া সম্ভব ।
আর কৃষ্ণদাস ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ লেখা শুরু করেছিলেন একেবারে তার বৃদ্ধ বয়সে, তৎকালীন বৃন্দাবনবাসী বৈষ্ণব ভক্তদের অনুরোধে ! কিছুটা পাণ্ডুলিপি লেখা হওয়ার পর তার মনে ধন্দ জাগে যে, তার এই লেখাটি যথাযথ হোচ্ছে কি না ! তার মনের সন্দেহ দূর করার জন্য পান্ডুলিপি মদনগোপাল মন্দিরে রেখে দেওয়া হয় এবং সকলে বাইরে বেরিয়ে আসে ৷ কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে দেখা যায় দেবতার গলায় মালা পাণ্ডুলিপিতে পড়ানো রয়েছে ! তখন উপস্থিত সকলে মহাপ্রভুর জয়ধ্বনি দিতে থাকে এবং কৃষ্ণদাস এটাকেই ‘দেব-আজ্ঞা’ মনে করে হৃষ্টচিত্তে বাকি অংশ লেখার কাজে মন দেয় । তাহলেই বোঝা যাচ্ছে এই দুজনের কেউই নিতান্ত সাধারণ লেখক নয় ৷ মহৎ কার্য করার জন্যই এদের শরীর ধারণ ।
যাইহোক, কথা হচ্ছিলো ‘সংঘশক্তি’ নিয়ে । ধর্মীয়ভাবে সংঘশক্তির ধারণা প্রথম দিয়েছিলেন ভগবান বুদ্ধ ৷ তার অনেক পরে মহাপ্রভু এই আদর্শকে কাজে লাগিয়েছিলেন । ভগবান বুদ্ধ বলেছিলেন – ” সংঘম্ শরণং গচ্ছামি।” বুদ্ধ তৈরি করেছিলেন সংঘারাম । বুদ্ধের সময়কালে (২৫০০ বছর আগে) বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে এই দেশটি বিভক্ত ছিল আর সকলের সাথে সকলের বিভেদ লেগেই ছিল । ফলে সাধারন মানুষের তখন ছিল চরম কষ্ট ! কথাতেই রয়েছে “রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়”। নলখাগড়া বা উলুখাগড়ার বনগুলি যেমন যুদ্ধবিগ্রহের সময় পদপৃষ্ট হয়ে ম’রে সাদা হয়ে যেতো__ তেমনি সাধারণ মানুষও শ’য়ে শ’য়ে, হাজারে হাজারে মারা যেতো ৷ তাছাড়া রাজশক্তি ও ব্রাহ্মণ্যশক্তির অশুভ আঁতাত সমাজে এমন ভাবে চেপে বসেছিল যে, সাধারণ মানুষের__ বিশেষত: নিম্নশ্রেণীর মানুষদেরকে চরম অবহেলা, লাঞ্ছনা সইতে হোত – একথায় চরম দুরবস্থা ছিল তাদের !
ভগবান বুদ্ধকে রাজশক্তি এবং ব্রাহ্মণ্যশক্তির বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়তে হয়েছিল ৷ বিশেষত: বুদ্ধ পরবর্তীরা যাতে তাঁর প্রচারিত আদর্শকে ধরে রাখতে পারে – তাই প্রয়োজন ছিল সংঘের ৷ তৎকালীন বেশকিছু রাজা বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল বটে, কিন্তু বুদ্ধ জানতেন যে সত্য, ত্যাগ, প্রেম – ইত্যাদি ধর্মের আচরণগুলি ত্যাগী সন্ন্যাসী পরম্পরাই রক্ষা করতে পারে – কোনো ভোগবাদী রাজা বা জমিদার নয় । তারা ক্ষত্রিয়শ্রেণী__ তারা সংঘ এবং সংঘের সাধু-সন্তদের রক্ষা করবে, কিন্তু ‘ধর্মাদর্শ’ রক্ষা করবে সাধুরা ৷ সেইজন্য ভগবান বুদ্ধের পর থেকেই ভারতবর্ষের নবীন অবিবাহিত ব্রহ্মচারী সন্নাসী পরম্পরার সৃষ্টি হয়েছিলো ৷ তার আগে বৈদিক ধারার সন্ন্যাস-আশ্রম ছিল ! কিন্তু সেখানে প্রথমে গুরুগৃহে ব্রহ্মচর্য, পরে সংসার জীবন বা গার্হস্থ্য, তারপর ৫০–৬০/৬৫ বছর পর্যন্ত বানপ্রস্থ, শেষে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে হোতো ৷ কিন্তু বর্তমানে যে নবীন সন্ন্যাসী পরম্পরা দেখছো, এর স্রষ্টা ভগবান বুদ্ধ ।
ঠিক এইরকমই পরিস্থিতি ছিল চৈতন্য মহাপ্রভুর সময়কালেও । তখন আবার বিদেশী (তুর্কি মুসলমান)-দের অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে । দেশে মুসলমান শাসক, দলে দলে হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হয়ে যাচ্ছে – বিশেষত: এই বাংলাদেশে(অবিভক্ত) হাবসীরা (ক্রীতদাস) ৬ মাস/১বছরের জন্য, একে অপরকে মেরে পরপর সিংহাসনে বসছে ! সে এক চরম বিশৃংখল অবস্থা ! সেই সময় সনাতন ধর্মকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই মহাপ্রভুর ধর্ম আন্দোলন ! এক্ষেত্রে সংঘশক্তির খুবই প্রয়োজন ছিল, নাহলে বিদেশী শাসক বা তাদের সাহায্যকারী দেশীয় রাজারা তাঁকে মানবে কেন ? মহাপ্রভূ যখন সদলবলে নবদ্বীপে কাজীর দরবারে হাজির হোলেন – অত লোক দেখে ভয় পেয়ে কাজী মহাপ্রভুর সঙ্গে সন্ধি করেছিল । তোমরা কি ভাবো–সেটা কাজীর মহানুভবতা ছিল ? মোটেই না !
মহাপ্রভুর মৃত্যুর ব্যাপারেও গৌড়বঙ্গের শাসককুল এবং উড়িষ্যার রাজন্যবর্গ উভয়েরই হাত (চক্রান্ত) ছিল ।
সে যাইহোক, যুগপুরুষরা জানেন__ কি কৌশলে তাঁকে কার্যোদ্ধার করতে হবে ৷ ফলে এক এক যুগে এক একরকম লীলা সংঘটিত হয়। তবে মনে রাখবে –এই যে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করা__ এটায় সামাজিক সংস্কারমূলক কাজ হয়, সমাজের অবক্ষয় রোধ করা যায়, দলবদ্ধভাবে আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠা যায় না ! ওটা individual ! অবশ্য সামাজিক কাজটাও যুগপুরুষদের আরব্ধ কাজের মধ্যে পড়ে । সমাজে এমনিতে দেখবে দলবেঁধে চুরি-ডাকাতি হোচ্ছে ৷ দলবেঁধে সেবামূলক কাজ খুবই ভালো হয় – তাই দলবেঁধে সামাজিক অনেক ভালো কাজ বা মন্দ কাজ করা যায় । কিন্তু মানুষের জীবনের যে চূড়ান্ত লক্ষ্য আত্মদর্শন – তা হয় না । মানুষের প্রকৃত আধ্যাত্মিক উত্তরণ হয় “মনে-বনে-কোনে” ।৷ মহাপ্রভুও তো বলেছিলেন –’ বহিরঙ্গে নাম সংকীর্তন, অন্তরঙ্গেই হয় প্রেম আলাপন ৷’
ভগবান বুদ্ধেরও যে সাধনা ও অর্হত্ত্বলাভ তা তো বনে-ই, নৈরঞ্জনা নদীর তীরে বোধিবৃক্ষের তলে ৷ বুদ্ধের ত্রিশরণ ছিল – ” বুদ্ধং (জীবিতং পরিয়ন্তং) শরণং গচ্ছামি, ধর্মং (জীবিতং পরিয়ন্তং) শরণং গচ্ছামি, সংঘং (জীবিতং পরিয়ন্তং) শরণং গচ্ছামি ৷৷” নারীদের তিনি প্রথমটায় সংঘে নিতে চাননি, পরে তাঁর পালিতা মা গৌতমীর অনুরোধে পৃথকভাবে নারীদের জন্যও সংঘারাম তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে পরে ওনার স্ত্রী গোপাও যোগদান করেছিল ৷ বুদ্ধের ওই যে ত্রিশরণ – এটিই পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্মের Trinity । স্বামী বিবেকানন্দও একবার বলেছিলেন যে খ্রিস্টধর্ম বৌদ্ধধর্মের-ই একটা শাখা ।
(এরপর গুরুমহারাজ পালি ভাষায় বুদ্ধের নানা শিক্ষার কথা বলে যেতে শুরু করলেন । তারপর আবার বাংলায় বলতে শুরু করলেন –)। ভগবান বুদ্ধ সারাজীবনে ছোট ছোট গল্পের মাধ্যমে শিষ্যদের বহু শিক্ষা দিয়েছেন, যে গুলিকে জাতকের গল্প বলা হয়– কিন্তু তিনি শেষ বয়সে এসে, তাঁর পার্ষদদের ডেকে বললেন, “আমাকে দ্যাখো, আমার মতো হও ।”
দ্যাখো, পরবর্তীকালে আমরা যীশুকেঐ দেখছি একই কথা বলতে__ ” Follow me “৷ (এরপর গুরুজী ইংরাজীতে বাইবেলের কিছু উদ্ধৃতি দিলেন ৷ কোনো কলকাতার ভক্ত বললো, ” গুরুজী, যীশুর কথা আপনি হিব্রু বা অ্যারামাইকে বলুন – গুরুমহারাজ তাও বললেন । তারপর চুপ করে গেলেন । অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর উপরে উঠে ঘরে চলে গেলেন ।)
গুরুমহারাজ :– না_ না, মহাপ্রভু এমন কথা বলেন নি । মহাপ্রভুর নিজের মুখের কথা তো বিশেষ পাওয়াই যায় না ! বৈষ্ণবগ্রন্থে কিছু কিছু ওনার মুখের কথার উল্লেখ রয়েছে(শিক্ষাষ্টকম্), কিন্তু সেই গ্রন্থগুলিরও বেশিরভাগই মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের বহু পরে রচিত । মহাপ্রভূর সমসাময়িকদের মধ্যে স্বরূপ দামোদর, রায় রামানন্দ, বাসুদেব ঘোষ, নরহরি, মুরারি গুপ্ত – ইত্যাদিরা কিছু কিছু লিখে গিয়েছিলেন, সেইগুলি authentic ! কিন্তু তাঁদের গ্রন্থগুলি খুবই ছোট ছোট সংকলন । এঁদের মধ্যে একমাত্র বাসুঘোষ-ই মহাপ্রভূর বাল্যলীলা থেকে শুরু করে তাঁর জীবনীর অনেকটা অংশই লিখেছিলেন কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বইটি পরবর্তীতে সেভাবে পাওয়া যায়নি । গবেষকগণ অবশ্য চেষ্টা করছে_এগুলো উদ্ধার করার !
যাইহোক, এইসব কারণে গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তিন-চার generation পরে লিখিত__ পূর্ণাঙ্গ চৈতন্যবিষয়ক পুস্তক হিসাবে বৃন্দাবন দাসের “চৈতন্য ভাগবত” এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থ দুটিকে মান্যতা দিয়েছে ৷ গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের কাছে এই দুটিই আকরগ্রন্থ ৷ কিন্তু “চৈতন্যভাগবত” গ্রন্থটি শ্রীচৈতন্যের 3rd generation এবং “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থটি 4th generation -এর ব্যক্তির দ্বারা লিখিত । সুতরাং ঠিক ঠিক মহাপ্রভুর মুখের ভাষা পাওয়াটা খুবই মুস্কিল, তবে দেখা যায় ওনাদের লেখায় মহাপ্রভুর ভাবটি অবিকৃত রয়েছে ! বৃন্দাবন দাস এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজ দুজনেই মহাজন এবং মহাপ্রভুর কৃপাপাত্র ও আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তা নাহলে শতশত গৌরাঙ্গ বিষয়ক গ্রন্থের মধ্যে এই দুটি গ্রন্থই বা এতো মহত্ত্ব পাবে কেন ? ঈশ্বরের আশীর্বাদ না থাকলে কখনই এমনটি হোতো না ৷ শোনা যায় বৃন্দাবন দাস তার মা নারায়ণীর গর্ভে যখন ছিল, তখন মহাপ্রভু স্বয়ং তার জন্মরহস্য, তার মায়ের কাছে বর্ণনা করেছিলেন ! হয়তো এই কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে তাঁকে ‘মহত্ত্ব’-দানের চেষ্টাও হোতে পারে_কিন্তু লীলার জগতে সবকিছুই হওয়া সম্ভব ।
আর কৃষ্ণদাস ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ লেখা শুরু করেছিলেন একেবারে তার বৃদ্ধ বয়সে, তৎকালীন বৃন্দাবনবাসী বৈষ্ণব ভক্তদের অনুরোধে ! কিছুটা পাণ্ডুলিপি লেখা হওয়ার পর তার মনে ধন্দ জাগে যে, তার এই লেখাটি যথাযথ হোচ্ছে কি না ! তার মনের সন্দেহ দূর করার জন্য পান্ডুলিপি মদনগোপাল মন্দিরে রেখে দেওয়া হয় এবং সকলে বাইরে বেরিয়ে আসে ৷ কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে দেখা যায় দেবতার গলায় মালা পাণ্ডুলিপিতে পড়ানো রয়েছে ! তখন উপস্থিত সকলে মহাপ্রভুর জয়ধ্বনি দিতে থাকে এবং কৃষ্ণদাস এটাকেই ‘দেব-আজ্ঞা’ মনে করে হৃষ্টচিত্তে বাকি অংশ লেখার কাজে মন দেয় । তাহলেই বোঝা যাচ্ছে এই দুজনের কেউই নিতান্ত সাধারণ লেখক নয় ৷ মহৎ কার্য করার জন্যই এদের শরীর ধারণ ।
যাইহোক, কথা হচ্ছিলো ‘সংঘশক্তি’ নিয়ে । ধর্মীয়ভাবে সংঘশক্তির ধারণা প্রথম দিয়েছিলেন ভগবান বুদ্ধ ৷ তার অনেক পরে মহাপ্রভু এই আদর্শকে কাজে লাগিয়েছিলেন । ভগবান বুদ্ধ বলেছিলেন – ” সংঘম্ শরণং গচ্ছামি।” বুদ্ধ তৈরি করেছিলেন সংঘারাম । বুদ্ধের সময়কালে (২৫০০ বছর আগে) বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে এই দেশটি বিভক্ত ছিল আর সকলের সাথে সকলের বিভেদ লেগেই ছিল । ফলে সাধারন মানুষের তখন ছিল চরম কষ্ট ! কথাতেই রয়েছে “রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়”। নলখাগড়া বা উলুখাগড়ার বনগুলি যেমন যুদ্ধবিগ্রহের সময় পদপৃষ্ট হয়ে ম’রে সাদা হয়ে যেতো__ তেমনি সাধারণ মানুষও শ’য়ে শ’য়ে, হাজারে হাজারে মারা যেতো ৷ তাছাড়া রাজশক্তি ও ব্রাহ্মণ্যশক্তির অশুভ আঁতাত সমাজে এমন ভাবে চেপে বসেছিল যে, সাধারণ মানুষের__ বিশেষত: নিম্নশ্রেণীর মানুষদেরকে চরম অবহেলা, লাঞ্ছনা সইতে হোত – একথায় চরম দুরবস্থা ছিল তাদের !
ভগবান বুদ্ধকে রাজশক্তি এবং ব্রাহ্মণ্যশক্তির বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়তে হয়েছিল ৷ বিশেষত: বুদ্ধ পরবর্তীরা যাতে তাঁর প্রচারিত আদর্শকে ধরে রাখতে পারে – তাই প্রয়োজন ছিল সংঘের ৷ তৎকালীন বেশকিছু রাজা বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল বটে, কিন্তু বুদ্ধ জানতেন যে সত্য, ত্যাগ, প্রেম – ইত্যাদি ধর্মের আচরণগুলি ত্যাগী সন্ন্যাসী পরম্পরাই রক্ষা করতে পারে – কোনো ভোগবাদী রাজা বা জমিদার নয় । তারা ক্ষত্রিয়শ্রেণী__ তারা সংঘ এবং সংঘের সাধু-সন্তদের রক্ষা করবে, কিন্তু ‘ধর্মাদর্শ’ রক্ষা করবে সাধুরা ৷ সেইজন্য ভগবান বুদ্ধের পর থেকেই ভারতবর্ষের নবীন অবিবাহিত ব্রহ্মচারী সন্নাসী পরম্পরার সৃষ্টি হয়েছিলো ৷ তার আগে বৈদিক ধারার সন্ন্যাস-আশ্রম ছিল ! কিন্তু সেখানে প্রথমে গুরুগৃহে ব্রহ্মচর্য, পরে সংসার জীবন বা গার্হস্থ্য, তারপর ৫০–৬০/৬৫ বছর পর্যন্ত বানপ্রস্থ, শেষে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে হোতো ৷ কিন্তু বর্তমানে যে নবীন সন্ন্যাসী পরম্পরা দেখছো, এর স্রষ্টা ভগবান বুদ্ধ ।
ঠিক এইরকমই পরিস্থিতি ছিল চৈতন্য মহাপ্রভুর সময়কালেও । তখন আবার বিদেশী (তুর্কি মুসলমান)-দের অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে । দেশে মুসলমান শাসক, দলে দলে হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হয়ে যাচ্ছে – বিশেষত: এই বাংলাদেশে(অবিভক্ত) হাবসীরা (ক্রীতদাস) ৬ মাস/১বছরের জন্য, একে অপরকে মেরে পরপর সিংহাসনে বসছে ! সে এক চরম বিশৃংখল অবস্থা ! সেই সময় সনাতন ধর্মকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই মহাপ্রভুর ধর্ম আন্দোলন ! এক্ষেত্রে সংঘশক্তির খুবই প্রয়োজন ছিল, নাহলে বিদেশী শাসক বা তাদের সাহায্যকারী দেশীয় রাজারা তাঁকে মানবে কেন ? মহাপ্রভূ যখন সদলবলে নবদ্বীপে কাজীর দরবারে হাজির হোলেন – অত লোক দেখে ভয় পেয়ে কাজী মহাপ্রভুর সঙ্গে সন্ধি করেছিল । তোমরা কি ভাবো–সেটা কাজীর মহানুভবতা ছিল ? মোটেই না !
মহাপ্রভুর মৃত্যুর ব্যাপারেও গৌড়বঙ্গের শাসককুল এবং উড়িষ্যার রাজন্যবর্গ উভয়েরই হাত (চক্রান্ত) ছিল ।
সে যাইহোক, যুগপুরুষরা জানেন__ কি কৌশলে তাঁকে কার্যোদ্ধার করতে হবে ৷ ফলে এক এক যুগে এক একরকম লীলা সংঘটিত হয়। তবে মনে রাখবে –এই যে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করা__ এটায় সামাজিক সংস্কারমূলক কাজ হয়, সমাজের অবক্ষয় রোধ করা যায়, দলবদ্ধভাবে আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠা যায় না ! ওটা individual ! অবশ্য সামাজিক কাজটাও যুগপুরুষদের আরব্ধ কাজের মধ্যে পড়ে । সমাজে এমনিতে দেখবে দলবেঁধে চুরি-ডাকাতি হোচ্ছে ৷ দলবেঁধে সেবামূলক কাজ খুবই ভালো হয় – তাই দলবেঁধে সামাজিক অনেক ভালো কাজ বা মন্দ কাজ করা যায় । কিন্তু মানুষের জীবনের যে চূড়ান্ত লক্ষ্য আত্মদর্শন – তা হয় না । মানুষের প্রকৃত আধ্যাত্মিক উত্তরণ হয় “মনে-বনে-কোনে” ।৷ মহাপ্রভুও তো বলেছিলেন –’ বহিরঙ্গে নাম সংকীর্তন, অন্তরঙ্গেই হয় প্রেম আলাপন ৷’
ভগবান বুদ্ধেরও যে সাধনা ও অর্হত্ত্বলাভ তা তো বনে-ই, নৈরঞ্জনা নদীর তীরে বোধিবৃক্ষের তলে ৷ বুদ্ধের ত্রিশরণ ছিল – ” বুদ্ধং (জীবিতং পরিয়ন্তং) শরণং গচ্ছামি, ধর্মং (জীবিতং পরিয়ন্তং) শরণং গচ্ছামি, সংঘং (জীবিতং পরিয়ন্তং) শরণং গচ্ছামি ৷৷” নারীদের তিনি প্রথমটায় সংঘে নিতে চাননি, পরে তাঁর পালিতা মা গৌতমীর অনুরোধে পৃথকভাবে নারীদের জন্যও সংঘারাম তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে পরে ওনার স্ত্রী গোপাও যোগদান করেছিল ৷ বুদ্ধের ওই যে ত্রিশরণ – এটিই পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্মের Trinity । স্বামী বিবেকানন্দও একবার বলেছিলেন যে খ্রিস্টধর্ম বৌদ্ধধর্মের-ই একটা শাখা ।
(এরপর গুরুমহারাজ পালি ভাষায় বুদ্ধের নানা শিক্ষার কথা বলে যেতে শুরু করলেন । তারপর আবার বাংলায় বলতে শুরু করলেন –)। ভগবান বুদ্ধ সারাজীবনে ছোট ছোট গল্পের মাধ্যমে শিষ্যদের বহু শিক্ষা দিয়েছেন, যে গুলিকে জাতকের গল্প বলা হয়– কিন্তু তিনি শেষ বয়সে এসে, তাঁর পার্ষদদের ডেকে বললেন, “আমাকে দ্যাখো, আমার মতো হও ।”
দ্যাখো, পরবর্তীকালে আমরা যীশুকেঐ দেখছি একই কথা বলতে__ ” Follow me “৷ (এরপর গুরুজী ইংরাজীতে বাইবেলের কিছু উদ্ধৃতি দিলেন ৷ কোনো কলকাতার ভক্ত বললো, ” গুরুজী, যীশুর কথা আপনি হিব্রু বা অ্যারামাইকে বলুন – গুরুমহারাজ তাও বললেন । তারপর চুপ করে গেলেন । অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর উপরে উঠে ঘরে চলে গেলেন ।)
