জিজ্ঞাসু :– কথায় বলা হয়, “বেদ-বেদান্ত”, আচ্ছা গুরু মহারাজ_ এই দুটি কি একই ?
গুরু মহারাজ :– কি জানি_কেমন শিক্ষিত তোমরা ? এইগুলিও জানো না ? ভারতবর্ষের প্রাচীন ঋষিদের উপলব্ধ সত্যের লিখিত সংকলন‌ই হোলো আজকের চারটি বেদ__ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব ! আর বেদের অন্ত__ বেদান্ত, অর্থাৎ বেদের সারভাগ হোলো বেদান্ত । প্রত্যেক বেদের চারটি করে অংশ – মন্ত্র, সংহিতা, ব্রাহ্মণ ও আরণ্যক । আবার এমনও বলা হয়, বেদের তিনটি ভাগ – মন্ত্র, কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড, যা আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানভান্ডার বা এই তিনটি ভাগকে বলা যায় যথাক্রমে__জড়বিদ্যা, মনোবিদ্যা ও প্রাণবিদ্যা-র শিক্ষা সংক্রান্ত গ্রন্থ ৷ আরণ্যক বা জ্ঞানকাণ্ড হোলো বেদের আধ্যাত্মিক অংশ, এই প্রাণবিদ্যা সংক্রান্ত শিক্ষাই বেদান্ত বা উপনিষদ ৷
বেদ কথাটি এসেছে বিদ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ জানা/জ্ঞান ৷ সাধারণ মানুষ যে যেটুকু জানে সেটাকেই সে ‘জ্ঞান’ ভেবে বসে থাকে ৷ কিন্তু কোনো ব্যক্তির যে ‘জ্ঞান’__ তা তো ধার করা জ্ঞান । অর্থাৎ সেই ব্যক্তি যেটা জেনেছে সেটা অন্য কেউ আগে থেকেই জেনেছিল, তার কাছ থেকে শেখা জ্ঞান ! সেটা হয় কারো লেখা বই পড়ে, নয় কারো কাছ থেকে কথা শুনে অথবা জীবন সংগ্রামে ঠকে ঠকে শেখা – এসবই অপরের কাছ থেকে ধার করা জ্ঞান ৷
কিন্তু ঋষিদের জ্ঞান সাধনলব্ধ অর্থাৎ উপলব্ধ-জ্ঞান ! এটাকেই বলা হয়_ “বোধ” । এই জ্ঞান মৌলিক, কারো কাছ থেকে ধার করা নয় । ভারতীয় ঋষিদের এক একজন জন্ম-জন্মান্তর ধরে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়ে নীরবে-নিভৃতে সাধনা করে গেছেন । ধ্যানের গভীরে, জ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করে তুলে এনেছেন একটি একটি করে সমগ্র জগৎ-সংসারের জ্ঞানের বীজ । এনারাই হোলেন ঋষি ! ঋষিদের এই সাধনলব্ধ জ্ঞান বা “বোধে”-র কথাগুলি যখন তিনি তাঁর শিষ্যদেরকে বলতেন__তখন এই পরমজ্ঞান বা ‘বোধ’, শ্রুতি-র আকারে শিষ্যদের কাছে আসতো ! এইভাবে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মুখে মুখে সেই উপলব্ধ-জ্ঞানের শিক্ষা চলতো । এইজন্যেই বেদের (এই জ্ঞান সমূহের) আর একটা নাম হয়েছিল ‘শ্রুতি’ ৷ বেদ-সৃষ্টির বহু হাজার বছর পর ব্যাসদেব বা বেদব্যাস ঋষিদের সেই উপলব্ধ জ্ঞানরাশিকে গ্রন্থভুক্ত করেছিলেন এবং চারভাগে ভাগ করেছিলেন___ঋক,সাম,যজু ও অথর্ব।৷
জিজ্ঞাসু :– তাহলে সাধারণভাবে আমরা যেটা ‘জ্ঞান’ মনে করি, সেটা কি ‘জ্ঞান’– নয় ?
গুরুমহারাজ :– কেন নয় ? যে কোনো বস্তু বা বিষয় সম্বন্ধে গভীরভাবে জানা-ই তো ‘জ্ঞান’, সেগুলি সম্বন্ধে বিশেষভাবে জানা –’বিজ্ঞান’, আর জ্ঞানের বোধ হলে বলা হয় ‘প্রজ্ঞান’।
জগৎজ্ঞান আর ঈশ্বরজ্ঞান – শাস্ত্রে এই দুটিকেই অপরাজ্ঞান এবং পরাজ্ঞান বলা হয়েছে । ব্রহ্ম-ই সব হয়েছেন, তাই জগৎ-জীবন-ঈশ্বর সবই ব্রহ্ম । জগৎজ্ঞান পরোক্ষ এবং ব্রহ্মজ্ঞান অপোরক্ষ ।
প্রাচীনকালে একমাত্র মিথিলারাজ জনক‌ই অপরোক্ষ-বিদ্যারূপ আত্মতত্ত্ব বা ব্রহ্মতত্ত্ব শিক্ষাদানের জন্য উপযুক্ত গুরু হিসাবে সকলের কাছে সুবিদিত ছিলেন কিন্তু এই বিদ্যাদানের জন্য তিনি উপযুক্ত শিষ্য পাচ্ছিলেন না (ভারতীয় শাস্ত্র অনুযায়ী__যে কোনো বিদ্যায় পারদর্শী ব্যক্তি যদি তার বিদ্যা অপর অন্য কাউকে দান করে যেতে না পারে_তাহলে পরজন্মে তার punishment হয়) । সেইসময় ব্যাসদেব, তাঁর পুত্র শুকদেবকে পরম্পরাগত বিদ্যার শিক্ষা দিচ্ছিলেন । সেই শিক্ষা সমাপ্ত হোলে তিনি শুকদেবকে পাঠিয়েছিলেন রাজা জনকের দরবারে ব্রহ্মবিদ্যা শিক্ষার জন্য ৷
শুকদেব জন্ম থেকেই সিদ্ধ ছিলেন, তাছাড়া ব্যাসদেব তাঁর যাবতীয় জগৎজ্ঞান শুকদেবকে দান করেছিলেন ! তাই তিনি জানতেন, শুকদেব যদি রাজা জনকের কাছে ব্রহ্মবিদ্যার পাঠ সম্পূর্ণ করতে পারেন__তাহলে তিনি অবশ্যই পূর্ণজ্ঞানী হয়ে উঠতে পারবেন । সেইজন্যেই ব্যাসদেবের ঐ বিধান !
বিভিন্ন পরীক্ষার ছলে রাজর্ষি জনক‌ও শুকদেবের কাছে নানান বিদ্যালাভ করেছিলেন ! এবার রাজা জনকের আত্মবিদ্যা বা ব্রহ্মবিদ্যা প্রদানের পালা !
‘অধ্যাত্মবিদ্যা’ কথাটির অর্থ__ “অধিত আত্মবিদ্যা”, অর্থাৎ এটি সেই বিদ্যা_ যা মানুষের চেতনাকে সম্পূর্ণরূপে উৎকর্ষতা দান করে । যাইহোক, এবার শুকদেব রাজা জনকের কাছে ব্রহ্মবিদ্যা বা আত্মজ্ঞান শিক্ষার পাঠ গ্রহণ করতে চাইলে, রাজর্ষি বলে বসলেন – “আগে গুরুদক্ষিণা দাও “! ___এ কেমন কথা ! গুরুই হোলো না, তাহলে গুরুদক্ষিণার প্রশ্ন কেন ? রাজর্ষি জনক‌ উত্তর দিলেন – ” হে ব্রহ্মচারী ! আত্মজ্ঞান লাভ হওয়া মানেই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ । আর তখন সবই ব্রহ্মময়, তখন আর দ্বৈত বা বহুত্ব কোথায় ? তখন সবাই সমান, সবাই এক ৷ তখন কি আর তোমার মধ্যে গুরু-শিষ্যের ভেদ থাকবে ? তাই গুরুদক্ষিণা আগেই দিয়ে দাও ।” রাজা জনকের বিলাসবহুল রাজ-দরবার, প্রচুর দাস-দাসী-নর্তকী, অতুল ঐশ্বর্য __এইসব দেখে ব্রহ্মচারী শুকদেবের, তাঁকে গুরু-ত্বে বরণ করার ব্যাপারে হয়তো একটু সংশয় ছিল – কিন্তু ওই কথার পর আর তাঁর মনে কোনো সংশয় থাকলো না । তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, তাঁর গুরু একজন যথার্থ ব্রহ্মজ্ঞানী !
বেদাদি-শাস্ত্র জগৎজ্ঞানকে “জগৎকারা বৃত্তি” এবং পরাজ্ঞানকে “ব্রহ্মকারা বৃত্তি” বলেছে ৷ শুকদেব, রাজা জনকের কাছে এসেছিলেন “ব্রহ্মকারা বৃত্তি” লাভের জন্য !.{এইদিন গুরু মহারাজ বলেছিলেন_’শুকদেবের কাছেও রাজা জনক অনেক কিছুই শিখেছিলেন। তরুণ ব্রহ্মচারীর নিষ্ঠা,সংযম, চিত্তের অবিচলতা ইত্যাদি দেখে উনি শুকদেবকে দন্ডবৎ প্রনাম‌ও করেছিলেন।’অর্থাৎ এক কথায় বলা যায়__উভয়েই ছিলেন উভয়ের গুরু! }… [বাকি অংশ পরের দিন]!