শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের নিয়ে কিছু কথা আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখন আমরা ছিলাম ‘বাউলবাবা’ স্বামী ভাগবতানন্দ মহারাজের কথায়। এই যে ওনাকে বারবার ‘বাউলবাবা’ বলা হোচ্ছে – সত্যি সত্যি কিন্তু উনি বাউল গানটা খুবই ভালো করেন। আমার মনে আছে – বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে যখন ফাল্গুন সংক্রান্তির উৎসব হোতো এবং পশ্চিমবাংলার বিখ্যাত বিখ্যাত বাউলেরা হাজির হোতো বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের স্টেজে – সেই সময়ের কথা ! তখন সারাদিনই কোনো না কোনো লোকাল শিল্পীর গান-বাজনা হোতো, কিন্তু সন্ধ্যার সময় থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলতো নামকরা বাউলদের সংগীত পরিবেশন!
সেই সময় দেখতাম – ‘বাউলবাবা’ স্বামী ভাগবতানন্দ ওই সংগীতের মঞ্চেই একটা একতারা নিয়ে বসে থাকতেন, তিনি নিজেও গান গাইতেন – আবার অন্যেরা গান গাইলে তাদের সাথে সঙ্গত করতেন। কিন্তু যেটা বলার জন্য এতোটা উপক্রমণিকা, সেটা হোলো – ঐসময় দেখতাম, যেকোনো নামকরা শিল্পীরা স্টেজে গান গাইতে শুরু করার আগে ভাগবতানন্দজীকে প্রণাম করে – তারপর তার গান শুরু করতো৷ আমি তখন ভাবতাম যে, এরা সকলেই বোধহয় মহারাজের পূর্বপরিচিত ! কেননা – মহারাজ যেহেতু একজন বাউল শিল্পী, তাই অন্যান্য বাউল শিল্পীদের তাঁকে চেনা কিছুই বিচিত্র নয়। কিন্তু পরে খবর নিয়ে জেনেছিলাম – ব্যাপারটা তা নয়। শিল্পীদের বেশিরভাগই বনগ্রাম আশ্রমে গান গাইতে আসার পর__ ওনার পরিচয় পেয়েছিলেন। আসলে ব্যাপারটা হোলো__ মহারাজ বাউলগান গাইবার সময় বাউল-তত্ত্বগুলি শ্রোতাদের বুঝিয়ে বুঝিয়ে বলতেন, তারপর আবার গান গাইতেন, তাছাড়াও যেহেতু উনি একজন সন্ন্যাসী_তাই ভক্তিতে বা শ্রদ্ধাতেই বাউল শিল্পীরা ওনার পায়ে মাথা ঠেকাতো !
এই যে প্রতিটি বাউল গানের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা উনি গাইতে গাইতে সকলকে উদ্দেশ্য করে বুঝিয়ে বলতেন – এগুলি গুরুমহারাজেরই ব্যাখ্যা ! এই ব্যাখাগুলি গুরুমহারাজ সিটিং-এ সবার সামনেই আলোচনা করতেন! হয়তো কিছু কিছু তত্ত্ব উনি ভাগবতানন্দ মহারাজকে আলাদা করেও বলতেন।
এখন আপনারাও নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছেন অন্যান্য বাউল শিল্পীদের মহারাজের প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের আসল কারণটা কি ! দেখুন__ গুরুমহারাজের কথা সবসময়েই যে কোনো মানুষের কাছে নতুন লাগে, অদ্ভুত লাগে__ শুনে মনে হয় – এমন কথা তো আগে কখনো শুনিনি ! তাই ভাগবতানন্দের মুখে প্রাচীন বাউলগানগুলির নতুন আঙ্গিকের ব্যাখ্যা শুনে অন্যান্য বাউল শিল্পীরাও মোহিত হয়ে যেতেন ! তাই তারা মহারাজের সান্নিধ্যে কিছুক্ষণ থাকতে ভালবাসতো, নতুন নতুন ব্যাখ্যাসমূহ শুনতে চাইতো ! এইভাবেই বিভিন্ন বাউল শিল্পীদের কাছে মহারাজ খুবই সম্মানীয় ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত হোতেন !
যাইহোক, এগুলি আমাদের অনেক পরের আলোচনার কথা। আমরা আগের আলোচনা আগেই সেরে নিতে চাই – তাই আমরা ফিরে যাবো সেই রাত্রে গুরুমহারাজের ছোট্ট কুটিয়ায়, যেখানে গুরুমহারাজের সাথে ভাগবতানন্দ মহারাজের একান্তে কথা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজের কাছ থেকে সেই রাত্রেই দীক্ষামন্ত্র পেয়েছিলেন উনি এবং পেয়েছিলেন জীবনপথে এগিয়ে চলার পথনির্দেশ ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – সাধুসঙ্গ করার কথা ! আর ভাগবতানন্দ মহারাজের জীবনে ওটার সংযোগ খুব শীঘ্রই ঘটেছিল। বনগ্রাম থেকে কলকাতায় ফিরে যাবার কিছুদিন পরেই মহারাজের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণী মন্দির প্রাঙ্গণে দেখা হয়েছিল একজন বৈষ্ণব-সম্প্রদায়ভুক্ত সন্ন্যাসীর। তাঁর নাম ছিল স্বামী চৈতন্যানন্দ ! সাধুবাবা একাধারে যেমন প্রেমিক স্বভাবের ছিলেন, তেমনই সংস্কারমুক্তও ছিলেন। প্রথম আলাপেই ওনাদের মধ্যে একটা সুসম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে ঐ সাধুবাবা, মহারাজকে ওনার ‘বালি’-তে যে আশ্রম রয়েছে – সে কথা উল্লেখ করে ওখানে যাবার জন্য আমন্ত্রণ করেছিলেন।
ভাগবতানন্দ মহারাজ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চৈতন্যানন্দ মহারাজের বালি-আশ্রমে যাননি। বেশ কয়েকমাস বাউলভাবে এখানে ওখানে ঘুরতে ঘুরতে একদিন হঠাৎ করে চৈতনানন্দের আশ্রমে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। যাবার পর থেকেই শুরু হয়েছিল সৎসঙ্গ ! দীর্ঘ সৎসঙ্গের পর নৈশ খাওয়া-দাওয়া এবং সকলে মিলে একটাই বড় ঘরে বিশ্রামের ব্যবস্থা ! ওখানে দু-একদিন কাটানোর পর সেই সাধুবাবা (চৈতন্যানন্দ) মহারাজকে বলেছিলেন – ” আমার সাথে ঘুরলে তোমার কিছু হবে না। তোমার গুরুর তোমাকে নিয়ে আলাদা কিছু কাজ রয়েছে !”
বহু পরে ভাগবতানন্দ মহারাজ যখন গুরুমহারাজের কাছে স্বামী চৈতন্যানন্দের কথা তুলেছিলেন, তখন গুরু মহারাজ বলেছিলেন – ” ওনাকে আমি জানি !” তার মানেটা হোল এই – যতদিন না ভাগবতানন্দ মহারাজ পাকাপাকিভাবে গুরুমহারাজের কাছে এসেছিলেন – ততদিন গুরুমহারাজেরই নির্ধারিত লোক মহারাজের দেখভাল করছিল ! [ক্রমশঃ]