জিজ্ঞাসু :– প্রকৃতিতে মেঘে যে বজ্রবিদ্যুৎ দেখা যায়, সেখান থেকেই কি বিদ্যুতের Concept পেয়েছিল মানুষ ? আমি একবার পড়েছিলাম এক বিজ্ঞানী ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে বিদ্যুতের ক্রিয়া অনুভব করে – আর তারপর থেকেই গবেষণা শুরু হয় ?
গুরুমহারাজ :– হ্যাঁ, ওইরকম একটা ঘটনার কথা রয়েছে ৷ বিদ্যুৎ বা Electricity হোচ্ছে Electron-এর প্রবাহ । যে কোনো বস্তুকে ভাঙলে পাওয়া যায় অনু, আর অনুকে ভাঙলে পাওয়া যায় পরমাণু ৷ এবার পরমাণুকে ভাঙলে পাওয়া যায় ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন ইত্যাদি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণা । এই ইলেকট্রন যখন কোনো ধাতব পরিবাহী দিয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয় – তখনই আমরা বলি তড়িৎপ্রবাহ বা বিদ্যুৎ ৷ তুমি প্রকৃতির বজ্রবিদ্যুৎ-এর কথা বলছিলে, কিন্তু জেনে রাখবে যে__তাছাড়াও প্রকৃতিতে নানাভাবে বিদ্যুতের সৃষ্টি হয় ।
হিমালয়ে বরফাবৃত এলাকায় হঠাৎ হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ছোটো ছোটো গাছ বা গাছের ফুলে তীব্র শক্তিসম্পন্ন Hi-Voltage-এর বিদ্যুৎ থাকে ৷ খুব ছোটোবয়সে হিমালয়ে যখন আমি দু’জন নাগাবাবার সাথে বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরছিলাম ৷ তখন আমরা যাচ্ছিলাম গোমুখের উপর দিয়ে গঙ্গার প্রকৃত উৎস সন্ধানে মানস সরোবরের পথে । আমাদের সাথে আরো কয়েকজন সাধু জুটে গেল, এদের মধ্যে গোরখপন্থী একজন সন্ন্যাসীও ছিলেন ৷ ওই পথে এক জায়গায় পৌঁছে আমরা দেখলাম চারিদিকে বরফাবৃত স্থানের মধ্যেই অদ্ভুত সুন্দর ফুলবাহার ! কি সুন্দর তাদের বর্ণবৈচিত্র্য, আর ফুলগুলির আকারও বেশ বড়ো বড়ো । হয়তো ব্রহ্মকমলের-ই কোনো Variety, কিন্তু আমার সঙ্গের সাধুরা ঐ ফুলগুলিকে বলছিল ‘পারিজাত’। ওরা আরও বলছিলো_’এগুলিই স্বর্গের দেবতাদের প্রিয় সেই বিখ্যাত পারিজাত পুস্প’ ! দীর্ঘ যাত্রাপথে শুধু বরফ আর বরফ, অত উঁচুতে যেখানে অক্সিজেনের অভাবে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়াই কষ্টের, সেখানে হঠাৎ করে ঐরকম একটা সৌন্দর্যের প্রকাশ দেখলে মানুষের মন কি নেচে উঠবে না ? সাধুরাও তাই করে, ঈশ্বরের মহিমার কথা স্মরণ করে(ঐরকম স্থানে এইরূপ ফুলবাহার দেখে) বিভিন্ন মত বা পথের সাধু-সন্তরা উচ্চৈঃস্বরে ঈশ্বরের গুণগান করতে করতে নাচে মাতোয়ারা হয়ে যায় ! এমনিতে সাধুসমাজে হিমালয়ের কোনো গাছ-ফুল-পাতায় হাত দেবার ব্যাপারে নিষেধ রয়েছে কিন্তু সেদিন ওই গোরখপন্থী সাধুটি নিজের আবেগ রাখতে পারলেন না – একটা ফুলকে স্পর্শ করে ফেললেন ৷ ব্যস্, সাথে সাথেই তিনি যন্ত্রণায় চিৎকার করেই ছিটকে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন । আমরা তাকিয়ে দেখি – সর্বনাশ যা হবার ততক্ষণে হয়ে গেছে ! সাধুটির হঠাৎ ঐ আর্তচিৎকার নাগাসন্ন্যাসীরা তাড়াতাড়ি এসে__ নানারকম ক্রিয়ার দ্বারা সাধুটির প্রাণ রক্ষা করলো বটে, কিন্তু যে হাত দিয়ে উনি ফুলটা ছুঁয়েছিলেন__ সেই হাতটা বেগুনপোড়ার মত পুড়ে কালো হয়ে গেল ! দু-এক দিনের মধ্যেই ঐ হাতটির ছাল-চামড়া ছেড়ে ছেড়ে পড়তে থাকলো !
গোমুখের উপর দিয়ে, গঙ্গার প্রকৃত উৎসমুখ ধরে যাত্রাপথ খুবই দুর্গম এবং নানানভাবে বিপদসংকুল । এই পথে কতো সাধুর যে প্রাণ গিয়েছে তার ইয়ত্তা নাই । এই সাধুটিরও তাই হোত ৷ ওখানকার স্থানীয় ‘কহাবত’- আছে__’যেহেতু এই ফুলগুলি স্বর্গীয় ফুল, তাই পৃথিবীর মানুষের এগুলি স্পর্শ করা উচিত নয়’ ! আমরা এসব কথা সবাই জানতাম, গোরোখপন্থী সাধুটিও জানতেন কিন্তু তাৎক্ষণিক উচ্ছ্বাসে হাত দিয়ে ফেলেছিলেন ৷
সাধুটি গোরক্ষনাথপন্থী হওয়ায় যোগবিদ্যায় উনি খুবই উন্নত ছিলেন ৷ অবশ্য যোগ-সিদ্ধ না হোলে এই পথে কেউই যেতে পারে না । যাইহোক, ঐরকম একটা শারীরিক অবস্থা নিয়েই সাধুটি আমাদের সাথে হাঁটতে লাগলেন এবং শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ কৈলাস_ মানসসরোবর পরিক্রমা সম্পূর্ণ করলেন ৷ কিন্তু যখন আমরা আবার গঙ্গোত্রীতে ফিরে এলাম ততদিনে ওনার হাতে গ্যাংগ্রিন হয়ে গেছিলো । পরে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে হাতটা কেটে বাদ দিতে হয়েছিল । যাইহোক, তাহলে বুঝতে পারলে তো কিরকম কারেন্ট তৈরি হয়েছিল ওখানে !
এছাড়াও সমুদ্রের ঢেউয়ে ঢেউয়ে এক ধরনের তীব্র বিদ্যুৎ তৈরি হয় ৷ এখানেও ইলেকট্রনের প্রবাহ তৈরি হয়ে একটা Circle করে ঘুরে বেড়ায় ঢেউয়ের মাথায় মাথায় । সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে অনেক পর্যটকেরই এতে আটকে পড়ে মৃত্যু ঘটে গেছে ৷ অবশ্য সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে চোরাস্রোতে বা Under Current-এ পড়েও অনেকে মারা পরে ৷ আবার জানো__অনেক সামুদ্রিক মাছ রয়েছে যারা তাদের শরীরেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে । এর সাহায্যে তারা আত্মরক্ষাও যেমন করে, তেমনি শিকারও করতে পারে ।
হিমালয়ে আমার সামনে গোরক্ষনাথপন্থী সাধুটির যে ফুলগুলিতে হাত দিয়ে ঐরূপ হয়েছিল, আমি ঐ ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই, ওখানে যারা ছিল তাদের অলক্ষে ঐ ফুলটাতেই হাত দিয়েছিলাম –তবে আমার কিন্তু কিছুই হোলো না ! পরে আমি ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করে দেখেছিলাম___ ‘ওই যে কথা (কহাবত্) চালু রয়েছে যে, স্বর্গের জন্য সৃষ্ট ফুলের গায়ে পৃথিবীর মানুষ হাত দিতে পারবে না__অর্থাৎ পার্থিব ভাবনায় ভাবিত মানুষদের কথা বলা হয়েছে ! তাছাড়া, ব্যাপারটার মধ্যে যে বিজ্ঞান রয়েছে সেটা হোলো – বরফে যখন সূর্যালোক পড়ে তখন অতিবেগুনি রশ্মি(ultra violet ray)-র প্রভাবে অনেক সময় জল H+ ও OH- আয়নে ভেঙে যায় । ফলে সাময়িকভাবে তীব্র বিদ্যুৎশক্তি সৃষ্টি হয়, কিন্তু সেটা আবার কোনো কারণে Earthing হয়ে গেলেই তা Neutral হয়ে যায় ৷
ওই গোরোখপন্থী সাধুটি যেইমাত্র ফুলটা Touch করেছিলো_ সেই মুহুর্তেই Earthing হয়ে গেছিলো, তাই তারপরে আমি যখন হাত দিয়েছিলাম, তখন আমার কোনো ক্ষতি হয়নি ।