[কাজের কাজটি কি?__ এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে গুরু মহারাজ ত্রৈলঙ্গ স্বামীর কথা বলেছিলেন। আজ তার পরবর্ত্তী অংশ!]
…..সেই অর্থে ‘ঈশ্বর প্রীত্যর্থে কর্মই ‘যোগ’। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের কথা জানো তো ? কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষে যুধিষ্ঠির খুব বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন ৷ এতো রক্তপাত, এতো হিংসা বিশেষত: আত্মীয়-স্বজন, গুরুজনদের হত্যাজনিত পাপ ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিধান দিয়েছিলেন রাজসূয় যজ্ঞ করার ৷ সেইমতো সমস্ত আয়োজন করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ঋষি, মুনি, সাধু-মহাত্মা, ব্রাহ্মণ-ইতর জনেদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হয়েছে যজ্ঞস্থলে ৷ সাতদিন ধরে দেদার খাওয়া-দাওয়া, দান-ধ্যান, যজ্ঞাদি চলছে তো চলছেই । উপস্থিত সকলেই ‘ধন্য – ধন্য’ করছে । এবার রাজসূয় যজ্ঞ শেষ – শুধু বাকি পূর্ণাহুতি দেওয়া । এমন সময় কোথা থেকে এক অদ্ভুত দর্শন নেউল এসে হাজির । অদ্ভুত দর্শন অর্থে – তার অর্ধেক শরীর সোনার আর অর্ধেকটা সাধারণ । যজ্ঞস্থলে পৌঁছেই সে মানুষের গলায় বলে উঠলো, ” দাঁড়াও ! আমি আগে এই যজ্ঞস্থলে গড়াগড়ি দিয়ে দেখি আমার শরীরের পরিবর্তন হয় কি না !” এই বলে সে গড়াগড়ি দিতে লাগল । কিছুক্ষণ গড়াগড়ি দেবার পর নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে নেউলটি বলে উঠল, ” এ যজ্ঞ যজ্ঞ-ই নয়, এ যজ্ঞ সেই যজ্ঞের মতন নয় !” উপস্থিত সকলে এই ঘটনা দেখে অবাক ! যুধিষ্ঠির পূর্ণাহুতি ফেলে রেখে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – ব্যাপারটা কি ? ভগবান সব কান্ড বসে বসে দেখছিলেন আর মৃদু মৃদু হাসছিলেন । তিনি বললেন, ” ওই নেউলকেই জিজ্ঞাসা করো – ওই সব উত্তর দেবে ৷”
নেউলকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলতে শুরু করল – ” সত্যযুগে একবার এক অঞ্চলে ঈশ্বর অপ্রসন্ন হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো বৃষ্টিপাত হচ্ছিলো না । ফলে প্রায় সাত বছর ধরে সেখানে চলছিল দুর্ভিক্ষ । বহু মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা, খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে মারা পড়ছিল । মানুষ এত কষ্টে থাকা সত্বেও সেখানে ভগবৎ প্রীত্যর্থে কোনো কর্মই হচ্ছিলো না । তবু জীবজগতের অসহায় আকুল আর্তনাদে করুণার্দ হয়ে ঈশ্বরের অবতরণ হোলো । ‘নারায়ণ’ নাম নিয়ে এক ব্রাহ্মণের রূপ ধরে গৈরিক পোষাকে তিনি ভিক্ষার নিমিত্ত বাড়ী বাড়ী ঘুরছিলেন ৷ এই প্রথম পৃথিবীতে ঈশ্বরের অবতরণ হয়েছিল তাই ‘ভগবান নারায়ন’ । সেই প্রথম গেরুয়া পোষাক তাই গেরুয়াকে ‘ভগোয়া’ বলা হয়, ‘ভগোয়া’ অর্থে ‘ভগবানের বস্ত্র’ । আর যেহেতু গেরুয়া কাপড় পড়ে সন্ন্যাসীর বেশ ধরেছিলেন – তাই একজন সন্ন্যাসীর সাথে অন্য সন্ন্যাসীর দেখা হলে পরস্পর পরস্পরকে সম্বোধন করে “নমো নারায়নঃ”।
যাইহোক, সেই অঞ্চলে এক ব্রাহ্মণ পরিবার বাস করতো । ব্রাহ্মণ ভিক্ষাবৃত্তির দ্বারা দেবসেবা এবং স্ত্রী-পুত্র-কন্যার প্রতিপালন কোরতো । সেই সময় যেহেতু দুর্ভিক্ষ চলছিল তাই ব্রাহ্মণ সাতদিন কোনো ভিক্ষা পায় নি, ফলে তার আরাধ্য দেবতাও উপবাসী ছিলেন ! আর তার সাথে সাথে পরিবারের সকলেও সাতদিন ধরে কিছুই খাবার পায়নি ৷ সেদিনও ব্রাহ্মণ সকাল থেকে ঘুরে ঘুরে খালি হাতেই ফিরছিল, হঠাৎ এক জায়গায় একটা মরে যাওয়া গাছের কোঠরে দেখে একমুঠো যব রয়েছে । হয়তো পাখিরা সঞ্চয় করেছিল – পরে তারা বাঁচার জন্য অন্যত্র চলে যায় । সেই একমুঠো যব বস্ত্রাঞ্চলে যত্ন করে বেঁধে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলো ব্রাহ্মণ ৷ ব্রাহ্মণীকে তাড়াতাড়ি ঐগুলো গুঁড়ো করে জলে গুলে মন্ড বানিয়ে দেবতাকে নিবেদন করার ব্যবস্থা করতে বলে নিকটস্থ নদীতে স্নান করতে গেলেন ব্রাহ্মণ । ব্রাহ্মণী তাড়াতাড়ি সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবতার কাছে নৈবেদ্য সাজিয়ে রাখলে, ব্রাহ্মণ এসে সেগুলি দেবতাকে নিবেদন করলেন । তারপর – সাতদিন পর ক্ষুধাতুর ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের মুখে একটু যবগোলা(মন্ড) তুলে দেবার জন্য ব্যাকুলা ব্রাহ্মণী চারভাগে ভাগ করে সকলকে পরিবেশন করলো । সবে ব্রাহ্মণ গণ্ডূষ করে মুখে দিতে যাবে – এমন সময় ব্রাহ্মণবেশী ভগবান ‘নারায়ণ’ – “ভবতু ভিক্ষাং দেহী মাতঃ”- বলে দোরগোড়ায় হাজির !
ব্রাহ্মণ তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে অতিথি ব্রাহ্মণকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে এসে আসন পেতে বসালো । তারপর তার হাত-পা ধুইয়ে দিয়ে তার নিজের জন্য নির্দিষ্ট যবের ভাগটি অতিথি ব্রাহ্মণকে খেতে দিল ৷ ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ এক গ্রাসে তা খেয়ে নিয়ে গৃহকর্তার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে রয়েছে দেখে ব্রাহ্মণীও তার ভাগের যবের মণ্ডটি ব্রাহ্মণকে দিয়ে দিল । সেটিকেও মুহূর্তের মধ্যে খেয়ে নিয়েও যখন সেই ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণ আবার খাবারের যাচঞা করল, তখন অতিথির মান রক্ষার্থে ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী তাদের পুত্র-কন্যার জন্য নির্দিষ্ট করে রেখে দেওয়া খাবারও সেই ভিখারিবেশী নারায়ণকে দিয়ে দিল ৷ সব খাবারটা খাবার খেয়ে এক লোটা জল খেয়ে__ পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন ছদ্মবেশী ভগবান । সঙ্গে সঙ্গে সেই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টির অবসান হোলো ৷ আকাশ কালো হয়ে মেঘ করে এলো এবং শুরু হোলো ঝমঝম্ করে বৃষ্টিপাত । কিন্তু দীর্ঘ সাতদিনের অনাহারে সেই মুহূর্তেই একে একে পুত্র-কন্যাসহ ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীর শরীরপাত হয়ে গেলো ভগবান নারায়ণের কোলে ৷ ভগবান চতুর্ভূজ নারায়ণের রূপ পরিগ্রহ করে তাদেরকে নিয়ে চিন্ময়ধামে চলে গেলেন ।
সেই গৃহেরই আশেপাশে এই নকুলটি থাকতো ৷ সে এইরূপ অদ্ভুত আত্মত্যাগের পুরো ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে আনন্দে সেইখানে এসে গড়াগড়ি দিতে থাকলো । ভগবানের মুখ থেকে যে দু’এককণা খাদ্য পড়েছিল, তার স্পর্শেই হোক_ বা স্থানমাহাত্ম্যেই হোক – তৎক্ষণাৎ নেউলটির শরীর অর্ধেক সোনা হয়ে গেল এবং সে মৃত্যুরহিত হয়ে গেল ! তাছাড়াও তার মানুষের মতো কথা বলার শক্তিলাভ হয়ে গেলো । তখন থেকে ওই নেউল হিমালয়ে বিভিন্ন সাধুসঙ্গ করে বেড়াতো এবং সাধু-মহাত্মাদের কাছেই বসবাস করতো । আর যেখানে কোনো বড় যজ্ঞ হোতো, সেখানেই সে এসে উপস্থিত হয়ে একবার করে গড়াগড়ি দিতো – যদি তার গায়ের বাকী অর্ধেক অংশ সোনা হয়ে যায় ! কিন্তু আজ পর্যন্ত কোথাও হয় নি । তারপর সে যখন খবর পেলো, যে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতিতে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করছে এবং ভারতবর্ষের বড় বড় সাধু, সন্ত, মহাত্মা, ঋষি-মুনিরা সেখানে নিমন্ত্রিত হয়েছে । তাছাড়া সকলেই দান গ্রহণ করে ধন্য ধন্য করছে – তাই সে ঐ যজ্ঞস্থলে না এসে পারেনি । সে ভেবেছিল এবার এই যজ্ঞস্থলে গড়াগড়ি দিলে নিশ্চয়ই তার শরীরের বাকী অংশ সোনা হয়ে যাবে । কিন্তু তার বাকি অঙ্গ যখন সোনা হোলো না, তখন সে বুঝলো এ যজ্ঞ ঠিকমতো হয়নি অর্থাৎ এতে ভগবান প্রসন্ন হয়নি ৷ এই যজ্ঞে আড়ম্বর, ধুমধাম, প্রচার বেশি হয়েছে কিন্তু ‘কাজের কাজ’-টি হয়নি । এই বলে সেই নেউল যজ্ঞস্থল ত্যাগ করে চলে গেল ৷
যুধিষ্ঠির যজ্ঞ সম্পূর্ণ করলেন বটে কিন্তু মনে কষ্ট রয়েই গেল ৷ পরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করায় ভগবান উত্তর দিয়েছিলেন যে এত বড় যজ্ঞ করে যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন সহ দ্রৌপদীরও মনে একটু একটু অহংকার জন্মেছিল – তাই এই ঘটনা ঘটিয়ে ঈশ্বর তাদের সেই অহংকারটুকুকে বিনষ্ট করলেন ! আর এতেই তাদের মঙ্গল হোলো ।
সেইজন্য বলছিলাম, বাবা ! ‘কাজের কাজ’টি করো, তাহলেই হবে ৷ কোন্ মত, কোন্ পথ, কিভাবে করছো__ সেসব বড় কথা নয়, ‘কাজের কাজ’টি করাই বড় কথা !
…..সেই অর্থে ‘ঈশ্বর প্রীত্যর্থে কর্মই ‘যোগ’। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের কথা জানো তো ? কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষে যুধিষ্ঠির খুব বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন ৷ এতো রক্তপাত, এতো হিংসা বিশেষত: আত্মীয়-স্বজন, গুরুজনদের হত্যাজনিত পাপ ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিধান দিয়েছিলেন রাজসূয় যজ্ঞ করার ৷ সেইমতো সমস্ত আয়োজন করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ঋষি, মুনি, সাধু-মহাত্মা, ব্রাহ্মণ-ইতর জনেদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হয়েছে যজ্ঞস্থলে ৷ সাতদিন ধরে দেদার খাওয়া-দাওয়া, দান-ধ্যান, যজ্ঞাদি চলছে তো চলছেই । উপস্থিত সকলেই ‘ধন্য – ধন্য’ করছে । এবার রাজসূয় যজ্ঞ শেষ – শুধু বাকি পূর্ণাহুতি দেওয়া । এমন সময় কোথা থেকে এক অদ্ভুত দর্শন নেউল এসে হাজির । অদ্ভুত দর্শন অর্থে – তার অর্ধেক শরীর সোনার আর অর্ধেকটা সাধারণ । যজ্ঞস্থলে পৌঁছেই সে মানুষের গলায় বলে উঠলো, ” দাঁড়াও ! আমি আগে এই যজ্ঞস্থলে গড়াগড়ি দিয়ে দেখি আমার শরীরের পরিবর্তন হয় কি না !” এই বলে সে গড়াগড়ি দিতে লাগল । কিছুক্ষণ গড়াগড়ি দেবার পর নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে নেউলটি বলে উঠল, ” এ যজ্ঞ যজ্ঞ-ই নয়, এ যজ্ঞ সেই যজ্ঞের মতন নয় !” উপস্থিত সকলে এই ঘটনা দেখে অবাক ! যুধিষ্ঠির পূর্ণাহুতি ফেলে রেখে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – ব্যাপারটা কি ? ভগবান সব কান্ড বসে বসে দেখছিলেন আর মৃদু মৃদু হাসছিলেন । তিনি বললেন, ” ওই নেউলকেই জিজ্ঞাসা করো – ওই সব উত্তর দেবে ৷”
নেউলকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলতে শুরু করল – ” সত্যযুগে একবার এক অঞ্চলে ঈশ্বর অপ্রসন্ন হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো বৃষ্টিপাত হচ্ছিলো না । ফলে প্রায় সাত বছর ধরে সেখানে চলছিল দুর্ভিক্ষ । বহু মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা, খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে মারা পড়ছিল । মানুষ এত কষ্টে থাকা সত্বেও সেখানে ভগবৎ প্রীত্যর্থে কোনো কর্মই হচ্ছিলো না । তবু জীবজগতের অসহায় আকুল আর্তনাদে করুণার্দ হয়ে ঈশ্বরের অবতরণ হোলো । ‘নারায়ণ’ নাম নিয়ে এক ব্রাহ্মণের রূপ ধরে গৈরিক পোষাকে তিনি ভিক্ষার নিমিত্ত বাড়ী বাড়ী ঘুরছিলেন ৷ এই প্রথম পৃথিবীতে ঈশ্বরের অবতরণ হয়েছিল তাই ‘ভগবান নারায়ন’ । সেই প্রথম গেরুয়া পোষাক তাই গেরুয়াকে ‘ভগোয়া’ বলা হয়, ‘ভগোয়া’ অর্থে ‘ভগবানের বস্ত্র’ । আর যেহেতু গেরুয়া কাপড় পড়ে সন্ন্যাসীর বেশ ধরেছিলেন – তাই একজন সন্ন্যাসীর সাথে অন্য সন্ন্যাসীর দেখা হলে পরস্পর পরস্পরকে সম্বোধন করে “নমো নারায়নঃ”।
যাইহোক, সেই অঞ্চলে এক ব্রাহ্মণ পরিবার বাস করতো । ব্রাহ্মণ ভিক্ষাবৃত্তির দ্বারা দেবসেবা এবং স্ত্রী-পুত্র-কন্যার প্রতিপালন কোরতো । সেই সময় যেহেতু দুর্ভিক্ষ চলছিল তাই ব্রাহ্মণ সাতদিন কোনো ভিক্ষা পায় নি, ফলে তার আরাধ্য দেবতাও উপবাসী ছিলেন ! আর তার সাথে সাথে পরিবারের সকলেও সাতদিন ধরে কিছুই খাবার পায়নি ৷ সেদিনও ব্রাহ্মণ সকাল থেকে ঘুরে ঘুরে খালি হাতেই ফিরছিল, হঠাৎ এক জায়গায় একটা মরে যাওয়া গাছের কোঠরে দেখে একমুঠো যব রয়েছে । হয়তো পাখিরা সঞ্চয় করেছিল – পরে তারা বাঁচার জন্য অন্যত্র চলে যায় । সেই একমুঠো যব বস্ত্রাঞ্চলে যত্ন করে বেঁধে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলো ব্রাহ্মণ ৷ ব্রাহ্মণীকে তাড়াতাড়ি ঐগুলো গুঁড়ো করে জলে গুলে মন্ড বানিয়ে দেবতাকে নিবেদন করার ব্যবস্থা করতে বলে নিকটস্থ নদীতে স্নান করতে গেলেন ব্রাহ্মণ । ব্রাহ্মণী তাড়াতাড়ি সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবতার কাছে নৈবেদ্য সাজিয়ে রাখলে, ব্রাহ্মণ এসে সেগুলি দেবতাকে নিবেদন করলেন । তারপর – সাতদিন পর ক্ষুধাতুর ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের মুখে একটু যবগোলা(মন্ড) তুলে দেবার জন্য ব্যাকুলা ব্রাহ্মণী চারভাগে ভাগ করে সকলকে পরিবেশন করলো । সবে ব্রাহ্মণ গণ্ডূষ করে মুখে দিতে যাবে – এমন সময় ব্রাহ্মণবেশী ভগবান ‘নারায়ণ’ – “ভবতু ভিক্ষাং দেহী মাতঃ”- বলে দোরগোড়ায় হাজির !
ব্রাহ্মণ তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে অতিথি ব্রাহ্মণকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে এসে আসন পেতে বসালো । তারপর তার হাত-পা ধুইয়ে দিয়ে তার নিজের জন্য নির্দিষ্ট যবের ভাগটি অতিথি ব্রাহ্মণকে খেতে দিল ৷ ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ এক গ্রাসে তা খেয়ে নিয়ে গৃহকর্তার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে রয়েছে দেখে ব্রাহ্মণীও তার ভাগের যবের মণ্ডটি ব্রাহ্মণকে দিয়ে দিল । সেটিকেও মুহূর্তের মধ্যে খেয়ে নিয়েও যখন সেই ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণ আবার খাবারের যাচঞা করল, তখন অতিথির মান রক্ষার্থে ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী তাদের পুত্র-কন্যার জন্য নির্দিষ্ট করে রেখে দেওয়া খাবারও সেই ভিখারিবেশী নারায়ণকে দিয়ে দিল ৷ সব খাবারটা খাবার খেয়ে এক লোটা জল খেয়ে__ পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন ছদ্মবেশী ভগবান । সঙ্গে সঙ্গে সেই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টির অবসান হোলো ৷ আকাশ কালো হয়ে মেঘ করে এলো এবং শুরু হোলো ঝমঝম্ করে বৃষ্টিপাত । কিন্তু দীর্ঘ সাতদিনের অনাহারে সেই মুহূর্তেই একে একে পুত্র-কন্যাসহ ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীর শরীরপাত হয়ে গেলো ভগবান নারায়ণের কোলে ৷ ভগবান চতুর্ভূজ নারায়ণের রূপ পরিগ্রহ করে তাদেরকে নিয়ে চিন্ময়ধামে চলে গেলেন ।
সেই গৃহেরই আশেপাশে এই নকুলটি থাকতো ৷ সে এইরূপ অদ্ভুত আত্মত্যাগের পুরো ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে আনন্দে সেইখানে এসে গড়াগড়ি দিতে থাকলো । ভগবানের মুখ থেকে যে দু’এককণা খাদ্য পড়েছিল, তার স্পর্শেই হোক_ বা স্থানমাহাত্ম্যেই হোক – তৎক্ষণাৎ নেউলটির শরীর অর্ধেক সোনা হয়ে গেল এবং সে মৃত্যুরহিত হয়ে গেল ! তাছাড়াও তার মানুষের মতো কথা বলার শক্তিলাভ হয়ে গেলো । তখন থেকে ওই নেউল হিমালয়ে বিভিন্ন সাধুসঙ্গ করে বেড়াতো এবং সাধু-মহাত্মাদের কাছেই বসবাস করতো । আর যেখানে কোনো বড় যজ্ঞ হোতো, সেখানেই সে এসে উপস্থিত হয়ে একবার করে গড়াগড়ি দিতো – যদি তার গায়ের বাকী অর্ধেক অংশ সোনা হয়ে যায় ! কিন্তু আজ পর্যন্ত কোথাও হয় নি । তারপর সে যখন খবর পেলো, যে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতিতে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করছে এবং ভারতবর্ষের বড় বড় সাধু, সন্ত, মহাত্মা, ঋষি-মুনিরা সেখানে নিমন্ত্রিত হয়েছে । তাছাড়া সকলেই দান গ্রহণ করে ধন্য ধন্য করছে – তাই সে ঐ যজ্ঞস্থলে না এসে পারেনি । সে ভেবেছিল এবার এই যজ্ঞস্থলে গড়াগড়ি দিলে নিশ্চয়ই তার শরীরের বাকী অংশ সোনা হয়ে যাবে । কিন্তু তার বাকি অঙ্গ যখন সোনা হোলো না, তখন সে বুঝলো এ যজ্ঞ ঠিকমতো হয়নি অর্থাৎ এতে ভগবান প্রসন্ন হয়নি ৷ এই যজ্ঞে আড়ম্বর, ধুমধাম, প্রচার বেশি হয়েছে কিন্তু ‘কাজের কাজ’-টি হয়নি । এই বলে সেই নেউল যজ্ঞস্থল ত্যাগ করে চলে গেল ৷
যুধিষ্ঠির যজ্ঞ সম্পূর্ণ করলেন বটে কিন্তু মনে কষ্ট রয়েই গেল ৷ পরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করায় ভগবান উত্তর দিয়েছিলেন যে এত বড় যজ্ঞ করে যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন সহ দ্রৌপদীরও মনে একটু একটু অহংকার জন্মেছিল – তাই এই ঘটনা ঘটিয়ে ঈশ্বর তাদের সেই অহংকারটুকুকে বিনষ্ট করলেন ! আর এতেই তাদের মঙ্গল হোলো ।
সেইজন্য বলছিলাম, বাবা ! ‘কাজের কাজ’টি করো, তাহলেই হবে ৷ কোন্ মত, কোন্ পথ, কিভাবে করছো__ সেসব বড় কথা নয়, ‘কাজের কাজ’টি করাই বড় কথা !
