শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা, তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের কথা আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা এখন ছিলাম স্বামী ভাগবতানন্দের কথায়। গুরুমহারাজের নির্দেশে মহারাজ পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ! একেবারে বাউল ভ্রাম্যমান জীবন। কোনোরকম কপর্দক না নিয়ে শুধু একতারা সম্বল করে পথে পথে হাঁটা ! কিন্তু তখন যেহেতু শীতকাল ছিল – তাই এক সাধু-সাথীর পরামর্শে উনি ঐ সময়টা সাউথ ইন্ডিয়ায় কাটানোর জন্য ‘কালকা মেলে’ চড়েন, কিন্তু কোনো টিকিট ছিল না – রিজার্ভেশনের তো কোনো বালাই-ই নাই – এমনকি কোনো কামরার দরজাও খোলা পান নি। ফলে পুরো এক ঘণ্টা ওনাকে কামরার পা-দানিতে পা দিয়ে, হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে যেতে হয়েছিল। তার মানেটা হোচ্ছে এই যে, বৃন্দাবনে থাকাকালীন ওনাকে একটু একটু করে যতটা শীত বোধ করার বা ভোগ করার কথা ছিল (কারণ ওখানে থাকলে উনি যেখানেই হোক একটু আশ্রয় পেতেন, অন্ততঃ একটা কম্বল গায়ে জড়াতে পারতেন) –ঐদিন যেন এক ঘণ্টাতেই তার সবটা ভোগ করতে হয়েছিল !
দক্ষিণ ভারতেরও বেশ খানিকটা জায়গা ঐ একইভাবে ঘুরে বেরিয়ে ভাগবতানন্দ মহারাজ আবার ফিরে এসেছিলেন বনগ্রামে। কারণ ১৯৮০ সালে ধাত্রীগ্রামে গঙ্গার ধারে GBM-ইঁটভাটার শিবমন্দিরে, গুরুমহারাজ যে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য দানের ব্যবস্থা করেছিলেন – সেখানে তালিকায় ভাগবতানন্দেরও নাম ছিল। ওই ব্যাচে মুরারী মহারাজ (স্বামী নিষ্কামানন্দ), অনুপ মহারাজ (স্বামী পূর্ণানন্দ), নব মহারাজ (স্বামী অসীমানন্দ), কেশব মহারাজ (স্বামী দেবানন্দ)- প্রমুখের সাথে ওনারও ব্রহ্মচর্য সংস্কার হয়েছিল, আর তপেশ্বরানন্দ মহারাজের সন্ন্যাস‌ও হয়েছিল ঐ সময়েই। ঐ দিনে গুরুমহারাজ সকল ব্রহ্মচারীদেরকেই ‘গেরুয়া’ কাপড় পরার অনুমতি দিয়েছিলেন (তার আগে বেশিরভাগজনই সাদা কাপড় পড়তেন)। কিন্তু ভাগবতানন্দ মহারাজের কাছে গেরুয়া কাপড়টা নতুন ছিল না ! যখন থেকে গুরুমহারাজ ওনাকে পথে পথে ঘুরতে বলেছিলেন – তখন থেকেই “গেরুয়া কাপড়” পড়তেও অনুমতি দিয়েছিলেন অর্থাৎ ভাগবতানন্দ মহারাজ যখন উত্তর ভারত এবং দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করেছিলেন তখন তা করেছিলেন গেরুয়া কাপড় পড়েই।
নৈষ্ঠিক গ্রহণের পর ভাগবতানন্দ বেশ কিছুদিন বনগ্রাম আশ্রমেই ছিলেন। কিন্তু ওনার স্বভাব এবং সংস্কার ছিল সম্পূর্ণ আলাদা – তাই সবার সাথে adjust করে চলার ব্যাপারে ওনার খুবই অসুবিধা হচ্ছিলো। তাহলে ? কি করা যায় এখন ? কেন – অগতির গতি রয়েছেন তো ! গেলেন গুরুমহারাজের কাছে – বললেন মনের সব কথা ! গুরুমহারাজ বললেন, ” ঠিক আছে। তোমার সাথে রাত্রে গ্রাম থেকে ফেরার পর কথা বলব (তখন গুরুমহারাজ বনগ্রাম আশ্রমে থাকলে, প্রতি সন্ধ্যাতেই আশ্রমে প্রার্থনা হবার পর গ্রামে মুখার্জি বাড়িতে যেতেন)।” ফলে মহারাজ সেই রাত্রে আশ্রমের খেলার মাঠের মধ্যে অপেক্ষা করছিলেন – কখন গুরুমহারাজ তাঁর জোরালো টর্চের আলো ফেলে ফেলে আশ্রমের ফেরেন !
অবশেষে ওনার প্রতীক্ষার অবসান হলো। তখনকার রাত্রির বনগ্রাম !!! একেবারে অন্ধকারে ডুবে থাকা আশ্রম (কারেন্ট তো ছিলই না, তাছাড়া কেরোসিনের আলো বেশিক্ষণ জ্বালানোও তখন বিলাসিতা ছিল), আশ্রমিকরা সবাই নিজ নিজ বিশ্রামের স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন, চারিদিক নিস্তব্ধ-নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ! শুধু ঝিঁ-ঝিঁ পোকার ডাক, ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে ওঠা পাখির ডানার ঝটপটানি এবং মাঝে মাঝে পেচককুলের আর্তচিৎকার ! এইসবের মধ্যেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ! গুরুমহারাজ রাস্তা ধরে টর্চ ফেলতে ফেলতে এসে পৌঁছালেন খেলার মাঠের কাছে (তখন প্রাচীর বা গাছপালার সারি এসব ছিল না, সবটাই ফাঁকা)। ভাগবতানন্দ মহারাজ একটু এগিয়ে যেতেই গুরুমহারাজ জলদগম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন – “কে ?” মহারাজ এগিয়ে কাছাকাছি হয়ে প্রণাম করতেই উনি বললেন – ” ও – তুমি ! তোমার সাথে আমার কিছু কথা রয়েছে। দ্যাখো, একই জায়গায় তোমাদের মতো যুবক ব্রহ্মচারীদের অনেকে থাকা ভালো নয় ! কাজের চেয়ে কোন্দল বেশি হবে ! তাছাড়া আমাদের অনেক কাজ রয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন করতে হবে – আর তারজন্য কিছু শাখা আশ্রম তৈরি করতে হবে – যেখানে তোমাদের মতো যুবক ব্রহ্মচারীরা থাকবে। – তোমরাই সেগুলোর ভার নেবে এবং নিজের মতো করে চালাবে।”
ভাগবতানন্দ মহারাজ এতদুর শোনার পর বলেছিলেন – ” কিন্তু আশ্রম বানালেই তো কিছু মানুষ আসবে, তাদেরকে নিয়ে কাজ করতে হবে (সেবামূলক কাজের কথাই গুরুমহারাজ বলেছিলেন)– ফলে সেখানেও তো কোন্দল বাঁধবে। তাই আশ্রম করে কি হবে ?”
গুরুমহারাজ প্রেমপূর্ণ স্বরে উত্তর দিয়েছিলেন – ” ওইসব শাখাআশ্রমগুলি থেকে মানুষের সেবা হবে। মানুষকে ভালোবাসা আর তাদের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর জন্যই আমাদের আসা ! তাইতো আমাদের অনেকগুলি শাখা-আশ্রম বানাতে হবে।” [ক্রমশঃ]