শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত, শিষ্য ও পার্ষদদের কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখন আমরা ছিলাম গুরুমহারাজের ত্যাগী-ভক্ত ও সন্ন্যাসী সন্তান স্বামী ভাগবতানন্দের কথায়। ওনারা (স্বামী সত্যানন্দ ও স্বামী ভাগবতানন্দ) যখন প্রথমবারের জন্য বনগ্রাম আশ্রমের বাইরে কোনো একটি শাখা আশ্রম তৈরি করার মানসে (এবং গুরুজীর নির্দেশে) মোরগ্রাম সাঁকোবাজারে ছিলেন – সেই সময়কার কথা বলা হচ্ছিলো। সেইসময় শীতের প্রারম্ভে গুরুমহারাজ ওনাদের কাছে মোরগ্রামে গিয়েছিলেন এবং ওখান থেকে সুশান্তবাবুর (যাঁর বাড়িতে ওনারা থাকতেন) বোন মেরি-দির বাড়ি আজিমগঞ্জেও গিয়েছিলেন। ওখানেই রাস্তায় একটা বিপরীত পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ আজিমগঞ্জ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতাদের (ববিন-বিষ্ণু-বিজয়) সাথে ওনার সাক্ষাৎ হয়েছিল !
পরে যখন গুরুমহারাজ মেরি-দির পরিবারের লোকেদের দিয়ে ওই তিনজনকে ধর্মালোচনায় যোগ দেবার আমন্ত্রণ করেছিলেন – ওনারা তিনজনই সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মেরি-দির বাড়ি এসেছিলেন। সেই দিনই আজিমগঞ্জের ঐ বাড়িতে তুমুল আধ্যাত্মিক বিষয়ের বাদানুবাদ হয়েছিল, বসেছিল গুরু-শিষ্যের চিরন্তন আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা-উত্তরের আসর ! আসলে তখন ওই তিনজনেই (ববিন-বিষ্ণু-বিজয়) চরমভাবে একটা মানসিক শূন্যতায় ভুগছিলেন ! সেই শূন্যতা বা অতৃপ্তির ব্যাপারটা ছিল আধ্যাত্মিক ! ওনারা প্রচুর ধর্মপুস্তক পাঠ করেছিলেন, বিভিন্ন সাধু-সন্ত-মহাপুরুষদের জীবনীও পড়েছিলেন। আর এইসব করতে গিয়েই মনে নানান সংশয়, নানান জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয়েছিল ! ওনারা সেইসব জিজ্ঞাসার উত্তর পাবার জন্য অনেক সাধু-সন্তের কাছেও গিয়েছিলেন – কিন্তু ওঁদের তিয়াসা মেটেনি। ওনারা হয়তো সেইজন্যে প্রথম দর্শনেই গুরুমহারাজকে tease করেছিলেন ! এটা করেছিলেন তাঁদের অন্তরের কষ্ট থেকেই ! আর অন্তর্যামী ভগবান ! তিনি তো সবই জানেন, সবই বোঝেন – তিনিই তো ওই যুবকদের মাধ্যমে ওই ধরনের বক্তব্য সৃষ্টি করেছিলেন – আবার তিনিই সস্নেহে তাঁর প্রিয়জনদের, তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার রূপকারদের কাছে ডেকে নিয়েছিলেন !
দেখুন ! কি আশ্চর্য এই জগৎ রহস্য, আর কি অত্যাশ্চর্য ভগবানের লীলা ! প্রথম যখন এই project-টা (বনগ্রাম আশ্রমের বাইরে কোথাও শাখা-আশ্রম প্রতিষ্ঠার project) শুরু হোলো, তার root-টা ছিল দুর্গাপুরে তৃষাণ মহারাজ, সেজো কাকা (উমাপ্রসাদ মুখার্জি) এবং সুশান্তবাবুর আলোচনার মাধ্যমে। তারপর স্বামী সত্যানন্দ এবং ভাগবতানন্দজীর মোরগ্রামে সুশান্তবাবুর বাড়িতে আসা এবং অতি কষ্ট করে প্রায় সাত-আট মাস একসাথে কাটানো, এর মাধ্যমেই স্থানীয় বহু মানুষের সাথে ওনাদের আলাপ হয়েছিল, যাদের মধ্যে অনেকেই বনগ্রাম আশ্রমের দীক্ষিত হয়েছিল এবং তারা বহুভাবে ওখানকার আশ্রমগুলি (আজিমগঞ্জ এবং রসবেরুলিয়া) স্থাপনের ব্যাপারে প্রচুর সাহায্য করেছিল। কিন্তু দেখুন – যখন প্রকৃতই গুরুমহারাজের আশ্রমগুলি (পরমানন্দ মিশনের শাখা-আশ্রমগুলি) গড়ে উঠেছিল, তখন কিন্তু সুশান্তবাবু বা মেরি-দির বাড়িতেও নয় – বা তাদেরই যে মুখ্য ভূমিকা তাও নয় ! গুরুমহারাজের লীলাখেলায় কখন যে কোন player মাঠে নেমে কসরৎ দেখাবে এবং কখন যে কোচ তাকে তুলে নিয়ে আবার নতুন কোনো player-কে মাঠে নামিয়ে গোল করাবে – সেই লীলারহস্য বোঝার সাধ্য সাধারণ মানুষের কখনোই হবে না !
সুতরাং আমরা যারা সাধারন ভক্ত, তাদের একটাই কাজ – ভগবানের লীলার ব্যাখ্যা করতে না গিয়ে, বেশি বুঝতে না গিয়ে শুধুই ‘চেয়ে থাকা’ ! লীলা ঘটনা-অঘটনের ঘনঘটায় ফেঁসে যাওয়া, আর তাতে দুঃখ পাওয়াটা নিছক আহম্মকি ছাড়া আর কিছুই হবে না। ভগবানের এই বিচিত্র লীলা শুধু প্রত্যক্ষ করে যেতে হবে এবং তাতেই আনন্দে বিভোর থাকতে হবে। আমাদের মতো সাধারন ভক্তরা শুধু এটাই করতে পারে !
তারা আরও একটা জিনিস করতে পারে – তা হোলো ভগবানের লীলাবৈচিত্র দেখে চোখের জলে বুক ভাসানো ! মনে পড়ে যাচ্ছে – শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে রয়েছে, ঠাকুর বলছেন – রামচন্দ্র যখন লঙ্কা বিজয়ের পর সসৈন্যে রাবণের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করছেন – তখন সেই শূন্যপুরীতে দেখা গেল, কেউ যেন একজন থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে। হনুমান তাকে রামের কাছে ধরে আনতেই দেখা গেল তিনি রাজমাতা অতিবৃদ্ধা নিকষা !
‘যে নারীর প্রিয় পুত্রগণ মারা পড়েছেন, বীর নাতিরাও যুদ্ধে বীরগতি লাভ করেছে – সমস্ত রাজপ্রাসাদ যেখানে মৃত্যুপুরীর ন্যায় – তবুও এই বৃদ্ধাবয়সেও তাঁর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা কেন’ –এই জিজ্ঞাসা করায় রাজমাতা নিকষা উত্তর দিয়েছিলেন – “হে রাম ! তুমি লীলাময় ! তোমার লীলার আর কতোটাই বা দেখেছি ! মনে সাধ – আরও কিছুকাল বেঁচে তোমার আরও কিছু লীলা দেখি।”
ভগবান শ্রীরামের কৃপায় নিকষার ‘জ্ঞান’ হয়েছিল ! ভগবান পরমানন্দের কৃপায় পরমানন্দ ভক্তদেরও ‘জ্ঞান’ হোক – তাঁর শ্রীচরণে এই প্রার্থনা ! [ক্রমশঃ]