শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত, শিষ্য ও পার্ষদদেরকে নিয়ে এখন এখানে আলোচনা চলছিল। আমরা আলোচনা করছিলাম গুরুমহারাজের অন্যতম এক সন্ন্যাসী সন্তান স্বামী ভাগবতানন্দজীর কথা। ভাগবতানন্দ মহারাজেরা(উনি এবং স্বামী সত্যানন্দ) যখন ১৯৮০/৮১ সালে প্রথম মোরগ্রামে গিয়েছিলেন, তখন কয়েক মাসের মধ্যেই গুরুমহারাজ ওখানে গিয়েছিলেন এবং আজিমগঞ্জের ববিনদা, বিজয়দা ও বিষ্ণুদাকে মাত্র একটা সিটিং-এর দ্বারাই প্রভাবিত করেছিলেন। ফলে ওই তিনজন এরপর থেকেই গঙ্গাতীরবর্তী স্থানে আশ্রম তৈরীর জন্য জায়গার সন্ধান শুরু করে দিয়েছিলেন। ঐ বছরেই অর্থাৎ ১৯৮১ সালে দিয়ারা মহীনগর এলাকায় জায়গা পাওয়া গিয়েছিল – যেটি আজিমগঞ্জ স্টেশন থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে এবং গঙ্গার ধারেই। যেটি পরবর্তীকালের ” কনশাস্ স্পিরিচুয়াল সেন্টার_ ” এবং যেটি আজও ভগবানের ইচ্ছানুসারে মানুষের সেবামূলক কাজ করে চলেছে।
যাইহোক আমরা এইসব কথায় পরে আসবো – আগের কথা আগেই বলে নেওয়া যাক্। নাকপুর থেকে ঘুরে আসার পর গুরুমহারাজের সাথে রাত্রিতে ভাগবতানন্দজীর দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল । ভাগবতানন্দজী সেইসময় সাধারণভাবে নারী-পুরুষের সম্পর্ক, সাধন জীবনে বাউলতত্ত্ব, রস-রতি তত্ত্ব ইত্যাদি নিয়ে research করছিলেন ! উনি এই সব সাধনের সাথে যুক্ত বিভিন্ন পরম্পরার গুরুদের সঙ্গে এবং নারী নিয়ে সাধনকারী সাধকদের সঙ্গে সঙ্গ করে – তাদের কাছ থেকে নানান তথ্য জোগাড় করছিলেন এবং সেইগুলি উনি লিখেও রাখছিলেন। সেই রাতে এইসব ব্যাপার নিয়েই ভাগবতানন্দজী গুরুমহারাজের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করেছিলেন। সেইসময় মহারাজ মানবজীবনে “কাম” ও “কামিনী”-র ভূমিকা নিয়ে নানান জিজ্ঞাসাও করেছিলেন। তার উত্তরে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” আধ্যাত্মিকতায় অগ্রগতির পথে ‘কাম’ অপেক্ষা ‘কাঞ্চন’ বা ‘বিষয়-বাসনা’ অধিকতর বাধাস্বরূপ।” উনি আরও বলেছিলেন যে, ‘মানুষের জীবনে ‘কামের’ প্রভাব সীমাবদ্ধ, তাছাড়া একটা বয়সের পর মানুষের আর কাম-প্রবণতা ততটা থাকে না কিন্তু বিষয়-বাসনা এবং কাঞ্চনের প্রভাব মানুষের মৃত্যুকাল পর্যন্ত থেকে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে বেড়ে যায় কিন্তু কমে না – যদি না সে যৌবনকাল থেকেই কাঞ্চনের মোহ বা বিষয়বাসনা থেকে বেরোবার চেষ্টাটা শুরু করে’ !
গুরুমহারাজ পরবর্তী কালে বনগ্রামে বা অন্যত্রও সিটিং-এ এই ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনাকালে বলেছিলেন – ” কামকীটের মুক্তিলাভ সহজ, কিন্তু বিষয়কীটের মুক্তিলাভ ঘটা খুবই সঙ্গীন !”
যাইহোক, ঐদিন সাঁকোবাজারে ভাগবতানন্দজীর সাথে গুরুমহারাজের একান্ত আলোচনাকালে গুরুজী মহারাজকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – “এই যে তোমরা দুজন এখানে রয়েছো –এতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে নাকি ?” ভাগবতানন্দজী গুরুমহারাজকে নিজে থেকে কারও সম্বন্ধে কোনো অভিযোগ করেন নি ! কিন্তু যেহেতু গুরুমহারাজ নিজেই সুযোগ করে দিয়েছিলেন – তাই মহারাজ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণের negative side সম্বন্ধে দু-চার কথা বলতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু গুরুমহারাজ ওনাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলেছিলেন – ” ভাগবতানন্দ – তুমিও ! তুমিও অপর কারো সম্বন্ধে অভিযোগ করছো ? আমি কিন্তু তোমার কাছ থেকে কারো সমন্ধে কোনও ‘অভিযোগ’ আশা করি না !”
গুরুমহারাজের কাছে এই কথা শুনেই ভাগবতানন্দজী বুঝতে পেরেছিলেন – তাঁর কাছে গুরুমহারাজ কি চান ! উনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ওনাকে একলাই চলতে হবে। ইতিমধ্যে আজিমগঞ্জের দিয়ার মাহিনগরের জায়গা কেনা হয়ে গেছিল। আর ববিনদা-বিজয়দা-বিষ্ণুদার সাথে মহারাজের যোগাযোগও খুবই ভালো ছিল ফলে আজিমগঞ্জ আশ্রমের একেবারে গোড়াটায় ভাগবতানন্দজীই সন্ন্যাসী হিসাবে ওখানে ছিলেন। প্রথমে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে বাঁশ, খড় জোগাড় করে কুটিয়া স্থাপন করা হয়েছিল। আজিমগঞ্জ আশ্রমের উদ্বোধন হয়েছিল ১২-ই জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিনে।
ওখান থেকে ভক্তরা গুরুমহারাজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন যাতে তিনি স্বয়ং এসে আশ্রমের উদ্বোধন কার্য সমাধা করেন ! কিন্তু গুরুমহারাজ সেবার যে কোনো কারণেই হোক_ আসতে পারেননি ! গুরুমহারাজ এসেছিলেন পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮২ সালে। সেবার থেকেই আজিমগঞ্জের দীক্ষাদানের পর্ব শুরু হয়েছিল। আর ঐ বছরেই শিবরাত্রিতে ওখানে হয়েছিলো ব্রহ্মচর্য বা সন্ন্যাসদানের অনুষ্ঠান। [ক্রমশঃ]