~ শুভ সূচনা~
*।।ওঁ নমো শ্রী ভগবতে পরমানন্দায় নমো নমঃ।।*
জিজ্ঞাসু :– ত্যাগ মানে কি পরিবারের ভোগ-বিলাস ছেড়ে, দারিদ্রতা অবলম্বন করে কৃচ্ছসাধন – যেমনটা ভগবান বুদ্ধ করেছিলেন ?
গুরুমহারাজ :– ত্যাগের কি সংজ্ঞাই তুমি দিলে !! আসলে বেশীরভাগ মানুষই বুদ্ধি দিয়ে কোনো বিষয়কে বোঝার বা ধারণা করার চেষ্টা করে ! কিন্তু বুদ্ধির গভীরে ঢোকে না, অর্থাৎ ধ্যান করে না ৷ তাই ঠিক ঠিক বোঝা হয় না বা বলা যায় সেই বিষয়ের ‘বোধ’ হয় না ।
দ্যাখো, ত্যাগ – অর্থে আসক্তি ত্যাগ ! কামনা-বাসনা জনিত কারণে ভোগ-ঐশ্বর্য্যের প্রতি মানুষের যত আসক্তি রয়েছে, সেগুলি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিস্পৃহ রাখাই “ত্যাগ” । এককথায় বলতে গেলে, বলতে হয়_বিষয়ে, ব্যক্তিতে বা বস্তুতে সম্পূর্ণ অনাসক্তিই ত্যাগ ! এটা সহজ কথা নয় ! দীর্ঘ অভ্যাসযোগের(সাধনার) মধ্যে দিয়ে অনাসক্ত ভাব আসে । প্রকৃতপক্ষে, এই ভাব জাগ্রত হোতে জন্ম-জন্মান্তর লেগে যায় । আর ‘কৃচ্ছসাধন’ যেটা বলছো – এটা হঠযোগের একটা সাধন । এই সাধন করতে গেলে প্রচন্ড ‘রোক্’ লাগে, সবার জন্য এই সাধন নয় । দু-একদিন অনাহারে, অনিদ্রায় থাকতে হোলেই তোমাদের মত লোকের ভাব ছুটে যাবে !
আর একটা কথা তুমি যেটা বলছিলে ‘দারিদ্রতা’ – দারিদ্রতা বা দারিদ্র্য মানুষের জীবনে, সমাজ জীবনে তথা রাষ্ট্রজীবনের অভিশাপ ! অপরদিকে সমৃদ্ধি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে অথবা সমাজ তথা সমগ্র দেশের ক্ষেত্রে ভূষণ-স্বরূপ ! ‘দারিদ্রতা’ মানুষকে দেয় অবজ্ঞা-ঘৃণা ! সহানুভূতি বা ভালোবাসা নয় ! সামাজিক বা পারিবারিক জীবনে একটু অনুসন্ধান করো__এর ভুরি ভুরি প্রমাণ পাবে ৷
আমি আমার পরিবারে একটু বড় হবার পর প্রায় নয় (৯) বছর ধরে এই জীবন(দারিদ্রতাপূর্ণ জীবন) দেখেছি । কি দেখেছি জানো__সমাজজীবনে মানুষের কাছে আগে লক্ষ্মী পরে নারায়ণ ! লক্ষ্মীকে বাদ দিয়ে নারায়ণ নয় ৷ তবে এটাও ঠিক যে লক্ষ্মী লাভ করতে হলে নিজেকেও নারায়ণ হোতে হয় ৷ নারায়ণ ছাড়া আবার অন্য কেউ লক্ষ্মীকে ধরে রাখতে পারে না । এইজন্যই বলা হয় “লক্ষ্মী চঞ্চলা”। লক্ষ্মীলাভ করেও নারায়ণ না হয়ে উঠতে পারলে, লক্ষ্মী অন্যত্র চলে যান ।
ভারতবর্ষে মাঝখানে অর্থাৎ বিদেশী আক্রমণের যুগ থেকে(আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে থেকে) ভারতীয় ঋষি-প্রণীত সুপ্রাচীন শাশ্ত্রগুলির ভুল ব্যাখ্যা করা হয়ে আসছিল । ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় পর্যন্ত গান্ধীজির ন্যায় ব্যক্তিও দারিদ্রতার স্বপক্ষে কথা বলতো ।
কিন্তু দ্যাখো, স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন – ” হে ভারত ! ভুলিও না – সর্বত্যাগী শংকর তোমার আদর্শ ।” হ্যাঁ, এটাই ঠিক কথা ! শংকর ‘সর্বত্যাগী’ অর্থে দরিদ্র নয় ! মনে রাখতে হবে শঙ্করের ভান্ডারী ছিল ধনরত্নের দেবতা কুবের, তাঁর গৃহিণী স্বয়ং অন্নপূর্ণা ! আরে__ কাঙাল কি ত্যাগ করবে ? কাঙাল তো নিজেই সব সময় ‘দাও’ ‘দাও’ করছে । যার আছে, অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে যে ‘ধনী’, আরও ভালো করে বলতে গেলে যার শুধু ঐহ্যিক ঐশ্বর্য-ই (দেহবল, মনোবল, অর্থবল, জ্ঞানবল – ইত্যাদি) নয়, পরমার্থিক ঐশ্বর্যও রয়েছে সেই তো প্রকৃত ত্যাগ করতে পারে ! আর সেই ত্যাগেরই মহিমা ত্রিজগতে বন্দিত হয়। (ক্রমশঃ)