শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত শিষ্য ও পার্ষদদের নিয়ে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আজকের আলোচনা প্রসঙ্গে শুধুই পরমানন্দ কথা। দেখুন – সত্যি বলতে কি, পরমানন্দ কথা ছাড়া কি অন্য কোনো কথা মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করতে বা সেখানে একটা নাড়া দিতে পারে ? পারে না ! বুদ্ধিদীপ্ত দু-চারটে কথা বা লেখা বা বক্তৃতা – মানুষের মনকে স্পর্শ করতে পারে ! মানুষ বলে ওঠে – “বেড়ে বলেছেন মশাই !” অথবা আলোচনা প্রসঙ্গে একে অপরকে বলে – ” ওমুক লেখকের লেখাটা পড়েছো – দারুন লিখেছে কিন্তু !” আবার দেখবেন কোনো নামকরা লোকের বক্তব্য আলোচনা বা বক্তৃতা শুনে এসে অনেক মানুষ বলে থাকে – ” আজকে ওনার কথা শুনে আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। আমার মনের অনেক ধন্দ কেটে গেল, অনেক জিজ্ঞাসার আজকে মীমাংসা হয়ে গেল !”
কিন্তু এগুলি সবই মনের satisfaction ! এগুলি তো ‘প্রাণে নাড়া’ পড়ে না ! একবার প্রাণের নাড়া পড়লে আর ঘরে স্থির হয়ে থাকতে পারে না মানুষ ! ‘প্রাণে নাড়া’ পড়লে মন এমনিতেই বশে এসে যায়। তখন সে যেন শ্যামের বাঁশির সুর শুনতে পাওয়া ‘রাধা’-র মতো হয়ে যায় ! লোকলজ্জা, স্বামী-সংসার, এমনকি অপত্যস্নেহের দূরতিক্রম্য মায়াও তুচ্ছ হয়ে যায়। সে তখন ছুটে চলে – সেই মনের মানুষ, প্রাণের মানুষ, তার পরম প্রেমাষ্পদের অমোঘ আকর্ষণে ! গুরু মহারাজ বলেছিলেন – ” যিনি আকর্ষণ করেন, কর্ষণ করেন – তিনিই কৃষ্ণ।” তাই “কৃষ্ণ” কোনো একজন ব্যক্তি ন’ন – যুগে যুগে বারবার ঈশ্বরের অবতরিত রূপই “কৃষ্ণ”। সেই অর্থে প্রতিটি সদ্গুরু-ই কৃষ্ণ ! যিনি মন-প্রাণকে প্রেমের দ্বারা ‘হরণ’ করেন – তিনিই “হরি” ! আর যিনি সদাসর্বদা সাধককুলকে তাঁর নিজের দিকে অর্থাৎ মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে যিনি আকর্ষণ করে নিয়ে চলেন, যিনি মানুষের উষর মনোজগৎ, প্রাণজগৎ-কে কর্ষন করেন অর্থাৎ মানুষকে অজ্ঞান অন্ধকার থেকে জ্ঞানালোকের পথ দেখান, অসৎ-অনিত্য জগতের মায়ামোহ দূর করিয়ে সত্যরূপী ব্রহ্মের বোধ জাগ্রত করেন এবং এই মরজগতের বারবার জন্ম-মৃত্যুর আবর্তন থেকে বের করে নিয়ে আসেন – তিনিই কৃষ্ণ !
এগুলো সবই গুরুমহারাজের কথা। একসময় বাংলাদেশের যে কোন গানেই রাধা-কৃষ্ণের জীবন কাহিনীর কথা থাকতো, তাই কোনো মহাজন বলেছিলেন – “কানু বিনে গীত নাই”। আর আমাদের এখন এমন দশা যে, “পরমানন্দ কথা ছাড়া আর অন্য কোনো কথা নাই”! এটা একদম সত্যি কথা ! এখন আর অন্য কোনো লেখকের লেখা পড়তে ভালো লাগে না, অন্য কোনো ব্যক্তির (তো সে যত নামকরা লোকই হোক না কেন) আলোচনা বা বক্তব্য শুনতেও ভালো লাগে না। ন’কাকা (শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) এই ধরনের আলোচনা উঠলেই বলতেন – ” হ্যাঁ বাবা ! তা তো বটেই ! ওই যে বলে না – ‘গদাই (শ্রীরামকৃষ্ণ) আমাদের কান খারাপ করে দিয়েছে!’ – আমাদেরও সেইরকম অবস্থা !” এটাই সত্যি ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথা শোনার পর তৎকালীন কলকাতার ভক্তদের এইরকমই দশা হয়েছিল – তাদের আর অন্য কোনো কথা ভালো লাগতো না – সেইজন্যেই সেই সময়ের কোনো রামকৃষ্ণ-ভক্ত এই কথা বলেছিলেন।
ন’কাকা মাঝেমাঝেই ওই কথাটা বলে আমাদের ভুল ভাঙ্গিয়ে দিতেন, যখন আমরা বলাবলি করতাম – ‘এখন আর কোনো sitting বা ধর্মালোচনা আমাদের অতোটা মনে ধরে না !’ তখনই ন’কাকা বলতেন – ” তা আর কি করে মনে ধরবে বাবা ! ঐ যে কথায় রয়েছে – ‘গদাই আমাদের কান খারাপ করে দিয়েছে’ !” এই কথা বলেই সেই মিষ্টি-মধুর হাসি ! আসলে ন’কাকার কথাটা এখন বারবার মনে পড়ে যাবার অন্য একটা কারণও রয়েছে, সেটা হোলো – গত ২২-শে অক্টোবর ওনার প্রয়াণ দিবস ছিল। যদিও কোনো মহাপুরুষের জন্মদিনটাই সমারোহ সহকারে পালন করা হয় – প্রয়াণ দিবস নয় ! তবু ভক্তরা সেইদিনটা চোখের জলে তাঁকে স্মরণ করবে বই কি ! আর স্বজনদেরকে অনাড়ম্বরভাবে হোলেও ঠাকুর-দেবতার উদ্দেশ্যে পূজা নিবেদন এবং প্রয়াত ব্যক্তির স্মৃতির উদ্দেশ্যে শাস্ত্রোক্ত-বিধান অনুযায়ী কিছু ক্রিয়া-কর্মও করতে হয় !
এবারেও বনগ্রামে ন’কাকীমাকে তা করতে হয়েছিল। দু-চারজন ভক্তরাও উপস্থিত ছিলেন।
তবে এখন ওসব কথা থাক – আমরা আবার ফিরে আসি গুরুমহারাজের কথায় ! গুরুমহারাজের কথা দিয়েই কথা শুরু হয়েছিল যে, “মনে নয় – ‘প্রাণে নাড়া’ দিতে যিনি পারেন – জানবি তিনিই তোর পথপ্রদর্শক, তিনিই তোর ইহজগতের গুরু, ভবপারের কান্ডারী !” তবে এখানে একটা কথা এসেই যায় যে, স্বামী পরমানন্দের সাথে যত সহস্র সহস্র মানুষের সাথে সংযোগ হয়েছিল – তাদের সবারই কি “প্রাণে নাড়া” পড়েছে ? না – নিশ্চয়ই পড়েনি ! পড়ার কথাও নয় ! এমনটা কোনোকালেই হয় না – কারণ এটা হবার নয় ! চেহারায় সকলেই মানুষ হোলেও জন্ম-জন্মান্তরের অভিজ্ঞতার বিচারে অনেকেই চেতনায় অনেকটা উন্নত, কেউ হয়তো ততটা নয়, আবার কেউ কেউ একেবারেই অনুন্নত। ফলে তারা জাগতিক ভোগবিলাস, স্বার্থবুদ্ধি, অহংপ্রতিষ্ঠা, অপরের উপর জোর খাটানো – যার ফল হিংসা-মারামারি ইত্যাদি নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এতেই তাদের দু’চারটে জীবন কেটে যায়। আর যারা উন্নত চেতনার ব্যক্তি, বিবেকবানেরাই প্রাণের নাড়াটা বোঝে, বুদ্ধির জগতের ব্যক্তিরা মনে নাড়া পায়। আর দেহসর্বস্ব ব্যক্তিরা মহাপুরুষের শরীর ছাড়ার পরেই আবার তাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ফিরে যায় – মহাপুরুষের শিক্ষা নিয়ে কোনো মাথাই ঘামায় না ! [ক্রমশঃ]