শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের ‘প্রাণ ও মন’ বিষয়ক বিভিন্ন আলোচনার অংশ নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” thousand faculties of mind !” শাস্ত্রে কালীয়নাগের যেমন সহস্রফণার কথা বলা হয়েছে – তেমনি মনের সহস্র দিকে গতি রয়েছে। ওই রূপকাকার গল্পটিতে দেখা যায় যে, কালীয়নাগের বিষের জ্বালায় সমস্ত পশুপাখিসহ কৃষ্ণসখা গোপবালকরাও জর্জরিত ! কিন্তু একমাত্র শিখীপুচ্ছধারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ-ই সেই কালীয়নাগের সহস্রফণার উপরে উপরে নেচে নেচে বেড়াচ্ছেন এবং মধুর সুরে মোহনবাঁশি বাজাচ্ছেন ! এর অর্থ হচ্ছে মনের অধীনে থাকা জীবেরা সহস্র ফণার বিষের জ্বালায় সর্বদা যন্ত্রণাক্লিষ্ট ! অপরপক্ষে যিনি মনকে জয় করেছেন, যিনি মনকে control করতে পেরেছেন (অর্থাৎ সহস্রফণার ফণীর মাথায় মাথায় অনায়াসে নৃত্য করতে পারেন) তিনিই ‘কৃষ্ণ’। তিনিই মোহনবাঁশির সুরে ভক্তকুলকে (রাধা সহ গোপ-গোপিনীরা) তাঁর দিকে আকর্ষণ করতে পারেন !
এই কথাগুলির আরো সরল অর্থ হলো এই যে, যিনি তার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন – তিনি-ই অপরের মনোজগৎ-কে read করতে পারেন, অপরের মনোজগতে প্রবেশ করে তাদের মনের বন্ধ দরজা খুলে দিতেও পারেন।
গুরুমহারাজকে অনেকেই অনেক সময় জিজ্ঞাসা করতো – “আমার মনকে স্থির কি করে করবো?” অথবা বলতো “মনকে একটা point-এ কিভাবে fixed করবো?”- ইত্যাদি, ইত্যাদি। যে সমস্ত মানুষ ধ্যান-জপ করে এবং ঠিকমতো নিজের জীবনকে পরিচালিত করতে চায় – তাদের অধিকাংশেরই এই জিজ্ঞাসা থাকতো ! গুরুমহারাজ এর উত্তরে বেশিরভাগ জিজ্ঞাসাকারীকেই বলতেন – ” মনকে কি করে প্রথমেই স্থির করতে পারবে ? মনকে একাগ্র করার চেষ্টা করতে পারো, কিন্তু স্থির করতে পারবে না ! তবে চেষ্টা করলে প্রাণকে স্থির করতে পারবে। প্রাণবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করো, প্রথমেই মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে যেও না – ওতে বিশেষ কাজ হবে না !”
গুরু মহারাজের মুখ থেকে এই কথাগুলি শুনে আমাদের মনে হয়েছিল – এ-তো নতুন কথা শুনলাম ! তবে, এটা বেশ বুঝতে পেরেছিলাম যে, এতদিন ধরে কোন মহাপুরুষ-ই এতো সহজভাবে এই সমস্ত মীমাংসা দিয়ে যান নি ! গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ সুন্দরভাবে, সহজ-সরল করে আমাদেরকে এইরূপ অনেক জটিল রহস্য বুঝিয়ে দিতেন। ওনার শ্রীমুখের কথাই তো বেদবাক্য, ওনার কথাই তো উপনিষদ ! সত্যিই তো, প্রাণ স্থির হলে তবেই মন প্রকৃত অর্থে ‘একাগ্র’ হয় ! শেষকালে মন ‘স্থির’ও হয়। মন তো মানুষের অন্তঃকরণের-ই একটা part ! অন্তঃকরণ বলতে আবার চারটির কথা বলা হয়েছে – মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকার। গুরুমহারাজ বলেছিলেন (ভারতীয় দর্শনে রয়েছে) চিত্তের তিনটি বৃত্তি রয়েছে সংকল্প-বিকল্পাত্মিকা বৃত্তি – যা মনের ক্রিয়া, নিশ্চয়াত্মিকা বৃত্তি – যা বুদ্ধির ক্রিয়া এবং অভিমানাত্মিকা বৃত্তি – যা জীবের মধ্যে অহংকার রূপে ক্রিয়াশীল।
সুতরাং মনে শুধু সংকল্প আর বিকল্প-ই রয়েছে ! এটা ঠিক – ওটা ঠিক নয়, এটা করবো – ওটা করবো না, এটা মানবো – ওটির মান্যতা দেব না — সদা-সর্বদা অসংখ্য সংকল্প বিকল্পের ক্রিয়া হয়ে চলেছে মনে ! মানুষ যেন মনের ক্রিয়ার ভারে ভারাক্রান্ত ! মন-ই মানবকে নিয়ন্ত্রণ করছে –অথচ যেখানে মানবের উচিত মনকে নিয়ন্ত্রণ করা ! কিন্তু এইটি করতে গেলে সাধন-ভজনের প্রয়োজন এবং ঠিকমতো সাধন-ভজন করতে গেলে সদ্গুরুর সন্নিধানে পৌঁছানো প্রয়োজন ! কিন্তু বেশিরভাগ মানবের সাধন-ভজন করার সময় কোথায় ? বাঁচা ও বাড়ার (বৃদ্ধি পাওয়া) জন্য যাবতীয় কাজ ঠিকই হয়ে চলেছে, কিন্তু মানব জীবনের যে অন্যতম উদ্দেশ্য ‘বিকাশ’ বা নিজেকে বিকশিত করা অর্থাৎ আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত হয়ে ওঠা – নিজের বিবেকের জাগরন ঘটানো, নিজের চেতনাকে উন্নত করা – ঐটির প্রতি আর নজর দেওয়া হয় না। কেমন যেন প্রায় সকলেই একটা জায়গায় এসে থেমে গেছে – “এইতো বেশ আছি”– এমন ভাব ! “কি হবে আর বেশি বুঝতে গিয়ে”– এই ভাবটাও রয়েছে।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” এটাকেই বুদ্ধিভ্রংশ বলা হয়েছে !” জীবনের আর এক নাম ‘গতি’ ! যে কোনো একটা মতে বা একটা আদর্শে আটকে পড়ার নাম-ই বদ্ধতা – বাঁধনে বাঁধা পড়া ! এই অবস্থাটা ঠিক ‘গতিহীনতা’ নয় – এটা হ’ল একই জায়গায় ঘুরপাক খাওয়া ! কর্মপ্রধান ব্যক্তিরা তাদের নিজের এবং স্বজনদের ভরণপোষণের কাজেই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে ! বুদ্ধিপ্রধান ব্যক্তিরা অপরকে dominate করে_ কি করে নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সংস্কৃতির জগতে – প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, সেই চেষ্টায় জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছে ! এই ধরনের বিভিন্ন প্রকার মানুষদেরকে যেন এক-একটা দলভুক্ত করা যায় এবং সব দলেরই উপদল, অনুদল ইত্যাদি রয়েছে, আর সবক্ষেত্রেই তাদের নেতাও রয়েছে !
পৃথিবী চলেছে তার নিজের নিয়মে। গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের মতো অবতারপুরুষেরা এই পৃথিবীতে শরীর ধারণ করেন শুধুমাত্র বিভিন্ন আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকে মানুষজনেদের সেখান থেকে বের করার জন্যই ! কিন্তু পৃথিবীর মানুষ এমনই নিম্নচেতনায় রয়েছে – তারা একটা ঘুরপাক থেকে বেড়িয়ে কিছুকালের মধ্যেই আবার একটা আবর্তে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে এবং আবার ঘুরপাক খেতে থাকে।৷ [ক্রমশঃ]