শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বিভিন্ন আলোচনায় ‘প্রাণ’ এবং ‘মন’ বিষয়ক যেসব কথা শুনেছিলাম – সেগুলিকেই এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। “স্বপ্ন দেখে মন”– বলে যে কথাটি বাংলায় ব্যবহার হয় –এটিকে সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয় – অবচেতন মনের ক্রিয়াতেই মানুষ স্বপ্ন দেখে ! জাগ্রত অবস্থায় মন স্বপ্ন দেখে না । তখন চিন্তা করা যায়, নানান কল্পনা করা যায় – কিন্তু স্বপ্ন দেখা যায় না ! ফলে “জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা”- এই কথাটি ব্যাঙ্গার্থে ব্যবহার হোলেও, আদপেই বাস্তবে সেটা হয় না। যেইমাত্র মানুষটি জাগ্রত অবস্থা থেকে নিদ্রাবস্থায় প্রবেশ করে অমনি অবচেতন মন ক্রিয়াশীল হয় এবং মানুষ স্বপ্ন দেখে !
স্বপ্নে মানুষ নানান আজগুবি ব্যাপারসমূহ অথবা অদ্ভুত অদ্ভুত বস্তু, ব্যক্তি, পরিবেশ, পরিস্থিতি – ইত্যাদি দর্শন করে থাকে। এইটা হোলো প্রাক্-চেতন বা preconscious মনের কারিকুরি ! গুরুমহারাজ একবার আলোচনা করেছিলেন যে, ” আজগুবি মনে হোলেও স্বপ্নে আসা বিষয়ের কোনো কিছুই আজগুবি নয় ! কারণ জাগ্রত অবস্থায় যে কোনো মানুষ জীবনে কত কিছু দেখে, কত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, কত ভাবনা-চিন্তা করে, কত কল্পনা করে থাকে – সেগুলি সবই মানবের মনের অবচেতনে কিলবিল করে। ফলে যখনই চেতন মন তার কাজ বন্ধ করে দেয় – তখনই অবচেতন থেকে ঐগুলি এক এক করে অথবা হুড়মুড় করে একসাথে অনেকগুলি উঠে আসে। এইবার একটার সঙ্গে অন্যটা বা একাধিক যুক্ত হয়ে গিয়ে, স্বপ্নাবস্থায় ওটা একটা আজগুবি রূপ নিতে পারে। এই সময় চেতন মনের অভিজ্ঞতাপুষ্ট বিষয়গুলির Supply দেয় প্রাক্-চেতন !
গুরুমহারাজ আরো বলেছিলেন – ” মানুষের নিদ্রাবস্থার বেশিরভাগটাই স্বপ্নাবস্থা ! মানবের যে তিনটি অবস্থা রয়েছে – জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি ! এরমধ্যে সুষুপ্তি অবস্থাটা খুবই কম – হয়তো মাত্র কয়েক মিনিট ! এই অবস্থাটা হোলো খুবই গাঢ় ঘুমের অবস্থা ! এই অবস্থা একটু বেশি স্থায়ী যার হয়, তখন ঘুম ভেঙে উঠে সে বলে – “আজকে খুব তাড়াতাড়ি রাতটা কেটে গেল – এইতো একটু আগে শুলাম !” সেদিন ওই ব্যক্তির ঘুম থেকে উঠে শরীর ও মন দারুন fresh হয়ে যায় – ঝরঝরে হয়ে যায়। কিন্তু এমন অবস্থাটা সাধারণ মানুষের খুব একটা বেশি হয় না। আমাদের বেশিরভাগ রাতই কাটে স্বপ্নাবস্থার মধ্যেই ! আজগুবি সব স্বপ্ন– যার বেশিরভাগই ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথেই আমরা ভুলে যাই । ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে ভয় পাওয়া, চেঁচিয়ে ওঠা, অনর্গল কথা বলা ইত্যাদি ব্যাপারগুলিও খুবই ঘটে থাকে । ওই অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম ভাঙ্গিয়ে যদি “কি স্বপ্ন দেখছিলে”_ এই কথাটা জিজ্ঞাসা করা যায়, তাহলে স্বপ্ন দেখা ব্যক্তিটি হয়তো কিছু কিছু বলতে পারবে কিন্তু সকালে ঘুম ভাঙার পর জিজ্ঞাসা করলে আর বলতে পারবে না ! তবে, গুরু মহারাজ আমাদেরকে বলেছিলেন যে, কোনো মহাপুরুষ সংক্রান্ত স্বপ্নগুলি __স্বপ্নের মধ্যে পড়ে না ! অনেক সময় ঐগুলোকে বলা হয় “দর্শন”, যা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বিশেষ সৌভাগ্যের ব্যাপার, আর যোগী-সাধকদের ক্ষেত্রে সাধনার ফল।
অনেকে রয়েছে যারা একই স্বপ্ন বা একই রকম স্বপ্ন বারবার দেখে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে । আবার এমনও রয়েছে যারা স্বপ্নে দেখা কোনো বিষয়, বস্তু বা ব্যক্তিকে পরে বাস্তবেও দেখে থাকে। এইরকমটাও হয়ে থাকে উন্নত চেতনার মানুষজনেদেরই !
গুরু মহারাজের কাছে শুনেছিলাম__ যারা চিৎ হয়ে শোয়, অনেক সময় তাদের হাতদুটো প্রণাম মুদ্রায় বা অন্য কোনো অবস্থায় বুকের কাছে রাখার অভ্যাস হয়ে যায় । এতে হার্ট ও লাং-এ সামান্য হোলেও চাপ পড়ে । এইরূপ ব্যক্তিরা রাত্রে অনেক সময় স্বপ্ন দেখে যে__ তার উপর যেন কেউ চেপে বসেছে বা তাকে কেউ শ্বাসরোধ করে মারতে চাইছে ! তাছাড়া সাধারনভাবে দেখা যায় যে, মানুষ চিৎ হয়ে শুলে নাক ডাকে ! তাতে পাশে কেউ শুয়ে থাকলে তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে__ এইসব নানান কারণে গুরুমহারাজ বলেছিলেন চিৎ হয়ে শোয়া বা উপুড় হয়ে শোয়া এই দুটোই ভালো অভ্যাস নয় । উপুড় হয়ে শুলেও হার্টে চাপ পড়ে ! তাই যে কোনো দিকে কাৎ হয়ে শোয়া-ই বিজ্ঞানসম্মত । তবে বাঁ কাৎ-এ শুয়ে বিশ্রাম নেবার ব্যাপারে উনি বেশি জোর দিতেন ! বাঁ কাৎ-এ শুলে ডান নাসায় অর্থাৎ পিঙ্গলা নাড়ীতে শ্বাস বয় । ফলে, মানুষের বিশ্রামকালেও অগ্নি গ্রন্থি ক্রিয়াশীল থাকে এবং হজমের ক্রিয়াসহ অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াগুলি ভালো ভাবে সম্পন্ন হয়।
এসব কথা থাক্, আমরা আমাদের মূল আলোচনা ‘মনের ক্রিয়া’-য় ফিরে যাই । গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ ‘মন’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই__ ‘বাংলায় মন নিয়ে যে সমস্ত প্রচলিত গান রয়েছে’– সেগুলো উল্লেখ করে বলতেন,_ “মানুষের মনকে নিয়েই যত ঝামেলা বল্!!” সত্যিই তো মানুষের মনোজগতে সদাসর্বদা উত্থিত অজস্র কামনা-বাসনাগুলি যদি কিলবিল না করতো, তাহলে মানুষ নিজেও শান্তি পেতো এবং সমগ্র মানব সমাজ সুস্থ থাকতো। কিন্তু তা তো আর হয় না ! সমস্ত রকম অশান্তির মূলে রয়েছে মানবের মনে নিরন্তর উঠতে থাকা কামনা-বাসনার ঢেউ ! বাউল গানে এগুলোকেই ‘মনের ময়লা’ বলা হয়েছে ! ঐ সব গানের মাধ্যমে “গুরু আমার মনের ময়লা যাবে কেমনে”– এই ধরনের প্রার্থনাও করা হয়েছে ।
শাস্ত্রে আর একটা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে__ ‘চিত্তমল’ ! মানুষের চিত্তে সঞ্চিত এইসব ময়লা জন্ম-জন্মান্তর ধরে সংস্কার রূপে থেকে যায়। কামনা-বাসনা মেটাতেই বারবার ফিরে ফিরে আসতে হয় মানবকে। তাহলে এর শেষ কোথায় ? গুরুমহারাজ বলেছিলেন __”ভজনের দ্বারা এগুলিকে ভাজতে হবে এবং সাধনার দ্বারা এগুলিকে সিদ্ধ করতে হবে । তবেই মানুষের মনের ময়লা যাবে।” [ ক্রমশঃ]
স্বপ্নে মানুষ নানান আজগুবি ব্যাপারসমূহ অথবা অদ্ভুত অদ্ভুত বস্তু, ব্যক্তি, পরিবেশ, পরিস্থিতি – ইত্যাদি দর্শন করে থাকে। এইটা হোলো প্রাক্-চেতন বা preconscious মনের কারিকুরি ! গুরুমহারাজ একবার আলোচনা করেছিলেন যে, ” আজগুবি মনে হোলেও স্বপ্নে আসা বিষয়ের কোনো কিছুই আজগুবি নয় ! কারণ জাগ্রত অবস্থায় যে কোনো মানুষ জীবনে কত কিছু দেখে, কত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, কত ভাবনা-চিন্তা করে, কত কল্পনা করে থাকে – সেগুলি সবই মানবের মনের অবচেতনে কিলবিল করে। ফলে যখনই চেতন মন তার কাজ বন্ধ করে দেয় – তখনই অবচেতন থেকে ঐগুলি এক এক করে অথবা হুড়মুড় করে একসাথে অনেকগুলি উঠে আসে। এইবার একটার সঙ্গে অন্যটা বা একাধিক যুক্ত হয়ে গিয়ে, স্বপ্নাবস্থায় ওটা একটা আজগুবি রূপ নিতে পারে। এই সময় চেতন মনের অভিজ্ঞতাপুষ্ট বিষয়গুলির Supply দেয় প্রাক্-চেতন !
গুরুমহারাজ আরো বলেছিলেন – ” মানুষের নিদ্রাবস্থার বেশিরভাগটাই স্বপ্নাবস্থা ! মানবের যে তিনটি অবস্থা রয়েছে – জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি ! এরমধ্যে সুষুপ্তি অবস্থাটা খুবই কম – হয়তো মাত্র কয়েক মিনিট ! এই অবস্থাটা হোলো খুবই গাঢ় ঘুমের অবস্থা ! এই অবস্থা একটু বেশি স্থায়ী যার হয়, তখন ঘুম ভেঙে উঠে সে বলে – “আজকে খুব তাড়াতাড়ি রাতটা কেটে গেল – এইতো একটু আগে শুলাম !” সেদিন ওই ব্যক্তির ঘুম থেকে উঠে শরীর ও মন দারুন fresh হয়ে যায় – ঝরঝরে হয়ে যায়। কিন্তু এমন অবস্থাটা সাধারণ মানুষের খুব একটা বেশি হয় না। আমাদের বেশিরভাগ রাতই কাটে স্বপ্নাবস্থার মধ্যেই ! আজগুবি সব স্বপ্ন– যার বেশিরভাগই ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথেই আমরা ভুলে যাই । ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে ভয় পাওয়া, চেঁচিয়ে ওঠা, অনর্গল কথা বলা ইত্যাদি ব্যাপারগুলিও খুবই ঘটে থাকে । ওই অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম ভাঙ্গিয়ে যদি “কি স্বপ্ন দেখছিলে”_ এই কথাটা জিজ্ঞাসা করা যায়, তাহলে স্বপ্ন দেখা ব্যক্তিটি হয়তো কিছু কিছু বলতে পারবে কিন্তু সকালে ঘুম ভাঙার পর জিজ্ঞাসা করলে আর বলতে পারবে না ! তবে, গুরু মহারাজ আমাদেরকে বলেছিলেন যে, কোনো মহাপুরুষ সংক্রান্ত স্বপ্নগুলি __স্বপ্নের মধ্যে পড়ে না ! অনেক সময় ঐগুলোকে বলা হয় “দর্শন”, যা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বিশেষ সৌভাগ্যের ব্যাপার, আর যোগী-সাধকদের ক্ষেত্রে সাধনার ফল।
অনেকে রয়েছে যারা একই স্বপ্ন বা একই রকম স্বপ্ন বারবার দেখে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে । আবার এমনও রয়েছে যারা স্বপ্নে দেখা কোনো বিষয়, বস্তু বা ব্যক্তিকে পরে বাস্তবেও দেখে থাকে। এইরকমটাও হয়ে থাকে উন্নত চেতনার মানুষজনেদেরই !
গুরু মহারাজের কাছে শুনেছিলাম__ যারা চিৎ হয়ে শোয়, অনেক সময় তাদের হাতদুটো প্রণাম মুদ্রায় বা অন্য কোনো অবস্থায় বুকের কাছে রাখার অভ্যাস হয়ে যায় । এতে হার্ট ও লাং-এ সামান্য হোলেও চাপ পড়ে । এইরূপ ব্যক্তিরা রাত্রে অনেক সময় স্বপ্ন দেখে যে__ তার উপর যেন কেউ চেপে বসেছে বা তাকে কেউ শ্বাসরোধ করে মারতে চাইছে ! তাছাড়া সাধারনভাবে দেখা যায় যে, মানুষ চিৎ হয়ে শুলে নাক ডাকে ! তাতে পাশে কেউ শুয়ে থাকলে তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে__ এইসব নানান কারণে গুরুমহারাজ বলেছিলেন চিৎ হয়ে শোয়া বা উপুড় হয়ে শোয়া এই দুটোই ভালো অভ্যাস নয় । উপুড় হয়ে শুলেও হার্টে চাপ পড়ে ! তাই যে কোনো দিকে কাৎ হয়ে শোয়া-ই বিজ্ঞানসম্মত । তবে বাঁ কাৎ-এ শুয়ে বিশ্রাম নেবার ব্যাপারে উনি বেশি জোর দিতেন ! বাঁ কাৎ-এ শুলে ডান নাসায় অর্থাৎ পিঙ্গলা নাড়ীতে শ্বাস বয় । ফলে, মানুষের বিশ্রামকালেও অগ্নি গ্রন্থি ক্রিয়াশীল থাকে এবং হজমের ক্রিয়াসহ অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াগুলি ভালো ভাবে সম্পন্ন হয়।
এসব কথা থাক্, আমরা আমাদের মূল আলোচনা ‘মনের ক্রিয়া’-য় ফিরে যাই । গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ ‘মন’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই__ ‘বাংলায় মন নিয়ে যে সমস্ত প্রচলিত গান রয়েছে’– সেগুলো উল্লেখ করে বলতেন,_ “মানুষের মনকে নিয়েই যত ঝামেলা বল্!!” সত্যিই তো মানুষের মনোজগতে সদাসর্বদা উত্থিত অজস্র কামনা-বাসনাগুলি যদি কিলবিল না করতো, তাহলে মানুষ নিজেও শান্তি পেতো এবং সমগ্র মানব সমাজ সুস্থ থাকতো। কিন্তু তা তো আর হয় না ! সমস্ত রকম অশান্তির মূলে রয়েছে মানবের মনে নিরন্তর উঠতে থাকা কামনা-বাসনার ঢেউ ! বাউল গানে এগুলোকেই ‘মনের ময়লা’ বলা হয়েছে ! ঐ সব গানের মাধ্যমে “গুরু আমার মনের ময়লা যাবে কেমনে”– এই ধরনের প্রার্থনাও করা হয়েছে ।
শাস্ত্রে আর একটা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে__ ‘চিত্তমল’ ! মানুষের চিত্তে সঞ্চিত এইসব ময়লা জন্ম-জন্মান্তর ধরে সংস্কার রূপে থেকে যায়। কামনা-বাসনা মেটাতেই বারবার ফিরে ফিরে আসতে হয় মানবকে। তাহলে এর শেষ কোথায় ? গুরুমহারাজ বলেছিলেন __”ভজনের দ্বারা এগুলিকে ভাজতে হবে এবং সাধনার দ্বারা এগুলিকে সিদ্ধ করতে হবে । তবেই মানুষের মনের ময়লা যাবে।” [ ক্রমশঃ]
