শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের আলোচনায় “প্রাণ ও মন” বিষয়ক যে সমস্ত আলোচনা শুনেছিলাম – সেইগুলিই এখানে সবার সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করা হচ্ছিলো। আমরা আগের আগের আলোচনায় ‘মনে’র কথাই বেশি আলোচনা করেছিলাম – সে তুলনায় ‘প্রাণে’র কথা অতটা বেশি বলা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু গুরুমহারাজের একটা সাংঘাতিক দামী কথা বলা হয়েছিল যে, “প্রাণকে স্থির করতে পারলে মন ঠিক ঠিক একাগ্র হয়।” ঐ মনের একাগ্রতা অবস্থাকেই মনের ‘স্থির অবস্থা’ বলে অনেকেই বর্ণনা করে থাকে। কিন্তু আমরা গুরুমহারাজের কাছে ঐ অবস্থার যে ব্যাখ্যা শুনেছিলাম সেটাই বাস্তবসম্মত এবং শাস্ত্রসম্মতও বটে। উনি বলেছিলেন – ” মনের এই অবস্থা আপাত স্থিরাবস্থা, কিন্তু প্রকৃত অর্থে স্থির নয়__বরং প্রচন্ড dynamic ! এটি ‘নিরবিচ্ছিন্ন তৈলধারার ন্যায়’ একটা অবস্থা।” আপনারা যারা বড় পাত্র থেকে অপেক্ষাকৃত কোনো ছোট পাত্রে তৈল অর্থাৎ তেল ঢালার দৃশ্য দেখেছেন – তারা ব্যাপারটা সহজেই বুঝতে পারবেন। যখন অল্প ছিদ্রযুক্ত স্থান থেকে প্রচন্ড গতিতে তৈলধারা উপরের বড় পাত্র থেকে নিচের ছোট পাত্রে অনেকক্ষণ ধরে পড়ে – তখন ওই প্রচন্ড গতিশীল তৈলধারাটিকে আপাতভাবে মনে হয় যেন সেটি স্থির হয়ে গেছে – অথচ প্রকৃতপক্ষে সেটি প্রচন্ড গতিশীল !
মনকে ঠিক ঠিক একাগ্র করতে পারলে (সাধনার দ্বারা) মন আরও dynamic হয়ে যায়, মনের শক্তি প্রচন্ড বেড়ে যায়। গুরুমহারাজ মনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন যোগীরা কতরকম অসাধ্য সাধন করতে পারেন – তার অজস্র উদাহরণ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটা হোলো – শ্যামাকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বা সোহহং স্বামীর কথা ! যিনি পাহাড়ের গুহায় বসে বসে পাথরের দেওয়ালে একটা থাপ্পর মারতেই একটা বড় পাথরের চাঁই ভেঙে পড়ে গিয়েছিল ! “কি করে উনি এটা করলেন?”– এই জিজ্ঞাসার উত্তর উনি বলেছিলেন – “এটা হাতের জোরে সম্ভব হয়নি ! মনের শক্তিকে concentrate করে সেটাকে হাতে প্রয়োগ করা হয়েছিল।” আর একটা উদাহরন উনি দিয়েছিলেন – যেখানে একজন মহিলা সাধক (সম্ভবতঃ থাইল্যান্ডের, উনি একজন নামকরা সার্জেনও ছিলেন) কোনরকম surgical equipments ছাড়াই রোগীদের পেট বা অন্যান্য অঙ্গ open করতেন এবং অসুস্থ প্রত্যঙ্গটির নিখুঁত repair বা replacement করতেন। গুরুমহারাজ ওই মহিলার এই কাজের অনেকগুলি still ছবি আমাদেরকে দেখিয়েছিলেন।
ওই দুটো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছাড়াও উনি আর একজনের কথাও বলেছিলেন – তিনি ঘরের মাঝখানে চেয়ারে বসে বসেই ঘরের এককোণায় থাকা চায়ের কাপ-প্লেট বা জলের গ্লাস শুধুমাত্র মনের শক্তিতে টেনে আনতে পারতেন। এইটা করতে গিয়ে কাপ, প্লেট বা গ্লাস যে শুধু টেবিল বেয়ে বেয়েই আসতো_ তাই নয়, gravitational law-এর বিরুদ্ধে গিয়ে হাওয়ায় ভেসে ভেসেও আসতো !
গুরুমহারাজ এই ধরনের মননশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নানান অত্যাশ্চর্য কাজ করতে পারার আরও অনেক উদাহরণের উপস্থাপনা করেছিলেন। মনকে নিয়ন্ত্রণ করে, মনকে একাগ্র করতে পারলে – মনের অসম্ভব শক্তির প্রকাশ ঘটানো যায়। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখা উচিত, তা হোলো__সাধকের জীবনে যে কোনো শক্তির প্রকাশ ঘটানোই হ’ল সাধনশক্তির অপচয়। তবু সাধু-সন্তরা বা যোগী-সাধকেরা অনেক সময় আর্ত-মানবের কল্যাণার্থে স্নেহবশতঃ-করুণাবশতঃ শক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে ফেলেন।
বহু সাধক বা যোগীরা এই ঝামেলা এড়ানোর জন্যই সম্পূর্ণভাবে সমাজের সংস্রব এড়িয়ে গভীর অরণ্যে বা হিমালয়ের ন্যায় কোনো দুর্গম স্থানগুলিতে চলে যান এবং যতদিন না সিদ্ধ হ’ন ততদিন পর্যন্ত তাঁর সংকল্পে অটল থাকেন। তাঁরা জানেন যে, সমাজের কাছাকাছি থাকলে আর্ত-পীড়িত মানুষেরা তাঁর সাধনশক্তির অপচয় ঘটাবেই। তাই তাঁরা চান আগে সাধন-ভজন করে নিজে পূর্ণ হয়ে উঠতে। আর সেইজন্য-ই তাঁদের এই স্বেচ্ছানির্বাসন ! অনেক বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের এই ধরনের নির্জন তপস্যার ব্যাপারকে ‘escaping’ বলে অভিহিত করে, তাঁদেরকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা-সমালোচনা করে। কিন্তু গুরুমহারাজ আমাদেরকে বলেছিলেন – ” সূর্য যেমন দূর থেকে পৃথিবীকে আলো দিয়ে, উত্তাপ দিয়ে সবসময় সমগ্র জগতের কল্যাণ করে চলেছে – ঠিক তেমনি ঐ সমস্ত মহাত্মারা লোকসমাজ থেকে অনেক দূরে থাকলেও তাঁরা তাঁদের সূক্ষ্মশক্তির সাহায্যে, তাদের মননশক্তির সাহায্যে পৃথিবীর সমস্ত মানবের কল্যাণ সাধন করে থাকেন।”
ঊপনিষদে বলা হয়েছে – “প্রাণ-ই ধর্ম !” এই কথা বলার কারণ হোলো –যেহেতু ‘ধর্ম’ কথাটির ব্যাকরণগত অর্থ হলো – ‘যা সমস্ত কিছুকে ধারণ করে বা ধরে থাকে’, তাই প্রাণ (বিশ্বপ্রাণ)-ই সমগ্র বিশ্বসংসারকে ধরে রেখেছে।’ বেদাদি শাস্ত্রে ‘প্রাণ’ অর্থে মহাকালী বা মহাশক্তিকে বোঝানো হয়েছে। যে মহাশক্তি এই বিশ্বচরাচর পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে – যা সমস্ত কিছুকে ধরে রেখেছে, যার মধ্যেই সবকিছু রয়েছে। সেই অর্থেই বলা হয়েছে ‘প্রাণ’-ই ধর্ম ! আবার পৃথিবীর ক্ষেত্রে ধরলে সমস্ত জীবজগৎ, জড়জগৎ-কে ঘিরে রয়েছে বায়ুমণ্ডল। সবকিছুই বায়ুসমুদ্রে-ই রয়েছে। পৃথিবীর সবচাইতে উন্নত জীব মানবের বেঁচে থাকাকে বলা হয়__ ‘প্রাণ-ধারণ’। এখানে ‘প্রাণ’ অর্থে প্রাণবায়ু ! মানুষের শরীরে যতক্ষন শ্বাস-প্রশ্বাসের(বায়ুর) ক্রিয়া থাকে, ততক্ষনই মানুষ বেঁচে থাকে। মানবশরীরে ক্রিয়াশীল প্রাণবায়ুকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে – প্রাণ-অপান-সমান-উদান-ব্যান। এই প্রাণ বায়ু-কে ধরেই মানবের সাধনা – মানবের আধ্যাত্মিকতায় উত্তরণ ! গুরু মহারাজ বলেছিলেন–“প্রাণকে আশ্রয় করেই ভিতরে প্রবেশ করতে হয়।” (বাকি কথা পরের দিন৷)
… [ক্রমশঃ]