জিজ্ঞাসু :– আমি গোড়া থেকেই বনগ্রাম আশ্রমে আসা যাওয়া করছি । এবার অনেকদিন পরে এলাম, এসে দেখছি__এই আশ্রমের প্রথম দিকের ত্যাগী ভক্তদের মধ্যে অনেকেই এখন আশ্রমে থাকে না – শুনলাম ওদের কেউ কেউ নাকি গৃহেও ফিরে গেছে ! কিন্তু এমনটা কেন হোলো মহারাজ ?
গুরুমহারাজ :– ‘প্রথমদিকের ত্যাগী-ভক্তরা’ বলতে কাদের কথা বলছো –প্রশান্ত, দেবেন্দ্র, সম্বিত -প্রমুখদের কথা ? ঠিকই বলেছ_ প্রশান্ত (স্বামী সচিদানন্দ) এখানে অর্থাৎ এই বনগ্রাম আশ্রমে প্রায় প্রথম থেকেই ছিল । জানো__ওর হাত ধরেই আশ্রমে প্রথম হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু হয়েছিল। আর বনগ্রামের নগেন(নগেন মন্ডল) যখন স্যালো টিউবয়েলের খালে মাটি তুলছিল, তখন ওর মাথায় লোহা পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল তখন তৃষাণরা ওকে কাঁধে নিয়ে পাহাড়হাটী হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছিল – ওটাই ছিল বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের “প্রথম সেবাকাজ” !
যাইহোক, যা বলা হচ্ছিলো__প্রশান্ত বরাবরই ছিল খুব উদার মনোভাবের ছেলে। সাধন-ভজন‌ও খুবই নিষ্ঠা সহকারে কোরতো। ও নিজের জন্য কিছুই রাখতে পারতো না। তখন ওদের (ব্রহ্মচারী ছেলেরা গ্রামে ন’কাকাদের কালীমন্দিরের প্রাঙ্গণে টিনের চাল দেওয়া ঘরে থাকতো।) শীতকালে সবার জন্য কম্বলও ছিল না। সেই সময় কেউ একজন প্রশান্তকে একটা কম্বল দিয়েছিল। সেইদিনেই জাবুইডাঙা থেকে ফেরার পথে(সময়টা শীতকাল ছিল) রাস্তায় কোনো মা(বৃদ্ধা মহিলা)-কে দেখেছিল শীতে কষ্ট পাচ্ছে –সাথে সাথে ও কম্বলটা তাকে দিয়ে চলে এসেছিল। তারপর ফিরে এসে, নিজে কষ্ট করে শুধু চাদর মুড়ি দিয়ে শীতকাল কাটিয়েছিলো। এই ধরনের উদারনৈতিক স্বভাব ছিল প্রশান্তের ! এটা ঠিকই যে, প্রশান্ত এখানে বেশি দিন থাকে নি ! এখান(বনগ্রাম) থেকে চলে গিয়ে ও হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গিয়েছিল আমার গুরুদেবের আশ্রমে অর্থাৎ উত্তরকাশীতে, রামানন্দ অবধূতের কাছে !
গুরুদেব শেষের দিকটা উত্তরকাশীতেই থাকতেন। প্রথমদিকে উনি প্রায় ছয়মাস(শিবরাত্রির পর থেকে রামনবমীর কিছুদিন পর পর্যন্ত) থাকতেন গঙ্গোত্রীতে, আর বাকি ছয়মাস(প্রায়) থাকতেন উত্তরকাশীতে। কিন্তু শেষের দিকটায় উনি বয়সের কারণে (ওনার তখন বয়স ছিল প্রায় ১৫৭ বছর, কারণ উনি শরীর ছেড়েছিলেন ১৬২ বছর বয়সে।)আর গঙ্গোত্রী যেতেন না। সে যাই হোক, প্রশান্ত বেশ কিছুদিন গুরুদেবের কাছে ছিল এবং সেইসময় ওনার খুব‌ই সেবা-শুশ্রূষা করেছিল। প্রশান্ত ছিল হৃদয়বান ছেলে– এই ধরনের ছেলেরা যখন যেটাই করে__সেটা করে হৃদয় দিয়ে ! ফলে ও গুরুদেবের (স্বামী রামানন্দ অবধূতজী) সেবা করছে জানতে পেরে আমি খুবই প্রসন্ন হয়েছিলাম ।
দ্যাখো, বৃদ্ধবয়সে মানুষের একটা সাহারার প্রয়োজন হয়৷ যদিও উত্তরকাশীর বিভিন্ন আশ্রম থেকে ওনার সেবার জন্য ‘সেবক’ পাঠানো হোতো। তাহলেও তারা কি প্রশান্ত-র মতো অতোটা যত্ন করতে পারতো ?
ওখান থেকে ফিরে আসার কিছুদিন পরে প্রশান্ত ওর নিজের বাড়ি ত্রিপুরায় ফিরে যায় এবং বর্তমানে ও বিয়ে-থা করে সংসারী হয়েছে। তবে, আমার সাথে ও মাঝে মাঝেই যোগাযোগ রাখে। জানো__প্রশান্ত যখন বনগ্রামে থাকতো, তখন তো আশ্রমের একেবারে প্রথমদিক__তাই সন্ধ্যার দিকটায় আশ্রম প্রায় একেবারেই ফাঁকা হয়ে যেতো৷ সুর্য যখন পশ্চিম দিগন্তে অস্তমিত হোতো__ চারিদিকটা কেমন যেন থমথমে হয়ে উঠতো ! গ্রামের ছেলেরা খেলার মাঠ ছেড়ে–রাখাল বালকেরা গরুর দল নিয়ে–পাখিরা সারাদিনের খাদ্য অন্বেষণ সেরে__নিজের নিজের ঘরে ফিরে যেতো । আর ঠিক তখনই মাঠের মাঝখানে বসে প্রশান্ত প্রায়শঃই একটা গান করতো “দিনের শেষে ঘুমের দেশে, ঘোমটা পড়া ঐ ছাওয়ায়…!” আমার কি ভাল যে লাগতো–ঐরকম একটা পরিবেশে ঐ গানটা শুনতে !
আমার গুরুদেব (রামানন্দ অবধূত) ওকে বলেছিলেন __’প্রশান্ত বৈদিক যে চতুরাশ্রম রয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে আগাবে৷’ আসলে দ্যাখো___ বৈদিক পরম্পরা রক্ষা করার জন্য উপযুক্ত আধার‌ও তো দরকার –নাকি!
দেবেন্দ্রনাথের সাথে আমার আলাপ হয়েছিল যখন আমার camp-life, অর্থাৎ যখন আমি Rural Electrification-এ কাজ করি__তখন। সম্বিত, দেবেন্দ্র আর সুব্রত (একজন দিল্লির ছেলে, তখন ওদের সাথে গুরুমহারাজের কাছে আসতো) ভূপাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র ছিল। ওরা রামকৃষ্ণ খুঁজতে মাঝেমধ্যেই বাংলায় আসতো, আর বিভিন্ন মঠ-মিশন-বাউল আশ্রম – এইসব স্থান ঘুরে বেড়াতো। ওদের স্থির ধারণা ছিল যে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আবার বাউলবেশে বাংলায় শরীর গ্রহণ করেছে । এছাড়াও, দেবেন্দ্রনাথের স্বভাবেই ছিল সাধু-সন্ত খুঁজে বেড়ানো !! যেহেতু_ ও অন্ধপ্রদেশের ছেলে, তাই ওই অঞ্চলে যে সমস্ত সাধু-মহাত্মারা ছিল, তাদের সাথেও যোগাযোগ ছিল দেবেন্দ্রের। পরবর্তীকালে দেবেন্দ্রনাথ উত্তর ভারতের__ বিশেষতঃ হরিদ্বার, ঋষিকেশ, উত্তরকাশী ইত্যাদি অঞ্চলে থাকা বহু মহাত্মাদের সাথেও যোগাযোগ রাখতো।
অংক এবং science subject-এ খুব জ্ঞান ছিল দেবেন্দ্রের। এখানে(বনগ্রামে) আসার পর মুখার্জি বাড়ির যে ছেলেরা science পড়তো বা অংক করতো – দেবেন্দ্র ওদের কাছে বসে মুখে মুখে উত্তর বলে দিতো। অসম্ভব বুদ্ধি ছিল ওর ! রাবণের দশমাথার বুদ্ধির মতো ওর বুদ্ধি ছিল। কিন্তু জানো__পরের দিকে দেবেন্দ্রনাথ অন্ধ্রে নিমপালি বাবার কাছে দীক্ষা নিয়ে ওনার শিষ্য হিসাবে সেখানেই থেকে গিয়েছিল। ওরা ছিল অঘোরপন্থী পরম্পরা। ঐসব পরম্পরায় নিয়ম রয়েছে যে, কালো পোশাক পরতে হয়– হাতে লোহার তৈরি ত্রিশুল বা ঐ জাতীয় কিছু একটা রাখতে হয়, ঘৃণা দূর করার জন্য কপালে পায়খানার টিপ্ পরতে হয় – তাছাড়াও আরো উদ্ভট নানারকম অভিচার ক্রিয়াচার করতে হয়।
আসলে কি হয়েছে জানো__ ‘ও’ তো শুদ্ধসত্ত্ব স্বভাবের ছেলে ! এইসব নানারকম ক্রিয়াকান্ড করতে গিয়েই ওর মাথাটি বিগড়ে গেলো ! এরপর থেকে ‘ও’ বনগ্রাম আশ্রমে আসা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিল। এখন আমি যখন অন্ধ্রপ্রদেশের ভক্তদের অনুরোধে নন্দীয়ালে যাই, তখন ওর সাথে দেখা হয়। হয় খবর পেয়ে ‘ও’ নিজেই আসে অথবা আমি খুঁজে খুঁজে ওর সাথে দেখা করে আসি। দেবেন্দ্রনাথের মা(গর্ভধারিনী) আমাকে খুবই ভালবাসতেন, যত্ন করে অনেকবার খাইয়েছেন। মায়ের শেষ বয়সে ও মায়ের খুব সেবা কোরতো। আমার সাথে ওর শেষ যেবার দেখা হয়েছিলো তখন ‘ও’ বলল, ” আমি মোহাম্মদের অবতার, তুমি যীশুর অবতার – এই দুজনকে আমি চিনতে পেরেছি। কিন্তু রামকৃষ্ণের অবতারকে এখনও খুঁজে পাইনি। তাকে খুঁজে পেলেই আমরা তিনজনে জগৎ-সংসারকে উদ্ধার করতে বেরিয়ে পড়বো।” আমি বললাম – “তাহলে তাঁকেই খোঁজো!” বুঝতে পারলাম সত্যিই ওর মাথাটা একটু গন্ডগোল করছে। …. [ক্রমশঃ]