শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বলা কথা নিয়ে এখানে কিছু কিছু আলোচনা হচ্ছিলো। শেষের episode-এ ‘প্রাণ’- উপাসনা সম্বন্ধে কিছু কথা বলা হয়েছিল। ‘উপাসনা’ প্রসঙ্গে গুরুমহারাজ একটি article লিখেছিলেন। এই আলোচনায় গুরুমহারাজ বলেছিলেন যে, ” মানবের কামনা-বাসনা যুক্ত নিম্নমুখী বেগযুক্ত মন-ই অশুদ্ধ মন এবং কামনা-বাসনা মুক্ত ঊর্ধ্বমুখী বেগযুক্ত মন-ই শুদ্ধ মন বা বিশুদ্ধ মন !” এই যে ‘শুদ্ধ মন’, – এটার কথাই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন । উনি বলেছিলেন – ” ঈশ্বর শুদ্ধ মনের গোচর !”
গুরুমহারাজ আলোচনা করেছিলেন যে, মানুষের মনোজগতে সদা-সর্বদা উত্থিত এই কামনা-বাসনার মূল হোলো অজ্ঞানতা বা ভ্রান্তি ! অজ্ঞানতা বা ভ্রান্তিবশতঃ-ই মানুষ কামনা-বাসনার আবর্তে জন্ম-জন্মান্তর ধরে ঘুরে ঘুরে মরে ! আর মানবের এই অজ্ঞানতা বা ভ্রান্তি নাশ করার জন্য, তার মনের কামনা-বাসনা চিরতরে মন থেকে মুছে ফেলার জন্যই প্রয়োজন হয় ‘উপাসনা’-র ! এই আলোচনায় গুরুমহারাজ খুব স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, দেশ-কাল-পাত্রভেদে উপাসনার পদ্ধতি, আচার-অনুষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন হোলেও কিন্তু সকলের উপাস্য সেই একই ! আর সেই উপাস্য হলো *সচ্চিদানন্দ পরমেশ্বর* ! দেশভেদে-মানুষভেদে-সম্প্রদায়ভেদে কেউ এই সচ্চিদানন্দকেই ‘ঈশ্বর’ বলে থাকে, কেউ ‘আল্লাহ্’ বা ‘God’ অথবা ‘জিহোবা’ বলে থাকে । এছাড়া আরও বিভিন্ন সম্প্রদায়, আরো কত কি নামে তাঁকে উপাসনা করে থাকে তার ইয়ত্তা নাই !
কেনই বা স্থান-কাল-পাত্রভেদে উপাসনার পদ্ধতি, অনুষ্ঠান, আচার, উপাস্যের নাম — এইগুলি বদলে যায় ? তারও উত্তর দিয়েছিলেন গুরুমহারাজ। উনি বলেছিলেন যে, এই মহাবিশ্বপ্রকৃতি যেমন ত্রিগুণ সমন্বিত, ঠিক তেমনি মানব প্রকৃতিতেও সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ- এই তিন গুণ বিদ্যমান রয়েছে। এই তিন গুণের তারতম্য হেতু মানুষের স্বভাব ভিন্ন ভিন্ন হয় এবং স্বভাবের ভিন্নতার জন্য মানুষের রুচিবোধ, ভালোলাগা বোধ, আচার-আচরণ সবই পাল্টে পাল্টে যায়। কিন্তু যতই পাল্টে যাক – যেকোনো দেশের যেকোনো পরম্পরার সাধকের সাধনার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যদি হয় পরমেশ্বরকে লাভ করা – তাহলে শুধুমাত্র সাধকের পরম্পরার (গুরুর) প্রতি *শ্রদ্ধা*, সাধন period-এ অশেষ *ধৈর্য* অবলম্বন এবং পরমেশ্বরকে লাভের ঐকান্তিক *ব্যাকুলতা* – এই তিনটি থাকলেই অবশ্য তা লাভ হবে।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন, বেশিরভাগ মানুষের মন রয়েছে অভিমানিক স্তরে। এইজন্যেই মানুষের মন কোনো বিষয়েই বেশিক্ষণ স্থায়ী হোতে পারে না। এই সুখ – তো এই দুঃখ, এই হর্ষ – তো এই বিষাদ ! এইরূপ সবসময়েই নানান দ্বন্দ্বাত্মক বিষয়ে বা দোলাচলে থাকে। আমাদের একটা ধারণা রয়েছে যে, এগুলির মধ্যে positive বিষয়গুলি হয়তো ভালো এবং negative বিষয়গুলো খারাপ ! কিন্তু ভারতীয় ঋষিগণ অর্থাৎ যাঁরা যথার্থ জ্ঞানী, তাঁরা বলে গেছেন – মনের অভিমানিক স্তরে উঠতে থাকা (কামনা-বাসনা সঞ্জাত) সবকিছুই ‘বিকার’ ! এগুলি হল চিত্তবিকার ! কারণ আমরা ভুলে থাকতে ভালবাসলেও এটাই সত্যি যে, সুখের চাহিদা করা মানেই তার সাথে সাথে দুঃখকে আহ্বান করে নিয়ে আসা ! যেকোনো ভালো কিছুকে চাওয়া মানেই হোলো – সঙ্গে সঙ্গে যত কিছু খারাপ রয়েছে তাদেরকেও পেতে চাওয়া !!
ঠিক এই কারণেই জ্ঞানীগণ চুপ করে যান, সমস্ত ধরনের ‘চাওয়া’ বন্ধ করে দেন। শরীরের বা ইন্দ্রিয়ের চাওয়া, মনের চাওয়া – সব stop ! তবে, প্রাণের চাওয়াটা কি থাকে !! একটা অবস্থায় পৌঁছানোর পর আর কোনোকিছুরই চাওয়া থাকে না। গুরুমহারাজ বলেছিলেন – মনকে unit ধরে এবং মনের বিষয়গুলিকে যদি অন্য সংখ্যা ধরা হয় তাহলে ১/১০০০, ১/১০০, ১/১০ করতে করতে আগালে দেখা যায় যে ভগ্নাংশের মান ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে অর্থাৎ অন্যান্য বিষয় যতো কমছে, বিষয় সম্বন্ধে সাধকের ধারণা বাড়ছে। তারপর যখন মনের বিষয় ১/১ হোচ্ছে – তখনই যেকোনো বিষয়ের ষোলআনা বা পুরোপুরি জ্ঞান হোচ্ছে। কিন্তু সেখানেও থেমে থাকেন নি ভারতীয় ঋষিরা __ তাঁরা এইবার চিত্তবৃত্তিনিরোধ অবস্থায় পৌঁছালেন, যখন ১/০ হয়ে যাচ্ছে ! আর তখনই “১/০ = infinity” বা অসীম, অনন্ত হয়ে যাচ্ছে ! এটাই সাধকের উপাসনার অন্তিম বা ultimate উদ্দেশ্য !
সকল সাধনার উদ্দেশ্য‌ই হোলো__ সমস্ত বিষয় থেকে, বস্তু থেকে, ব্যক্তি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা ! তাই উপাসনার একটি স্তরে এসে শরীর-মন-প্রাণ ইত্যাদি কোনো কিছুরই চাওয়া থাকে না, আর তখনই সাধকের জীবনে আসে এই শূন্য অবস্থা বা বলা যায় পূর্ণ অবস্থা !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – বৌদ্ধমতে এই অবস্থাকে “শূন্য অবস্থা” বলা হয়েছে আর ঔপনিষদিক চিন্তাধারায় এটাই “পূর্ণ অবস্থা” ! এই ‘পূর্ণাবস্থা’ হোলো এমন এক অবস্থা যা সবসময়েই পূর্ণ ! এমনকি এই পূর্ণ থেকে পূর্ণকে বাদ দিলেও সেই পূর্ণই অবশিষ্ট থাকে !
“পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে – পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণ মেবাবশিষ্যতে।”।৷