শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের আলোচনার অংশসমূহ এখানে আপনাদের সকলের সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছিলো। আমরা আগের দিন আলোচনা করছিলাম – বিভিন্ন মহাপুরুষগণ মূর্তিপূজার বিরোধিতা করে গেছেন কেন ? ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় – ভারতবর্ষই সকল কিছুর জননী। ভারতবর্ষ থেকেই মূর্তিপূজার প্রয়োজনীয়তার কথা বিচার করে ঋষিগণ পৌরাণিক যুগে মূর্তির প্রচলন করেছিলেন – আবার আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে ভারতবর্ষেরই এক মহান আচার্য ভগবান বুদ্ধদেব মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি শুধু মূর্তিপূজা-ই নয়, বেদাদি শাস্ত্রে উল্লিখিত যাবতীয় উপাসনা পদ্ধতি (যাগ-যজ্ঞ ইত্যাদি)-রই বিরোধ করেছিলেন। তাঁরই সূত্র ধরে পরবর্তীতে ন্যাজারেথের যীশু এবং আরও বেশ কিছুটা পরে হযরত মুহাম্মদ মূর্তিপূজার বিরোধ করেছিলেন।
ভারতবর্ষ-ই সবকিছুর জননী। এখান থেকেই সবকিছু সৃষ্টি হয়ে থাকে – তারপর তা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে যখন পুনরায় ভারতে ফিরে আসে – তখন তা বিবর্তিত হয়ে আসে, বিকৃত হয়ে আসে। সবক্ষেত্রেই এটা হয়। শুধু ধর্মনৈতিকভাবেই এটা হয়েছে তা নয় – রাজনৈতিক, সামাজিক – যে কোনোভাবেই এই পরিবর্তিত-বিকৃতরূপগুলোকেই ভারতবর্ষ বহুকাল থেকে আবার নিজের মধ্যে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বা বলা চলে কোনো কোনো সময় এইগুলিকে ভারতবাসীকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। বিদেশি শাসকেরাই এই বাধ্য করার দায়িত্বটা নিয়েছিল। সুপ্রাচীন সভ্যতার আকরভূমি, সমস্ত সভ্যতার জননী – এই ভারতবর্ষের এই দুর্গতিই বা হোলো কেন ? কেন তাকে প্রায় হাজার বছর ধরে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে হোলো – এই গ্লানি বহন করতে হোলো ? এই কারণগুলি খুঁজতে গিয়েই অন্য অনেককিছুর সঙ্গে ভগবান বুদ্ধের মূর্তিপূজার বিরোধ করার কারণ, বেদবিরোধী হওয়ার কারণও খুঁজে পাওয়া যাবে।
ভগবান বুদ্ধের শরীরগ্রহণের আগে ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ্যবাদের এতো রমরমা হয়েছিল আর সমাজে ব্রাহ্মণদের দাপট, অত্যাচার, অনাচার এমন বেড়ে গিয়েছিল যে, সমাজের নিম্নবর্ণের মানুষদের তখন বেঁচে থাকাই দায় হয়ে উঠেছিল। চরম লাঞ্চনা-অত্যাচার-অবহেলা-অবমাননার শিকার ছিল তারা ! তাদের এইরূপ লাঞ্ছনা-অবজ্ঞা-অবহেলা-অবমাননা আর হাহাকারে ব্যথিত ও করুণার্দ হয়ে ঈশ্বরের অবতরণ হয়েছিল ভগবান বুদ্ধরূপে ! এরপর উনি ব্রাহ্মণ্যপ্রথা থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন পৃথিবীতে খ্রিস্টান বা ইসলাম নামক ধর্মমতগুলির জন্মই হয়নি।
ঠিক তেমনই ইউরোপের বিস্তীর্ণ স্থানে রাজন্যবর্গের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল সাধারণ প্রজারা। ভগবান যীশু এসে নিজের শরীরে লাঞ্ছিত মানুষের কষ্ট-যন্ত্রনাকে গ্রহণ করে ক্রুশবিদ্ধ হোলেন। মানুষ যীশুকে ক্ষমা ও করুণার মূর্তি হিসাবে পেলো, রুক্ষ-শুষ্ক মানুষেরা ভগবৎ প্রেমের স্বাদ পেয়ে ধন্য হোলো। মানুষের মধ্যে মানবিকতার বোধ জাগ্রত হোলো – ফলে ইউরোপীয় সমাজ দ্রুত সভ্যতার এবং উন্নতির পথে আগাতে শুরু করলো।
কিন্তু আরবের মরুভূমিকে কেন্দ্র করে তখনও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ যাযাবর জীবনযাপনেই অভ্যস্ত ছিল। ছোট ছোট দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে তারা ভ্রাম্যমাণ জীবন কাটাতো। সুযোগ পেলেই বণিকদের কাফেলা আক্রমন করতো, তাদের ধনরত্ন লুটপাট করতো – তাদের ছিল পথেই জীবন। মাঝে মাঝে এক-একটা সর্দার বড় দল তৈরি করে কোনো না কোনো সীমান্তবর্তী রাজ্যের শহরে-নগরে ঢুকে পড়ে সেখানকার ধনরত্ন খাবার-দাবার সহ নারীদেরকেও লুট করে পুনরায় ফিরে যেতো দুর্গম রুক্ষ মরুভূমিতে ! এদের বেশিরভাগেরই – না ছিল ধর্মবোধ, না ছিল মানবিক মূল্যবোধ। আসলে তখনও পর্যন্ত সেভাবে এদের মনের বিকাশই সংঘটিত হয়নি। হযরত মুহাম্মদের শরীর গ্রহণের আগে এই সময়টাকে “অন্ধকারময় যুগ” বা “আইয়ামে জাহেলিয়াত” বলা হয়ে থাকে৷
এইরকম যখন একটা চরম সংকটকাল চলছিল আরবের মরুভূমির বুকে – তখনই ঈশ্বরের করুণা নেমে এসেছিল হযরত মুহাম্মদ রূপে ! তখনকার আরবের মক্কা বা মদিনা ছিল খুবই ছোটো ছোটো জনপদ। রুক্ষ-অনুর্বর-বন্ধ্যা ধরীত্রির অধিবাসীরাও রুক্ষ হয়, নারীদের বেশিরভাগই বন্ধ্যা হয়। ফলে এমনিতেই জনসংখ্যা ওখানে কম (এইজন্যেই আরবের ধনীরা সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা অঞ্চল থেকে হাজারে হাজারে নারীদেরকে প্রতি বৎসর পাচার করে নিয়ে যায় এবং জনসংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করে(যেখানকার মাটি সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা, সেখানকার নারীও বহুপ্রসবা হয়।)। বেশিরভাগ মানুষই “ধর্ম” ব্যাপারটাই জানতো না ফলে মানার প্রশ্ন‌ই ওঠে না ! তার উপর মক্কার হযরতের বংশধরেরাই ছিলেন মহাকাল মন্দিরের মুর্তিপূজক পুরোহিত। ফলতঃ, ব্রাহ্মণ্যবাদের মানসিকতা থেকে তারাও মুক্ত ছিল না এবং অবশ্যই এইজন্য সাধারণ মানুষজন আরো ধর্মবিমুখ হয়ে পড়েছিল।
সেইরকম একটা প্রতিকূল অবস্থায় হযরত মুহাম্মদ মহাপ্রকৃতির নিয়মে সৃষ্টির ধারার অগ্রগতি বজায় রাখতেই ওই দেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এটা মাথায় রাখা উচিত যে, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে যে কোনো মহাপুরুষের আগমন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় – মহাপ্রকৃতির মহানিয়মের মধ্যেই পড়ে। পরবর্তীকালের followers-গণের মহাবিশ্বপ্রকৃতির great rule সম্বন্ধে ধারণা না থাকায় – তারা তাদের নিজ মতের প্রতিষ্ঠাতা বা এই ধরনের অন্য মহাপুরুষদেরকে নিয়ে এক-একটা দল, এক-একটা সম্প্রদায় ইত্যাদি বানিয়ে – অপর দল, অপর সম্প্রদায়ের সাথে ঝগড়া করে, হানাহানি করে, মারামারি-কাটাকাটি করে !
যাইহোক যা বলা হচ্ছিলো – এক কঠিন পরিস্থিতিতে চরম সংকটজনক অবস্থার মধ্যে হযরত মুহাম্মদ আরবের মরুভূমিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। মহাপুরুষদের ‘এক এবং একমাত্র’ কাজই হোলো – মানবের কল্যাণ সাধন করা। সুতরাং তিনিও সাধারণ মানুষের কল্যাণার্থে সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যাযাবর-লুটেরা জনজাতিকে এক ছত্রছায়ায় আনার জন্য__ যা যা করার দরকার তাই করেছিলেন ! তাদেরকে জনজীবনের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য_ যে শিক্ষা দেবার প্রয়োজন ছিল তিনি সেই শিক্ষাই দিয়ে গিয়েছিলেন।
এঁরা হোলেন যুগপুরুষ ! যে যুগে, যে স্থানে, যে শিক্ষার প্রয়োজন – তাঁরা যথাযথভাবে সেই কাজটিই করে যান। বহুকাল ধরে চলে আসা মানব-বিবর্তনের ইতিহাস যদি পর্যালোচনা করা যায় – তাহলে এটাই দেখা যায় যে, স্থান-কাল-পাত্রভেদে যুগে যুগে মহামানবগণ মানব কল্যানার্থে শরীর গ্রহণ করেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ যথার্থই লিখেছেন – “তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে !”
এখানে “তুমি পাঠায়েছ”- বলতে সেই মহাবিশ্বপ্রকৃতির great-rule ! সেখান থেকেই সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু মুশকিল হোলো বেশিরভাগ সাধারণ মানুষকে নিয়ে ! তাদের মনোজগত এখনো উন্নত হয়নি। তাই তাদের মনে হিংসা-অভিমান-অহংকার-বিদ্বেষ-ঈর্ষা ইত্যাদি বদ্-গুণগুলি রয়ে গেছে ! মানবোচিত সদ্-গুণগুলি অর্থাৎ ক্ষমা-দয়া-করুণা-ভালোবাসা-সহনশীলতা-ধৈর্য-সংযম ইত্যাদিগুলির বিকাশ ঘটেনি। তাই তো এতো মহান মানুষেরা বারবার জন্মগ্রহণ করলেও, বারবার মানুষকে প্রেমপূর্ণভাবে সহাবস্থানের শিক্ষা দিয়ে গেলেও__ আমরা এমন আহাম্মক, আমরা এতটাই নিম্ন চেতনায় রয়েছি যে – শুধুই ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি করতেই ভালোবেসেছি। বারবার আমাদের কল্যাণ করতে আসা সেইসব যুগপুরুষদেরকেও মেরে ফেলেছি ! তাই আসুন আমরা সকলে মিলে সেই পরমেশ্বরের কাছেই প্রার্থনা করি–
” অসদো মা সদ্গময়ঃ ! মৃত্যোর্মা অমৃতংগময়ঃ ! তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ !”
[ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।]