শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের আলোচনা করা বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলা হচ্ছিলো। এখন আমরা আলোচনা করছিলাম ‘উপাসনা’ প্রসঙ্গে। ‘উপাসনা’ অর্থে আরাধনা বা সাধন-ভজন করা। উপাসনা, আরাধনা বা সাধন-ভজনের প্রয়োজনীয়তাই বা কি ? এর উত্তর দিয়েছিলেন গুরুমহারাজ। উনি বলেছিলেন – “এই মহাবিশ্ব এক অজানা মহাশক্তির দ্বারা পরিচালিত। গ্রহ, নক্ষত্রাদি ও জড়জগৎ আবর্তিত হচ্ছে ওই মহাশক্তির প্রভাবে।” উনি আরও বলেছিলেন – “ঐ একই নিয়মে প্রাণিজগতের সৃষ্টি, পালন এবং সংহাররূপে নিয়ন্ত্রণ সংঘটিত হচ্ছে। এই প্রাণীজগতের মধ্যে মানব হোলো উন্নত স্তরের প্রাণী। মানব প্রাণস্তরের শ্রেষ্ঠ অভিব্যক্তি এবং মানবের মধ্যে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। আর ঐ বৈশিষ্ট্য হোলো মানবের কাণ্ডজ্ঞান বা বিবেক ! এই বিবেক-ই মানুষকে অন্যান্য প্রাণীকুলের যে সাধারণ বৃত্তি অর্থাৎ আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুন এই চারটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে দেয়নি। মানুষের মধ্যে এই চারটি ছাড়াও যে পৃথক একটি প্রেরণা রয়েছে – সেটি হল ‘সম্পূর্ণতা লাভের ইচ্ছা’ !”
এই সম্পূর্ণতা বা পূর্ণতালাভের ইচ্ছাই মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলে। এগিয়ে চলাই মানবের ধর্ম। এটাকেই উপনিষদ বলেছে – “চরৈবেতি !” আর শুধু এগিয়ে চলাই নয় – এগিয়ে চলতে চলতে সম্পূর্ণতা বা পূর্ণতায় উপনীত হওয়াই মানবের মূল ধর্ম, এটাই মানব জীবনের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য। যুগে যুগে মহাপুরুষগণ নিজেদের জীবনে ত্যাগ-বৈরাগ্য-সংযম-সাধন-ভজনের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে সমকালীন মানুষের কাছে আদর্শস্থানীয় হয়ে ওঠেন, বহু মানুষের পথিকৃৎ হ’ন তাঁরা ! তাঁদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু মানুষ প্রকৃত ধর্মবোধে উপনীত হয়, তাদের মধ্যেও সম্পূর্ণতা আসে। কিন্তু কিছুকালের মধ্যেই মানুষ সেই মহাপুরুষের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে সংকীর্ণবুদ্ধির শিকার হয়। ফলে অসহজতা, হীনবুদ্ধি ও অবিবেকবশতঃ মানুষ মহাপুরুষের আদর্শ থেকে সরে যায় –ফলতঃ তাদের কক্ষচ্যুতি ঘটে।
এইভাবে বিভিন্ন মহাপুরুষদেরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বিভিন্ন সম্প্রদায়। আর সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবিশিষ্ট মানুষেরা সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে ঝগড়া, মারামারি, কাটাকাটিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এটাই বহুকাল ধরে চলে আসা মানবজাতির ইতিহাস। বর্তমানকালের যুগপুরুষ স্বামী পরমানন্দ বললেন – ” অসহজতার আবিলতা মুক্ত হয়ে তোমরা ‘সহজ’ হয়ে ওঠো !” আসলে স্বামী পরমানন্দ যে ‘সহজ মানুষ’ (সমস্ত যুগপুরুষরাই সহজ মানুষ), ‘সহজ’ স্থিতির মানুষ ! এই স্থিতিলাভ-ই মানবের সম্পূর্ণতা লাভ ! সাধন-ভজন, উপাসনা, আরাধনার দ্বারা মানুষ আধ্যাত্মিকভাবে যতো উন্নত হয়, সে ততোটাই ‘সহজ’ হয়ে উঠতে থাকে !
কি এই সহজ স্থিতি ? এই ‘সহজ স্থিতি’ হোলো মানবের এমন একটা উন্নত অবস্থা – যেখানে কোনো ভেদাভেদ থাকে না, কোনো সম্প্রদায়–কোনো মত–কোনো শ্রেণী বৈষম্য থাকে না ! তিনি হয়ে ওঠেন চিরস্বাধীন, নিত্য-মুক্ত-সদানন্দময় ! তাঁর সংস্পর্শে আসা মানুষজনও এই সহজ মানুষের ছোঁয়া পেয়ে, সহজ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে – পূর্ব পূর্ব জীবনের সংস্কার ত্যাগ করে, অসহজতা-অবিবেক-অজ্ঞানতা মুক্ত হয়ে সহজ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হোতে শুরু করে এবং পরিপূর্ভাবে সহজ মানুষ হয়ে ওঠার প্রচেষ্টায় প্রয়াস পায়। এই সহজ অবস্থা লাভ করাই হোলো সমস্ত মানবের অন্তিম লক্ষ্য বা অন্তিম অবস্থা ! সহজ অবস্থাই প্রেমিক অবস্থা, সহজ অবস্থাই পূর্ণজ্ঞানের অবস্থা, সহজ অবস্থাই শ্রেষ্ঠ কর্মযোগীর অবস্থা !
গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ হিমালয়ে থাকাকালীন সময়েই “সহজতা ও প্রেম”- গ্রন্থখানির পান্ডুলিপি প্রাথমিক খসড়া রচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে উনি বনগ্রামে আসার পর একেবারে প্রথম অবস্থাতেই (১৯৭৮-৭৯ সাল) এই বইটির পান্ডুলিপির সম্পূর্ণতা দান করেন। এরও অনেক পরে ১৯৮৬ সালে চরৈবেতি কার্যালয় থেকে গুরুমহারাজের অনুমতিক্রমে চরৈবেতি কার্যালয়ের সম্পাদক স্বামী স্বরূপানন্দ ঐ পান্ডুলিপিগুলি নিয়ে “সহজতা ও প্রেম”- বইটি প্রকাশ করেন(অবশ্য এর আগেই এই ব‌ইটির ইংরেজি অনুবাদ “Normality and Love”- ব‌ইটি বেরিয়েছিল। অনুবাদ করেছিলেন–সিঙ্গুরের সন্তোষবাবু, সব্যদার বাবা।) তখন আশ্রমে ভালো ছাপা মেশিন এবং expert ছাপাইকর্মী না থাকায় এই বইটি বর্ধমানের শ্রীলেখা আর্ট প্রেস_ থেকে ছাপা হয়েছিল।
যাইহোক, এই গ্রন্থে গুরুমহারাজ “সহজতা” এবং “প্রেম” সম্বন্ধে সম্যক ধারণা দিয়েছেন। এই গ্রন্থটি সম্বন্ধে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” এই বইটি আগামীদিনের গীতা হিসাবে মানুষের কাছে মর্যাদা পাবে। প্রতিদিন এই বইটি মানুষের পাঠ করা প্রয়োজন। বইটি যত বেশি বার পড়া হবে – ততই এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ কথাগুলির অন্তর্নিহিত অর্থগুলি নতুন নতুন ভাবে পাঠকের কাছে পরিস্ফুটিত হবে।”
কিন্তু ব্যস্ততার কারণে সকল পরমানন্দ ভক্তদের এই গ্রন্থ প্রতিদিনই বা বারেবারে পাঠ করা সম্ভব হয় না। তাই আমরা এখন থেকে চেষ্টা করবো গুরুজীর “সহজতা ও প্রেম” থেকেই অংশবিশেষ তুলে তুলে__ সেই নিয়ে আলোচনা করার ! তাহলে গুরুমহারাজকে স্মরণ করার সাথে সাথে তাঁর গ্রন্থের বিষয়বস্তুর পাঠ অর্থাৎ এই যুগপুরুষের প্রচারিত শিক্ষা লাভও হয়ে যাবে। তাহলে আসুন__আমরা এখন থেকে সেই চেষ্টায় ব্রতী হ‌ই।।(ক্রমশঃ)