শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বিভিন্ন আলোচনা (বলা এবং লেখা) গুলিই এখানে কথাপ্রসঙ্গে বলা হচ্ছিলো। এখন আমরা আলোচনা করছিলাম গুরুমহারাজের বলা “উপাসনা”-র ব্যাখ্যা নিয়ে এবং উপাসনা বা আরাধনার একমাত্র উদ্দেশ্য যে ‘সহজ’ হওয়া বা ‘সহজ স্থিতি’ লাভ করা – সেইসব সম্বন্ধে ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” স্বার্থপর পাশবিক মানবই অসহজ, আর স্বার্থমুক্ত প্রেমিক মানবই সহজ !” বাউলগণ এই সহজ মানুষের কথাই বলেন, এই সহজ মানুষের খোঁজে পথে পথে ঘুরে বেড়ান ! যদি সেই সহজ মানুষের সংস্পর্শ লাভ কোরে – তাঁর কাছে সহজ-শিক্ষা গ্রহণ কোরে নিজেও ‘সহজ’ হওয়া যায় !
আগের আলোচনায় আমরা দেখেছিলাম, গুরুমহারাজ বলেছেন মানব পৃথিবীগ্রহের শ্রেষ্ঠ প্রাণী – কারণ তার কাণ্ডজ্ঞান বা বিবেক রয়েছে। কিন্তু সেখানেও একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে, তাহলে মানুষে-মানুষে এতো ভেদাভেদ, এতো হিংসা, এতো মারামারি-ঝগড়া-রক্তপাত কেন ? তার কারণ বোঝাতে গিয়ে গুরুমহারাজ বলেছেন – ” মানুষের বিবেক রয়েছে, কিন্তু তা কোনো না কোনো বন্ধনে অবশ হয়ে রয়েছে।” এই বন্ধনের বিষয়গুলি কি কি হোতে পারে ? সেগুলি হোলো – বিভিন্ন ধরনের অভিমান, যেমন – কুলাভিমান, জাত্যাভিমান, পান্ডিত্যাভিমান, এছাড়াও শ্রেণী, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ইত্যাদি নানারকম অভিমান-ই মনস্তরের বন্ধনে মানবের বিবেক আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে।
সাধারণত আমরা সাধারন মানুষেরা কোনো না কোনো সংস্কারের বন্ধনে (অর্থাৎ এটা ‘মানি’ অথবা ওটা ‘মানি’ না), কোনো না কোনো সিদ্ধান্তের অনুশাসনে__ আটকে যায়। আর তার ফলেই যত সমস্যার সৃষ্টি হয়, তার ফলেই মানুষে-মানুষে, ভাইয়ে-ভাইয়ে যত বিরোধ, ঝগড়া, মারামারি !
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” তোমরা এইসব সিদ্ধান্তের বন্ধনে আটকে না থেকে তারও উপরে ওঠো, ‘মানা’ এবং ‘না মানা’-র উর্ধে নিজের চেতনাকে উন্নীত করো।” তাহলেই সহজ স্থিতি লাভ করা যাবে। মানুষ সমস্ত প্রকারের বন্ধন থেকে মুক্ত হবে, স্বাধীন হোতে পারবে। গুরুজী তাইতো বললেন – “মানবের সমস্ত প্রকার বন্ধন কেটে গেলে, সমস্ত রকমের নির্ভরতা থেকে মুক্ত হোতে পারলে যা থাকে,– তাই হোলো আত্মনির্ভরতা বা ঈশ্বরনির্ভরতা।”
উনি আরও বলেছিলেন – ” প্রকৃত সত্যকে জীবনে উপলব্ধি করতে হোলে মানবকে সমস্ত মতবাদের ঊর্ধ্বে যেতেই হবে।” সত্যিই তো – কোনো মতবাদ তো মানুষকে ধরে রাখেনি, ভিন্ন ভিন্ন মানুষই ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ-কে ধরে রেখেছে এবং নিজেদেরকে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। সুতরাং ঐ মত বা মতবাদকে ছাড়লেই তো মানব “মুক্ত”, মানব স্বাধীন__ তাই নয় কি ? তাহলে মানুষ ইচ্ছা করলেই ‘মুক্ত’ হতে পারে – যদি সে তা চায়। কিন্তু এমনই মানবের স্বভাব যে, সে মুক্ত হতে চায় না, বন্ধন-ই যেন সে অধিক ভালোবাসে।
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ‘ঘাড় বাঁকা গাধা’র গল্প ! এক ধোবার একটি গাধা ছিল, সেটিকে ধোবা একটা শক্ত দড়ি দিয়ে খোঁটার সাথে বেঁধে রাখতো। কিন্তু কোনোসময় ঐ দড়িটি ছোট হয়ে যাওয়ায় তাকে নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকা পাত্র থেকে ঘাড় বাঁকিয়ে খাবার খেতে হোতো। ধীরে ধীরে এই ব্যাপারটায় গাধাটি এমন অভ্যস্ত হয়ে গেল যে, পরবর্তীতে ওই দড়িটি লম্বা করে দিলেও গাধা ঘাড় বাঁকিয়েই দাঁড়িয়ে থাকতো। এমনকি গলার দড়ি খুলে দিলেও গাধাটি ঐরকমভাবেই থাকতো এবং কষ্ট করেই ঘাড় বাঁকা করে খাবার খেতো! মানুষ‌ও নানারকম মতবাদ, সংস্কাররাশি ইত্যাদির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ঐ রূপ কষ্ট পাওয়াটাকেই অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছে।
সংস্কাররাশির চাপে, বিভিন্ন ‘মানা’–’না মানা’-র চাপে, সমাজনেতাদের (রাজনৈতিক, ধর্মনৈতিক, সামাজিক) চাপানো সিদ্ধান্তের চাপে – সাধারণ মানুষ ঐ ঘাড়বাঁকা গাধার ন্যায় সর্বদা কষ্ট পেয়ে যাচ্ছে – কিন্তু আঁকড়ে ধরে থাকা সংস্কার থেকে বেরোতে পারছে না ! এখানেই গুরুমহারাজ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন – উনি বলেছেন – ” অপরের দৃষ্টিতে নিজেকে দেখো না আপন দৃষ্টিতে আপনাকে – আপন দৃষ্টিতে আপনাকে দেখো !”
কিন্তু হায় ! আমরা সবসময় অপরের দৃষ্টিতেই জগতকে দেখতে চাই – নিজের দৃষ্টিতে নিজেকে মোটেই দেখতে চাই না। এইজন্যেই আমরা আমাদের থেকে চেতনায়-বুদ্ধিতে-ধনসম্পদে-বিদ্যায়-শক্তিতে-পদাধিকারে (ধর্মনৈতিক-রাজনৈতিক) একটু উন্নত যে কোনো ব্যক্তির দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হয়ে পড়ি ! তারা যেভাবে আমাদেরকে চালিত করে – ভেড়ার পালের মতো আমরা তাকে অনুসরণ করি ! এটাই মূর্খতা – এটাই আহাম্মকি – এটাই আমাদের মতো মানবের চরম দুর্বলতা !
এইভাবে স্রোতে গা না ভাসিয়ে – একবার এগুলির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে, স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটার চেষ্টা করতেই হবে, একবার আয়নার সামনে নিজেকে দাঁড় করাতেই হবে ! একবার নিজের সুপ্ত বিবেককে জাগিয়ে জিজ্ঞাসা করতে হবে – ” ঠিকটা কি ?” এটাই হোলো আধ্যাত্মিকতার শুরু !! জীবের জীবত্ব থেকে, ত্রিতাপ জ্বালার হাত থেকে মুক্ত হওয়া – স্বাধীন হয়ে ওঠার সূত্রপাত !!