শ্রী শ্রী গুরুমহারাজের কথা (বলা এবং লেখা) নিয়ে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” সাধারণত মানব নিয়মের বাইরে যেতে পারে না – যতক্ষণ না তারা সহজ হচ্ছে !” একাধারে মানব কিছু নিয়ম ভাঙে, আবার তারা কিছু নিয়ম গড়ে তোলে। অর্থাৎ কোনো নিয়মের প্রতিক্রিয়াতেই আবার নতুন এক নিয়ম গড়ে ওঠে।
পাঠকবৃন্দ! এই দেখুন –গুরু মহারাজের কথায় আবার সহজতার কথা, সহজ মানুষের জীবনযাত্রার কথা এসে যাচ্ছে ! মানুষের বিবর্তনের একেবারে গোড়ার দিকে যখন আদিম মানবেরা বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো – তখন তো আর বর্তমানের ন্যায় সমাজ-ব্যবস্থা ছিল না, থানা-পুলিশ-আইন-আদালত-সংবিধানও ছিল না। কিন্তু তাদেরও জীবনধারণের প্রয়োজনে কিছু কিছু নিয়মকে নিশ্চয়ই মান্যতা দিতে হোতো ! তারা প্রাকৃতিক নিয়মের অনুকুলে নিজেদের জীবনযাত্রাকে প্রবাহিত করতো !
কিন্তু মানুষ এরপর থেকে যত সভ্য হোতে শুরু করেছে, ততই তারা নিজেদের ভালো করতে গিয়ে নতুন নতুন নিয়মের নিগড়ে সমাজকে, সমাজের member-দেরকে বেঁধে ফেলেছে।
স্থান-কাল-পাত্রভেদে সেই নিয়মের আবার বদল হয়েছে। এইভাবেই একদেশের আইন-কানুন, অন্য দেশের সাথে মেলে না। একদেশে যে কাজটা বৈধ – অন্য দেশে সেটাই অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হয়ে যায়। কিন্তু গুরুমহারাজ যেটা বলেছেন তা হোলো – যে কোনো মানবসমাজে মানবের জন্য যতই নিয়ম তৈরি করা হোক না কেন – মানুষ সেই নিয়মকে ভাঙতে ভালোবাসে। কিন্তু একটা নিয়ম ভেঙে সে আবার নতুন কোনো নিয়ম তৈরি করে – একেবারে প্রায় কেউই সম্পূর্ণভাবে নিজেকে নিয়মের বাইরে আনতে পারে না। সেটা যাঁরা পারেন – তাঁরাই সহজ মানুষ, আত্মজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ !
‘সমাজের নিয়ম প্রণেতাগণ যুগ যুগ ধরে তাদের নিজ নিজ ইচ্ছানুসারে মানবসমাজকে নিয়মের দ্বারা বাঁধতে চেয়েছে – কিন্তু বহমান কালের স্রোতে সেই সব নিয়মই আবার অনিয়ম বা বেনিয়মে পরিণত হয়েছে এবং আবার নতুন কোন নিয়ম এসে সমাজের ঘাড়ে চেপে বসেছে’__গুরু মহারাজের কথা। এই যে নিয়ম ও অনিয়মের খেলা হয়ে চলেছে, এই নিয়ে গুরুমহারাজ বলেছেন – ” এই অনিয়মের ভিতর একটা নিয়ম অপ্রতিহত অবস্থায় চলছে – সেটা হোলো সমস্ত নিয়মকে না মেনে নেওয়া বা সেগুলোকে ভেঙে দেওয়া। এই নিয়মই হোলো– মহাকাল বা কালচক্র ! নিয়মবিদ্-গণের নিয়ম সেখানে তুচ্ছ, ক্ষণিক প্রতিভাস মাত্র !”
ভারতীয় শাস্ত্রে, বিশেষতঃ ভক্তিশাস্ত্রে ‘বৈধি’ ও ‘অবৈধি’ ব্যাপারগুলো রয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে যে – বৈধি ভক্তি, বৈধি আচার-অনুষ্ঠান-পূজা-অর্চনার দ্বারা একটা নির্দিষ্ট সাধনার স্তর পর্যন্ত যাওয়া যায় – কিন্তু এর দ্বারা পরিপূর্ণ আস্বাদন লাভ সম্ভবপর হয় না। একমাত্র অবৈধি-তেই হয় সেই আস্বাদন ! বৃন্দাবনের ব্রজগোপীরা হোলেন অবৈধি ভক্তির পরাকাষ্ঠা ! ভাগবতে রয়েছে নারদের ন্যায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈধিভক্ত(এমনকি স্বয়ং শিবও না)-রাও রাসমঞ্চে প্রবেশাধিকার পায় নি, কিন্তু অশিক্ষিত গোপবধূ – যারা স্বামী-সন্তানাদি নিয়ে ঘর-সংসার করতো _তারা অনায়াসে রাসে প্রবেশাধিকার লাভ করেছিল!! কেন এমনটা হয়েছিল – তার একটা প্রমাণ ভক্তিশাশ্ত্রেই রয়েছে যে, একবার শ্রীকৃষ্ণের (নারায়ণের) এমন তীব্র মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল যে, তাঁর প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল। নারদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রভুকে এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় কি– তা জানতে চাইলে প্রভু বলেছিলেন – ” ভক্তপদরজঃ আমার মাথায় লাগালেই এই যন্ত্রণা থেকে আমি মুক্ত হবো !”
কিন্তু কোনো ভক্তই পাপের ভয়ে, তার পদধূলি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের (নারায়ণের) মাথায় লাগাতে সাহস করছিল না ! নারদ সমস্ত বৈধি ভক্তশ্রেষ্ঠদের কাছে কাছে গিয়েও যখন নিরাশ হোলো – তখন সে গেল বৃন্দাবনে, যদি সেখানে পদরজঃ পাওয়া যায় ! ব্রজগোপীদের কাছে শ্রীকৃষ্ণের অসহ্য মাথা ব্যথার ঘটনা এবং তার উপশমের ‘নিদান’ শুনে গোপীনীরা তৎক্ষণাৎ পথের আগে পা ডুবিয়ে নিলো_ তারপর পা ঝেড়ে ঝেড়ে নারদের কাপড়ের আঁচলে বেঁধে দিল তাঁদের পায়ের ধূলি ! কৌতূহলী নারদ জিজ্ঞাসা করলো – ” তোমরা জানো – এটি একটি মহা পাপকার্য্য ! এই পাপের শাস্তি কি ভয়ানক হোতে পারে ?” গোপীনীরা উত্তর দিয়েছিল – ” আমাদের কি হবে_সেটা পরের কথা ! আগে তো আমাদের প্রাণবধূঁয়া সুস্থ হোক – তারপর আমাদের যা হয় হবে ! তুমি সময় নষ্ট না করে ওই ধুলো নিয়ে চলে যাও !”
এই ঘটনায় নারদের ‘ভক্ত’ হিসাবে যে অহংকার ছিল – তা চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল ! আর এই একই ঘটনা থেকে মানুষকে বৈধি এবং অবৈধি ভক্তির পার্থক্যটাও বোঝানো গিয়েছিল।৷
যাইহোক, গুরু মহারাজের কথা অনুযায়ী নানারকম নিয়ম বা ‘বাদ’ই মানবকে ‘সহজ’ হোতে দেয় না – তাকে ‘অসহজ’ করে তোলে। মানবের ব্যক্তিজীবনে এবং সমাজ জীবনে একটা ‘বাদ’ থেকে মুক্ত হোতে গিয়ে আবার একটা ‘বাদে’র কবলে পড়ে যায় মানুষ। একদল একটা ‘বাদ’ হয়তো সমাজে আনছে – অপর কিছুদল মানুষ সেটার বিরোধিতা করছে। এইভাবে সমাজে সদাসর্বদা একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হোচ্ছে – সমাজ সুস্থ বা সুস্থির হোতে পারছে না ! এইজন্য গুরুমহারাজ বললেন – ” প্রিয় আত্মন্ ! বাদের কবলে না পড়ে, বাদ্-বিতণ্ডায় বা ঝগড়ায় জীবনকে না জড়িয়ে – যেখানে সমস্ত বাদের পরিসমাপ্তি হয়েছে – সেই পরমবোধের জন্য উৎকন্ঠিত হয়ে ওঠো !
চরৈবেতি – চরৈবেতি – চরৈবেতি !”