শ্রী শ্রী গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (বলা এবং লেখা) নিয়ে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজের যে কথাগুলি আমরা আগে বারবার ফিরে ফিরে আসতে দেখেছি, সেগুলি হোলো – ‘মানুষ যখন থেকে বিভিন্ন নিয়ম-বাঁধন-অনুশাসন-মতবাদ ইত্যাদিতে আটকে পড়েছে, তখন থেকেই সে তার ‘সহজতা’ হারিয়েছে। নিয়ম-অনুশাসন-মতবাদ ইত্যাদির প্রয়োজন রয়েছে – কিন্তু তা প্রাথমিক অবস্থায়। এইগুলির প্রয়োজনীয়তা একবার অনুভূত হয়ে গেলে বা উপলব্ধিতে এসে গেলে আর ঐ ব্যক্তির নিয়ম-অনুশাসনের প্রয়োজন কি আছে ? সে তো আর কোনো নিয়মই ভাঙবে না, কোনো অন্যায়কার্য্য-ই আর তার দ্বারা হবে না ! যে মতবাদকে সে আশ্রয় করেছিল__ সেই মতবাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি, তখন তার জানা হয়ে যায় ! সে বুঝতে পারে যে – যেকোনো মত-কে অবলম্বন করেই উপলব্ধির জগতে, বোধের জগতে পৌঁছানো সম্ভব হয়। ফলে সেখানে বিরোধের আর কোনো অবকাশ থাকে না ! সাধক তখন শান্ত হয়ে যায় এবং সর্বদা এক অপার শান্তি ও আনন্দের জগতে বিরাজ করে।
এইজন্যই গুরুমহারাজ বললেন – ” প্রিয় আত্মন্ ! মানব যদি মতান্তর (অর্থাৎ একমত ছেড়ে অন্য মত) গ্রহণ করতে থাকে, তাহলে কি তার সত্যের উপলব্ধি হবে ? না, তা হয় না। কারণ, মতবাদের বন্ধনে সত্য আবদ্ধ নয়।” সত্যিই তো – প্রকৃত সত্যের উপলব্ধি বা পরমেশ্বরের বোধ হওয়াটাই মানবজীবনের উদ্দেশ্য। আর তারজন্যই তো বিভিন্ন মতবাদ, বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-অর্চনা ! তাহলে সাধারণ মানুষের এক ‘মত’ ছেড়ে অন্য ‘মত’ গ্রহণ করার মানে হোলো এক পদ্ধতিতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা ক্রিয়া-পদ্ধতি ছেড়ে অন্য কোনো পদ্ধতির আচার-অনুষ্ঠান পালন করা – এর বেশি কিছুই নয়। এক ‘মত’ ছেড়ে অন্য কোনো ‘মতে’ আটকে পড়া। বন্ধন কিন্তু এখানেও থেকেই যাচ্ছে – মানুষ সেই বন্ধন কেটে মুক্ত আর হোতে পারছে কই ? এইজন্যেই গুরুমহারাজ বললেন – ” যতক্ষণ না মানব সমস্ত মতবাদের উপরে উঠবে, সহজ না হবে, ততক্ষণ পরম সত্যের সাক্ষাৎ করা খুবই দুরহ ! সাধারণতঃ মানব ‘মত ও পথে’-র বন্ধনে আটকে যায়, লক্ষ্যবস্তুতে উপনীত হোতে পারে না।”
আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এইটুকু ধারণা রয়েছে যে, কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, ক্রিয়া-পদ্ধতির মাধ্যমে, কোনো যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহারের দ্বারা অথবা মনের ক্রিয়ার দ্বারা পরম সত্যের বোধ বা ঈশ্বরোপলব্ধি হয় না৷ অনেকে হয়তো বলতে পারেন – ‘সে কি ! মনের একাগ্রতা দ্বারা তো ধ্যান হয় এবং ধ্যানের গভীরতায় তো আত্মোপলব্ধি হতে পারে !’ কিন্তু মনের একাগ্রতা বা ধ্যানের গভীরতায় প্রবেশের শেষ ধাপ হোচ্ছে_ ‘মনের বিলয় হওয়া’ ! মন কিন্তু সেখানে ক্রিয়াশীলই নয়। গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” মনের দ্বারা যা নির্মিত, তা পরিণামী ও কল্পিত। কিন্তু কল্পনা নিশ্চয়ই সত্য নয়। যিনি সমস্ত বন্ধনমুক্ত, মুক্তবিবেক, মুক্ত মনের অধিকারী – তিনিই সহজ ! আর সহজ অবস্থাতেই পরম সত্যের উপলব্ধি হয়।”
বাঁচা এবং বাড়া (বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া ও বংশবিস্তার) সাধারণ জীবের ধর্ম, কিন্তু যেহেতু মানব জীবশ্রেষ্ঠ – তাই মানবজীবনের সহজ ধর্ম বাঁচা-বাড়া ছাড়াও আরো একটা কিছু রয়েছে, আর সেটা হোলো__ পরিপূর্ণতা লাভের প্রবণতা। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষেরা আমাদের (মানবের) এই ‘সহজ’ ধর্ম-টাই ভুলে গিয়েছি এবং ধর্মের নামে নানারকম গোঁড়ামিতে ভরা এক একটা সম্প্রদায় গড়ে তুলেছি। আর তারপর আমরা প্রত্যেকেই পৃথক পৃথকভাবে বলছি – “এটিই ধর্মাচার !” গুরুমহারাজ এইসব কথা বলার পর বললেন – ” জীবনকে বাদ দিয়ে ধর্ম নয়। ….. ধর্ম জীবনমুখী, জীবনবিরোধী কখনোই নয়। মানবকে জীবনমুখী হতে হবে৷ জীবনবিরোধী ভাবগুলি কাটিয়ে উঠতে হবে। গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের আস্তাকুঁড় এবং অজ্ঞানঘন অন্ধকার হোতে জীবনকে মুক্ত করতে হবে এবং মনকে সর্বপ্রকারে সংস্কার মুক্ত করতে হবে দীপ্ত জীবনমুখী কর্মশালায়।”
গুরুমহারাজ (যে কোনো অবতার পুরুষকেই বলা যায়) জীবনের পূজারী ছিলেন। উনি যেমন নিজের জীবনকে কাজে লাগিয়ে ‘মহাজীবন’ হয়ে উঠেছিলেন – তেমনি উনি সকল মানুষকেই কিভাবে তাদের নিজ নিজ জীবনকে কাজে লাগিয়ে ‘মহাজীবন’ হয়ে ওঠা যায় – অহরহ তার শিক্ষা দিতেন ! উনি আপ্রাণ প্রচেষ্টা করতেন যাতে কোনো খালে-বিলে আটকে পড়া স্রোতহীন জলের মতো জীবনগুলিকে, আবার স্রোতবতী করে তোলা যায় ! তাইতো গুরুমহারাজ বললেন – ” জীবনমুখী চিন্তাস্রোত প্রবাহিত হোক দিব্যপ্রেমের পথে, প্রবল কর্মস্রোত প্রকট হোতে থাকুক, মানুষের জন্য মানুষ সেবাব্রতী হয়ে উঠুক। মানব বিভেদের প্রাচীর ভেঙে দিয়ে পরম প্রেমের সাগরে অবগাহন করতে থাকুক। আর ঐ পরমতত্ত্বে তন্ময় হয়ে আপন অস্তিত্বকে অনুভব করুক – আর এটাই হোলো সহজতা বা পরমানন্দস্থিতি।”
প্রিয় পাঠক ! আজ আর নয়। আসুন – আমরা সবাই পরমানন্দ কৃপাপ্রাপ্ত লাভ করে – আচার, নিয়ম, বাদ, মত ইত্যাদিতে আটকে না থেকে – আমাদের চিন্তাস্রোত, কর্মস্রোত-কে প্রেমের পথে, জ্ঞানের পথে, সেবার পথে প্রবাহিত করে – মানবজীবনের সার্থকতা লাভ করি। যুগপুরুষ’ স্বামী পরমানন্দের___ যে কারণে অবতরণ (বিবেকের জাগরন ও আত্মিক উত্তরণ ঘটানো), সেই কাজের অনুগামী হয়ে উঠি।৷
এইজন্যই গুরুমহারাজ বললেন – ” প্রিয় আত্মন্ ! মানব যদি মতান্তর (অর্থাৎ একমত ছেড়ে অন্য মত) গ্রহণ করতে থাকে, তাহলে কি তার সত্যের উপলব্ধি হবে ? না, তা হয় না। কারণ, মতবাদের বন্ধনে সত্য আবদ্ধ নয়।” সত্যিই তো – প্রকৃত সত্যের উপলব্ধি বা পরমেশ্বরের বোধ হওয়াটাই মানবজীবনের উদ্দেশ্য। আর তারজন্যই তো বিভিন্ন মতবাদ, বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-অর্চনা ! তাহলে সাধারণ মানুষের এক ‘মত’ ছেড়ে অন্য ‘মত’ গ্রহণ করার মানে হোলো এক পদ্ধতিতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা ক্রিয়া-পদ্ধতি ছেড়ে অন্য কোনো পদ্ধতির আচার-অনুষ্ঠান পালন করা – এর বেশি কিছুই নয়। এক ‘মত’ ছেড়ে অন্য কোনো ‘মতে’ আটকে পড়া। বন্ধন কিন্তু এখানেও থেকেই যাচ্ছে – মানুষ সেই বন্ধন কেটে মুক্ত আর হোতে পারছে কই ? এইজন্যেই গুরুমহারাজ বললেন – ” যতক্ষণ না মানব সমস্ত মতবাদের উপরে উঠবে, সহজ না হবে, ততক্ষণ পরম সত্যের সাক্ষাৎ করা খুবই দুরহ ! সাধারণতঃ মানব ‘মত ও পথে’-র বন্ধনে আটকে যায়, লক্ষ্যবস্তুতে উপনীত হোতে পারে না।”
আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এইটুকু ধারণা রয়েছে যে, কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, ক্রিয়া-পদ্ধতির মাধ্যমে, কোনো যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহারের দ্বারা অথবা মনের ক্রিয়ার দ্বারা পরম সত্যের বোধ বা ঈশ্বরোপলব্ধি হয় না৷ অনেকে হয়তো বলতে পারেন – ‘সে কি ! মনের একাগ্রতা দ্বারা তো ধ্যান হয় এবং ধ্যানের গভীরতায় তো আত্মোপলব্ধি হতে পারে !’ কিন্তু মনের একাগ্রতা বা ধ্যানের গভীরতায় প্রবেশের শেষ ধাপ হোচ্ছে_ ‘মনের বিলয় হওয়া’ ! মন কিন্তু সেখানে ক্রিয়াশীলই নয়। গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” মনের দ্বারা যা নির্মিত, তা পরিণামী ও কল্পিত। কিন্তু কল্পনা নিশ্চয়ই সত্য নয়। যিনি সমস্ত বন্ধনমুক্ত, মুক্তবিবেক, মুক্ত মনের অধিকারী – তিনিই সহজ ! আর সহজ অবস্থাতেই পরম সত্যের উপলব্ধি হয়।”
বাঁচা এবং বাড়া (বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া ও বংশবিস্তার) সাধারণ জীবের ধর্ম, কিন্তু যেহেতু মানব জীবশ্রেষ্ঠ – তাই মানবজীবনের সহজ ধর্ম বাঁচা-বাড়া ছাড়াও আরো একটা কিছু রয়েছে, আর সেটা হোলো__ পরিপূর্ণতা লাভের প্রবণতা। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষেরা আমাদের (মানবের) এই ‘সহজ’ ধর্ম-টাই ভুলে গিয়েছি এবং ধর্মের নামে নানারকম গোঁড়ামিতে ভরা এক একটা সম্প্রদায় গড়ে তুলেছি। আর তারপর আমরা প্রত্যেকেই পৃথক পৃথকভাবে বলছি – “এটিই ধর্মাচার !” গুরুমহারাজ এইসব কথা বলার পর বললেন – ” জীবনকে বাদ দিয়ে ধর্ম নয়। ….. ধর্ম জীবনমুখী, জীবনবিরোধী কখনোই নয়। মানবকে জীবনমুখী হতে হবে৷ জীবনবিরোধী ভাবগুলি কাটিয়ে উঠতে হবে। গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের আস্তাকুঁড় এবং অজ্ঞানঘন অন্ধকার হোতে জীবনকে মুক্ত করতে হবে এবং মনকে সর্বপ্রকারে সংস্কার মুক্ত করতে হবে দীপ্ত জীবনমুখী কর্মশালায়।”
গুরুমহারাজ (যে কোনো অবতার পুরুষকেই বলা যায়) জীবনের পূজারী ছিলেন। উনি যেমন নিজের জীবনকে কাজে লাগিয়ে ‘মহাজীবন’ হয়ে উঠেছিলেন – তেমনি উনি সকল মানুষকেই কিভাবে তাদের নিজ নিজ জীবনকে কাজে লাগিয়ে ‘মহাজীবন’ হয়ে ওঠা যায় – অহরহ তার শিক্ষা দিতেন ! উনি আপ্রাণ প্রচেষ্টা করতেন যাতে কোনো খালে-বিলে আটকে পড়া স্রোতহীন জলের মতো জীবনগুলিকে, আবার স্রোতবতী করে তোলা যায় ! তাইতো গুরুমহারাজ বললেন – ” জীবনমুখী চিন্তাস্রোত প্রবাহিত হোক দিব্যপ্রেমের পথে, প্রবল কর্মস্রোত প্রকট হোতে থাকুক, মানুষের জন্য মানুষ সেবাব্রতী হয়ে উঠুক। মানব বিভেদের প্রাচীর ভেঙে দিয়ে পরম প্রেমের সাগরে অবগাহন করতে থাকুক। আর ঐ পরমতত্ত্বে তন্ময় হয়ে আপন অস্তিত্বকে অনুভব করুক – আর এটাই হোলো সহজতা বা পরমানন্দস্থিতি।”
প্রিয় পাঠক ! আজ আর নয়। আসুন – আমরা সবাই পরমানন্দ কৃপাপ্রাপ্ত লাভ করে – আচার, নিয়ম, বাদ, মত ইত্যাদিতে আটকে না থেকে – আমাদের চিন্তাস্রোত, কর্মস্রোত-কে প্রেমের পথে, জ্ঞানের পথে, সেবার পথে প্রবাহিত করে – মানবজীবনের সার্থকতা লাভ করি। যুগপুরুষ’ স্বামী পরমানন্দের___ যে কারণে অবতরণ (বিবেকের জাগরন ও আত্মিক উত্তরণ ঘটানো), সেই কাজের অনুগামী হয়ে উঠি।৷
