শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (বলা এবং লেখা) নিয়ে এখানে আলোচনা হচ্ছিলো। এখন আমরা ওনার “সহজতা ও প্রেম” গ্রন্থ থেকে ধারাবাহিকভাবে উদ্ধৃতি তুলে তুলে এই আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হোচ্ছে। আগের দিন আমরা ছিলাম গুরুমহারাজের ‘উপাসনা’ বা ‘আরাধনা’ সংক্রান্ত আলোচনায়। গুরুমহারাজ এই প্রসঙ্গে আলোচনাকালে বলেছিলেন – ” প্রিয় আত্মন্ _ প্রতিটি মানবের প্রকৃতিগত সংস্কার বা স্বভাব বিদ্যমান। মানবের ওই স্বভাবই হোলো মানবের বৈশিষ্ট্য। ঐ স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য মানবের পূর্ব হোতেই সহজাতক্রমে তার প্রকৃতিতে বিদ্যমান থাকে। স্বভাব নির্দিষ্ট কর্মের দ্বারা ঐ বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা করে – তার বিকাশ করাই হোলো সাধনা।”
তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম যে, মানবের স্বভাব-ই হোলো মানবের বৈশিষ্ট্য। স্বভাব-নির্দিষ্ট কর্মের দ্বারা ঐ বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা কোরে, তার বিকাশ সাধন করাই ‘সাধনা’, ‘আরাধনা’ অথবা ‘উপাসনা’। এইবার গুরুমহারাজ যা বলেছেন সেটা হোলো – ” সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ– এই ত্রিগুণ মানব প্রকৃতিতে বিদ্যমান। আর গুণের তারতম্য অনুসারে মানব প্রকৃতিতে স্বভাবের বৈচিত্র্যও বিদ্যমান। এই কারণে আপন আপন প্রকৃতিগত স্বভাব অনুযায়ী সংসারে অনেক প্রকার উপাসনাগত ভেদ দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং আচার-অনুষ্ঠানগত ভেদ – অধিকারী বিশেষে ভেদরূপে পরিলক্ষিত হয়।”–অর্থাৎ গুরুমহারাজ এটাই বললেন যে, মানুষের মধ্যে যেহেতু তিনটি গুণের (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ) ভিন্নতা বিদ্যমান থাকে, এইজন্যে মানুষের স্বভাব ভিন্ন ভিন্ন হয় এবং তাদের উপাসনা পদ্ধতি ভিন্ন হয়– উপাসনার আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি সব কিছুই ভিন্ন হয়।
মানবজীবনের উদ্দেশ্য হোলো আত্মবোধ বা পরমেশ্বরের বোধ। আর এই বোধের জন্য চিত্তশুদ্ধির প্রয়োজন ও অবিদ্যানাশের প্রয়োজন । আর এইগুলির জন্যই একান্ত প্রয়োজন হয় ‘উপাসনা’র। এতোক্ষণ যে কথাগুলি বলা হোলো – সেই প্রসঙ্গেই গুরুমহারাজ বললেন – ” এই ‘উপাসনা’ আবার অধিকারী বিশেষে ধ্যান, জ্ঞান, প্রেম ও কর্ম – ইত্যাদি বৈচিত্রে পরিলক্ষিত হয়।” তার মানে হোচ্ছে – উপাসনার জগতে (অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্মমত অনুযায়ী বিভিন্ন আচার পালন) যাঁরা উন্নত__ তাঁদের কেউ ধ্যানী, কেউ বা জ্ঞানী, কেউ,বা প্রেমী, আবার কেউ বা সেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত – এঁরা কিন্তু সকলেই সেই সেই ক্ষেত্রের জন্যই নির্দিষ্ট, তাঁরা সেই particular যোগের অধিকারী ! যে ব্যক্তি, যে যোগের অধিকারী নয় – সে সেই ‘যোগ’ করবেই না – তার সেই ‘যোগে’-র প্রতি তার রুচিই হবে না !
তাই হোক, এটাও জেনে রাখা ভালো যে, ‘উপাসনা’ করতে শুরু করলেই যে অতি দ্রুত পরমেশ্বরের বোধ হবে – তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। তবে কতকগুলি শর্তে তা হোতে পারে, আর সেগুলি হোলো – সদ্গুরুর সান্নিধ্য পাওয়া এবং তাঁর প্রতি অটুট শ্রদ্ধা ও সাধনায় নিষ্ঠা ! এই গুলি থাকলেই অতি শীঘ্রই সাধনায় সিদ্ধিলাভ হয়।
গুরুমহারাজ বলেছেন – ” প্রতিটি জীবন সচ্চিদানন্দ পরমাত্মার প্রকাশ। প্রত্যেক জীবনে রয়েছে আধ্যাত্মিক রহস্য বা সেই তত্ত্ব। সুতরাং ঐ পরম সত্য প্রত্যেককেই অনুভব করতে হবে ! পরমাত্মার প্রকাশের জন্যই ‘মানবজীবন’ লাভ হয়েছে। তাঁর প্রতি অনুরাগ আসবার জন্য দেহে প্রাণ এসেছে। তাঁকে মনন করবার জন্য মানসিক বল এবং তাঁকে চিন্তা করবার জন্য বুদ্ধি, আর তাঁর উপলব্ধির জন্য এই আনন্দময় তনু বা দুর্লভ মানবজীবন লাভ হয়েছে।”
পাঠকবৃন্দ ! গুরুমহারাজের এই মধুর বাণীর মধ্য দিয়ে মানবজীবন তথা মানবশরীরের সমস্ত কিছুর প্রকৃত উপযোগিতা কি – তা আমরা বুঝতে পারলাম। আমাদের এই দেহ, আমাদের মন, আমাদের বুদ্ধি, আমাদের সমগ্র জীবন সেই পরমেশ্বরকে ‘বোধ’ করার জন্যই তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়তই তার দুরপোযোগ করে চলেছি – আর সেজন্যেই আমরা কষ্ট পাই, ত্রিতাপ জ্বালায় জ্বলে মরি ! আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দুরপোযোগ করি-ই বা কেন ? কেন আমরা মহাজন’বাক্য জীবনে গ্রহণ করতে পারি না – কেনই বা আমরা তাঁদের শিক্ষাকে আচরণে আনতে পারি না ? তার কারণ হিসাবে আমরা গুরুমহারাজের কাছে শুনেছি – ” আমাদের মধ্যে এখনো বিবেকের জাগরণ হয়নি।”
কিভাবে বিবেকের জাগরণ হয় – তা বোঝাতে গিয়ে উনি বলেছিলেন – ” প্রিয় আত্মন্, সৎসঙ্গ বা সাধুসঙ্গ না করলে বিবেক জাগ্রত হয় না, আর বিবেক জাগ্রত না হোলে বৈরাগ্য আসে না এবং বৈরাগ্য না এলে সত্যনিষ্ঠা ও সত্যলাভ হয় না।”
তাহলে আমরা এটাই বুঝতে পারলাম যে, সত্যলাভ বা পরমেশ্বরের বোধের জন্য বিবেক ও বৈরাগ্যের প্রয়োজন হয়। আর সাধুসঙ্গ বা সৎসঙ্গে বিবেকের জাগরণ হয়। এরপর গুরুমহারাজ যা বললেন তার দ্বারা উনি প্রথমে উল্লেখিত কথাগুলির সাথে এখনকার কথার মিলন ঘটিয়ে দিলেন। উনি বললেন – ” ভাব ও অভাবের অধিষ্ঠান হোলো মানবের স্বভাব ! এই স্বভাব-ই হোলো মানবজীবনের বৈশিষ্ট্য। অভাব হোতে স্বভাবে এবং স্বভাব হোতে মহাভাবে মানবকে উত্তরণ করাই হোলো উপাসনার লক্ষ্য !”(ক্রমশঃ)
তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম যে, মানবের স্বভাব-ই হোলো মানবের বৈশিষ্ট্য। স্বভাব-নির্দিষ্ট কর্মের দ্বারা ঐ বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা কোরে, তার বিকাশ সাধন করাই ‘সাধনা’, ‘আরাধনা’ অথবা ‘উপাসনা’। এইবার গুরুমহারাজ যা বলেছেন সেটা হোলো – ” সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ– এই ত্রিগুণ মানব প্রকৃতিতে বিদ্যমান। আর গুণের তারতম্য অনুসারে মানব প্রকৃতিতে স্বভাবের বৈচিত্র্যও বিদ্যমান। এই কারণে আপন আপন প্রকৃতিগত স্বভাব অনুযায়ী সংসারে অনেক প্রকার উপাসনাগত ভেদ দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং আচার-অনুষ্ঠানগত ভেদ – অধিকারী বিশেষে ভেদরূপে পরিলক্ষিত হয়।”–অর্থাৎ গুরুমহারাজ এটাই বললেন যে, মানুষের মধ্যে যেহেতু তিনটি গুণের (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ) ভিন্নতা বিদ্যমান থাকে, এইজন্যে মানুষের স্বভাব ভিন্ন ভিন্ন হয় এবং তাদের উপাসনা পদ্ধতি ভিন্ন হয়– উপাসনার আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি সব কিছুই ভিন্ন হয়।
মানবজীবনের উদ্দেশ্য হোলো আত্মবোধ বা পরমেশ্বরের বোধ। আর এই বোধের জন্য চিত্তশুদ্ধির প্রয়োজন ও অবিদ্যানাশের প্রয়োজন । আর এইগুলির জন্যই একান্ত প্রয়োজন হয় ‘উপাসনা’র। এতোক্ষণ যে কথাগুলি বলা হোলো – সেই প্রসঙ্গেই গুরুমহারাজ বললেন – ” এই ‘উপাসনা’ আবার অধিকারী বিশেষে ধ্যান, জ্ঞান, প্রেম ও কর্ম – ইত্যাদি বৈচিত্রে পরিলক্ষিত হয়।” তার মানে হোচ্ছে – উপাসনার জগতে (অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্মমত অনুযায়ী বিভিন্ন আচার পালন) যাঁরা উন্নত__ তাঁদের কেউ ধ্যানী, কেউ বা জ্ঞানী, কেউ,বা প্রেমী, আবার কেউ বা সেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত – এঁরা কিন্তু সকলেই সেই সেই ক্ষেত্রের জন্যই নির্দিষ্ট, তাঁরা সেই particular যোগের অধিকারী ! যে ব্যক্তি, যে যোগের অধিকারী নয় – সে সেই ‘যোগ’ করবেই না – তার সেই ‘যোগে’-র প্রতি তার রুচিই হবে না !
তাই হোক, এটাও জেনে রাখা ভালো যে, ‘উপাসনা’ করতে শুরু করলেই যে অতি দ্রুত পরমেশ্বরের বোধ হবে – তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। তবে কতকগুলি শর্তে তা হোতে পারে, আর সেগুলি হোলো – সদ্গুরুর সান্নিধ্য পাওয়া এবং তাঁর প্রতি অটুট শ্রদ্ধা ও সাধনায় নিষ্ঠা ! এই গুলি থাকলেই অতি শীঘ্রই সাধনায় সিদ্ধিলাভ হয়।
গুরুমহারাজ বলেছেন – ” প্রতিটি জীবন সচ্চিদানন্দ পরমাত্মার প্রকাশ। প্রত্যেক জীবনে রয়েছে আধ্যাত্মিক রহস্য বা সেই তত্ত্ব। সুতরাং ঐ পরম সত্য প্রত্যেককেই অনুভব করতে হবে ! পরমাত্মার প্রকাশের জন্যই ‘মানবজীবন’ লাভ হয়েছে। তাঁর প্রতি অনুরাগ আসবার জন্য দেহে প্রাণ এসেছে। তাঁকে মনন করবার জন্য মানসিক বল এবং তাঁকে চিন্তা করবার জন্য বুদ্ধি, আর তাঁর উপলব্ধির জন্য এই আনন্দময় তনু বা দুর্লভ মানবজীবন লাভ হয়েছে।”
পাঠকবৃন্দ ! গুরুমহারাজের এই মধুর বাণীর মধ্য দিয়ে মানবজীবন তথা মানবশরীরের সমস্ত কিছুর প্রকৃত উপযোগিতা কি – তা আমরা বুঝতে পারলাম। আমাদের এই দেহ, আমাদের মন, আমাদের বুদ্ধি, আমাদের সমগ্র জীবন সেই পরমেশ্বরকে ‘বোধ’ করার জন্যই তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়তই তার দুরপোযোগ করে চলেছি – আর সেজন্যেই আমরা কষ্ট পাই, ত্রিতাপ জ্বালায় জ্বলে মরি ! আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দুরপোযোগ করি-ই বা কেন ? কেন আমরা মহাজন’বাক্য জীবনে গ্রহণ করতে পারি না – কেনই বা আমরা তাঁদের শিক্ষাকে আচরণে আনতে পারি না ? তার কারণ হিসাবে আমরা গুরুমহারাজের কাছে শুনেছি – ” আমাদের মধ্যে এখনো বিবেকের জাগরণ হয়নি।”
কিভাবে বিবেকের জাগরণ হয় – তা বোঝাতে গিয়ে উনি বলেছিলেন – ” প্রিয় আত্মন্, সৎসঙ্গ বা সাধুসঙ্গ না করলে বিবেক জাগ্রত হয় না, আর বিবেক জাগ্রত না হোলে বৈরাগ্য আসে না এবং বৈরাগ্য না এলে সত্যনিষ্ঠা ও সত্যলাভ হয় না।”
তাহলে আমরা এটাই বুঝতে পারলাম যে, সত্যলাভ বা পরমেশ্বরের বোধের জন্য বিবেক ও বৈরাগ্যের প্রয়োজন হয়। আর সাধুসঙ্গ বা সৎসঙ্গে বিবেকের জাগরণ হয়। এরপর গুরুমহারাজ যা বললেন তার দ্বারা উনি প্রথমে উল্লেখিত কথাগুলির সাথে এখনকার কথার মিলন ঘটিয়ে দিলেন। উনি বললেন – ” ভাব ও অভাবের অধিষ্ঠান হোলো মানবের স্বভাব ! এই স্বভাব-ই হোলো মানবজীবনের বৈশিষ্ট্য। অভাব হোতে স্বভাবে এবং স্বভাব হোতে মহাভাবে মানবকে উত্তরণ করাই হোলো উপাসনার লক্ষ্য !”(ক্রমশঃ)
