জিজ্ঞাসু :– সমুদ্র মন্থন আসলে কি কোনো রূপক – না সত্যিই এটা কখনো বাস্তবে হয়েছিল ?
গুরুমহারাজ :– সমুদ্র মন্থন তো প্রতিনিয়ত প্রতিটি জীবের মধ্যেই হয়ে চলেছে_ বাবা ! তোমার বোঝার ক্ষমতা নাই বলে বুঝতে পারছো না। ভারতীয় পুরাণে রয়েছে দেবাসুরের সংগ্রামের কথা ! দেবাসুরের সংগ্রাম অর্থাৎ contradiction theory – জড়জগৎ থেকে জীবজগৎ অর্থাৎ মহাবিশ্বের সমস্ত কিছুর মধ্যেই এই theory ক্রিয়াশীল। পৌরাণিক কাহিনীসমূহের মাধ্যমে রূপকাকারে জীবনের কথা – জগতের বিভিন্ন রহস্যেরই ব্যাখ্যা করা হয়েছে! যে কোনো কঠিন তত্ত্বকে সহজভাবে পরিবেশন করা অথবা গল্পের আকারে তাকে প্রকাশ করা__ একটা দারুন art ! এই art-এ পারদর্শী ছিলেন ভারতীয় ঋষিরা এবং জ্ঞানী মহাজনেরা ! তারাই বৈদিক বা ঔপনিষদিক শিক্ষাসমূহকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য গল্পাকারে বিভিন্ন তত্ত্ব পরিবেশন করতেন। পরবর্তীতে সেগুলিকে লিখিত আকারে আনার ফলে পুরাণাদি শাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল।
তবে যখন এগুলি রচনা হয়েছিল বা তার পরেও হাজার হাজার বছর ধরে ভারতীয় সমাজে উপযুক্ত শিক্ষক বা আচার্যকূল ছিলেন – যারা এই রূপক থেকে প্রকৃত তত্ত্ব বা তথ্যগুলিকে বের করে এবং বিশ্লেষণ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম ছিলেন। কিন্তু আলেকজান্ডারের পর থেকে বিদেশি আক্রমণের ঢেউ ভারতের সীমান্ত প্রদেশগুলিতে আছড়ে পড়তে থাকে। বিশেষতঃ মধ্যএশিয়ার বিভিন্ন অসভ্য-বর্বর জাতির মুহুর্মুহু আক্রমণ, লুটপাট, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি শুরু হয়ে যায়! এতে ভারতবর্ষের উত্তর ও পশ্চিম অংশের সমাজজীবনে ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছিলো। ভারতবর্ষের প্রাচীন শিক্ষা, সংস্কৃতি, জীবনধারা ইত্যাদি সবকিছুই নবীনের সংস্পর্শে originality হারাতে শুরু করেছিল। ফলে এখনও পূর্ব বা দক্ষিণ ভারতে original ভারতবর্ষের যেটুকু ছোঁয়া রয়েছে – ভারতবর্ষের অন্যান্য অংশে তা নাই। রক্তে-ই বিদেশী অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে – তো অন্য field-এ তুমি কি আশা করবে ?
এইভাবে পুনঃ পুনঃ বিদেশি আক্রমণ আর হত্যালীলায় বেদ-উপনিষদ-পুরাণাদি শাশ্ত্রের চর্চা, প্রাচীন ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা__একেবারে বন্ধ হয়ে গেল, কারণ ঐ অসভ্য জাতির সদস্যরা ভারতের প্রাচীন পুঁথিপত্র-শাস্ত্রাদি বিনষ্ট করে দিল। পন্ডিতকুল বা আচার্য্যকুলদের মেরে ফেলল, অবশিষ্টরা বিদ্যাচর্চার জন্য নির্দিষ্ট স্থান ত্যাগ করে বনে-জঙ্গলে-গিরি-গুহায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হোলো !
এইভাবেই দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভারতীয় শাশ্ত্রাদির ব্যাখা করার মতো উপযুক্ত আচার্যের অভাব হয়ে পড়েছিল ভারতীয় সমাজে। পুরাণ গুলিকে ভালোভাবে পাঠ করলে বোঝা যায় যে, বেশ কিছু ‘পুরাণ’ বয়সে খুবই নবীন। ঋষিদের পুরাণ রচনার উদ্দেশ্য ছিল_যাতে উপনিষদের শিক্ষা রূপকাকারে হোলেও অন্ততঃ লিপিবদ্ধ অবস্থায় যেন থেকে যায়। নবীন পুরাণ গুলি বিভিন্ন রাজার রাজদরবারে জন্ম হয়েছিল এবং সেগুলিতেই বেশিরভাগ আজগুবি কাহিনীর বা অবৈজ্ঞানিক-মনগড়া কাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে !
যাইহোক, তোমার জিজ্ঞাসার উত্তরে এবার সমুদ্রমন্থনের গল্পের ব্যাখ্যায় আসছি। পুরাণে বলা হয়েছে একদিকে ৩৩ কোটি দেবতা, অন্যদিকে সমগ্র অসুরকুল সমুদ্রমন্থন করেছিল_অমৃতলাভের আশায়। মন্থনদন্ড হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল মন্দার পর্বতকে, রজ্জু হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল বাসুকি নাগ-কে ! মন্থন করতে করতে, একে একে উঠে এসেছিল – ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবা, দামি দামি রত্ন, লক্ষ্মীদেবী ইত্যাদি ! সবশেষে এসেছিল “অমৃত” ! কিন্তু তার আগে উঠেছিল বাসুকীর বিষ বা হলাহল ! কিন্তু দ্যাখো – এটা কিন্তু সমুদ্র থেকে ওঠেনি – এটা বাইরে থেকে এলো !
সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অর্থাৎ জীবজগৎ, জড়জগৎ, মানবদেহ এমনকি অনু-পরমাণুর মধ্যেও অবিরত এই দেবাসুরের সংগ্রাম হয়ে চলেছে। এখানে ৩৩ কোটি (কোটি সংখ্যা নয়, কোটি অর্থাৎ ‘প্রকার’ বা রকম।) দেবতা অর্থাৎ ৩৩ টি পৃথক পৃথক দেবতার কথা বলা হয়েছে। আমরা মানবদেহ দিয়েই এর ব্যাখ্যা করব। একাদশ ইন্দ্রিয় (পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, এবং মন), দ্বাদশ আদিত্য ( বিবস্বান বা সূর্য, অর্যমা, পূষা, ত্বষ্টা, সাবিত্র, ভগ, ধাত্র, বিষ্ণু, বরুণ, মিত্র, ইন্দ্র, অংশুমান। অনেক পণ্ডিতের মতে, দ্বাদশ আদিত্য বলতে বারোটি মাসকে বুঝানো হয়।মানব দেহে এইগুলোই দ্বাদশ অঙ্গে তিলকের স্থান।), পঞ্চপ্রাণ (প্রাণ, অপান, সমান, উদান, ব্যান) এবং পঞ্চমহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) – এই ৩৩ প্রকারের বিষয়সমূহকেই পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা ৩৩ কোটি বলে বর্ণনা করেছে বা মানুষকে ব্যাখ্যা করে শুনিয়েছে ! অসুরদের নাম বলা হয়েছে, যেমন কয়েকজন হোলো__ নেমি, কালনেমি, বিরোচন ইত্যাদি। সাধকের (যে বা যিনি আত্মতত্ব বা অমৃতত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত হোতে চাইছেন) জীবনে এই অসুরগুলি হোলো কাম, ক্রোধ, মোহ, ঈর্ষা, বাসনা, লোভ ইত্যাদি যা মানুষকে মহামায়ার জগতে আবদ্ধ রাখে এবং এখান থেকে বেরোতে দেয় না।
ইরা আর পিঙ্গলা অর্থাৎ মানবের প্রধান তিন নাড়ীর দুটির শ্বাস-প্রশ্বাস দু’দিকে movement হয়ে চলেছে সর্বক্ষণ, মন্দার হোচ্ছে মেরুদন্ডে স্থির অবস্থায় থাকা সুষুন্মা (তৃতীয় নাড়ি যা spinal chord বরাবর ক্রিয়াশীল), সাধকের কুলকুণ্ডলিনীই বাসুকীনাগের রূপক।
এই জগতেই দুটো জগৎ রয়েছে। কামময় বা বাসনাময় জগৎ এবং প্রেমময় জগৎ ! এই দুই জগতের মধ্যে সংগ্রাম সতত হয়েই চলেছে। এর মধ্যেই অর্থাৎ সংগ্রাম(সাধনা) চলতে চলতেই সাধকের জীবনে কিছু কিছু প্রাপ্তিও ঘটতে থাকে। এই প্রাপ্তি বা বিভিন্ন সিদ্ধিই হোলো –রূপকাকারে উচ্চৈঃশ্রবা, ঐরাবত, লক্ষীদেবী ইত্যাদি।
শুধুমাত্র সাধক‌ই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রতিনিয়ত এই সংগ্রাম হয়ে চলছে এবং তোমাদের জীবনেও তো নানারকম প্রাপ্তি ঘটে, কিছু-না-কিছু প্রাপ্তি ঘটে থাকে_ নাকি? তবে ঐ যে বলা হোলো__এগুলি বাসনাময় বা ভোগময়। কিন্তু সাধকের জীবনে এইগুলিকে বলা হয়ে থাকে_ ‘সিদ্ধি’ !
পুরাণে রয়েছে_ সমুদ্র মন্থনের একেবারে শেষে উঠে এসেছিল ‘অমৃত’ ! তবে পৌরাণিক টিভি সিরিয়াল বা সিনেমা দেখে যেন মনে কোরোনা যে, ‘অমৃত’ মানে কলসির ন্যায় পাত্রে রেখে দেওয়া সাদা রাবড়ির মতো কোনো বস্তু ! না তা নয় – এটা সাধকের অন্তর্জগতের প্রাপ্তি ! মানবের জীবনে প্রকৃত অর্থে ‘অমৃত’ কি জানো__ ‘আনন্দ’ আর ‘শান্তি’ !! পুরাণে বর্ণিত রয়েছে – দানবেরা এরপরেও মন্থন করতে শুরু করেছিল – তখন বেরোলো ‘গরল’ _যা এলো বাসুকির কাছ থেকে! মানুষের কামময় জগতের আসুরিক প্রবৃত্তির ফল হোচ্ছে ত্রিবিধ (আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক)। জগতের এই ত্রিবিধ জ্বালা-যন্ত্রণা-ক্লেশই হোলো সেই ‘গরল’। যার দ্বারা অহর্নিশি ক্লিষ্ট হোচ্ছে মানুষ। এই গরলের প্রভাবে দেবতারাঐ ম্রিয়মাণ হোলো,তারাও এই বিষের ক্রিয়া নিতে পারলো না !
তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো__এই জ্বালার কি পারিত্রাণ নাই !__ আছে ! পুরাণে উল্লেখ রয়েছে_দেব-অসুর-মর্তবাসী সবাই যখন বিষের জ্বালায় জর্জরিত হয়ে “ত্রাহি-ত্রাহি” করছে, তখন সেখানে এলেন শিব ! জাগতিক ক্লেশসমূহকে যিনি নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে নিতে পারেন(বিষপান করে হজম করতে পারেন) তিনিই শিব !
শিবের সহস্রার থেকে কন্ঠ পর্যন্ত অবতরণ – এর নিচে শিব অবস্থান করেন না। তাই শিবাবতারকে অনেক সময় মানুষ হৃদয়হীন বলে ভুল করে ! জীবজগতের ত্রিতাপ জ্বালা গ্রহণ করেন শিব, এমনও বলা হয় শিবের অবতার ভূ-ভার-হরণ করেন।।
এবার এই কাহিনীর আরও একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা যাক। দেবতা অর্থে যিনি দেন। পিতা, মাতা, আচার্য্য ইত্যাদিরা, এমনকি সমাজে বসবাসকারী আধ্যাত্মিক মানুষেরা_ যাঁদের মধ্যে দেবার প্রবৃত্তি জাগ্রত হয়েছে – তাঁরাই দেবতা ! কিন্তু কোনো সাধারণ মানুষ যখন তার শোক-তাপ-ব্যাধি-অভাব-অনটন ইত্যাদি ক্লেশ নিয়ে কোনো সাধক বা সাধারণ গুরুর কাছে যায় – তখন কি ঐ গুরু বা সাধক তার শিষ্যের ক্লেশ নিজের মধ্যে নিয়ে ঐ ব্যক্তিকে ক্লেশমুক্ত করতে পারবেন? হয়তো ঐ গুরু কিছু suggession দিতে পারবেন কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছানো মাত্রই বা একবার স্পর্শ করা মাত্রই ক্লেশমুক্ত করতে পারেন যিনি – তিনিই শিব। জাগতিক বিষপান করে তিনি হয়েছেন – নীলকন্ঠ ! শিবকল্প পুরুষের সন্নিধানে তাঁরাই আসে _তিনি সবার সব কালো নিমেষে টেনে নিতে পারেন ! সবার কথা শোনেন_সবার মান রাখেন।শিব যেন কল্পতরু, শিব ছাড়া এই বিশেষ ক্ষমতা আর কারো নাই !তাইতো তাঁর প্রনাম মন্ত্রে বলা হয়েছে – “প্রণমামি শিবম্ শিব কল্পতরুম্।”