জিজ্ঞাসু :– কৌলিন্য কি ?
গুরুমহারাজ :– ‘কৌলিন্য প্রথা’ বলে একটা কুপ্রথা কিছুদিন আগেও এই বাংলাদেশে চালু ছিল, যেটা একসময়ে এখানকার সমাজজীবনে বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছিল। অবশ্য যুগবিবর্তনে এইসব কুপ্রথাগুলি এখন সমাজ থেকে চলে গেছে। যাই হোক, কৌলিন্য কথাটি এসেছে ‘কুল’ থেকে ! বংশ মর্যাদায় কে কতোটা ছোটো বা বড় __এই দিয়ে সামাজিকভাবে উঁচু-নিচু ব্যক্তির বিচার হোতো।
কিন্তু আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে এইসব ব্যাপারগুলির কোনো মূল্য‌ই নাই। সেখানে কৌলিন্য ত্যাগ করাই শুধু নয় – ‘কুল’ ত্যাগ‌ও করতে হয় ! তবে, ‘কুল’ মানে ‘বংশ’ নয়। দ্যাখো, ভক্তিশাশ্ত্রে রয়েছে _ বৃন্দাবনে গোপীরা কুলত্যাগ করেছিল, তার মানে কিন্তু তারা বংশ ত্যাগ করেনি, ঘর-সংসার‌ও ত্যাগ করে নি ! শুধুমাত্র ভগবানের প্রতি একান্ত অনুরাগ_তাদেরকে স্বামী-পুত্রকন্যা-সংসার ইত্যাদিকে সময় সময় ভুলিয়ে দিতো। কৃষ্ণের বাঁশি বাজলেই_তারা ঘর ছেড়ে উন্মাদের মতো ছুটে বেরিয়ে যেতো।
সুতরাং ভক্তের ‘কুলত্যাগ’ অর্থে সংসারের প্রতি অনুরাগ ত্যাগ করে_ ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ।। আর ‘কৌলিন্য’-ব্যাপারটা বাংলার সেন রাজাদের প্রবর্তিত এক ধরণের কুপ্রথা, যার দ্বারা মানুষের অহংকার বা গর্ব-ই প্রকাশ পায়_অন্য কিছু্ই নয়। কুলগর্ব, ধনগর্ব, যৌবনগর্ব – এইগুলি হোলো আবরণ, যে আবরণ ভক্তকে ভগবদ্-দর্শনে বাধা দেয়। যেমন মেঘের আবরণ সূর্যকে দেখতে দেয় না –এইগুলিও সেইরকম।
এই জন্যেই বৃন্দাবন লীলায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কি করলেন – না গোপিনীদের আবরণ উন্মোচন করলেন। এইটাকেই বৈষ্ণবশাস্ত্রে ‘গোপীদের বস্ত্রহরণ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে ! আর পরবর্তীকালের কিছু লেখক এইটাকে রসিয়ে রসিয়ে লিখে এমনভাবে সাধারণের কাছে বর্ণনা করল এবং কিছু চিত্রকর অর্ধ-উলঙ্গ বা উলঙ্গ গোপিনীদের রগরগে ছবি এঁকে সমাজে ছড়িয়ে দিল ! ব্যস্ _বেশিরভাগ মানুষজন ওতেই মেতে গেল ! বিশেষতঃ বাঙালীরা ! কীর্তনগানের পালায় বস্ত্রহরণের পালা, কীর্তণীয়ারা বেশ সুন্দর সুর করে করে গাইতে শুরু করে দিল। মানুষ‌ও আগ্রহ সহকারে এই পালাগানগুলি শুনে_সত্যি ভেবে গ্রহণ করে নিল। আসলে মানুষ নিজেরা যা ভালবাসে, বা যে ধরণের জীবন-যাপন সে ভালবাসে _ সেইটা সে গ্রহণ করে, কারণ সেইটাতে তারা রস পায়।।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ‘বস্ত্রহরণ’ কথাটার প্রকৃত অর্থ কি জানো __সেটা হোলো ভক্তের ঐসব ‘আবরণের’ উন্মোচন !
ভক্তিশাস্ত্রে সাধকের জীবনে তিনটি বাধার কথা উল্লেখ রয়েছে – মল, বিক্ষেপ ও আবরণ ! স্থূল অর্থে দেহের মল যেমন বর্জ্য এবং এটিকে ত্যাগ করলে যেমন স্থূলদেহের শান্তি হয়, তেমনি চিত্ত-মল ও প্রাণ-মল ত্যাগে সূক্ষ্মশরীর এবং কারণশরীর শুদ্ধ হয়, নির্মল হয়। এইভাবে বিক্ষেপও তিন প্রকার ! সাধক ধীরে ধীরে এগুলিকেও অপসারিত করে_নিজে মুক্ত হ’ন। কিন্তু শেষকাল পর্যন্ত অহংকাররূপী ‘আবরণ’- আর যেতে চায় না। একমাত্র আকুল প্রার্থনায় আর ঈশ্বরের কৃপাতেই এই ‘আবরণ’ যায়।
বুঝতে পারছো_আমি কি বলতে চাইছি ! এইজন্যেই বৈষ্ণবশাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোপীদের বস্ত্রহরণ করেছেন। ‘বস্ত্রহরণ’ অর্থাৎ অহংকার-রূপ আবরণ উন্মোচন, যা উন্মোচিত না হোলে আধ্যাত্মিক রাজত্বে (আজ্ঞাচক্র থেকে সহস্রার পর্যন্ত যাত্রাই প্রকৃত আধ্যাত্মিক রাজ্য) সাধকের প্রবেশাধিকার ঘটে না।
ভারতীয় ধর্মশাস্ত্রাদিতে প্রবৃত্তিমার্গ ও নিবৃত্তিমার্গ – এই দুটি পথে ধর্মজীবনে অগ্রসরের মার্গ বা পথ হিসাবে বর্ণিত আছে। প্রবৃত্তি এবং নিবৃত্তি কথাদুটি তোমরাও জানো – কিন্তু আর একটি কথা আছে ‘পরাবৃত্তি’! ‘পরাবৃত্তি’- কি তোমরা জানো কি?– জানো না ! মহাপ্রভুর দুজন সহযোগীর কথা বলছি শোনো – ওদেরকে রূপ এবং সনাতন বলেই সকলে জানে। কিন্তু ওনারা তৎকালীন বাংলার শাসনকর্তা হোসেন শাহের দরবারে উচ্চপদস্থ কর্মচারী বা officer হিসাবে চাকরি করতেন। এঁরা দুজনেই মহাপন্ডিতও ছিলেন, আবার রাজকার্য্যেও সুনিপুণ ছিলেন ! কিন্তু যখন এঁরা মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ পেলেন এবং ”কি উপায়ে কৃষ্ণপদে মতি হয়”– এইটা জানতে চাইলেন, তখন মহাপ্রভু ওদেরকে বলেছিলেন – ” পদমর্যাদার অভিমান থাকতে কৃষ্ণপদে মতি বা কৃষ্ণ দরশন হয় না।” ‘পরাবৃত্তি’-ই ‘পরাভক্তি’। পরাভক্তিতে – জাগতিক কোনো কিছুই থাকে না, সেখানে জাগতিক ভোগ-ঐশ্বর্য্যের কোনো স্থান নাই। সেখানে রয়েছে শুধুই ত্যাগ ! “তোমার সুখেই সুখ – তোমার দুঃখই আমার দুঃখ”_এই ভাব ! আর ‘ত্যাগ’ বলতে কি বলোতো – আত্মত্যাগ-ই ত্যাগ ! ‘আত্ম’ বলতে এখানে ‘অহংকার’ ! আর এই অহংকার-ই হোলো শেষ আবরণ – যা ত্যাগ না করা পর্যন্ত কৃষ্ণ-দরশন হয় না।
আত্মসুখের তিলমাত্র বাসনা না থাকাই – পরাভক্তিতে প্রবেশ ! এবার একবার যখন প্রবেশ হয়ে গেল – তখনই শুধু বলতে পারা যায় – “তোমার-ই কুশলে কুশল মানি”! এই অবস্থায় “আমি-আমার” বা “অহং-মমঃ”– এই ভাব থাকে না। তখন শুধুই প্রেম – প্রেম আর শুধুই প্রেম !!!