জিজ্ঞাসু :– ‘জীবনের সংজ্ঞা’ কি অল্প কথায় দেওয়া যায়_গুরু মহারাজ ? আমাকে একজন জিজ্ঞাসা করেছিল__তাই আপনার কাছে জানতে চাইছিলাম !!
গুরুমহারাজ :– অল্প কথায় বলতে গেলে বলতে হয়__ ‘জীবন যেন আনন্দ ও বেদনামাখা একটা যাত্রা, একটা অভিসার__পূর্ণত্বের দিকে !’ এই যে কথাটা আমি তোমাকে বললাম – এটা কিন্তু আমার জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ কথা।
একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছি__যেমন ধরো, মানবের জীবনে প্রেম রয়েছে আবার বিরহ‌-ও রয়েছে। প্রেমে মানুষ আনন্দ পায়, আর বিরহে থাকে বেদনা ! বাংলা সাহিত্যেও একটা কথা ব্যবহৃত হয়ে থাকে__’বিরহ-বেদনা’ ! কিন্তু আমি চিন্তা করে দেখেছি__বিরহে আত্যন্তিক কোনো বিচ্ছেদ নাই, এটা যেন স্বল্প বিরাম। তাছাড়া জানো – ‘বিরহে’র কোনো ইংরেজি প্রতিশব্দ‌ও নাই ! ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে আলোচনার সময় আমাকে বারবার ‘প্রেম এবং বিরহ’ এই কথাদুটো অনেকবার ব্যবহার করতে হয়েছে। বৈষ্ণব শাস্ত্রের ‘প্রেম’-কে devine love দিয়ে বোঝানো যায় – “eternal love”-ও বলা যায়, কিন্তু “বিরহ”– কথাটির কোনো ইংরেজি প্রতিশব্দ পাইনি ! তাই – “a feeling for the detachment of loving aspect” – আমাকে ‘বিরহ’ বোঝাতে এইভাবে বোঝাতে হয়েছে !
আসলে আমি তো লেখাপড়া জানা পন্ডিত নই – তাই আমাকে ইউরোপে বারবার সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। প্রতিটি বিমানবন্দরে, বর্ডার cross করার সময় কতবার যে আমাকে form fill-up করতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নাই ! কিন্তু আমার তো form fill-up করতে অনেক সময় লাগতো – বানান করে করে ইংরাজি লিখতে হোতো। এতে বিমানবন্দরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা পিছনের লোকেদের অসুবিধা হোতো – এটা আমি feel করতাম, অনেকে সরাসরি বিরক্তি প্রকাশ‌ও করে ফেলতো।
এইসব কারণেই সমাজ জীবনে চলার পথে লেখাপড়া শেখার মূল্য রয়েছে ! এটা যেন মানবের জীবনে ‘ভূষণ স্বরূপ’। তবে, লেখাপড়া শেখা বলতে_ তথাকথিত পন্ডিত হবার কথা বলছি না ! পণ্ডিতেরা ভীষণ তর্ক-বিতর্ক করে, সহজ কথা সোজাভাবে বুঝতে চায় না ! অবশ্য পৃথিবীতে এমন কিছু কিছু মহা পন্ডিত জন্মগ্রহণ করেছেন__ যাঁরা স্বতন্ত্র, পন্ডিত হ‌ওয়া সত্ত্বেও পান্ডিত্যাভিমান-মুক্ত ! এঁরা সমাজে বরেণ্য ব্যক্তি ! উদাহরণস্বরূপ মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজের কথা বলা যায়। উনি একজন বিদগ্ধ পন্ডিত ছিলেন, ৩৭টা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় পারদর্শী ছিলেন, সেই সব ভাষায় কথাও বলতে পারতেন।
কাশী (বেনারস)-তে থাকতেন উনি – বিভিন্ন সাধু-সন্ত, মন্ডলেশ্বররা শাস্ত্রের বিভিন্ন সূত্রের বা তত্ত্বের মীমাংসা জানার জন্য_ ওনার কাছেই যেতেন। জানো__এই ধরনের মহাপন্ডিত ব্যক্তিরা এক একজন শুধুমাত্র যে মহান সাধক তাই নয়__এনারা বিশেষ সাধনায় সিদ্ধ । এনারা সরস্বতীর সাধনায় সিদ্ধ ! এঁরা সংসার (বিবাহ-ইত্যাদি) করলেও – ‘তথাকথিত সাধারণ মানবের ন্যায় সংসারী’ হ’ন না ! এঁদের সংসার করা গৌণ হয়ে যায়, এঁরা বেশিরভাগ সময় নিজের নিজের সাধনার মধ্যেই ডুবে থাকেন !
গোপীনাথ কবিরাজের পর বেনারসে অতবড় পন্ডিতের আর জন্ম হয়নি। আমার যখন ছোটো বয়স – ওইসময় কাশীতে ঘোরাকালীন ওনার সাথে আমার একবার দেখা হয়েছিল। তখন উনি খুবই বৃদ্ধ – দেখলাম যেন জ্ঞান-বৃদ্ধ ! কত গুণী মানুষজন, সাধুসন্ত ওনার সাথে সারাদিনে দেখা করতে আসছেন ! প্রয়োজনে উনি তাদের জিজ্ঞাসার উত্তরও দিচ্ছেন ! ওনার জীবনযাত্রাও খুব সহজ-সরল ছিল।
জানো, শিক্ষাদানের দুটো পরম্পরা আছে – অধ্যাপক পরম্পরা এবং আচার্য্য পরম্পরা! আধ্যাত্মিক গুরুরা অর্থাৎ যাঁরা মানুষকে অধ্যাত্মপথে এগিয়ে চলার শিক্ষা দেন তাঁরাই আচার্য্য ! তাঁরা যা নিজেদের জীবনে আচরণ করে(সাধনার দ্বারা) উপলব্ধি করেছেন_তার‌ই শিক্ষা দেন । এনাদের এই শিক্ষাই হোলো প্রকৃত শিক্ষা – অন্যান্য সমস্ত শিক্ষার প্রয়োজন হয়, শুধুমাত্র এই শিক্ষায় শিক্ষিত হবার জন্যই।
দেখবে – এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে কোনো ব্যক্তির প্রথাগত তথাকথিত বিদ্যাশিক্ষা-ই নাই, অথচ অধ্যাত্মজ্ঞানের পূর্ণ বিকাশ ঘটে যাওয়ায় – তথাকথিত শিক্ষায় শিক্ষিত পণ্ডিতেরা গিয়ে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়তে বাধ্য হোচ্ছে !
একটু আগেই আমি আলোচনা করছিলাম না__ ‘জীবন’ এবং ‘জীবিকা’ সম্বন্ধে। সেই অনুযায়ী ‘জীবনের সংজ্ঞা’ দিতে গেলে বলতে হয়__ ‘জীবিকার শিক্ষা দেন যারা বা জগৎজ্ঞান শেখান যাঁরা’__ তাঁরা ‘অধ্যাপক’। আর __’জীবনের রহস্য উন্মোচন করেন যাঁরা, জীবনকে মহাজীবনে রূপান্তরের মার্গ দর্শন করান যাঁরা, পূর্ণত্বের পথ বলে দেন যাঁরা’ – তাঁরাই আচার্য্য ! একজন আচার্য্য যা বলেন, তা তিনি নিজের জীবনে আচরণ করে দেখান – তাই তো তিনি ‘আচার্য্য’ পদবাচ্য!
যাই হোক, আমাদের কথা হচ্ছিলো গোপীনাথ কবিরাজকে নিয়ে – উনি দীর্ঘদিন অধ্যাপনার কাজ‌ও করেছিলেন। দেশ-বিদেশের কত জ্ঞানী-গুণীজন ওনার ছাত্র ! আজও (১৯৯৭-৯৮) বিদেশের বিভিন্ন university-তে বিভিন্ন শাখার প্রধান পদে আসীন ব্যক্তিরা ওনার ছাত্র | গোপীনাথ ছিলেন আচার্য্য এবং অধ্যাপক – এই দুইএর সমন্বয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়__এমনিতে হাতির দাঁত-ই কতো দামী, কিন্তু তা যদি সোনা দিয়ে বাঁধানো হয় – তাহলে তার মূল্য আরো বেড়ে যায় ! গোপীনাথ ছিলেন সেইরকমই একজন ! ভারতবর্ষে অনেক উল্লেখযোগ্য মহাপণ্ডিত জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এদের মধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে মহামহোপাধ্যায় গোপীরাজ, দক্ষিণ ভারতের কৃষ্ণমূর্তি, ‘ গঙ্গা থেকে ভোলগা ‘ গ্রন্থখ্যাত রাহুল সাংকৃত্যায়ন – প্রমুখের। কিন্তু গোপীনাথ এদের সকলের অগ্রগণ্য।
গোপীনাথ কবিরাজ, বিশুদ্ধানন্দ পরমহংস(সরস্বতী) বা গন্ধবাবার শিষ্য ছিলেন৷ এই অঞ্চলের‌ই মানুষ ছিলেন_বনগ্রাম থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত বন্ডুলে ওনার বাড়ি ছিল। বিশুদ্ধানন্দ সম্বন্ধে মানুষ যতটুকু জানতে পেরেছে, তা ঐ গোপীনাথের লেখা থেকেই। সাধারণতঃ সরস্বতী পরম্পরার প্রকৃত সন্ন্যাসী যাঁরা, তাঁদের বেশিরভাগেরাও সরস্বতীর বরপুত্র হ’ন ! সাধন-ভজন করে আধ্যাত্মিক উন্নতির সাথে সাথে, এঁরা অসম্ভব শাস্ত্রজ্ঞানের‌ও অধিকারী হ’ন। আর এঁদের conception একদম clear হ‌ওয়ায়__ এঁদের দেওয়া শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষকদের শিক্ষাদান অপেক্ষা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও ফলপ্রসূ হয়।।