জিজ্ঞাসু:— গুরুজী! আপনার লেখা কবিতাগুলি পড়ছিলাম। আপনার একটা কবিতা নিয়ে আপনি একবার আলোচনা করেছিলেন এবং অর্থ বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন ! সেখানে এক জায়গায় “দগ্ধ শ্মশান”__কথাটি ছিল। সেবার আমি শুনেছিলাম ঠিকই __কিন্তু মনে রাখতে পারি নি। আপনি যদি দয়া করে আর একবার বলেন !!
গুরুমহারাজ:— বাবা ! একবার বলার পরেও যখন বুঝতে পারো নি, তখন আর একবার বললেও কি বুঝতে পারবে ?
(জিজ্ঞাসু ভদ্রলোক সন্মতি জানালে গুরু মহারাজ বলতে লাগলেন)…ঠিক আছে_আমি বলছি, তুমি মন দিয়ে শোনো ! মানুষ__ তার জীবনে বেশিরভাগ সময়টাই তো যন্ত্রণাময় অবস্থার মধ্যে কাটায় ! আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক জ্বালায় সততই দগ্ধ হোচ্ছে মানুষ ! হোচ্ছে না কি ? তাহলে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কি ? উপায় হোলো__এই সমস্ত যন্ত্রণার মূলে পৌঁছে, সেখান থেকে এই যন্ত্রণাসমূহের অবসান ঘটাতে হবে এবং অবশিষ্ট মানুষজনকে উত্তরণের পথে এগিয়ে আনতে হবে ! মানুষকে মায়া-মোহ যুক্ত অন্ধকারের জগৎ থেকে উঠে আসতে হবে আনন্দের জগতে, আর সেটাই হোলো তার সহজ বা স্বাভাবিক স্থিতি।
ঐ কবিতার লাইনে ‘শ্মশান’ কথাটা ব্যবহার করা হয়েছে এইজন্য যে, মৃত্যুর সাথে ‘শ্মশান’ সম্পর্কযুক্ত। যে কোনো মানুষ, যদি হাসতে হাসতে বা অবহেলায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মানসিকতা অর্জন করতে পারে__তাহলেই তার জীবনের সমস্ত দুঃখের অবসান ঘটে। উপনিষদে বলা হয়েছে- “মৃত্যোর্মা অমৃতংগময়”- মৃত্যু থেকে আমাকে অমৃতত্বে নিয়ে চলো। এই যে মৃত্যুর কথা উপনিষদ বলেছে, এটি স্থুলদেহের মৃত্যু নয় ! স্থুলদেহের মৃত্যু তো যেন বাসাবাড়ি পাল্টানো ! এই বাড়িঘর ছেড়ে অন্য আরেকটা বাড়িতে গিয়ে ওঠা বা সেখানে আবার কিছুদিন বসবাস করা ! উপনিষদে যে ‘মৃত্যু’-র কথা বলা হয়েছে- সেটি মানবের “অজ্ঞানতার মৃত্যু”! অজ্ঞানতা থেকে মুক্তি পাওয়াই ‘অমৃততত্ব’! এইজন্যই বলা হয়েছে_”মৃত্যোর্মা অমৃতংগময়”!!
দ্যাখো, উপনিষদের ঐ প্রার্থনায় আরও দুটি কথা এক সঙ্গেই বলা হয়েছে- “অসদো মা সদ্গময়” এবং “তমসো মা জ্যোতির্গময়”। মানবজীবন অজ্ঞানতার আবরণ এমনভাবে থাকে যে, নিত্যস্থিত জ্ঞান-সুর্য _সেই আবরণে ঢাকা পড়ে যায় ! এর ফলে, শাশ্বত সত্যের বোধ বা সে-নিজেই যে স্বরূপতঃ ব্রহ্ম _এই বোধ হোতে দেয় না ! তাই মানবের প্রথম কর্তব্যই হোলো অজ্ঞানতার আবরণ কেটে বাইরে বেরিয়ে আসা ! অধ্যাত্মবিজ্ঞানের আকর গ্রন্থ উপনিষদে এইজন্যই ওই শ্লোকগুলি পাওয়া যায় __যেখানে প্রত্যহ প্রত্যুষে গুরু বা আচার্য তার শিষ্যদের নিয়ে এই প্রার্থনাগুলি করতেন এবং সকলের আধ্যাত্মিক উত্তরণের পথ প্রসস্থ করে দিতেন ! এই প্রার্থনা চিরন্তন, তাই এই প্রার্থনা পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তের মানুষের নিরন্তরই করে যাওয়া উচিত!
আবার বলা হয়েছে_ “অসদো মা সদ্গময়” এবং “তমসো মা জ্যোতির্গময়” ! ‘অসৎ’ অর্থে “Unreal”! সৎ-অসতের ভেদ দৃষ্টির কারণ‌ও তো সেই অজ্ঞানতা ! আবার অজ্ঞানতাই ‘তমসা’ ! ‘তমসা’ অর্থে ignorance (darkness নয়) ! অজ্ঞানতার ফলেই জীব নিজেকে ভাবছে মরণশীল ! তাই মরণশীলতা বা mortality-র কারণ ও সেই অজ্ঞানতা ! সেই অর্থে, উপনিষদের ওই শ্লোকগুলির সঠিক ইংরেজি অনুবাদ হবে-
Lead me,
Unreal to truth ,
Ignorance to wisdom (enlightenment)
Mortality to immortality.