শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত এবং কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা ছিলাম স্বামী পরমানন্দ বিরচিত দ্বিতীয় গ্রন্থ বাউলের মর্মকথা-র সহজিয়া বাউল বা বৈষ্ণবদের উৎপত্তি বিষয়ক কথায় ! আমরা এখন দেখি এই সম্বন্ধে গুরুমহারাজ আরও কি কি বলেছেন ! উনি বলেছেন – “এছাড়াও আরো অনেক সহজ সিদ্ধান্তের পুঁথি এবং সাহিত্য আছে – যা কেবল এই সহজিয়া বাউলদের মধ্যেই সংরক্ষিত, সাধারণ শিক্ষিত মানব সমাজ এখনও যেগুলির সন্ধান পায়নি। সহজিয়া বাউলগণ আপনাদের (তাদের নিজেদের) এইরূপ পরম্পরা মেনে থাকেন। তাঁরা তাঁদের সাধন রহস্য এবং সহজ সিদ্ধান্তমূলক তত্ত্বগুলি সাধারণতঃ লোকসমাজে প্রকাশ না করে অতি গোপনে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় নিজেদের মধ্যে বহন করে চলেন। কখনও কখনও বিভিন্ন বাউল সঙ্গীতের ভিতর দিয়ে সাংকেতিক শব্দের দ্বারা সাধ্য ও সাধনতত্ত্বের রহস্যগুলি প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু এই সাংকেতিক শব্দগুলি এতোই জটিল এবং দুর্বোধ্য যে, যতক্ষণ না বাউলদের সঙ্গ করা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এগুলির অন্তর্নিহিত অর্থ ধারণা করা বা বুঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে মোটেই সম্ভবপর নয়। সুতরাং বাউল সঙ্গীতের ভিতর যে সাংকেতিক শব্দগুলি বাউলগণ ব্যবহার করে থাকেন, তার তাত্ত্বিক রহস্য বুঝতে হোলে তাঁদের সঙ্গ করা আবশ্যক, তা না হোলে শব্দভেদ বা তত্ত্ব উদ্ঘাটন করা অতি কঠিন ব্যাপার।”
এতদূর পর্যন্ত বলে গুরুমহারাজ তাঁর গ্রন্থের প্রথম পরিচ্ছেদ শেষ করেছেন। তবে গুরুমহারাজের উপরোক্ত কথাগুলি শুনে আমরা বেশ ভালোই বুঝতে পারলাম – গুরুমহারাজ কেন তাঁর ভ্রমণকালে হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে থাকা গিরি-গুহা-অরণ্য যেমন পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরেছেন প্রাচীন ঋষি-যোগী-মহাত্মা-মহাপুরুষদের দর্শনের জন্য বা তাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য (কারণ আমরা দেখেছি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন মহাত্মা-মহাযোগী-মহাপুরুষগণ গুরুমহারাজের সাথে দেখা হবার পর তাঁকে তাদের সারাজীবনের সাধনালব্ধ শক্তি অকাতরে গুরুমহারাজকে দান করেছেন, ঠিক যেন মহিষাসুরমর্দিনী মাতা দুর্গাকে যেমন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর সহ সমগ্র দেবতারা ভিন্ন ভিন্ন আয়ুধ দিয়ে তাঁকে অসুর দমনের জন্য সুসজ্জিত করে তুলেছিলেন – এটাও যেন অনেকটাই সেইরকম), তেমনই উনি ছোটবেলা থেকেই বাউলের আখড়ায় আখড়ায়-ও খুবই ঘুরেছেন।
গুরু মহারাজের জন্মস্থান কৃষ্ণদেবপুর – কালনার খুবই সন্নিকট, আর কালনায় বাউল সাধনায় সিদ্ধ “ভবা-পাগলা”র বাড়ি এবং সাধনস্থল। গুরুমহারাজের পিতা ফকিরচন্দ্র গান-বাজনার ব্যাপারে ‘পাগল’প্রায় ছিলেন অর্থাৎ ঐ অঞ্চলের যেখানেই গান-বাজনা সেখানেই ফকিরচন্দ্র ! সেই অর্থে সিদ্ধ বাউল-সাধক ভবা পাগলার গানের আসরেও ফকিরচন্দ্রের খুবই যাতায়াত থাকার সঙ্গত কারণ রয়েছে। সেই সুবাদেই হোক বা ভগবানের লীলার অন্তর্গত হিসাবেই হোক – ভবা পাগলার সাথে বালক রবীন (গুরুমহারাজ)-এর একটা সুসম্পর্ক ছিল, আর সে সম্পর্ক খুবই মধুর ছিল। আমরা গুরুমহারাজের সিটিং-এ বেশ কয়েকবার ওনার মুখে ভবা পাগলার প্রসঙ্গে শুনেছিলাম এবং তাঁদের মধ্যে যে একটা সুসম্পর্ক ছিল – সে কথাও উনি বলতেন। সে যাই হোক – যে প্রসঙ্গে এইসব কথার অবতারণা তা হোলো – ঐ যে গুরুমহারাজ বললেন, ‘ যতক্ষণ পর্যন্ত না বাউলদের সঙ্গ করা যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বাউলদের সাধ্য-সাধন তত্ত্ব এবং এই তত্ত্বের দুর্বোধ্য সাংকেতিক ভাষা সম্বলিত বাউলগানগুলি বোঝা অসম্ভব।’
গুরুমহারাজের উপরিউক্ত কথাগুলি থেকে আমরা আরও একটা সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছি যে, যদিও বাউল-বৈষ্ণব-সুফী-ফকির ইত্যাদিদের নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সমীক্ষা হয়েছে, অনেক গবেষণা হয়েছে এবং সেই সংক্রান্ত অনেক বই-ও বাজারে প্রকাশিত হয়েছে, তবু এখনও সাধারণ শিক্ষিত মানব বাউল-মহাজনদের সহজ-সিদ্ধান্তের পুঁথির সন্ধান পায় নি। এইগুলি এখনও বাউল-পরম্পরার মধ্যেই রয়েছে যেগুলির শিক্ষা গুরু-শিষ্যের জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। সুতরাং প্রকৃত বাউলতত্ত্ব জানতে গেলে কোনো না কোনো মহাজন-বাউলের শিষ্য হয়ে তাঁর সেবায় রত হোতে হবে অথবা তাঁর কাছে দীক্ষা-শিক্ষা গ্রহণ করে বাউল-সাধনা করে যেতে হবে ! আর তাই হোলেই গুরু প্রসন্ন হয়ে ‘বাউল’-এর সহজ সিদ্ধান্ত শিষ্যকে একটু একটু করে শেখান। এইভাবেই বাউল পরম্পরার গোপন পুঁথিপত্র এবং শিক্ষা শুধুমাত্র গুরু-পরম্পরাতেই বাহিত হয়ে আসছে – বাইরের মানুষের কাছে যা এখনো সেভাবে প্রকাশিত হয়নি।৷
বাউল মহাজনদের রচিত গান বা বাউল সঙ্গীতগুলি সাধারণ মানুষের কাছে অনেকাংশে দূর্বোধ্য, কারণ সেগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাংকেতিক ভাষায় লেখা থাকে। সেইসব শব্দগুলির অর্থ করা অথবা তত্ত্বসমূহের মর্মোদ্ধার করতে গেলে বাউল সাধকদের সঙ্গ করতেই হবে। অন্যথায় বাউল গানগুলির দূর্বোধ্য সাংকেতিক শব্দগুলিকে মনে হয় উল্টোপাল্টা কথা দিয়ে সাজানো ! কিন্তু সঠিক মানেগুলো জানতে পারলে বুঝতে পারা যায় – বাউল সাধনের গানের ভাষায় দেহতত্ত্ব, ঈশ্বরতত্ত্ব, কামতত্ত্ব ইত্যাদিগুলিকে কত সহজভাবে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।৷
