জিজ্ঞাসু:— পুরাণাদি শাস্ত্র পড়ে দেখেছি সেখানে শুধু বিভিন্ন গল্প-কাহিনী রয়েছে । আপনি যেমন সুন্দর করে আমাদেরকে শাস্ত্র-ব্যাখ্যা গুলি বোঝান, ওখানে সেইরকম তো কিছু পাওয়া যায় না?
গুরু মহারাজ:— পুরাণাদি শাস্ত্রে রুপকাকারে গল্পের মাধ্যমে শাশ্বত সত্য এবং অধ্যাত্মতত্ত্ব সমূহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে ! সেই জন্যেই সরাসরি পুরাণ বা মহাকাব্যগুলি থেকে সঠিক তথ্য উদ্ধার করা মুশকিল হয়ে পড়ে ! উপযুক্ত গুরুর পদপ্রান্তে বসে এগুলি থেকে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে হয় ! পুরাণাদি শাস্ত্র রচনার পিছনে যে কারণ ছিল, সেটা বলছি শোনো ! ভারতবর্ষে ঋষিরা যখন শাশ্বত সত্যকে প্রথম উপলব্ধি করলেন বা বলা উচিত বোধ করলেন, তখন তাঁরা সেই ‘বোধ’কে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ঘোষণা করলেন_”শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা ! আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থু !”__ অর্থাৎ_”হে বিশ্ববাসীগণ, অমৃতের পুত্রগণ, দিব্যধামবাসীগণ ! তোমরা সবাই শোনো, আমি সেই আদিত্যবর্ণ মহান্ত পুরুষকে জেনেছি !” এইভাবে গুরুকুল আশ্রমে, গুরুরা বা আর্য ঋষিরা তাঁদের বোধসঞ্জাত জ্ঞানের কথা বলতেন, আর শিষ্যরা তাঁর পদপ্রান্তে বসে বসে সেগুলি শ্রদ্ধা সহকারে শ্রবণ করতো ! আর শুধু তাই নয়_ ব্রহ্মচর্য্য পালন এবং সকাল সন্ধ্যায় ধ্যানাভ্যাসের ফলে মেধানাড়ী খুলে যাওয়ায়, গুরুদেবের শিক্ষাগুলি তারা শুনে শুনেই মুখস্ত করে ফেলতো ! এরপর তারা সেগুলি গভীরভাবে অনুধাবন করতো এবং পুনঃপুনঃ চিন্তা বা নিদিধ্যাসনের দ্বারা এক‌ই শ্লোকের বিভিন্ন অর্থ করার বা সেটিকে নতুন নতুন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতো । এই প্রকারে ঐ গুরুকুলের শিষ্যদের সুপ্ত মস্তিষ্ককোষের উন্মীলন ঘটতো এবং পরবর্তীতে তাদের অনেকেও সাধনজগতের সর্বোচ্চ স্থিতিলাভ করতে সমর্থ হোতো ।
কিন্তু হোলো কি_ তৎকালে গুরুমশাই বা আচার্যরা বেশিরভাগই সমাজ-সংসার বা লোকালয় থেকে একটু দূরে কোনো তপোবনে আশ্রম করে সেখান থেকে বিদ্যাশিক্ষা দান করতেন ! এই জন্যই তৎকালীন শিক্ষাকে ‘আরণ্যক’ শিক্ষা বলা হোতো । যাই হোক, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে, ঐসব শিক্ষাকেন্দ্রে সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষ, শিক্ষা গ্রহণ করতে আসতে পারতো না । তাছাড়া যারা আসতো, তাদের সবাই যে ঋষিদের শিক্ষাকে সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারতো তা-ও নয় ! জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আরো বেশি বেশি করে শিক্ষাদানের‌ও প্রয়োজনীয়তা বাড়লো। এই জন্যই তৎকালীন আচার্যদের শিক্ষাদানের কৌশলের বদল ঘটাতে হোলো !
শাশ্বত বেদান্তের শিক্ষাকে সবার কাছে পৌঁছে দিতে তাঁরা রচনা করেছিলেন পুরাণাদি শাস্ত্র । যারা যথার্থ ব্রহ্মবিদ্যার অধিকারী, তাদের জন্য ব্রহ্মসূত্রই যথেষ্ট ! কিন্তু ততোটা অধিকারী যারা নয়(যাদের brain cell ততোটা জাগ্রত হয় নি), তাদের জন্য ব্রহ্মসূত্রের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও বেদ-উপনিষদের পাঠ নির্দিষ্ট হোলো। এরপর অধিকারী-ভেদে শিক্ষার্থীদেরকে বৈদিক কর্মকাণ্ড অর্থাৎ হোম-যজ্ঞ, পূজা-পাঠের অধিকার দেওয়া হোলো। চারটি বেদের পৃথক পৃথক আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির জন্য পৃথক পৃথক ব্যক্তিদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হোলো । সমাজে এইভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন পদবীর সৃষ্টি হয়েছিল ! সামবেদীয়, যজুর্বেদীয় ইত্যাদি গোষ্ঠী এবং দ্বিবেদী, ত্রিবেদী, চতুর্বেদী, অগ্নিহোত্রী ইত্যাদি পদবী গুলো থেকেই ব্যাপারটা বোঝা যায়।
সমাজের বিবর্তনে এইসব‌ যারা করতো, তারাই সমাজে উচ্চবর্ণ হিসাবে পরিচিত হোতে শুরু করলো। কিন্তু একবারে সাধারণ মানুষ বা খেটে খাওয়া মানুষ__ যাদের শিক্ষাকেন্দ্রে যাবার সময় ছিল না, উপায় ছিল না__তাদের কিভাবে শিক্ষাদান করা হবে ? এইভাবেই সাধারণ মানুষের শিক্ষাদানের জন্যই ঋষিরা তৈরি করেছিলেন মহাকাব্য এবং পুরাণাদি শাস্ত্র। দ্যাখো, যুগে যুগে_ সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গীকৃত প্রাণ, যথার্থ জ্ঞানী ব্যক্তিরাই সমাজের প্রকৃত কল্যাণ করে থাকেন ! পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই মহামানবরা জন্মগ্রহণ করুন না কেন__ সেখান থেকেই তাঁরা জীবজগতের কল্যাণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান ! এঁরা ঋষিকল্প মানুষ, এঁরাই যুগপুরুষ ! বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন স্থানে জন্মগ্রহণ করে হয় এঁরা পৃথিবীর এক একটা স্থানের সমাজকে এবং সমাজব্যবস্থাকে এগিয়ে দিয়ে যান অথবা সেই স্থান থেকেই সমগ্র জগতের কল্যান সাধন করে থাকেন!
যাই হোক, সমাজের সকল মানুষ যেন সেই শাশ্বত সত্যের একটু হোলেও স্পর্শ পেতে পারে, সবাই যাতে সেই পরম জ্ঞানের সন্ধান পেতে পারে__সেইটা ভেবেই অর্থাৎ মানবকল্যানের জন্যই তত্ত্বের সাথে রস(কাব্যের পঞ্চরস হোল__বীর,হাস্য, করুন, ভয়ানক বা বীভৎস ইত্যাদি) মিশিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছিল মহাকাব্য এবং পুরানাদি শাস্ত্র। …. (ক্রমশঃ)
[এই আলোচনাটি একটু দীর্ঘ, তাই এটি বেশ কয়েকটা এপিসোড ধরে চলবে….]