স্থান ~ বনগ্রাম, মুখার্জি বাড়ি । সময় ~ ২৪/১০/৯১. উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ বলরামবাটির বিমলবাবু, ন’কাকা, মেজকাকা ইত্যাদি ।

জিজ্ঞাসা বলরামবাটীতে একজন সাধু ছিলেন, তার নাম ছিল স্বামী পরমানন্দ, আপনি কি তাকে চিনতেন ?

গুরুমহারাজ :– হ্যাঁ খুব চিনতাম, কদিন আগে ওনার কথা এখানে আলোচনা হচ্ছিল। ওনারও নাম ছিল পরমানন্দ গিরি। তাঁর বিরাট চেহারা ছিল। বিরাট শরীর বলে মানুষ ওনাকে ‘তিনমণি সাধু’ বলত। প্রথম জীবনে উনি বহু জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, শেষের দিকে বলরামবাটীর আশ্রমে ওঠেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ওখানেই ছিলেন। ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয় আমােদপুরে রেল স্টেশনের কাছে এক আশ্রমে। আমোদপুর জানােতাে? বর্দ্ধমান-রামপুরহাট‌ ট্রেনলাইনে বোলপুরের দু-একটা ষ্টেশন পরে আমোদপুর ষ্টেশন। আবার কাটোয়া থেকে ন্যারাে গেজ বা ছােট লাইনের শেষ স্টেশন আমােদপুর। আমি কাটোয়া হয়ে তখন বীরভূমের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরছিলাম। এইরকম‌ই ঘুরতে ঘুরতে একবার আমোদপুরেএসে হাজির হয়েছি, খোঁজ নিয়ে জানলাম স্টেশনের কাছেই একটি আশ্রম রয়েছে। ওখানে এক বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনী থাকতেন, ওনার নাম ছিল “মগনেশ্বরী মাতা”, অনেকে বলত“মগনানন্দ”! তবে সাধারণত সকলে তাকে ‘গুরুমা’ বলে ডাকতাে। আমি গিয়ে দেখলাম প্রায় ৮৫৯০ বছর বয়স! বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়েছেন কিন্তু তখনও শক্ত রয়েছেন এবং কথা বলেন সুন্দর, মাতৃভাব। উনি ছােটবেলা থেকেই অধ্যাত্মপথের পথিক। উনি বলতেন_উনি নিজের হাতে সারদা মায়ের সেবা করেছেন, তাঁর চুল বেঁধে দিয়েছেন ইত্যাদি অনেক কিছুই করেছেন। খুবই উন্নত সাধিকা। শ্রী শ্রীমায়ের কাছে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথা শুনে তার মনে খুবই আক্ষেপ ছিল যে, একবার ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হল না, আবার ভাবতেন ১০০ বছরের মধ্যে যদি ঠাকুর পুনরায় শরীর নেন তাহলে নিশ্চয়ই দেখা হবে। ।

  যাইহােক, আমি গিয়ে তার আশ্রমে পৌঁছলাম প্রায় সন্ধ্যাবেলা। ওখানে গিয়ে দেখি ঐ সন্ন্যাসী পরমানন্দ গিরি বসে আছেন ওখানেই। সেদিন‌ই প্রথম আলাপ হয়েছিল, আমাকে উনি অবশ্য প্রথমটায় "বাচ্ছা ছেলে" বলে খুব একটা পাত্তা দেননি। কিন্তু আশ্রমে রাবার পরেই গুরুমা আমাকে কাছে ডাকলেন, তারপর আমার একটা হাত দেখতে চাইলেন। আমি ইচ্ছে করে একটু খারাপ ব্যবহার করলাম, রূঢ়ভাবে বললাম,  ‘কোন হাত দেখাব ?' গুরুমা আমার কথায় রুষ্ট হলেন না__অনেকক্ষণ চুপ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে খুব আদর করলেন। তারপর বললেন এখানে ক’দিন থেকে যাওনা বাবা। আমি রূঢ় ভাবে উত্তর দিলাম, "সবকিছু ভগবানের ইচ্ছায় হয়।” এই বলে আমি বাইরে চলে এলাম। যেখানে গাছতলায় একটা বাঁধানাে বেদি ছিল, ভাবলাম ঐটায় বসব কিন্তু বসতে গিয়ে দেখি অন্ধকারের মধ্যে ঐ সাধুবাবা অর্থাৎ পরমানন্দ বসে আছেন! মায়ের সাথে আমার কথােপকথনের মাঝেই কখন যেন উনি বাইরে চলে এসেছিলেন। আমি সেখানে বসতেই উনি আমাকে বললেন, “দ্যাখাে, তােমার বয়স অল্প তাই হয়তাে জানােনা, সাধু-মহাত্মাদের সাথে ঐরকম রূঢ়ভাবে কথা বলতে নেই।" আমি বললাম, ' আচ্ছা, আপনার উপদেশ মনে রাখবো।'

আসলে ব্যাপারটা হয়েছে কি–আমার তখন অন্যরকম ভাব চলছিল, অন্তরে তীব্র বৈরাগ্য ও জগৎ-সংসারে সত্য কি তা জানার প্রতি আকুল আকাক্ষা নিয়ে আমি তখন ছুটে চলেছি বিভিন্ন স্থানে__বিভিন্ন আখড়ায়, মঠে, মিশনে, দরগায়, গির্জায়, শ্মশানে, কবরস্থানে, জঙ্গলে, পর্বতে—’কোথায় পাবাে তারে’•••এ এক সাংঘাতিক অবস্থা! অন্তরে সুতীব্র বিরহ, একটা নিদারুণ বেদনা, কিন্তু বাইরে কাউকে প্রকাশ করতে পারছি না—ফলে বাহ্যিক ব্যবহারে একটা রূঢ়তা, কথার মধ্যে একটা ঝাঁঝ হয়তাে সেই সময় ফুটে উঠেছিল ! আবার একটা ঘটনা ঘটত কি, সেইসময় আমার ঐ অবস্থা দেখে অনেকেই আমাকে সেখানেই থাকতে বলতেন, এক জায়গায় বেঁধে ফেলতে চাইতেন—এটা আমার কাছে আরও অসহ্য লাগত। কারণ আমার তো তখনও “সত্য”-কে পাওয়াই হয়নি!ফলে এটা আমি জানতাম যে, Devine plan অনুযায়ী আমাকে আরও অনেক অন্বেষণ করতে হবে! তাহলে আমি এক জায়গায় আবদ্ধ হবাে কি করে ? —এই ভাব তখন আমার খুবই ক্রিয়াশীল ছিল।

 পরমানন্দ তাে আমার মনের অবস্থা জানতে পারেননি, ফলে আমাকে কাছে বসিয়ে অনেক উপদেশ দিচ্ছিলেন এবং আমিও মন দিয়ে সে সব শুনছিলাম হঠাৎ একটা কাণ্ড ঘটল! একজন বিরাট চেহারার তান্ত্রিক হাতে একটা বিরাট ত্রিশূল নিয়ে সেখানে এসে হাজির! ও এসেই আমাকে এটা-ওটা হুকুম করতে লাগল, আর আমি যেন শুনতেই পাইনি এমন ভাব দেখিয়ে অন্য দিকে চেয়ে রইলাম। এতে ও খুবই রেগে গেল। চিৎকার করে বলল , "জানো_আমি তারাপীঠে তন্ত্র-সাধনা করি! তােমার কি ক্ষতি করতে পারি_তার আন্দাজ আছে তোমার ?" এইসব নানা কথা বলে ওই তান্ত্রিক এমন চেঁচামেচি করতে লাগল যে, আশ্রমের ভেতর থেকে সবাই বেরিয়ে এল। গুরুমাও বেরিয়ে এলেন। দেখলাম তান্ত্রিকটিকে ওঁরা সবাই চেনেন এবংমনে হল তাকে যথেষ্ট ভয় পান। তাই সবাই মিলে তাকে চুপ করার জন্য অনুরােধ জানাতে লাগলেন। পরমানন্দ মহারাজ তাে খুবই কাতর অনুনয়-বিনয় করতে লাগলেন, “বাবা, আপনি শান্ত হন, এ ছেলেমানুষ জানেনা, একে মার্জনা করে দিন...।" ইত্যাদি আরো অনেক কথাই অনেকে বলতে লাগলেন। এসব দেখে আমি সেই তান্ত্রিকের কাছে এগিয়ে গেলাম এবং ওর চোখের দিকে চোখ রেখে বললাম, "কি করতে চাও তুমি করে ফেল_এখনি কর!" আমার কথা শুনে তান্ত্রিক তো আরও রেগে গেল, তেড়ে-মেড়ে এসে বিভিন্ন মন্ত্র উচ্চারণ করে—বিভিন্ন মুদ্রায় অভিচারক্রিয়া করতে শুরু করে দিল আমার উপর! আর বীভৎসভাবে আমার দিকে তাকাতে তাকাতে এগােতে লাগল। আমিও স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে! কিন্তু ও ঐভাবে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে আগাতে আগাতে আমার ঠিক সামনে আসতেই ধড়াস্ করে পড়ে গেল! পড়ে গিয়েই যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল এবং ঐখানেই পায়খানা-পেচ্ছাপ করে ফেলল ।

আকস্মিক ভাবে ঘটে যাওয়া এইসব ঘটনা দেখে ওখানে উপস্থিত সকলে ঘাবড়ে গেল। গুরুমা আমাকে হাত ধরে ওখান থেকে নিয়ে গিয়ে আশ্রমের ভিতরে ঢুকিয়ে নিলেন। বাকিরা ঐ তান্ত্রিক ভদ্রলােকের সেবা-শুশ্রূষায় লেগে গেল। পরে শুনেছিলাম একটু সুস্থ হয়েই তান্ত্রিকটি তিলার্ধ দেরি না করে দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ করে এবং আর কখনও ঐ অঞ্চলে আসেনি। [ঐ ঘটনারই কথা অন্য এক সময় গুরুজীর মুখে শুনেছিলাম । তিনি বলছিলেন, ঐ তান্ত্রিকটার প্রতি তিনি নিজে কোন প্রতিক্রিয়া ( Reaction) করতে যাননি, কেবল নির্লিপ্তভাবে তার দিকে চেয়েছিলেন। এর ফলে তান্ত্রিকের দ্বারা, গুরুজীর উপর আরােপিত শক্তি ওর দিকেই প্রত্যাগত হয়ে ওকেই আঘাত করেছিল। কারণ গুরুজী ছিলেন সর্বতােভাবে শুদ্ধ বা নির্মল। তাই নির্মল আধারে কোন বিরুদ্ধশক্তি প্রয়ােগ করলে সে শক্তি ঘুরে গিয়ে শক্তি-প্রয়ােগকারীর ওপরই বর্ষিত হয়! উদাহরণ হিসেবে গুরু মহারাজ বলেছিলেনযেমন স্ফটিকস্তম্ভে আলো নিক্ষেপ করলে সেই আলাে প্রতিফলিত হয়ে নিক্ষেপের জায়গাতেই ফিরে আসেএক্ষেত্রেও সেই রকমই হয়।]

(যাইহােক গুরুজী আবার বলতে লাগলেন-)মায়ের কাছে এও শুনলাম যে, ওই তান্ত্রিক নাকি মাঝে মাঝেই ঐ আশ্রমে এসে নানারকম উৎপাত করতো_ সবাইকে ভয় দেখাতো! ফলে আশ্রমের সবাই ওনার নানারকম অন্যায় আব্দার মেনে নিতে বাধ্য হোত। সব শুনে আমি শান্তকন্ঠে বলেছিলাম ঐ লোকটি এখানে আর কোনদিনই আসবে নাআপনারা এই ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকবেন। গুরুমা আমার শান্তভাব লক্ষ্য করে আমাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে খাওয়ালেন, তারপর আমাকে অনুরােধ করলেন যাতে আমি ওখানে Permanently (স্থায়ীভাবে) থেকে যাই। মা বলেছিলেন ঐ অঞ্চলের অসুরদের শায়েস্তা করার জন্য নাকি আমার মতাে কাউকে দরকার ! পরমানন্দ মহারাজও ওখানে ছিলেন, উনি গুরুমাকে খুবই মান্য করতেন। ফলে উনিও আমাকে গুরুমার আশ্রমে থেকে যাবার জন্য Request করতে লাগলেন এবং বললেন“তােমার ভাগ্য ভালো যে, গুরুমার মতাে একজন মহাসাধিকা তােমাকে থাকার জন্য অনুরােধ করছেন, এই offer ( প্রস্তাব) উনি আজ পর্যন্ত কাউকে দেননি”। দেখলাম ওই ঘটনার পর পরমানন্দ আমাকে একটু অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন। সেদিন অনেক রাত্রি পর্যন্ত নানান প্রসঙ্গ হ’ল, গুরুমা আমাকে অনেক উপদেশ দিতে লাগলেন। সাধন জীবনে একজন সাধকের কিভাবে চলতে হয়—এই রকম নানা কথাবার্তা চলতে থাকল। রাত্রি প্রায় ১১টা পর্যন্ত আমি ওখানে থেকে গেলাম। এর একটা কারণ ছিল এই যে, ওনাদের একটু ভয় ছিল হয়তাে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঐ তান্ত্রিকটি আবার ফিরে আসবে এবং কিছু ঝামেলা পাকাবে। তাই একটু অধিক রাত্রি পর্যন্ত থেকে আমি ওনাদের বিদায় জানিয়ে আবার পথে বেরিয়ে পড়লাম।

এরপর অনেকদিন কেটে গেছে, আমি তখন রূরাল ইলেকট্রিফিকেশনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছি। সিঙ্গুর অঞ্চলে কাজ করার সময় বলরামবাটিতে স্বামী পরমানন্দ গিরি মহারাজের আশ্রমেই ওনার সাথে আবার দেখা হয়েছিল। এরপর থেকে মাঝে মাঝেই যোগাযোগ হোত। উনি বেশ মজাদার মানুষছিলেন, দেখা হোলেও অনেক গল্প-গুজব হোত। ঐ অঞ্চলের কাজের শেষের দিকে একদিন ওনার সাথে দেখা করে বিদায় নেবার সময় উনিও আমাকে আমোদপুরের মা-টির মতোই বলেছিলেন “বয়স হয়েছে, এইবার ওপারে যেতে হবে, আশ্রমটার ভার নাও।” আমি বললাম ‘দেখুন অামার অন্য field-এ কিছু কাজ রয়েছে– এই আশ্রমের দায়িত্ব গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।’ এই বলে আমি ওখান থেকে চলে আসি। তারপর আর ওনার সাথে যোগাযােগ হয়নি, পরে খবর পেয়েছিলাম উনি শরীর ছেড়ে দিয়েছেন।