স্থান ~ আজিমগঞ্জ কনসাস স্পিরিচুয়াল সেন্টার । সময় ~ ১৯৯৬-৯৭ সাল । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ মানিক ব্রহ্ম ও তাঁর পরিবার, ম্যাকমিলন, সুধীর গৌড় ও তাঁর পরিবার ইত্যাদি ।

জিজ্ঞাসু:– আপনাকে কি কখনও পৃথিবীর Negative field দ্বারা আচ্ছন্ন হতে হয়েছিল ?

গুরু মহারাজ :– একবার আমি হিমালয়ে তিনজন শিবযোগীর সঙ্গে ঘুরছিলাম ৷ ওনারা সাক্ষাৎ শিবস্বরূপ ছিলেন ৷ হিমালয়ের একটা নির্দিষ্ট স্থানে এসে ওনারা বেলা গেয়ে বেশ কয়েকদিন থেকে গেলেন। আমি জল আনতাম,শুনিল কাঠ জোগাড় করে দিতামপ্রাণপণ ওঁদের সেবা করতাম । ওনারাও আমাকে খুবভালোবাসতেন আর কিছুতেই সঙ্গছাড়া করতে চাইতেন না । একদিন ওনাদের জন্য জল আনতে নিচে নেমেছি, পাহাড়ী ঝরনায় স্থানীয় মেয়েরা স্নান করছিল ৷ আমার তখন বয়স ১৫/১৬ বছর হবে। সেই প্রথম আমার শরীরে উন্মুক্ত নারীশরীর দেখে শিহরণ হল। আর সেই প্রথম আমার নিজেকে গোপন করতে ইচ্ছা জাগলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আমি আমার সম্বন্ধে সচেতন হয়ে গেলাম এবং জল নিয়ে ফিরে গেলাম। কিন্তু জীবনে এই প্রথম আমার মনে গ্লানি স্পর্শ করল। মন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। যে পথে আমি বারবার অনায়াসে জল নিয়ে বা কাঠ নিয়ে উঠেছি-নেমেছি সেই পথই যেন দীর্ঘায়িত হতে থাকল। ক্লান্তি আমাকে যেন গ্রাস করতে লাগল। ওনাদের কাছে ফিরে যেতেই আমার মন যেন ওঁদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকতে লাগল। কারণ আমি জানি যে, ওনাদের স্বচ্ছ মন আমার মনের সমস্ত ভাবটাকে পড়তে পারছে। এইভাবে তিনদিন কেটে গেল, আমার চোখের সামনে কালি জমতে লাগল, ভারী মনকে নিয়ে আমি যেন আর বইতে পারছি না! এমন সময় ওনারা আমাকে ডেকে পাঠালেন। যদিও আমি জানতাম যে, ওনারা স্থূল ঘটনা এবং আমার মনের বেদনার ভাষা দুটোই জানেন তবুও আমি সবিস্তারে সমস্ত ঘটনা ওঁদের কাছে অকপটে খুলে বললাম । সব শুনে ওনাদের মধ্যে যিনি সবচাইতে প্রবীণ, তিনি বললেন যে, তাঁরা সবই জানেন কিন্তু আমি প্রকাশ না করার জন্য ওনারাও চুপ করেছিলেন। যাইহােক, এসব শােনার পর ওনাদের সে কি আনন্দ ! আমি যত অবাক হই ওনারা তত আনন্দ করেন – সে এক কাণ্ড ! ওনারা বলতে লাগলেন, “যাক, আমাদের উপর যা দায়িত্ব ছিল, তা আমরা পালন করেছি এবার নিশ্চিন্ত হয়ে তুমি যেখানে খুশি বিচরণ কর।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মনে এই বিকার এল কোথা থেকে ? ওনারা বললেন, “তুমি পৃথিবী গ্রহে শরীর নিয়েছ, এখানকার যতরকম ভাব আছে– সে সকলই তােমার মধ্যে প্রবেশ করবে। পৃথিবীগ্রহের পুরুষ শরীরের যৌবনের ভাব তোমার মধ্যে প্রবেশ করেছিল এবং তুমি তার Taste পেয়েছ।” এরপর তাঁরা তিন জন মিলে আমাকে শিবসতী গ্রন্থিতে মনঃসংযােগ করে ধ্যানে বসিয়ে দিলেন। ধ্যানের গভীরতায় আমার উপলব্ধি হ’ল পুরুষ-শরীরে সতীগ্রন্থির ক্রিয়া এবং নারী-শরীরে শিবগ্রন্থির ক্রিয়ার রহস্য। আর এই জন্যই যৌবনে নারী-পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণ হয়। শিবসতী গ্রন্থির রহস্য ভেদ হবার পর থেকে কখনও কোন বিকার আমার মনে বা শরীরে আসেনি। আমি কখনও আলাদা করে সংযমশিক্ষা বা অভ্যাস করিনি। শুধু সত্যলাভের ঐকান্তিক ব্যাকুলতায় আমার দিন কেটে গেছে—রাত কেটে গেছে । পরবর্তীকালে জেনেছি যে, অষ্টাঙ্গিক যোগমার্গ বা সংযমাদি অভ্যাস, এগুলো আমার আপনা থেকেই হয়ে গেছে।

জিজ্ঞাসু :—আমি বিশ্বাস করি_ জগতে দু’রকম মানুষ আছে_ একদল ভাববাদী, অন্যদল বস্তুবাদী এবং বস্তুবাদের দ্বারাই সমাজ-সংস্কার করা সম্ভব। আপনিও তো একজন সমাজ-সংস্কারক, তাহলে আপনি বস্তুবাদ ছেড়ে ভাববাদী হলেন কেন?

গুরুমহারাজ :– আরে বাবা! জগতে কতরকমের বাদ রয়েছে_ তুমি শুধু দু’রকমের বাদ দেখছ, আর আমি দেখছি জগতে যত কোটি, যত লক্ষ, যত হাজার মানুষ আছে, তারা সবাই ভিন্ন ভিন্ন “বাদী”। তবে সবকিছু “বাদ”_বাদ দিতে পারলে তবেই সে সম্পূর্ণবাদী বা পরমবাদী! বাকিরা তো সবাই অপবাদী নয় খণ্ডবাদী!

 'বস্তুবাদ'_ কথাটা পাশ্চাত্য দর্শন থেকে এসেছে। জার্মান দার্শনিক কার্লমার্কস তাঁর দর্শনে "Dialectic Materialism" বা "দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ" কথাটি ব্যবহার করেছেন। কার্লমার্কস আবার তারই দেশের দুজন দার্শনিক জর্জ হেগেল এবং লুডউইং ফুয়ারবাকের কাছ থেকে এই কথাদুটি পান। হেগেলের লিখিত দর্শনশাস্ত্রটির নাম Dialectic Idealism বা দ্বান্দিক ভাববাদ এবং ফুয়ারবাকের দর্শন ছিল বিজ্ঞাননিষ্ঠ, ওর ব‌ইটির নাম Materialism বা বস্তুবাদ। আবার দার্শনিক হেগেল যেহেতু তাঁর পূর্বসূরি Immanuel Kant-এর প্রভাবমুক্ত ছিলেন না, সেহেতু বলা যায় এই তিন দার্শনিকের পরিপূর্ণ প্রভাব পড়েছিল মার্কসদর্শনে।কার্লমার্কস বর্জন করেছিলেন কাণ্ট দর্শনের প্রভাবযুক্ত হেগেল-এর Idealism বা ভাববাদ কথাটি , এরপর হেগেল এবং ফুয়ারবাকের ব‌ই দুটির নাম জুড়ে করে দিলেন_"Dialectic Materialism"!

কিন্তু কালমার্কস সরাসরি কোন ভারতীয় দর্শনের সংস্পর্শে আসেন নি। তিনি নিজে খ্রীষ্টান হ‌ওয়া সত্বেও তৎকালে পোপের মার্জনাপত্র দেওয়া,ধর্মযাজকদের অসংযমী জীবন যাপন ইত্যাদি খ্রীষ্টানদের নানান ব্যাপার সম্বন্ধে তিনি খুবই বিরক্ত ছিলেন। পরে লণ্ডনে গবেষণাকালীন তিনি ইসলামীয় চিন্তাধারার মধ্যে বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ব, মৈত্রী ইত্যাদির সন্ধান পান এবং এগুলি তাঁর ভালো লাগে। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ — ইত্যাদি চিন্তাগুলি ইসলাম দর্শনের Pan-Islamic Brotherhood থেকে নেওয়া!

যাইহোক, তোমার 'বস্তুবাদের উৎস সন্ধানে' যাবার কোন ইচ্ছা আমার নেই — কথা হচ্ছে বস্তুবাদী আর ভাববাদীদের নিয়ে। দ্যাখো, এই যে তুমি যে জিজ্ঞাসা করছ আর আমি উত্তর দিচ্ছি ! আবার দ্যাখো_কার্লমার্কস বক্তৃতা দিচ্ছেন বা বই লিখেছেন — এগুলি করার জন্য কোন না কোন ভাষার প্রয়োজন হচ্ছে_তাই তো! এবার বলোতো _ভাষা কি? হ্যাঁ, right! ভাষা হোল ভাব প্রকাশের মাধ্যম। এই হিসাবে বোবাদেরও ভাষা আছে — আঙ্গিকের মাধ্যমে তারা ভাব প্রকাশ করে থাকে। বিভিন্ন পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, প্রাণীরা বিভিন্নভাবে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। আর যেভাবে তারা সেটা করে থাকে — সেটাই তাদের ভাষা। তাহলে কি বুঝলে, আগে ভাব পরে ভাষা। ভাবনা — ইচ্ছা — ক্রিয়া। এই ত্রিমাতৃকা শক্তিতে জগৎসংসার চলছে। ভাবনা আসে ভাব থেকে, সুতরাং যে কোন চিন্তা_তা সে  যেই করুক না কেন — চিন্তাবিদ্, মনীষী, দার্শনিক_তাঁরাও ভাববাদী। ভাবনাকে বাদ দিয়ে তো কার্য হয় না। সুতরাং ভাববাদী নয় কে?

 আর বস্তুবাদী বা জড়বাদী বলতে মার্কসদর্শন কেন, ভারতীয় চার্বাক-দর্শন চরম জড়বাদী দর্শন। বৈশেষিক দর্শনে ঋষি কণাদ, কণা বা Particle-এর ধারণা দিচ্ছেন কতকাল আগে! বস্তুবিশ্লেষণ বা জড়বিশ্লেষণ করেছেন এঁরা, প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করেছেন সাংখ্যকার কপিল। আর এসব যখন হচ্ছে, তখন কোথায় তোমার নিউটন আর কোথায় তোমার আইনষ্টাইন!

সুতরাং ভারতীয়দের কাছে বস্তুবাদ নতুন কথা কিছু নয়, আর ভাববাদী বলতে তোমরা যদি আধ্যাত্মিক মানুষদের বোঝাও — তাহলে আমি তোমাদের জিজ্ঞাসা করব যে, আধ্যাত্মিক মানুষেরা সকলকে কি শিক্ষা দেয়? সত্য, ত্যাগ, প্রেম, শান্তি — এ সবের অনুশীলনই শিক্ষা দেয়। মানুষকে জীবনমুখী করে তোলার শিক্ষা দেয়, বিবেকের জাগরণ করতে সাহায্য করে — এই তো! যে কোন দেশে বা যে কোন সমাজ-জীবনের দিকে তাকিয়ে দ্যাখো তো_ বিবেকী মানুষ, ত্যাগী মানুষ, প্রেমী মানুষ, সত্যপরায়ণ মানুষ ও সংযমী মানুষদেরই তো মর্যাদা — এঁদেরই তো কদর! মূর্খ ছাড়া কে কবে এঁদের অনাদর করেছে! সমাজের প্রকৃত কল্যাণ করার যথার্থ অধিকারীই-তো এঁরা। পৃথিবীর ইতিহাস খুলে দেখাও তো জগতের কল্যাণ করেছে কোন অবিবেকী, অসংযমী, মিথ্যাবাদী, ভোগসর্বস্ব মানুষ?

তাহলে তোমাদের বিরোধের কারণটা কি? একমাত্র আহাম্মকরা ছাড়া কবে কোথায় কে আধ্যাত্মিক মানুষদের দূরে ঠেলতে চায়? সমাজসচেতন যে কোন ব্যক্তিই জানে যে, সমাজের প্রকৃত মঙ্গলকারী, প্রকৃত সমাজসেবী এঁরাই। এঁরাই তাপিত, ক্লিষ্ট মানুষের প্রাণে সুশীতল শান্তিবারি দান করে প্রাণ জুড়ান! অস্থির চিত্তে স্থিরতা এনেএঁরাই শান্তি প্রদান করতে পারেন! দ্যাখো, তোমার মত মাথামোটা কেউ কেউ এসব নিয়ে বিরোধ করতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষ জানে _সে কোথায় শান্তি পায়, কোথায় একটুকু আনন্দের স্পর্শ পায়_ সে সেখানে ছুটবেই, তোমার মার্ক্সবাদ দিয়ে আটকাতে পারবে না! তাছাড়া_ কালের অমোঘ নিয়ম এমনই যে, দেখা যাবে তোমার মত সমালোচকদের দল হারিয়ে যাবে কিন্তু আধ্যাত্মিকতা এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা কালের বুকে স্বমহিমায় জ্বল জ্বল করবে। এই ভাবে উত্তরকালের মানুষেরা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদেরকাছ থেকেই আবার নতুন Synthesis পাবে এবং এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। এই রকম ভাবেই চলছে সমাজের বিবর্তন !

জিজ্ঞাসু:— সমাজজীবনে ত্যাগ-সংযম এর ভূমিকা কি?

গুরুমহারাজ :— সভ্যতার পরিভাষা ‘সংযম’। সংযম থেকেই যে কোন কার্যে success আসে। ত্যাগের দ্বারা সংযম আসে ‌। সর্বত্যাগীরাই পারে সমাজের সকলকে সমানভাবে দেখতে। সর্বত্যাগী ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ সমাজের কর্তা হলে তো স্বজন-পোষণ বা পরিজন-পোষণ হবেই !

তাছাড়া সংযমের দ্বারাই মানুষ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হোতে পারে। সুস্বাস্থ্য না থাকলে তুমি সমাজসেবা, দেশসেবা করবে কি করে! সংযমী মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বা immunity power বেশি থাকে। ফলে যে কোন মহামারীতেও সে অক্লেশে সেবা করে যায়, অন্যদের মত রোগগ্রস্ত হয় না। আর একটা কথা, মস্তিষ্কের যে কোষগুলি dormant থাকে — যার জন্য জাগতিক রহস্যসমূহ মানুষের কাছে ধরা পড়ে না — সেই কোষগুলি জাগ্রত করতে হলে ব্রহ্মচর্য ও সংযমের একান্ত প্রয়োজন। শরীরের অভ্যন্তরস্থ কুলকুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগিয়ে তাকে ঊর্ধ্বমুখী করতে এবং তার অগ্রগতি অব্যহত রাখতে যে strength দরকার_ সেটা শুধু পেশিশক্তির কর্ম নয়। স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ এই ত্রিবিধ শরীরের পুষ্টিসাধন দরকার হয়। এগুলি সাধন-রহস্য — সার্বজনীন নয়, তাই বিস্তারিত বলা যাবে না। তবে এটুকু জানবে যে, ত্যাগ, সংযম, মানবজীবনে ও সমাজজীবনে অগ্রগতির সোপান।

   কোন মানুষ কতটা উন্নত তার মানদণ্ড হবে সে কতটা ত্যাগী বা কতটা সংযমী। আবার কোন মানবসমাজ কতটা উন্নত, তার বিচার হবে সেই সমাজ কতটা ত্যাগী বা সংযমী সন্তানের জন্ম দিয়েছে তার সংখ্যা দিয়ে। আর অন্য কোন ভাবে যদি উন্নত মানুষ বা উন্নত সমাজের সংজ্ঞা দিতে যাও — দেখবে ভুল হয়ে যাচ্ছে। আর্থিক উন্নতি, প্রযুক্তির উন্নতি দিয়ে যদি সমাজের উন্নতি বিচার কর তাহলে দেখবে সেখানে শুধুই প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অস্ত্রের ঝনঝনানি ও সর্বদা মৃত্যুর পদধ্বনি। তাহলে যে সমাজ সুস্থ নয়, যে সমাজের সভ্যরা শান্তিতে নেই — সেই সমাজ কি করে উন্নত হয়?

 এমন একটা চিত্র কল্পনা করো, যেখানে সর্বত্যাগী ঋষির পদপ্রান্তে রাজা, অমাত্যবর্গ, প্রজাগণ একসঙ্গে বসে ত্যাগ, সংযম বা শান্তির পাঠ গ্রহণ করছেন। এই যে চিত্রটির কথা বললাম, এখানেই শান্তি বিরাজমান। আর ভারতবর্ষই পারে পৃথিবীকে এই শিক্ষা দিতে। তবে তার আগে ভারতবর্ষ নিজে সেই ঋষি পরম্পরার শিক্ষা গ্রহণ করুক, তারপর নাহয় অপরকে শেখাবে।