স্থান ~ পরমানন্দ মিশন (বনগ্রাম) ৷ সময় ~ ২৬/০৪/৯২ ৷ উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ স্বামী স্বরূপানন্দ, সব্যসাচী মান্না, পঙ্কজবাবু এবংঅন্যান্য ভক্তজন ৷

জিজ্ঞাসু :— ‘আগম’ এবং ‘নিগম’ কি? আগমরা নাকি মানুষের ক্ষতি করে — এরূপ করে কেন?

গুরুমহারাজ :– ‘আগম’ অর্থে নিচে থেকে উপরে ওঠা আর ‘নিগম’ অর্থে উপর থেকে নিচে আসা। এ দুটোই সাধন-পদ্ধতি। প্রথমটি তন্ত্র পরম্পরা দ্বিতীয়টি বৈদিক পরম্পরার সাধন। দুটো পদ্ধতিতেই আত্মসাক্ষাৎকার বা চরম লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় । তাই আপনি যে বলছেন আগম-রা মানুষের ক্ষতি করেএমন বলাটা ঠিক নয়! তবে এমন বহু তান্ত্রিক বা আগমেরা আছে,যারা শুধুমাত্র সিদ্ধাই বা কিছুটা শক্তিলাভের জন্য বিভিন্ন ক্রিয়া-অনুষ্ঠান বা অভিচারাদি করে থাকে। শ্মশানে-মশানে বা নিভৃতে এইসব সাধন করতে হয়, উপাচারসমূহও অদ্ভুত ধরনের, যা জোগাড় করা সাধারণের পক্ষে খুবই দুঃসাধ্য। তবু ওরা এসব জোগাড় করে গভীর নিশীথে অমাবস্যায় বা অন্য তিথিতে নির্জনে সাধন করে। প্রায়শই সাথে এদের সাধন-সঙ্গিনী অথবা তার গুরুও সঙ্গে থাকে। এইসব অভিচার ক্রিয়া অর্থাৎ মারণ, উচাটন, বশীকরণ ইত্যাদি করলে কিছুটা শক্তিলাভ হয় বা কতকগুলি সহজলভ্য সিদ্ধাই করায়ত্ত হতে পারে। আর ঐ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে,যেমন মানুষের কিছু কিছু কল্যাণ বা মঙ্গলও করা যায় তেমনি আবার কিছু ক্ষতিসাধনও করা যায়। এই যে ওরা ক্ষতি করতে পারে, এইজন্যই সাধারণ মানুষ তান্ত্রিকদের ভয় পায় ! এছাড়া তান্ত্রিক, কাপালিক ও অঘোরাচারীদের নিয়ে সমাজে কত গল্প, কত কাহিনী রয়েছে — তারা নরবলি দেয়, নরমাংস ভক্ষণ করে, এগুলোর কিছুটা সত্য_কিছুটা কাল্পনিক। এই সব কারণে মানুষ জটাজূটধারী, লালবস্ত্র পরিহিত — লাল-লাল বড় বড় চোখ, গলায় হাড়ের অথবা বড় বড় রুদ্রাক্ষের মালা-বিশিষ্ট তান্ত্রিককে দেখলে ভয় পায়বা এড়িয়ে চলে!

 এবার কথা হচ্ছে তারা মানুষের ক্ষতি করে কেন? এর উত্তর খুবই সহজ — এমনিতেই জগতে যেমন সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, দিন-রাত্রি রয়েছে আবার তেমনি ভাল ও মন্দ দু'ধরনের মানুষও রয়েছে। দুই নিয়া — দুনিয়া। তন্ত্রক্রিয়া না করেই তো দুষ্ট লোকে সমাজে কত অনিষ্ট কর্ম করছে। তার উপর তারা যদি আবার শক্তি পায়, তাহলে আরও বেশি বেশি অনিষ্ট করবে — এটাই তো স্বাভাবিক !কোন সাধারণ মানুষ, সাধনার ফলে কিছুটা শক্তি লাভ করলো কিন্তু অন্তঃকরণের বা স্বভাবের পরিবর্তন ঘটল না _ফলে যা হবার তাই হবে, তাদের দ্বারা অপকর্মই হবে ! তবে আমার কথা এই যে, সিদ্ধাই দিয়ে তুমি মানুষের ভালোই করো আর মন্দই করো সিদ্ধাই কিন্তু বেশিদিন থাকে না, কিছুদিন পরেই নষ্ট হয়ে যায় ! যেমন ধরো, কাউকে অনেক টাকা দেওয়া হোল আর সে টাকা পেয়েই সে বেহিসাবি খরচ করতে থাকল _ তাহলে কি ঐ টাকা দিয়ে তার জীবনকাল অবধি চলবে ? না,তা চলবে না— অচিরেই তা নিঃশেষ হয়ে যাবে — এক্ষেত্রেও তেমনি হয়।

  তবে মজাটা কি জানো, এই যে সিদ্ধাই-এর বুজরুকি — এটা আমার এই শরীরটার উপর খাটে না।ছোটবেলা থেকে আমার জীবনের বেশিরভাগ সময় পথে-পথেই কেটেছে ! ফলে চলার পথে প্রচুর তান্ত্রিক, ভৈরবী, কাপালিক, অঘোরপন্থী ও অভিচারীদের সাথে আমার দেখা হয়েছে। এদের অনেকে শক্তি প্রয়োগ করে আমাকে নিজের দলে টানার জন্য চেষ্টা করেছে, আবার অনেকে তার অন্তরের ঈর্ষাবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য আমার উপর শক্তিপ্রয়োগ করেছে! কিন্তু কি আশ্চর্য জানো, আমাকে কিছু করতে হয়নি আপনা-আপনিই তাদের প্রয়োগ করা শক্তি তাদের নিজের উপরেই আছড়ে পড়েছে। এই আশ্রমেই (বনগ্রামে) এরকম ঘটনা কয়েকবার ঘটেছে। কাটোয়ার কাছে আমোদপুরে এক মায়ের আশ্রমে এ রকম ঘটেছে। হিমালয়ের বিভিন্ন জায়গাতে এমনকি তারাপীঠেও এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। কাটোয়ার কাছে উদ্ধারণপুরে গঙ্গার ধারে কয়েকজন তান্ত্রিক ভৈরবীচক্র কোরতো, তারাও আমার উপর ভৈরব নামিয়ে attack করার চেষ্টা করেছিল, পরে তারা নিজেরাই ভয় পেয়ে পালায় ! তবে হ্যাঁ, সাধারণ মানুষের উপর কোন শক্তিশালী তান্ত্রিক যদি কোন ক্রিয়া করে তাহলে তার অনিষ্ট হতে পারে! দ্যাখো, সাধারণ মানুষের উপর কোন তান্ত্রিক যদিভরং-ভারং করে, তাহলে যদি ঐ ব্যক্তির অনিষ্ট না হলেও সে তো ভয় পাবেই !

তবে একটা ব্যাপার দেখে আমার খুবই মজা লাগে যে, ভারতীয় সমাজে হেতুবাদী বা যুক্তিবাদী (Rationalist) যারা আছে, অর্থাৎ যারা ধর্ম-অধ্যাত্ম মানে না_ দেখেছি তারাও কিন্তু তান্ত্রিকদের ভয় পায়! ওরা ভারতীয় অধ্যাত্মচেতনা নিয়ে Criticize করে, অনেককিছুকে Challenge করে কিন্তু কখনও কোন তান্ত্রিককে নয়! ওরাও জানে এরা কত ভয়ংকর — বেশি ধানাই-পানাই করলেই দেবে কোন অভিচার-ক্রিয়া করে!

জিজ্ঞাসু :– Rationalist বলতে কাদেরকে বোঝাতে চাইছেন?

গুরুমহারাজ :– এরা নিজেদেরকে ‘হেতুবাদী’ বা ‘যুক্তিবাদী’ হিসাবে পরিচয় দেয় । সুইডেনের এক বিজ্ঞানী ডঃ আব্রাহাম কাভুর, যিনি বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় থেকে কাজকর্ম করছেন — ওনার নেতৃত্বে বা আদর্শেই Rationalist Movement নামে এই উপ-মহাদেশে একটা আন্দোলন চালানোর চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন দেশে ওরা বিভিন্ন ভাষায় Magazine বের করে, তাছাড়া স্কুল-কলেজে বা বিভিন্ন স্থানে সভা-সমিতি করে এরা বক্তৃতার মাধ্যমে মানুষকে যুক্তিশীল হতে শেখায় — অন্ধবিশ্বাস থেকে বা কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে শেখায়। কিন্তু এসব কিছু করার পিছনে ওদের প্রধান কাজ হ’ল ভারতীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি বা দর্শনকে আঘাত করা!

তবে, ডঃ কাভুর কতবড় বিজ্ঞানী বা আদৌ কোন বিজ্ঞানী কিনা তা জানি না, কারণ জীববিজ্ঞানীরাবিভিন্ন এণ্ডোক্রিণ গ্রন্থির সাথে Penial-এর সম্পর্ক নিয়ে যখন গবেষণা করছিলেন, উনি তখন তার সমালোচনা করেছিলেন। এখন তো Penial কে gland হিসাবে স্বীকার করে বিভিন্ন University-তে Academic Course-এ পড়ানো হচ্ছে, চিত্র অঙ্কন করে দেখানো হচ্ছে — এখন ওনার followers-রা কি বলবে? বলার কিছু নেই বলেই হয়ত চুপ করে আছে।

যাইহোক, ওদের শাখা কলকাতাতেও রয়েছে — যেখান থেকে প্রচার করা হয় এবং প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, ভূত বা ভগবানকে দেখাতে পারলে কাভুরের রেখে যাওয়া কয়েক লক্ষ টাকা দিয়ে দেওয়া হবে। কিছুদিন আগে পুরুলিয়ার এক তান্ত্রিক ওদের অফিসে গিয়ে হাজির হয়েছিল ! ওরা কিন্তু সেই তান্ত্রিককে ভিতরে ঢুকতে দেয়নি বা ওনাকে কোন Challenge-ও করেনি ! তান্ত্রিক ভদ্রলোক রেগেমেগে খবরের কাগজে এই নিয়ে লেখালেখিও করেছিল ! তাহলে দেখছো তো_ শুধু সাধারণ মানুষই নয়, ধর্মাচরণ-বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনকারী ব্যক্তি বা সংস্থাও তান্ত্রিকদের ভয় পায়! আর এই ভয় শুধুমাত্র তাদের ঐ temporary (অস্থায়ী) শক্তির জন্যই।

জিজ্ঞাসু :– জগদম্বাকে ইচ্ছাময়ী বলা হয় — কিন্তু মানুষ প্রতিনিয়ত অনেককিছুই তো চায় বা পেতে ইচ্ছা করে! কিন্তু কই সবাই তো তা পায় না, বরং অনেক সময় সে যা চায় না, তাই পায়। এটা কেন হয়?

গুরুমহারাজ :– হ্যাঁ — মা জগদম্বা ইচ্ছাময়ীই তো। তিনি কখনও কারও ইচ্ছাকেই অপূর্ণ রাখেন না। ভাবনা-ইচ্ছা-ক্রিয়া। মনে ভাবনার উদয় হলে যদি তা ইচ্ছায় রূপ নেয়, ইচ্ছাময়ী সেটাকে আঁচলে বেঁধে রাখেন। যা “কারণ” — তা পরে ‘কার্যে’ রূপ নেবে ই নেবে।

এবার তোমার জিজ্ঞাসার উত্তরে আসছি — কেন সবার সব ইচ্ছা ফলপ্রসূ হয় না অথবা কেন অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাপারসমূহ ঘটে যায় ? এখানে কথা হচ্ছে যে, সাধারণ চোখে তুমি যা দেখছ_ তাই তো বলছো! তোমার দেখার বাইরে যে বিশাল জগৎ রয়েছে তার খবর কি তুমি রাখো? “পৌষের কম্বল চৈত্রে” — বলে একটা কথা রয়েছে। তুমি যখন চেয়েছিলে তখন হয়তো শীতকাল ছিল কিন্তু দীর্ঘলাইনের পিছনে দাঁড়িয়ে_ ক্রম অনুযায়ী যখন তুমি তা পেলে তখন হয়তো চৈত্রমাস পড়ে গেছে ! এইটা দেখে অনেক লোকে ভাবছে যে, অসময়ে প্রাপ্তি বা যখন যেটার প্রয়োজন সেটা না পেয়ে যখন যার দরকার নেই তাই পাওয়া গেল ! কিন্তু এটা ঠিক নয় — ওটাও তোমারই চাওয়া ! কিন্তু চাওয়ার আঁট ছিল না_ তাই দাতাও ধীর গতিতে ক্রম অনুযায়ী দিয়েছেন। এজন্মের চাওয়া_ পরজন্মে বা তারও পরের জন্মেও মিটতে পারে।

    তাছাড়া একটা কথা খেয়াল রাখতে হবে যে, মানুষের চাওয়াটাই কি ঠিক মতো হয় ? অনেক সময় সে নিজেই জানে না যে, সে কি চাইছে অথবা সেই চাওয়াটা কতখানি তার পক্ষে ভাল বা মন্দ! হয়তো সে জানেই না যে তার কি চাওয়া উচিত আর কি উচিত নয়। দ্যাখো, চাওয়াটাও তো একটা Art ! ঠিকমতো চাওয়া হয় না বলেই_ পাওয়াও ঠিকমতো হয়ে ওঠে না। এলোমেলো চাওয়া — তাই এলোমেলো পাওয়া! মানুষের বেশিরভাগ চাওয়াই তো কামনা বা বাসনা চরিতার্থ করার জন্য — ইন্দ্রিয়সুখের নিমিত্ত ! কিন্তু কজন মানুষ মনে রাখে যে, এই কামনাসঞ্জাত চাওয়া বা কর্মাদির ফল রয়েছে_ যেগুলো তাকেই ভোগ করতে হয়! কর্মে-অকর্ম — যা গীতায় শ্রীভগবান অর্জুনকে কর্মরহস্য বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন ,"নিষ্কাম কর্ম করো কারণ এতে কর্মফল ক্ষয় হয়" — কিন্তু সেই কর্ম আর হয় কোথায়? অহংশূন্য হয়ে কর্ম করাই কর্মে-অকর্ম, এই কর্মের  ফলভোগ তো করতেই হয় না বরং সঞ্চিত কর্মের এতেই ক্ষয় হয়।

  আমি দেখি_বেশিরভাগ মানুষ অতীতকে আঁকড়ে ধরেই পড়ে রয়েছে। তার পূর্ব পূর্ব জন্মের স্বভাব-সংস্কার নিয়েই সে চলতে চায়,ফলে গতি সৃতির বা খুবই ধীর! চরৈবেতির চিকন পথটি ধরে দৃঢ় পদক্ষেপে গন্তব্যস্থলে ক'জন পৌঁছতে চাইছে বলো? দেখি তো__শুধুই অতীতের চর্বিত-চর্বণ চলছে_ আর অসুখ সারাতে পুরানো Prescription! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষায় রয়েছে _ "বাদশাহী আমলের মুদ্রা নবাবী আমলে অচল"। তাই তোমরা প্রাচীন সংস্কার ছেড়ে স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাকে গ্রহণ করো। তোমরা যারা যুবক ছেলে-মেয়েরা আছো — তারা কীর্তন শুনে ফ্যাঁস্ ফ্যাঁস্ করে কাঁদবে নাকি! স্বামীজীর জীবনই গীতা, তাঁর জীবনকে অনুসরণ করে নিজেদের জীবন গঠন করো। বর্তমান যুগে শিক্ষিতের বড় কদর! কিন্তু আমি বলি কি — শিক্ষিত হ‌ওয়া বড় কথা নয়, শিক্ষাকে জীবনের অগ্রগতির কাজে লাগানোই বড় কথা ! স্বামীজীর শিক্ষাকে জীবনে গ্রহণ করতে যে পেরেছেস__সেই ধন্য, সেই ব্যতিক্রমী, সেই যুগোপযোগী! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতার শ্লোকগুলি মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে ই  বলেছেন — তাই গীতা নিশ্চয়ই মহান গ্রন্থ কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের জীবনটাই কি আরও মহান নয়!

   মহাভারত কত বড় গ্রন্থ, এর মধ্যে কতশত মহান মহান চরিত্র! স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তারা সকলেই বিরাট! আর তার মধ্যে কত ঘটনা, কত যুদ্ধ, কত জ্ঞান, কত শিক্ষা ! কিন্তু এই সমগ্র মহাভারতের নেপথ্য-নায়ক শ্রীকৃষ্ণ ! সমস্ত কিছু তাঁরই অঙ্গুলিহেলনে ঘটেছে_ এসব সত্ত্বেও সর্বদা তিনি নিষ্কাম-নির্লিপ্ত রয়েছেন এবং শুধুই ধর্মরক্ষার্থে কর্ম করে যাচ্ছেন — এটাই তো শিক্ষা! শুধু গীতা মুখস্থ করে অথবা তর্ক-বিতর্ক করে কোন লাভ হয় না। শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনে তা পালন করতে হয়। এ রকম করে দেখো, তোমার 'চাওয়া' অনুযায়ীই ঠিক ঠিক 'পাওয়া' হবে।

জিজ্ঞাসু :— বরদাচরণ মজুমদার সম্বন্ধে কিছু বলুন?

গুরুমহারাজ :– বরদাচরণ মুর্শিদাবাদের লালগোলা অঞ্চলে হাই-স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ঐ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের পর এতবড় ক্রিয়াযোগী আর ছিল না বাংলাদেশে। তাঁর নিজস্ব সাধন-ভজনের সময় ছাড়াও এমনি এমনি অন্যসময়েও তাঁর মধ্যে যোগক্রিয়ার সিদ্ধি প্রকাশ হয়ে যেতো! বিদ্যালয় চলাকালীন তাঁর সহকর্মীরা অনেকেই দেখেছেন যে, তিনি চেয়ারসমেত শূন্যে ভাসমান অবস্থায় বসে আছেন! ঘটনার সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ থাকলেও এটা মনে রাখা দরকার যে, তৎকালীন শিক্ষকেরা কিন্তু মিথ্যা-কথা কমই বলতেন। বরদাচরণের যে শুধু নিজেরই আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ হয়েছিল তাই নয়, তিনি প্রয়োজনে উপযুক্ত বুঝলে অপরের মধ্যেও আধ্যাত্মিক শক্তি সঞ্চার করতে পারতেন। তৎকালীন বহু বিপ্লবী যুবকের তিনি কুলকুণ্ডলিনীশক্তি জাগ্রত করে দিয়েছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কালীন অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত বিপ্লবীদের হাঁসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরা বা মৃত্যুর just পূর্বে জীবনের জয়গান গাওয়ার পিছনে যে রহস্য লুকিয়ে আছে, তার পিছনে অনেকটা ভূমিকা ছিল এই মহাসাধকের! ঘটনার নেপথ্যে, লোকচক্ষুর অন্তরালে বরদাচরণই তৎকালীন বিপ্লবীদের প্রেরণা জোগাতেন। নামকরা বিপ্লবী বলতে যাঁদের তোমরা চেনো, তাঁদের প্রায় সকলের সাথেই বরদাচরণের যোগাযোগ ছিল। উপযুক্ত আধার বুঝে অরবিন্দ অথবা সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্যেও তিনিই শক্তিসঞ্চার করেছিলেন।

নজরুল ইসলাম যখন পুত্রশোকে কাতর — তাঁর প্রিয়পুত্র বুলবুল মারা গেছে, সেইসময় তিনি বরদাচরণের কাছে গিয়েছিলেন পুত্রকে আর একবার দেখার মানসিকতা নিয়ে। নজরুলের বন্ধু(আকাশবাণীতে একসাথে কাজ করার সুবাদে) দিলীপকুমার রায়(দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র) বরদাচরণের যোগ-বিভূতির ক্ষমতা সম্বন্ধে সম্যক অবগত ছিলেন। সবচাইতে প্রিয় পুত্রের শোকে নজরুল সবরকমকাজকর্ম বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেই অবস্থা থেকে নজরুলকে বের করে আনার জন্য দ্বিজেন্দ্রলাল পুত্র দিলীপকুমারই বন্ধুকে লালগোলায় সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন।

বরদাচরণের একটি কালীঠাকুরের ঘর ছিল, ঐ ঘরে তিনি নজরুলকে বসিয়ে একটি বিশেষ মন্ত্র জপ করতে বলেন। সারা রাত কেটে যাবার পর ভোর রাত্রে বুলবুল বল হাতে খেলতে খেলতে নজরুলের সামনে প্রকট হয়েছিল। আবেগতাড়িত হয়ে নজরুল যেই সেই বালককে ধরতে গেছেন — অমনি পাশের ঘর থেকে বরদাচরণ বলে উঠলেন, ‘কাজী, ওটা কায়া নয় ছায়া! রূপ নয় প্রতিরূপ! সত্য নয় মায়া!’

এরপর থেকেই মায়া ছেড়ে মা’কে ধরলেন কাজী ! কাজী নজরুলেরও কুলকুণ্ডলিনীর ক্রিয়া শুরু হয়েছিল তারপর থেকেই। কবির শ্যামাসঙ্গীতগুলি শুনলেই বোঝা যায় যে, তিনি মাতৃসাধনায় কতটা আত্মনিমগ্ন হয়েছিলেন। কিন্তু দ্যাখো, কবির মধ্যে একটা বাউলভাব ছিলতিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে, শ্যাম আর শ্যামাতত্ত্ব একই! এই সহজ কথাটা কত মানুষ বুঝতেই চায় না বা বুঝতে পারেও না। যাইহোক, আমি যখন হিমালয়ে ঘুরছিলাম তখন একবার ঘুরতে ঘুরতে এমন স্থানে এলাম, যেখানকার কথা কোন মহাত্মা কদাচিৎ প্রকাশ করেছেন। স্বামী বিশুদ্ধানন্দ যে স্থানকে বলেছিলেন “জ্ঞানগঞ্জ”। এইস্থান থেকেই পৃথিবীর ভালো-মন্দের হিসাব রাখা হয়-উন্নতির চিন্তা করা হয়- সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়- প্রতিকারও করা হয়। ওখানে গিয়ে দেখলাম প্রাক্-স্বাধীনতা যুগের Eastern-Zone-এ ওঁদের মনোনীত বা পাঠানো যোগী হলেন বরদাচরণ মজুমদার! তাহলেই ভাবো, কি অসাধারণ দায়িত্ব নীরবে প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে পালন করে গেলেন এই মহাযোগী-মহামানব! এইজন্যেই তো আমি প্রায়ই বলি যে, একজন দধীচি কেন কত শত-সহস্র দধীচির আত্মত্যাগ রয়েছে জগতে ! আর কত মহাত্মা যে নীরবে কত কাজ করে চলেছেন, কে তাদের খবর রাখে! প্রচারসর্বস্ব ধর্ম-প্রচারক আর কতটা কাজ করবে — প্রকৃত কাজ অন্তঃসলিলা প্রবাহের ন্যায় নিরন্তর হয়ে চলেছে। সে কাজের আদি নেই — অন্ত নেই। সে কাজ শুরু হয়েছে কিন্তু কখনই স্থির হবার বা থামবার নয়! লীলা চিরন্তন কিন্তু একঘেয়ে নয়, তাইতো এর নাম লীলা!