স্থান ~ পরমানন্দ মিশন । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ মিশনস্থ ও বহিরাগত ভক্তবৃন্দ ।
জিজ্ঞাসু :– জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায় অন্তত মুসলিমরা বেশ পিছিয়ে রয়েছে—এর কারণ কি ধর্মীয় অনুশাসন ?
গুরুমহারাজ :— খানিকটা তাই, প্রকৃতপক্ষে আরবজাতির ত্রাতা হিসাবে হজরত মহম্মদ যখন আত্মপ্রকাশ করেন তখন ঐ অঞ্চলে লােকসংখ্যা খুবই কম ছিল। কয়েকটি জনগােষ্ঠী, এখান ওখান ঘুরে ঘুরে যাযাবর-রূপে জীবনযাপন করত। আর নদীতীরবর্তী অঞ্চলে কিছু বসতি হয়তাে ছিল। এমনকি মক্কা বা মদিনা শহরগুলিকে আজকের দৃষ্টিতে বিচার করাে না—তখন ঐ সমস্ত স্থানেও জনসংখ্যা খুবই কম ছিল। তাই উনি এইরকম বিধান দিয়েছিলেন।
তবে মজার ব্যাপারটা কি জানাে, এই যে ভ্যাসেক্টমি বা ‘টিউবেক্টমি’ অর্থাৎ পুরুষ বা স্ত্রীলােকের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা লােপ করার প্রচলন, এটা কিন্তু প্রাচীন ভারতবর্ষে ছিল না। এদেশে এগুলির প্রচলন করল মুঘলেরা। খাসি, খােজা, দামড়া –এই শব্দগুলি হয় আরবি নয় ফারসি, এদেশীয় নয়। তখনকার মুঘল হারেমগুলিতে কয়েক শত বেগম, আর তাদের সেবার জন্য আরও শতশত দাসী-বাঁদি থাকতাে। এদের রক্ষণাবেক্ষণ অর্থাৎ security-র জন্য প্রয়ােজন ছিল রক্ষীর। সাধারণত তাতার রমণীরা হারেমেরঅন্দরমহলের দ্বাররক্ষীর কাজ করতাে কিন্তু হারেমের অন্যান্য স্থানে তাে পুরুষরক্ষী রাখতেই হােত। এতে অধিকাংশ সময়ে বেগমদের সাথে বা বাঁদিদের সাথে তাদের অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন হয়ে যেতাে। এই সম্ভাবনা দূর করার জন্য পুরুষ-রক্ষীদের ‘খােজা’ অর্থাৎ পুরুষত্বহীন বা জননেন্দ্রিয় অক্ষম করে দেওয়া হােত।
এই প্রক্রিয়াটি ছিল খুবই নিষ্ঠুর। সাধারণত বেশী মাত্রায় আফিং খাইয়ে দিয়ে শরীরটাকে নেশাগ্রস্ত করা হােত। এখনকার মতাে তখন তাে আর anaesthesia ছিল না ফলে ঐরকম নেশাগ্রস্ত করে ঐ স্থানটিতে বরফ চাপিয়ে দিয়ে অবশ করা হােত। তারপর অস্ত্রোপচার করে সংশ্লিষ্ট প্রত্যঙ্গগুলি বাদ দেওয়া হােত। এরপর হেকিমী দাওয়াই দিয়ে বেঁধে দেওয়া হােত। কয়েকদিন ধরে ঐ একই রকমভাবে নেশাগ্রস্ত করে রাখা হােত, ফলে যন্ত্রণার বােধ কম হােত এবং ধীরে ধীরে ঘা শুকিয়ে গেলে ব্যক্তিটি সুস্থ হয়ে যেতাে। নারীদেরও Tubectomy-র প্রয়ােজন হ'ত, বিশেষত দাসী-বাঁদিদের, নাহলে তাদের সন্তানাদি হলে বেগমদের সেবা করবে কিভাবে !
সাধারণত আবিসিনীয়া বা আফ্রিকার বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রীতদাসদের ধরে নিয়ে এইরকম ‘খােজা’ করা হােত। এদেরকে বলত 'হাবসী খােজা বা কাফ্রী খােজা'। এই ভয়ঙ্কর unscientific পদ্ধতির প্রয়ােগে infection হয়ে অনেকে মারাও যেতাে। যারা বেঁচে থাকতাে তারা সারাজীবন হারেমের অন্দরমহলে রক্ষী হিসাবে রয়ে যেতাে। পশুদের ষাঁড় থেকে বলদ করার রীতি বা ছাগলের পাঁঠা থেকে খাসি করার রীতি বা পদ্ধতিও ওরাই চালু করেছিল। প্রাচীনভারতের হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়াে কিংবা কোন প্রাচীন গুহাচিত্রে বা গ্রন্থে বলদ, খাসি এসব পাবে না—ষাঁড়, পাঁঠা এগুলি পাওয়া যাবে। এর কারণ মুসলমানেরা এদেশে আসার পর থেকেই এই পদ্ধতিগুলি ভারতীয় সমাজে প্রচলন হয়েছিল।
জিজ্ঞাসু :— আফ্রিকা, আবিসিনিয়া থেকে এত দূরে ক্রীতদাসদের কারা এবং কিভাবে নিয়ে আসত?
গুরুমহারাজ :— পর্তুগীজ, স্পেনিয়ার্ড, ওলন্দাজ (হল্যাণ্ডের অধিবাসী) ইত্যাদি (কয়েকটি দেশের) কিছু ব্যবসায়ীর কাজই ছিল ‘দাস’ সংগ্রহ করা। সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশ হওয়ায় বেশ সুপ্রাচীনকাল থেকেই ওরা নৌবিদ্যায় বেশ পারদর্শী ছিল এবং বিভিন্ন প্রকার নৌকা প্রস্তুত করা বা নৌ-চালনায় ওরা সিদ্ধহস্ত ছিল। ফলে সুযোগ পেলেই সমুদ্রের ধারে ধারে বসবাসকারী বিভিন্ন জনজাতির স্ত্রী-পুরুষদের ধরে নিয়ে আসত ওরা। এই করতে করতে ওরা আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায়। তৎকালীন আফ্রিকা তো ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ’! অর্থাৎ কোন রকম সভ্যতার আলো তখনও পর্যন্ত পৌঁছায়নি। ছোট ছোট জনগোষ্ঠীতে বিভক্ত, তাও আবার নিজেদের মধ্যেই রক্তক্ষয়ী মারামারি, স্থান দখলের লড়াই চলত। এই সুযোগে ইউরোপীয় বিভিন্ন বদমাইশ লোকেরা জলপথে বড় বড় নৌকা নিয়ে ঐসব অঞ্চলে গিয়ে ফাঁদ পেতে অথবা জাল পেতে রাখত। তারপর অরণ্যচারী কোন একটা গোষ্ঠীকে বন্দুকের শব্দ করে তাড়া করত। বন্যরা শব্দ আর আগুনকে প্রচণ্ড ভয় পায়। এখনও দেখবে বাঘ, ভাল্লুক, হাতি তাড়াতে ক্যানেস্তারা পিটিয়ে বিকট আওয়াজ করা হয় আর মশাল জ্বেলে আগুন দেখিয়ে পশুগুলিকে তাড়ানো হয়। তখন ঐসব বন্য মানুষগুলি শব্দ আর আগুন দেখে ভয় পেয়ে ওদের বিপরীত দিকে পালাত আর যেখানেই ফাঁদ বা জাল পাতা থাকতো, একসাথে পুরো জনগোষ্ঠীর সমস্ত লোক ধরা পড়ে যেত। এইভাবে যতক্ষণ না জাহাজ বা বড় নৌকার খোল ভর্তি হত, ততক্ষণ ওদের শিকার-অভিযান চলত। দু’একজনকে ওরা যেমন গুলি করে মেরে ফেলে বুনোদের ভয় দেখাতো, তেমনি আক্রমণকারীদেরও অনেকে সিংহ বা বাঘের কামড়ে, সাপের কামড়ে বা বুনোদের বিষতীরে মারা যেত। কিন্তু বণিকজাতি তাতে কি আর দমে! চড়া দামে এদেরকে দাসবাজারে বিক্রি করে রাতারাতি ধনী হওয়ার সুযোগ আর কে ছাড়ে! এইবার ওদেরকে যারা কিনল সেই দাসেরা তাদের ‘ক্রীতদাস’ হয়ে গেল। একবার ক্রীতদাস হয়ে গেলে নারী-পুরুষ পুরুষানুক্রমে ক্রীতদাস হয়েই থাকত, আর ছাড়া পেত না।
এইভাবে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী শ'য়ে শ'য়ে দাসদের ফাঁদ পেতে ধরে পিছমোড়া করে হাতে পায়ে বেঁধেনৌকা বা জাহাজের খোলে উপুড় করে ফেলে রেখে দিত। যাত্রাপথে কিছু খাবার বা পানীয় হয়তো দিত, খাদ্যের অভাব থাকলে তাও দিত না। পথের মধ্যে কেউ মারা গেলে, সাগরেই ছুঁড়ে ফেলে দিতো, হাঙ্গর বা অন্য মাছে খেয়ে নিতো। তবে শুধু আফ্রিকা নয় তখনকার দিনে আন্দামান, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এসব স্থান থেকেও বহু দাসদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় দাস-পাচারকারীরা ইউরোপীয় বিভিন্ন উপজাতিদেরও ছাড়তো না — তাদেরকে ইউরোপের বাজারে বিক্রি না করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সরাসরি বিক্রি করত। কিন্তু মুঘল হারেমে আফ্রিকা থেকে আসা ক্রীতদাসদেরই সংখ্যাধিক্য ছিল। আবার দেখা যায় মুঘল হারেমে অনেক ইউরোপীয় বেগম বা বাঁদিরা ছিল — তারাও এভাবেই সংগৃহীত হয়েছিল। একটু আগে বলছিলাম না আফ্রিকা তখন ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। চারিদিকে জঙ্গল, এত বড় বড় গাছ যে, সূর্যের আলোই ঢুকত না —তাই ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের কাছে দেশটা ছিল অন্ধকারময়, আবার যেহেতু কোন রকম জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, শিক্ষা-সভ্যতার আলোও প্রবেশ করেনি, সেই অর্থেও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অন্ধকারময়। আফ্রিকান দেশগুলির মধ্যে মিশর বহু পূর্ব থেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞান বা বিদ্যাশিক্ষার চর্চায় উন্নত ছিল।
ইউরোপীয়দের উপনিবেশবাদ কলঙ্কজনক অধ্যায় হলেও 'দাস' ধরে কেনাবেচার ব্যাপারটা ওদের সবচাইতে লজ্জাজনক বা কলঙ্কজনক দিক। মানবাত্মার এতবড় অপমান পৃথিবীতে এর আগে আর কখনও হয়নি! 'হারেমের কান্না' নিয়ে অনেক লেখক অনেক কিছু লিখেছেন কিন্তু আফ্রিকার অরণ্যের কান্নার কাহিনী ঠিক ঠিক পরিবেশিত হলে এখনও মানুষ শিউরে উঠবে! বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ আফ্রিকা গিয়ে, মানুষের সাথে কথা বলে এবং ইতিহাস পর্যালোচনা করে যতটুকু বুঝেছিলেন তাতেই তিনি তার অন্যতম বিখ্যাত কবিতা 'আফ্রিকা' লিখেছিলেন_ যা পড়লে হয়তো মানুষের মনে আজো বেদনা জাগে।কিন্তু জানো_ ওখানকার মানুষের সাথে যা হয়েছে_ পশুর সাথেও মানুষ সেরূপ ব্যবহার করে না। প্রাণভয়ে পালানো ভীত মানুষগুলিকে গুলিতে আধমরা করে অথবা জাল বিছিয়ে ধরে বেঁধে জাহাজের খোলে গাদাগাদি করে ফেলে ইউরোপের 'দাস-বাজারে' ওখানকার মানুষদেরকে নিয়ে আসা হোত। সাধারণতঃ নর-নারী সকলকেই উলঙ্গ রেখে দেওয়া হোত কারণ একেতো তখন তেমন পোষাক ছিল না, তাছাড়া ক্রেতারা দাস বা দাসী কেনার সময় বিভিন্ন অঙ্গে হাত দিয়ে খোঁচা মেরে দেখে নিত। অসহায় দাস-দাসীরা নীরবে সমস্ত অত্যাচার মেনে নিতে বাধ্য হ'ত। এরপর যারা কিনে নিয়ে গেল তারা যে কি ব্যবহার করত তা অবর্ণনীয়! কুকুরকে যেভাবে উঠোনে খাবার দেওয়া হয়, সেভাবে একঝুড়ি ভাত বা যে কোন খাবার ফেলে দেওয়া হোত এবং ওরা সবাই ক্ষুধার তাড়নায় কুকুরের মত কাড়াকাড়ি করে খেতো। সুস্থ সবলেরা বেশি খেতে পেতো, দুর্বলেরা কাড়াকাড়ি করে খেতে পারতো না ফলে দুর্বলগুলো এমনিতেই অল্পদিনেই মারা যেতো। এ ছাড়াও তাদের পা দুটি লোহার শিকলে বাঁধা থাকত যাতে পালিয়ে যেতে না পারে। কাজের সময় হাতের শিকল খুলে দেওয়া হোত। অন্যসময় হাতও বাঁধা থাকত। ক্রীতদাসদের পাহারা দিতো সমগ্প্রহরী আর বড় বড় অ্যালসেশিয়ান বা ওই জাতীয় কুকুর। কিছু ত্রুটি হলেই চাবুকের ঘা। পিঠ ফেটে রক্ত বেরিয়ে যেতো। অনাহার, অর্ধাহার আর নিষ্ঠুর অত্যাচারে যখন কেউ মারা যেত সঙ্গে সঙ্গে সেইখানেই তাদের দেহটা চপার দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে কুকুরগুলোকে খাইয়ে দেওয়া হোত। আফ্রিকান জনগোষ্ঠীগুলির শরীর খুবই বলিষ্ঠ হওয়ায় এত কিছুর পরও অনেকে বেঁচে থাকতো ! ক্রীতদাসদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীদের মধ্যে আবার লড়াই লাগিয়ে দেওয়া হোত, এমনকি রাজন্যবর্গের বা বণিকশ্রেণীর মনোরঞ্জনের জন্য ক্ষুধার্ত বাঘ বা সিংহের খাঁচায় তাদেরকে ঢুকিয়ে দেওয়া হোত এবং অসহায় যোদ্ধাটিকে ওই সিংহ বা বাঘ কিভাবে পরাস্ত করে তার ঘাড় ভেঙে তাকে চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে তা দেখে তারা মজা উপভোগ কোরতো। রোমের কলোসিয়ামের ভগ্নাবশেষ আজও এই সবকিছুর সাক্ষী !
যাইহোক, ইউরোপীয়দের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে ফ্রান্স ও ইংল্যাণ্ডের আগমন অনেক পরে ঘটেছিল, কিন্তু তারা যখন ব্যবসা করতে শুরু করল এবং বিভিন্ন স্থানে উপনিবেশ স্থাপন করলো, তখন ওরাও এই দাসব্যবসায় নেমে পড়ল। আমেরিকার উত্থানের ইতিহাস বেশিদিন নয়, জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে এই দেশটি নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ওদের কিন্তু এই ধরনের ব্যবসার কোন record নেই। আরব জাতিরত্রাণকর্তা হজরত মহম্মদ ক্রীতদাস প্রথা অবলুপ্তির চেষ্টা করেছিলেন, তিনি নিজে অনেক ক্রীতদাসকে মুক্ত করে দিয়ে এই কাজের শুভ সূচনা করেন। পরবর্তীকালে আমেরিকার শাসকগণও ক্রীতদাস প্রথা অবলুপ্তির ব্যাপারে সচেষ্ট হয়েছিল।
তবে যেটা বলছিলাম_ আফ্রিকার কথা ! আফ্রিকার কথা ভাবলে আমার খুব কষ্ট হয়, কেমন যেন বিহ্বল হয়ে পড়ি, হয়ত আগামীতে আমায় শরীর গ্রহণ করতে হবে ওখানে।
