[জিজ্ঞাসু:— “পুরাণাদি শাস্ত্র পড়ে দেখেছি সেখানে শুধু বিভিন্ন গল্প-কাহিনী রয়েছে । আপনি যেমন সুন্দর করে আমাদেরকে শাস্ত্র-ব্যাখ্যা গুলি বোঝান, ওখানে সেইরকম তো কিছু পাওয়া যায় না?”
এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছিলেন গুরু মহারাজ। আগের দুটো এপিসোড ধরে আলোচনা হয়েছে, আজ পরবর্ত্তী অংশ]
…. পৌরাণিক শাস্ত্রে মানুষের যে সমস্ত ভেদ(অসুর, দৈত্য, দানব ইত্যাদি)করা হয়েছে_ সেগুলোর‌ বর্তমানেও অস্তিত্ব রয়েছে ! উদাহরণ হিসাবে বলা যায় জার্মানিরা নিজেদেরকে বলে “ড‌ইচ্” ! ‘জার্মানি’ এই নামটা ইংরেজদের দেওয়া বলে ওরা নিজেরা এই নাম ব্যবহার করেনা ! জার্মান দেশটিকে ওই দেশের অধিবাসীরা বলে ‘ড‌ইচল্যান্ড’ ! এরাই পুরাণোক্ত ‘দৈত্য’ সম্প্রদায়, আর ওদের দেশটি হল দৈত্যস্থান ! ভারতীয় শাস্ত্রাদিতে সেমিটিক জাতির মানুষ-জনেদেরকে ‘অসুর জাতি’ বলা হয়েছে ! ভারতীয় পুরানাদি শাশ্ত্রে অর্থাৎ প্রাচীন ইতিহাসে ঐ সব দেশের কয়েকজন রাজার উল্লেখ রয়েছে যেমন আসুরবানিপাল, ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যানের স্থপতি নেবুকান্নেজার, হামুরাবি প্রমুখ ! এদের সবাইকে ‘অসুর’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভারতীয় শাস্ত্রে নেবুকান্নেজারকে_ “নিবাতকবচ” বলে উল্লেখ করা হয়েছে ! হামুরাবি-কে বলা হয়েছে সম্বরাসুর ! এখানে দেখা যাচ্ছে, প্রাচীনকালের নামের সঙ্গে আধুনিক ইতিহাসবিদদের নামের সামান্য পার্থক্য হয়ে গেছে_ অবশ্য সেটা হওয়ারই কথা ! কারণ আধুনিক ঐতিহাসিকরা প্রায় সবাই বিদেশি ! ভারতবর্ষের দুর্ভাগ্য যে, প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস যা পাওয়া যায় সেগুলি প্রায় সব‌ই বিদেশিদের লেখা। আর তার ফলেই উচ্চারণের তারতম্যে নামের পার্থক্য হয়ে গেছে।
জার্মানিরা নিজেদেরকে ভাবে_ পৃথিবীতে তারাই একমাত্র ‘আর্য’ ! হিটলারের সময় থেকে এই প্রচারটা ওরা প্রতিষ্ঠা করেছিল ! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, হিমালয়কে কেন্দ্র করেই মানবসভ্যতার সর্বপ্রথম বিকাশ হয়েছিল ! যারা আদিম অবস্থা, ভ্রাম্যমান জীবন ছেড়ে একস্থানে settled হয়েছিল এবং নিজেদের ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য চাষবাস শুরু করেছিল, বাসস্থান বানিয়েছিল, সর্বোপরি যারা জগৎ-জীবন ও ঈশ্বর সম্বন্ধে অন্বেষণ শুরু করেছিলতাদেরকেই “আর্য” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই অর্থে পরবর্তীতে হিমালয় অঞ্চল থেকে, পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের যেখানে যেখানে এরা ছড়িয়ে পড়েছিল_ তারাও ‘আর্য’ । পুরাণাদি শাস্ত্রে উল্লেখিত ভারতীয় রাজা বা অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলি, পরস্পর পরস্পরকে “আর্য” বলেই সম্বোধন করেছে। তৎকালে সমস্ত মানবগোষ্ঠীর মধ্যে আর্যদের আচার-ব্যবহার, মানবিক গুণসমূহের বিকাশ এবং অন্যান্য গুণাবলীর প্রকাশ সর্বাধিক ছিল। কারণ সমগ্র মানবগোষ্ঠীর মধ্যে এরাই ছিল সর্বাপেক্ষা প্রাচীন এবং জন্ম-জন্মান্তরের অভিজ্ঞতায় পুষ্ট ! সেই হিসাবে বলা যায়, এরা অন্যান্য মানবগোষ্ঠীর থেকে senior ছিল ! পরবর্তীতে ঐ প্রাচীন আর্যগোষ্ঠীর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিল যারা_ তারা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষ হোলেও, তাদেরকেও ‘আর্য’ বলা হোতো ! বর্তমানে যারা নিগ্রোয়েড জনজাতি, এদেরকে পৌরাণিক শাস্ত্রে ‘রাক্ষস’ বলে বর্ণনা করা হয়েছিল ! পরবর্তীতে ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’ ইত্যাদি শব্দগুলি তামসিক, নিষ্ঠুর, অত্যাচারী এইসব বোঝাতে ব্যবহৃত হ‌ওয়ায় কথাগুলির অন্যরকম অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ঐ শব্দগুলি প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক গঠন,স্বভাব-সংস্কার ইত্যাদি অনুযায়ীই ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এই যে কথাগুলো বলছি_ এগুলোর সাথে এখন হয়তো তোমরা ঠিক ঠিক মিল পাবে না ! এর কারণ_ পুরান-মহাকাব্যগুলি যখন লেখা হয়েছিল, তারপর থেকে এখন পর্যন্ত ধরলে দেখা যাবেএরমধ্যে বেশ কয়েক হাজার বছর কেটে গেছে ! ফলে ওইসব race-গুলোর মধ্যে কতো মিশ্রণ ঘটে গেছে ! এখন তো আর original কোনো race পৃথিবীতে প্রায় পাওয়াই যায় না ! সবই proto হয়ে গেছে ! Proto-astraloyed, proto-nigroyed এইরকম আর কি ! তবুও ভারতীয় শাস্ত্রে বিভিন্ন প্রকারের বা বিভিন্ন প্রজাতির মানুষের যে বর্ণনা পাওয়া যায় বর্তমানে সেগুলো এখন পৃথিবীতে এই ভাবেই রয়ে গেছে। পৃথিবীতে আস্তিক্যবাদীরা, সে তারা যে কোনো ধর্মমতেরই হোক না কেন “স্বর্গ” নামক একটি সুরম্যস্থানের কল্পনা করে থাকে ! কিন্তু অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে ভারতীয়দের এই ধরণের চিন্তাভাবনায় কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে ! ভারতীয় পুরাণাদি শাস্ত্রে বলা হয়েছে_ স্বর্গ হোলো দেবতাদের বাসভূমি, যেখানে দেবতাদের অধিপতি হোলেন দেবরাজ ইন্দ্র ! নানা ভোগের উপকরণ আর চির-সৌন্দর্য সেখানে বিরাজমান ! এই যে শেষের কথাগুলো বলা হোলো_ সেগুলি প্রায় সর্ব ধর্মমতের স্বর্গ কল্পনাতেই রয়েছে ! এইটার কি কারণ বলো তো, এর কারণ হোলো_ অফুরন্ত ভোগের সামগ্রী, মন প্রাণ কারা সৌন্দর্য– এইগুলোই তো সাধারণ মানুষের মনের চিরকালীন আকাঙ্ক্ষা এবং চাহিদা ! তাই নয় কি !! সুতরাং সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করার জন্যই সমস্ত ধর্মমতে এই ধরনের একটা কাল্পনিক স্বর্গের বর্ণনা পাওয়া যায় ! যে স্থানটি মনোরম, বিলাসবহুল এবং সুন্দর ও জাঁকজমকপূর্ণ স্থান, আর যেখানে ভোগ-বিলাসের সামগ্রী অফুরান যোগান রয়েছে এবং যা বহুকাল ধরে ভোগ করা যায় !
কিন্তু অন্যান্য ধর্মমতের স্বর্গ-বর্ণনার সঙ্গে ভারতীয় শাস্ত্রের বর্ণনায় যে মূল পার্থক্য রয়েছে, তা হোলো__ ভারতীয় শাস্ত্র বলেছে ” স্বর্গের সুখভোগ অন্তে সেখান থেকেও পতন হয়” অথবা “নরকের দুঃসহ কষ্টভোগ থেকেও উদ্ধার পাওয়া যায়”। অন্যান্য ধর্মমতে কিন্তু ব্যাপারটা এমন clear করে বলা নাই । সেখানে বলা হয়েছে যে, তাদের নিজ নিজ ধর্মমতের profet-রা সন্তুষ্ট হোলে তাঁরা তাদেরকে নরক থেকে উদ্ধার করতে পারে কিন্তু স্বর্গ থেকে পতনের কোনো কথা সেখানে নেই ! একমাত্র, মানবজাতির আদিপিতা ‘আদম’ একবারই স্বর্গ থেকে মর্তে পতিত হয়েছিলেন। … (ক্রমশঃ)