সময় ~ ১৯৯০ ডিসেম্বর । স্থান ~ কনসাস্ স্পিরিচুয়াল সেন্টার । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ সব্যসাচী মান্না, শান্তি ঝা, দিল্লী ও অন্যান্য স্থানের ভক্তজন ।

জিজ্ঞাসু :– প্রাচীন ভাষাগুলির সৃষ্টি কোন সুদূর অতীতে হয়েছিল তা জানা মুশকিল ! কিন্তু স্বীকৃত ভাষাগুলির মধ্যে সংস্কৃতই কি সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ? আর বর্তমানে পৃথিবীর সমস্ত ভাষাই কি সংস্কৃত থেকে সৃষ্ট ?

গুরু মহারাজ :– শেষের কথাটা আবার কি বললে ? বর্তমানের সংস্কৃত ভাষাটাই তো খুব প্রাচীন নয়– পাণিনির সংস্কারের পর “সংস্কৃত” হলো। সেই হিসাবে আর্যভাষাকে প্রাচীন ভাষা বলতে পারো৷ সংস্কৃতও আর্যভাষার একটি রূপ। আর যেসব জাতি আর্য culture-কে গ্রহণ করেছিল তাদের ভাষার বিভিন্ন শব্দের সাথে সংস্কৃতের মিল খুঁজে পেতে পারো। প্রাচীন আর একটি ভাষা হিব্রু। যেখান থেকে আরবী-ফারসী ইত্যাদি ভাষার সৃষ্টি হয়েছে এবং আরও পরে এই ভাষাগুলির সাথে হিন্দি মিশে উর্দু ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। আগে উর্দু-কে সেনাছাউনির ভাষা বলা হোত_কারণ তখন সম্রাটের সেনাছাউনিতে বিভিন্ন ভাষাভাষীর লোকেরা একসাথে থাকতো এবং এইভাবেই সেনাছাউনিতে উর্দুর ন্যায় মিশ্রভাষার জন্ম হয়েছিল।

পৃথিবীর প্রাচীন মানব-গোষ্ঠীকে দুটি শাখায় ভাগ করা যায়, পশুপালক গোষ্ঠী আর কৃষিজীবী গোষ্ঠী। প্রাচীন গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই দুটি শাখাতে দুটি ভিন্ন ধারার ভাষার সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিবর্তনে–খাদ্যের প্রয়োজনে নিরাপত্তার প্রয়োজনে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এই দুই গোষ্ঠীর লোকেরাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল– ফলে তাদের originality-র অনেক কিছুই বদলে গেছে। কৃষিজীবী গোষ্ঠীরাই আর্য নামে পরিচিত হয়। "আর্য" কথাটির বিভিন্ন অর্থ রয়েছে –যার মধ্যে একটি হলো 'লাঙ্গল বা হল'। আদিম মানবসমাজের এই গোষ্ঠী যখন প্রথম কোন নিরাপদ স্থানে settled হবার প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবলো – তখন থেকেই পৃথিবীতে সভ্যতার সূচনা হোল। খাদ্য ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে শুরু হলো নিত্য নতুন জিনিসপাতির আবিষ্কার। আর এই আবিষ্কারের পিছনে প্রয়োজন ছিল সুস্থ চিন্তার ও জীবন যাপনের। যতদিন তারা যাযাবর জীবনযাপন করেছে, পশু পালন করেছে ততদিন তাদের জীবন ছিল সদা চঞ্চল, অস্থির। সুস্থ চিন্তা, গভীর চিন্তার সময় কোথায়? তাই আর্যসমাজজীবনেই হয়েছিল চিন্তাশীল মানুষের উদ্ভব। পরবর্তীকালের মানুষ এদেরকেই বলল মুনি বা ঋষি। মনন করেছিলেন তাই মুনি, জগৎ রহস্যের ও জীবনরহস্যের বােধ করেছিলেন তাই ঋষি। আর্য-জীবনধারা অবলম্বন করেই সমাজে মুনি বা ঋষিরা আত্মপ্রকাশ করেন। সভ্যতার বিবর্তনের সূচনা ও শুরু হয়েছিল এঁদের হাত ধরেই ! মােক্ষমুলার (ম্যাক্সমুলার) -কে দেখে স্বামী বিবেকানন্দ ইউরােপে বলেছিলেন—যেন প্রাচীন কোন আর্য ঋষিকে দেখলাম। চিন্তাবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী যে নামেই অভিহিত করোনা কেন মনন করে মনের সর্বোচ্চ স্তরকে যিনি অতিক্রম করেছেন তিনিই তাে মুনি। আর যিনি জীবন, জগৎ ও ঈশ্বরতত্ত্বের বা আত্মতত্ত্বের বােধ করেছেন তিনিই ঋষি। এগুলি চেতনার উত্তরণের ক্রম। মনকে একাগ্র করতে হলে প্রয়ােজন প্রাণের উপাসনা, প্রাণ স্থির না হলে মন স্থির বা একাগ্র হয় না। এইভাবে আর্য মনীষিগণ আধ্যাত্মিক জগতের ক্রমবিকাশের সােপান তৈরি করতে করতে ঋষিত্বে উপনীত হলেন। সত্যকে বােধ করে ঋক্ বলতে শুরু করলেন। সৃষ্টি হোল বেদ বা উপনিষদের। সুতরাং প্রাচীন সমৃদ্ধ ভাষা হল আর্যভাষা। লণ্ডন মিউজিয়ামে ঋকবেদের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি রয়েছে—যা প্রায় ২০ হাজার বছরের প্রাচীন। ওখানকার লিপি এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রাপ্ত লিপিগুলির মধ্যে প্রাচীনতম। আবার একটা কথা জানবে__ লেখ্যভাষা এবং কথ্যভাষা আলাদা হয় ! তবে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সবকিছুরই যেমন পরিবর্তন হয় তেমনি ভাষার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। স্থান ও কাল ভেদে __পাত্রের অর্থাৎ মানুষের শারীরিক গঠনের পরিবর্তন হয়েছে, সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবর্তন হয়েছে, জীবনযাত্রার প্রধান দুটি বিষয় আহার এবং বিহারের (Food habit & Life-style) পরিবর্তন হয়েছে। এর ফলে পরিবর্তন ঘটেছে ভাবপ্রকাশের বিষয়বস্তুর, ভাবপ্রকাশের ভঙ্গিমার, পরিবর্তন হয়েছে উচ্চারণ ভঙ্গিমারও। পৃথিবীর ভাষার দিকে না তাকিয়ে শুধু তােমার নিজের মাতৃভাষা বাংলার দিকেই নজর দাও না কেন, দেখবে এক এক জেলায় এক এক রকমের উচ্চারণ ভঙ্গি। একই শব্দকে বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উচ্চারণ করা হচ্ছে। এই বাংলা ভাষাই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে আবার আরও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তুমি যদি চট্টগ্রামের কথ্য বাংলা শােন তাহলে তােমার মনে হবে ওটা বাংলা ভাষাই নয়। সাঁওতাল পরগণার border-এ যে সব বাঙালীরা বাস করে তাদের ভাষার সাথে সাঁওতালী ভাষার মিল পাবে। আবার উড়িষ্যার border-এ মেদিনীপুরের মানুষের ভাষার সঙ্গে উড়িয়া ভাষার মিল পাবে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভাষার বদল হয়ে যাচ্ছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা এই নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছে বা আজও করে চলেছে। তারা যে সমস্ত তথ্য দিয়েছে তাতে জানা যাচ্ছে যে, জিহ্বার বৈশিষ্ট্য, দাঁতের গঠন, মুখমণ্ডলের ভিন্নতা ইত্যাদির উপর মানুষের উচ্চারণের ভিন্নতা জন্মায়। এছাড়াও পৃথিবীতে বারবার একজাতির সাথে অন্য ভাষাভাষী জাতির সংমিশ্রণ ঘটেছে, এর ফলে আবার ভাষারও মিশ্রণ বা পরিবর্তন হয়েছে, হয়তাে নতুন কোন ভাষার উদ্ভব হয়েছে। ভারতবর্ষে মুসলমানরা আসার পর উর্দু ভাষাটা এইভাবেই আরবী-ফারসী-হিন্দী মিলেমিশে তৈরি হয়ে গেল। পৃথিবীতে কিছু কিছু ভাষা গতিশীল– ক্রমবিস্তারশীল। আবার কিছু কিছু ভাষা নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেছে, তারা মৃতপ্রায় (Dead Language)। ভাষার সমৃদ্ধি বা গতিশীলতা কখন আসে বলো তাে—গ্রহণশীলতায় ! এটাই Adoptability ! যে জাতি যে বিষয়ে উন্নত, সেই জাতির ভাষায় সেই বিষয়গুলির বলিষ্ঠ প্রতিশব্দ রয়েছে—যেটি অন্যান্য ভাষায় হয়তাে নেই। এবার কোন জাতি যদি বিভিন্ন জাতির এই ধরণের বলিষ্ঠ শব্দগুলি তার নিজের ভাষাতে অনুপ্রবেশ ঘটায় বা ব্যবহার করে, তাহলে অচিরেই সেই জাতির ভাষা সমৃদ্ধ হবে। যেমনটা আজ ইংরাজীর ক্ষেত্রে ঘটেছে। প্রাচীন ল্যাটিন এবং প্রাচীন সংস্কৃতের মধ্যে প্রচুর মিল পাবে। কিন্তু এরা এখন মৃতপ্রায় ভাষা। অথচ অপেক্ষাকৃত নবীন ভাষা ইংরাজী পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার প্রতিশব্দ গ্রহণ করে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়েছে। ইংরাজীতে ভারতীয় উন্নত সমাজ ব্যবস্থার অনেক প্রতিশব্দ ঢুকে পড়েছে। যেমন মাতরঃ থেকে মাদার, পিতরঃ থেকে পিটার বা ফাদার, ভ্রাতরঃ থেকে ব্রাদার, সসৃ থেকে সিষ্টার, সমাজ থেকে সােসাইটি ইত্যাদি। এইরূপে বিভিন্ন ভাষার প্রতিশব্দ নিয়ে ইংরেজী ভাষাটি বর্তমানে সমৃদ্ধিলাভ করেছে। যাইহােক, অনেক ভাষা চর্চা হল—ভাসা ভাসা জ্ঞানের আভাস কি হােল !

জিজ্ঞাসু :– ঠিকই বলেছেন–জেলার পরিবর্তন হোলেই কথ্য বাংলা ভাষা বদলে যায়। এছাড়াও গ্রামের কথ্য ভাষা_ আর শহরের কথ্য ভাষার মধ্যেও খুবই অমিল দেখা যায় ! অথচ লেখ্য বাংলা কিন্তু গ্রাম বা শহরে একই। শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে পড়েছি_ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণও কামারপুকুর অঞ্চলের কথ্য ভাষায় কথা বলতেন !

গুরুমহারাজ :– হ্যাঁ, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ হুগলী জেলার ঐ অঞ্চলের তৎকালীন চলিত গ্রাম্য ভাষাতেই কথা বলতেন। তবে দ্যাখো_ এই ব্যাপারটা কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ লীলার এক উল্লেখযােগ্য ঘটনা ! খােদ কলকাতার উপকণ্ঠে বসে ঠাকুর তৎকালীন ভারতবর্ষের তাবড় তাবড় শিক্ষিত লােকেদের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব করলেন কথার যাদুতে ! কিন্তু কলকাতার ভাষাকে তিনি গ্রহণ করলেন না। তৎকালীন সমাজের শিক্ষিতদের ভাষা তাঁর মনে কোন প্রভাবই ফেলতে পারেনি। আজীবন তিনি তাঁর নিজের জন্মভূমি কামারপুকুর এলাকার গ্রাম্য ভাষা ব্যবহার করে গেছেন। অসংখ্য ব্যাকরণের ভুল সমন্বিত বাক্য ব্যবহার করেছেন, তাও তৎকালীন শ্রেষ্ঠ শিক্ষিতদের সাথে কথা বলতে গিয়ে ! তৎকালীন কোলকাতার ব্রাহ্মসমাজ বা বাবু সমাজের ভদ্রলােকদের সাথে কথা বলার সময়তেও তাঁর পােশাকটা খেয়াল করোখাটো ধুতি, উধর্বাঙ্গে ফতুয়া, বড়জোর শীতকালে কোট। আর এমনিতে অর্থাৎ দক্ষিনেশ্বরে থাকলে উৰ্ধ্বাঙ্গ খােলা, পরনের কাপড়ের একটা “টেপ” গায়ে জড়িয়ে নিতেন বা মেয়েদের মত কাঁধে ফেলে রাখতেন। সময় সময় পরনের কাপড়ও খুলে পড়ে যেতো ! ব্রাহ্মসমাজে গিয়ে হয়তো বলছেন “আমার তাে পরনের কাপড় ঠিক থাকে না,তাে হ্যাঁগা! এবার ঠিক করে কাপড় পরা হয়েছে কিনা বলো” ! বলতে বলতেই দিগম্বর ! কিন্তু তিনি এসব যাই করুন না কেন ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ যেই শুরু করলেন অমনি ‘পুরুষসিংহ’ ! আর তাঁর সামনে কেউ দাঁড়াতে পারতো না , সমস্ত জড়তা কাটিয়ে তাঁর মুখ দিয়ে তখন কথার ফোয়ারা বেরোতো। তিনি নিজেই বলতেন–‘মা যেন রাশ ঠেলে দিচ্ছে।’ অর্থাৎ এত কথার জোগান আসতো যে, তিনি শুধু হুড়হুড় করে বলে-ই যেতেন ! উপযুক্ত পাত্র না থাকলে চুপ করে যেতেন বা গান গাইতেন। তা শুনেই উপস্থিত মানুষের প্রাণ জুড়াতো—মনের ব্যথা কমতো।

জানোসারদামাও জয়রামবাটীর কথ্য বাংলা ব্যবহার করতেন, ‘করেচু’, ‘খেয়েচু’ এই ধরণের শব্দ ব্যবহার করতেন। দ্যাখাে, তৎকালীন কোলকাতার বাবুসমাজের সবাই যে ঠাকুর বা শ্রীশ্রীমাকে গ্রহণ করেছিল তাতাে নয়–অনেকে সমালােচনাও করতো। সব রকম মানুষ‌ই তাে থাকবে সমাজে–বলো ? এই তাে ‘সব্য’ বসে রয়েছে–সেবার পুরুলিয়ায় গেছি, ও সাথে ছিল।ওখানে এক ভক্তের বাড়িতে Seating-এর ব্যবস্থা হয়েছিল। ওই এলাকায় বহুপূর্বে যারা রাজা ছিলসেইসব রাজবংশের লােকেরা এখনও দু’একজন রয়েছে এবং দেখছিলাম স্থানীয় লোকজন তাদের খুব মান্য‌ও করে। ফলে ভক্তটি, সেই অঞ্চলের রাজকুমারকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছিল। আমি দেখলাম_Seating চলাকালীন সময়ে সেই ভদ্রলােক সাথে ১০/১১ জন সাগরেদ নিয়ে এসে ওর জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা আসনে এসে বসল। ৪০/৪৫ মিনিট ধরে ভদ্রলােক আমার বিভিন্ন আলােচনা চুপচাপ বসে বসে শুনছিল—কোন কথা বলেনি। রাজপরিবারের সদস্য হ‌ওয়ার সুবাদে ছেলেটি খুব‌ই সুদর্শন ছিল ‌। সব্য হাঁ করে ঐ রাজকুমারের রূপ-সৌন্দর্য দেখছিল আর ইঙ্গিতে আমারও দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিল। আমি তাে আগেই দেখেছি যে ছেলেটি সত্যই রূপবান।

 এবার হােল কি–স্থানীয় লােকেরা চাইছিল ওদের রাজাবাবু কিছু জিজ্ঞাসা করুক– তাই তারা ওর কাছে কিছু বলার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করতে লাগলো। সবার অনুরোধে রাজাবাবু এবার বলে উঠলো – ' হঁ--সাধুবাবা! আমি তোর কোথা(কথা) উনেকখন শুনছিলম, ভালুই তো বলছিলিস বটে৷'

ওর কথা শুনে সব্য-র সৌন্দর্যপ্রীতি ছুটে গেল–ও আর ঘরেই থাকলো না– Seating ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ভদ্রলোকও কিছুক্ষণ পর চলে গেল। পরে সব্য আমাকে বলেছিল, “মহারাজ, এইরকম একজন সুন্দর, সুদর্শন, সুপুরুষ লোকের এইরকম ভাষা—এটা ভাবাই যায় না।”

তবে__ সব্য যদি সারদা মায়ের ভাষা শুনতো তাহলে কিন্তু React করতো না। কারণ সারদামা মহীয়সী – মাতৃশক্তির পূর্ণ প্রকাশ! ওখানে কোন reaction চলে না!