(পূর্বের প্রকাশিতর পর)
গুরুজী তাঁর ছোট বেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো বলছেন—
এরপর আমি ঘুরতে ঘুরতে বিহারের জামালপুর স্টেশনে এলাম। অনেকদিন কিছু খাওয়া হয়নি, ফলে খুবই ক্ষুধার(খিদে পেয়েছিল) উদ্রেক হয়েছিল ! সকালের দিকে জামালপুর স্টেশনে এক ভদ্রলোক একটি পাঁউরুটি খাচ্ছে দেখে - আমার খিদে যেন দ্বিগুন বেড়ে গেল । খিদে যেন আর সহ্যই করতে পারছিলাম না, তাই ঐ লোকটির কাছে একটি পাউরুটি কেনার জন্য ১২ পয়সা চেয়েছিলাম ।
কিন্তু তার জন্য যে ঐ লোকটি একটা বালকের সাথে এমন ব্যবহার করবে, সেটা ধারণাই করা যায় না ! পয়সা চাইতেই লোকটা সজোরে আমার পেটে এমন লাথি মারলো যে , আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম ! যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন দেখি এক ভাঙ্গী পরিবারের খাটিয়ায় শুয়ে আছি।”
গুরুজী এই কথাগুলি আমাদের এমন ভাবে বলছিলেন – গুরুজীর কথা বলার অভিব্যক্তি ও মুখের ভাব দেখে আমার এবং উপস্থিত শ্রোতা ও ভক্তদের সকলের হৃদয়ে সেদিন খুবই লেগেছিল, সবার খুবই কষ্ট হয়েছিল ।
গুরুজীও এই ঘটনাটা ভুলতে পারেননি । তাই উনি আবার বলতে শুরু করলেন__”আমার জ্ঞান ফিরতে ওরা(ভাঙ্গী পরিবার) আমাকে খুব আদর যত্ন করে পেট ভর্তি করে খাওয়ালো। খাবার খেয়ে আমার শরীরে অনেকটা বল এলো। ভাঙ্গী-বাবা আমাকে বলল –‘কোনোদিন কাউকে কিছু চাইবে না। যদি কিছু চাইতে হয়- রামজী র কাছে চাইবে ‘।
—এটা আমার জীবনের একটা বিরাট শিক্ষা!
আমি জীবনে কারো কাছে আর কখনো হাত পাতিনি এবং কিছু চাইনি।
আর তখনই সংকল্প করেছিলাম – যদি জীবনে কোনদিন সুযোগ পাই তো অনাথ এবং ভবঘুরেদের জন্য কিছু একটা করব “!!
স্বামী পরমানন্দ হোলেন স্বয়ং সচ্চিদানন্দ ভগবান । অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবই তিনি জানেন । অনাথ ছেলেদের জন্য তিনি (গুরুজী) যে সংকল্প করেছিলেন — তার বাস্তব রূপ বর্তমানে আমরা বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে এবং আরো অন্যান্য শাখায় দেখতে পাচ্ছি ।
গুরুজী বললেন – জানিস ঘুরতে ঘুরতে বুদ্ধগয়া তে এলাম । প্রচণ্ড রোদে ঘুরে ঘুরে খুবই ক্লান্ত হয়ে গেছি । তার উপরে খুবই খিদে পেয়েছে ।একটি আম গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিবার জন্য শুয়ে পড়লাম ।একটু তন্দ্রা আসতেই আম গাছের ভেতর থেকে কে যেন বলল – ধ্যান কর , ধ্যান কর , ধ্যান কর • • • –এটি শুনতে শুনতে ধ্যানস্থ হয়ে গেলাম । ধ্যানে বোধ হলো এখানে আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধদেব ধ্যান করেছিল । এই জায়গায় এখনো সেই ফ্রিকোয়েন্সি রয়েছে । তাহলে চিন্তা কর – কবে বুদ্ধদেব এই জায়গায় ধ্যান করেছিল – সেই চিন্তার তরঙ্গ গুলো এখনো রয়েছে। এইগুলি ধরার জন্য উপযুক্ত পাত্রের অভাব ।
মা জগদম্বা ইচ্ছায় কখনো খাবার জোটে , কখনো বেশ কয়েকদিন অনাহারে থাকতে হয় । এখানে এক মাতাজী কিছু খাবার ও জল নিয়ে এসে খেতে দিল । খাবার পর — খাবার থালা নিয়ে কিছু টা আগে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। মনসংযোগ করে দেখলাম মা জগদম্বা স্বয়ং ।
তারপর গুরুজী একটি সুন্দর হাসি আমাদের উপহার দিল । আমরা এটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমাদের মন দিব্য আনন্দে ভরে গেল।
এর পর সেই সময়ের জন্য সিটিং সেরে গুরুজী উঠে পড়লেন ।
দুপুরে বটগাছের তলায় গুরুজী ঘাসের উপরে বসে ছিলেন — আমরাও বেশ কয়েকজন সেখানে গিয়ে গুরুজীর এক দম কাছে , গোল করে ঘাসের উপর বসে পড়লাম । গুরুজী আঙ্গুল দেখিয়ে বলছিলেন__"দ্যাখো_ এই পুকুরটার ডানদিকে বড় রান্নাঘর হবে"। বটগাছের পাশে আঙুল দেখিয়ে বললেন_ "এদিকে সব বড় বড় বিল্ডিং হবে"। তারপর অনেকটা দূর পর্যন্ত হাত দেখিয়ে বললেন —"এই সব জায়গা একদিন আশ্রমের হবে । আরো সব অনেক বিল্ডিং হবে"।
গুরুজী বলেছেন, আর আমরা উপস্থিত ভক্তরা অবাক হয়ে যাচ্ছি ! ছোট্ট ওইটুকু জায়গার উপরে দুটো মাটির কুঠিবাড়ি, আর পিছনে এক তলার ছোট্ট একটি পাকা বাড়ি । কি করে এত সব হবে !
যিনি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা , সর্বজ্ঞানের জ্ঞানী ,তিনি তো সবই জানেন। আমরা অজ্ঞানী তাই অবাক হচ্ছিলাম !
ক্রমশ - - -
