(বাসুদেব ঘোষ।) “চৈতন্য সর্বমন্ত্রস্য চৈতন্য সর্বমঙ্গলম্। চৈতন্য সর্বসুখদং চৈতন্য সর্বসিদ্ধয়ঃ।।”(বাসুদেব সার্বভৌম)__চৈতন্য হোলেন সর্ব মন্ত্রের সার, সর্বমঙ্গলেরও সার! তিনি সর্বসুখের আধার, আবার সর্বসিদ্ধিরও কারক । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পার্ষদদের জীবনকাহিনী বর্ণনায় আজকের আলোচনা হবে বাসুদেব ঘোষকে নিয়ে ! আগের সংখ্যায় যে গোবিন্দ ঘোষের আলোচনা করা হয়েছিল, বাসুদেব ঘোষ তারই অনুজ । গোবিন্দ,বাসুর পিতা বল্লভ ঘোষের তিনটি স্ত্রী ছিল। প্রথমা স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান গোবিন্দ, মাধব ও বাসু। দ্বিতীয়া স্ত্রীর গর্ভের সন্তান দনুজারি, কংসারী, মীন-কেতন । তৃতীয়া স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান_ জগন্নাথ, দামোদর ও মুকুন্দ ঘোষ । এদের মধ্যে বল্লভের প্রথমা স্ত্রীর তিন সন্তানই চৈতন্য-পার্ষদ ছিলেন । তবে এই বংশের আর একজন সদস্য অর্থাৎ বাসুর ভাতুষ্পুত্র দনুজারির পুত্র শংকর ঘোষও কাকা-জ্যাঠাদের সাথে নীলাচলে মহাপ্রভুর সঙ্গী হয়েছিলেন । গোবিন্দ কবিরাজের পদে পাওয়া যায়_” গায় রায় রামানন্দ গোবিন্দ মাধবানন্দ _বাসুদেব গোবিন্দ শংকর।” শংকর ঘোষ সুকন্ঠ কীর্তনীয়া ছিলেন এবং মহাপ্রভু নিজেই মাঝে মাঝে সংকীর্তনের আসরে তাকে নিয়ে যেতেন। ধন্য গোপাল ঘোষ, বল্লভ ঘোষের বংশ_যেখানে চারজন চৈতন্য পার্ষদ জন্মেছিলেন! তবে আমাদের আজকের আলোচ্য চরিত্র বাসুদেব ঘোষ! তাই আমরা তাঁর কথায় ফিরে যাচ্ছি । বেশিরভাগ মানুষ বাসুদেব ঘোষকে জানে _গৌরচন্দ্রিকার পদকর্তা হিসাবে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন গাওয়ার আগে বঙ্গদেশে গৌর-বিষয়ক পদ গাওয়ার চল রয়েছে _একেই গৌরচন্দ্রিকা বলে। বেশিরভাগ কীর্তনের পালায় গৌরচন্দ্রিকা রচয়িতা হিসাবে পাওয়া যায় বাসুদেব ঘোষের নাম। কিন্তু বাসুদেব ঘোষ যে চৈতন্য পদাবলীও রচনা করেছিলেন_ এটা অনেকেই জানেন না। চৈতন্যের বাল্যলীলা থেকে শুরু করে পৌগন্ডলীলা, সন্ন্যাসলীলা এবং নীলাচলে থাকাকালীন লীলাকাহিনীর প্রচুর পদ লিখেছেন বাসুদেব ঘোষ। তাছাড়া তিনি সুকন্ঠের অধিকারী ছিলেন । মহাপ্রভুকে গান শুনিয়ে তিনি খুবই আনন্দ দিতেন। চৈতন্য চরিতামৃতে রয়েছে _”বাসুদেব গীতে করে প্রভুর বর্ণনে/ কাষ্ঠ পাষাণ দ্রবে তাহার শ্রবণে।”/ অথবা আরও বলা আছে__” গোবিন্দ মাধব বাসুদেব তিন ভাই।/ যা সবার কীর্তনে নাচে চৈতন্য নিতাই ।।” গৌড়ীয় বৈষ্ণব পদকর্তাগণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকেও একই আসনে বসিয়েছেন। তাইতো মহাপ্রভুকে বলা হয়েছে “অন্তঃকৃষ্ণ বহিঃরাধা”! সেইজন্য শ্রীকৃষ্ণের অষ্টসখা, রাধার অষ্টসখীর সবাই গৌরলীলায় শরীর ধারণ করেছিলেন বলেই মহাজনদের মত । “বৈষ্ণবাচার্যদর্পণ”- গ্রন্থে রয়েছে,_” গুনতুঙ্গা সখীএবে বাসুদেব খ্যাতি/ গৌরাঙ্গের শাখা তমলুকে বসতি।”/ মেদিনীপুরের তমলুকেও বাসুদেবের ‘পাট’ বা ‘শ্রীপাট’_ রয়েছে । জীবনের শেষ কয়েকটা বৎসর তার ওখানেই কেটেছিল। তমলুকে “পাট”_বা বাসস্থান করার পিছনে গবেষকদের ধারণা রয়েছে যে, যেহেতু নীলাচলের দূরত্ব এখান থেকে কম এবং গৌড়ের মুসলমান শাসকদের অত্যাচারও ওখানে কম ছিল __তাই উনি নিশ্চিন্তে নিরাপদে ওখানেই জীবনের শেষ কটা দিন গৌরগুনগান গেয়ে আর গৌরভাবে তন্ময় থেকে_ কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন । বাসুর কাতর আর্তি তার পদে ফুটে উঠেছে __”তোমার চরণ লাগি সব তেয়াগিনু / শীতল চরণ দেখি শরণ লইনু/ একুশে ওকুলে মুই দিনু তিলাঞ্জলী/ রাখিও চরণে মোরে আপনার বলি ।।/ এবার আবার আসি মূল আলোচনায়। বাসুদেব ঘোষের পরিচয় তার পদাবলীর মধ্যেই রয়েছে_তাই বাসুদেবের কথা বলতে গিয়ে_ছত্রে ছত্রে তার পদাবলী-ই ব্যবহার করা হচ্ছে। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর ভক্তদের সঙ্গেই প্রথম এই তিনভাই বাংলা থেকে গিয়েছিল নীলাচলে । সেখানে তারা নেচে গেয়ে প্রভুর সন্তুষ্টি বিধান করেছিল । প্রভু ও তাঁর ভক্তদের সঙ্গে মিশে তারা খুব আনন্দ পেয়েছিলেন,ফলে পরের বছর এই তিনভাই আবার গিয়েছিলো পুরীধামে। প্রভু গোবিন্দকে রেখে মাধব আর বাসুদেবকে বিদায় দিলেন _বললেন, “তোমরা নিতাই-এর সঙ্গে গৌড়ে গিয়ে নামপ্রচার করো!” বাসুদেব তো শুধু গায়ক নয়, সে প্রভুর যে লীলা স্বচক্ষে দেখেছিল_ তাই বর্ণনা করেছে। বিশ্বাস করেছে_ বৃন্দাবনের কৃষ্ণ আর নবদ্বীপের গৌর অভিন্ন। এই ভাবপ্রকাশের জন্য সুন্দর গৌরবন্দনা করে বলেছেন __”যদি গৌর না হোত / কেমনে হইত, কেমনে ধরিতাম দে(দেহ)/ রাধার মহিমা প্রেমরস সীমা জগতে জানাতো কে ?/ মধুর বৃন্দা বিপিন-মাধুরী_ প্রবেশ চাতুরী সার।/ বরজ যুবতী ভাবের ভবতি কেমনে হইতো পার । / গাও পুনঃপুনঃ গৌরাঙ্গের গুন সরল করিয়া মন।/ এ ভবসাগরে এমন দয়াল দেখি নাই একজন ।/ গৌরাঙ্গ বলিয়া না গেনু গলিয়া _এমন করিল কে/ বাসুদেব হিয়া পাষাণ দিয়া গড়েছিল বা কে ?”/ __কি সুন্দর ভাবে বাসুদেব শ্রীগৌরাঙ্গের পায়ে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন _তা তার পদাবলীর মধ্যে প্রকাশ করেছেন। তার অন্য পদাবলীতেও গৌরমহিমা প্রকাশের কথা বলেছেন__” শ্রীরাধার ভাবে এবে গোরা অবতার।/ হরেকৃষ্ণ নাম গোরা করিল প্রচার ।।/ বাসুদেব ঘোষ কহে করি জোড় হাত।/ যেই গৌর সেই কৃষ্ণ সেই জগন্নাথ।।”/ আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। চাঁদ দেখে ‘চাঁদ নেবে’_ বলে শিশু গোলা কাঁদছে মায়ের কোলে ! বলছে _”চাঁদ দে মা _মা চাঁদ দে!” শচীমাতা হাত তুলে ডাকছেন_”আয় চাঁদ_ আয় চাঁদ!” কিন্তু চাঁদ বড় নিষ্ঠুর _আসছে না, ধরা দিচ্ছে না! কিন্তু নিমাই কোল থেকে নেমে মাটিতে পড়ে কাঁদছে, কিছুতেই নিস্তার নাই ! ঘরে রাধাকৃষ্ণের একখানি পট ছিল, তাই পেড়ে আনলো শচীমাতা_ বালককে শান্ত করার জন্য । রাধাকৃষ্ণের ছবিটি হাতে পাওয়া মাত্রই নিমেষে বালক নিমাই শান্ত হোলো। “চিত্র পাঞা গোরাচাঁদের মনে বড় সুখ।/ বাসু কহে পটে পহু দেখো নিজ মুখ।।/ নিজের পদাবলীতে ব্রজলীলার অনুস্মৃতি করেছেন বাসুদেব । নিমাইয়ের গোষ্ঠলীলা, দানলীলা এমনকি ব্রজগোপীর ভাব আরোপ করে নগরলীলারও বর্ণনা করেছেন । কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর সত্যিকারের আন্তরিকতা ফুটেছে সন্ন্যাসলীলার বর্ণনায়। মহাপ্রভু ফিরলে এসে বসেছে, হরিনাম জপ করছে নিরন্তর । “সর্ব অবতার শিরোমনি__ অকিঞ্চন জনের চিন্তামণি। আগে দেহে সুগন্ধি চন্দন মামাতো, এখন ধুলো বিষে আর কোনো ভূষণ নাই। লক্ষীবিলাস ছেড়ে বৃক্ষতলে বসেছে । “বাঁশি ছেড়ে দন্ড ধরেছে । / ছাড়লো লক্ষীবিলাস । / কিবা লাগি তরুতলে বাস।/ বিভূতি করিয়া প্রেমধন /সঙ্গে লই সব অকিঞ্চন ।।/ প্রেমজলে করই সিনান।/ কহে বাসু বিদরে পরাণ।।/” বাসুদেব প্রভুর গৃহত্যাগের বর্ণনা সুন্দরভাবে দিয়েছেন । বিষ্ণুপ্রিয়া শচীর দুয়ারে এসে বসলো । ধীরে ধীরে বললো_ “শয়ণমন্দিরে ছিল _নিশাভাগে কোথা গেল, / মোর মস্তকে বছর পড়িয়া।” বধুর মুখের কথা শুনে শচীমাতা আলুথালু বেশে ছুটে এলো। “শীঘ্র করি জ্বালি বাতি,খুঁজিলেন ইতি উতি!”/_ গৌরাঙ্গের উদ্দেশ্য না পাইয়া বিষ্ণুপ্রিয়ার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে পথে এসে ডাকতে লাগলো নিমাইকে । একজনকে পথে দেখে শচীমাতা জিজ্ঞেস করলো_ “নিমাইকে দেখেছো?”_ “নিমাইকে দেখেছি__ সে এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে “হরি_ হরি”_ বলতে বলতে কাঞ্চননগরের দিকে চলেছে”__ উত্তর দিলো সেই ব্যক্তি। “চৈতন্য সর্বমন্ত্রস্য চৈতন্য সর্বমঙ্গলং।/চৈতন্য সর্বসুখদং চৈতন্য সর্বসিদ্ধয়ঃ।।”__[ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য হোলেন সর্বমন্ত্রের সার, সর্বমঙ্গলের সারও তিনি। তিনি সর্বসুখের আধার, আবার সর্বসিদ্ধিরও কারক তিনি ই।] বাসুদেব সার্বভৌম যিনি উড়িষ্যার রাজগুরু বেদান্ত শাস্ত্রের প্রবাদপ্রতিম মানুষ তিনি শ্রীচৈতন্যকে এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন । আর আমাদের আলোচ্য বাসুদেব ঘোষ সেই মহাপ্রভুর একজন সঙ্গী ছিলেন। তিনি সার্বভৌমের বাড়িতে মহাপ্রভুর একই অঙ্গে কত রূপ দেখে লিখেছিলেন __”নরসিংহরূপ প্রভুর দেখে একবার,বটুক বামনরূপ দেখে পুনর্বার।/ পুনঃ দেখে মৎস্য কুর্ম বরাহ আকার/ পুনঃ ভৃগুরাম হস্তে ভীষণ কুঠার!/ দুর্বাদল শ্যামরূপ দেখায় কখন,/ কখন মুরলীধর নীরদবরণ।/ এসব দেখিয়া তাঁর সন্দেহ ঘুচিল,ষড়ভুজরূপে প্রভু উঠি দাঁড়াইলো।/ শচীর দুলাল যেই সেই ননীচোর, অন্তরেতে কালা কানু বাহিরেতে গৌর।।”/ আমরা পুর্ব সংখ্যায় বাসুদেব ঘোষের চৈতন্যলীলার (বাল্যকালীন) রচনাশৈলী ও বর্ণনা দেখেছি। এবার উনি মহাপ্রভুর সন্ন্যাসগ্রহণ বা তৎসংক্রান্ত বিষয়গুলির চিত্র কেমন সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন _তার পরিচয় জানার চেষ্টা কোরবো। মহাপ্রভু নদীয়া ছেড়ে ভোররাতে বিষ্ণুপ্রিয়াকে ঘুম পাড়িয়ে গৃহত্যাগ করে চলে গেছেন। সকাল থেকে খোঁজ খোঁজ ! বিষ্ণুপ্রিয়া ঘন ঘন মূর্ছা যাচ্ছেন! শচীমাতা পাগলিনী প্রায়_এমন সময় খোঁজ পাওয়া গেল তাঁর! বাসুদেবের পদে রয়েছে সেই বর্ণনা__”সন্ন্যাসীর করে ধরি, তোমার নিমাই বলে হরি, দ্বিতীয় বসন নাহি গায়।/ বাসু কহে আহা মরি, তোমার গৌরাঙ্গ হরি_ পাছু গিয়া মস্তক মুড়ায়।।”__ এই কথা শুনে বিষ্ণুপ্রিয়ার প্রাণ কেঁদে উঠলো অস্ফুটে বলছেন__” শুনেছি রামচন্দ্র যখন বনবাসে গিয়েছিলেন, তখন মা জানকীকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। ভগবান কৃষ্ণ যখন মথুরায় গেলেন তখনও রাধার সাথে সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন করেন নি, উদ্ধবকে বৃন্দাবনে পাঠিয়ে ছিলেন ব্রজবাসীদের খোঁজ নিতে! কিন্তু হে স্বামী ! তুমি যে দেশান্তরী হলে, সন্ন্যাস ধর্ম নিয়ে গৃহত্যাগ করলে!”_ এই বলে আক্ষেপ করতে লাগলেন। বাসুর পদে রয়েছে বিষ্ণুপ্রিয়ার তৎকালীন অবস্থার বর্ণনা__” এত কহি বিষ্ণুপ্রিয়া নিজ অঙ্গ আছাড়িয়া_ ধরণীরে মাগয়ে বিদায়।/ বাসুদেব ঘোষ কহে মোর সমান পাষান নহে, তবু হিয়া বিদরিয়া যায়।।”/ শচীমাতাও কাঁদছেন _”আমার সোনার পুতুল গোরাচাঁদ কোথায় গেলো! কে তাকে ভুলিয়ে লুকিয়ে রাখলো_ যে সব ছেড়ে চলে গেলো ! তাকে ছেড়ে আমি কি করে বাঁচবো ? আমার কাছে সমস্ত নদীয়া আঁধার হয়ে গেল। মনে হচ্ছে সে যদি সন্ন্যাসী হয়, তাহলে আমিও যোগিনী হয়ে তার সঙ্গ নেবো। যে আমাকে গৌরাঙ্গ পাইয়ে দেবে, আমি তার কেনা দাসী হয়ে থাকবো।” __” যে মোরে মিলিয়া দেয়_ মূল্য দিয়া কিনে লয় / হই তার দাসের যে দাসী।/ বাসুদেব ঘোষ ভনে, শচীন কাঁদে অকারনে, জীব লাগি নিমাই সন্ন্যাসী।।”/ নদীয়া ছেড়ে নিমাই রাতারাতি গঙ্গার ধার ধরে ধরে কাটোয়ায় পৌঁছে গেলেন । সেখানে গঙ্গাতীরে এক বৃক্ষতলে গৌরসুন্দর দশদিশা আলো করে বসে রয়েছেন ! “কাঞ্চনের কান্তি জিনি দীপ্ত-কলেবর।” গৌরাঙ্গের যে কি জ্যোতির্ময় মূর্তি__ আর সেই মূর্তির যে কি দুর্নিবার আকর্ষণ_ তাই বোঝাচ্ছেন বাসুদেব, তার পদাবলীতে ___”কাঁখে কুম্ভ করি নারী দাঁড়াইয়া চায়,/ চলিতে না পারে সে- নড়ি হাতে ধায় ।/ নগরের পুরনারী যতেক যুবতী,/ সতী ছাড়ে নিজ পতি, জপ ছাড়ে যতি।/ কেহ বলে হেন গোরা কোন দেশে ছিল,/ সে দেশে পুরুষ নারী কেমনে বাঁচিলো।/” কাটোয়া তখন কাঞ্চননগর, গ্রাম বিশেষ! সেখানে খবর হয়ে গেছে যে, এক তরুণ গৌরবর্ণ অনিন্দ্যকান্তি যুবক বৃক্ষতলে পড়ে শুধু “কৃষ্ণ- কৃষ্ণ” করছে! হয়তো সে সন্ন্যাস নেবে বলে মনে হচ্ছে । দলে দলে লোক ছুটে আসছে গঙ্গাতীরে বৃক্ষতলে ! যে হাঁটতে পারে না, সেও লাঠি হাতে ছুটে আসছে! কেউ বলছে_’ এই গৌরবর্ণ তরুণ কোনো বাপ মায়ের প্রাণবধ করে এসেছে’, কেউ বলে _’এ নিশ্চয়ই কোনো নারীর গলায় পা দিয়ে এসেছে’, কেউ বলে_’ ধন্য সে মা যে এমন ছেলেকে গর্ভে ধারণ করেছে’, কেউ বলে_’ধন্য সেই নারী, যে একে পতিরূপে পেয়েছে’! কোনো মা-বাবা (বয়স্করা) এসে পরামর্শ দিচ্ছে __’এমন নবযৌবনে কেশমুন্ডন কোরো না _নিজের দেশে ফিরে যাও।’ তখন প্রভু কি বলছেন__” প্রভু বলে আশীর্বাদ করো পিতা-মাতা,/ সাধ আছে কৃষ্ণপদে বেচি নিজ মাথা ।/ প্রভু মস্তকমুন্ডন করতে চাইলেন_ জনতা যেই শুনলো, অমনি সকলে হাহাকার করে উঠলো । কিন্তু প্রভু বিচলিত হোলেন না _মধু শীলকে (নাপিত) বললেন_” আমি গঙ্গা স্নান করে আসি, তুমি আমার মাথা কামিয়ে দেবে ।” মধু বলছে _”প্রভু! তোমার এমন চাঁচর কেশ, আমি কাটতে পারবো না!” তখন প্রভু বললেন _”তোমার কোনো ভয় নাই, আজই আমি এখানে কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস নেবো__ তাই তার পূর্বে মস্তক মুন্ডন করাটা বাঞ্ছনীয়। সন্ন্যাসীর কেশবিন্যাসের কোনো প্রয়োজন হয় না।” “প্রভু বলে আমি যে ছাড়িবো এই ধর্ম / সন্ন্যাস লইব আমি কেঁদে নাহি কর্ম ।/ কেশ বেশ ধন জনে কৃষ্ণ নাহি পাই,/ সকল ত্যজিব আমি শুন ওহে ভাই(নাপিত)!”/ মধু বলে_” তোমার মস্তকে আমি কি করে হাত দেবো ? তোমার মাথায় হাত দেবার পর তো ওই হাত আমি কারো পায়ে ছোঁয়াতে পারবো না ! সেক্ষেত্রে আমার নিদারুণ অপরাধ হবে। এ কথা ভাবতেও আমার সর্বাঙ্গ কাঁপছে !” তখন প্রভু ভগবৎভাব অবলম্বন করে মধুকে বললেন_” আমি বলছি তোমাকে আর কখনো নিজের বৃত্তি অবলম্বন করতে হবে না । তোমাকে ভগবান কৃষ্ণ আজীবন সুখে রাখবেন। অন্তকালে তোমার বিষ্ণুলোক প্রাপ্তি হবে, আর বহুকাল ধরে মানুষ তোমাকে আমার সাথে মনে রাখবে ।” মধুর দর্শন হোলো, বুঝতে পারলো_ যে কথা বলছে, সে আর কেউ নয় স্বয়ং গোলোকপতি। ” মধু বলে গোঁসাই না ভাঁড়াও মোরে,/ তুমি ব্রহ্মা -তুমি বিষ্ণু জানিনু অন্তরে।/ যে কৃষ্ণ রাখিবে সুখে_ সেই কৃষ্ণ তুমি,/ তবে পদ বিষ্ণুলোকে কি বা জানি আমি ।/ মুড়াবো চাঁচর কেশ, হাত দিব যাতে,/ কিন্তু প্রভু শ্রীচরণ দাও আগে মাথে।/ মধুর বচনে প্রভু দিলাম শিরে পদ, বাসু কহে যার কাছে তুচ্ছ ব্রহ্মপদ।”/ এরপর ক্ষৌরকর্ম শুরু হোল__” তখন নাপিত আসি, প্রভুর বামেতে বসি, ক্ষুর দিল ও চাঁচর কেশে।” সকল লোকে উত্তাল হয়ে উঠলো, মধুও কাঁদতে লাগলো, শুধু মানুষেরাই নয় _সমস্ত পশুপাখিরাও কেঁদে উঠলো। বাসুদেব বলছেন _”প্রভুর মুন্ডন দেখি, কাঁদে যত পশুপাখি / আর কাঁদে যত শ্রীনিবাসী।/ বৎস নাহি দুগ্ধ খায়, তৃণদন্ডে গাভী ধায়_ নেহারে গৌরাঙ্গমুখ আসি।”/ গৌরাঙ্গের সন্ন্যাস হয়ে গেল । কেশব ভারতী সন্ন্যাস দীক্ষা দেওয়ার পর নাম দিলেন “শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য”! বাসু লিখলেন _”অরুণ দুখানি ফালি,ভারতী দিলেন তুলি,/ আর দিল এ ডোর কৌপিন।”/ সন্ন্যাস দেওয়ার পর কেশব ভারতীও উপস্থিত জনগণের সাথে কাঁদতে লাগলেন । বাসুদেব বলছে __”গৌরাঙ্গে সন্ন্যাস দিলা ভারতী কাঁদিলা,/ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নাম নিমাইয়েরে দিলা।/ পঁহু (প্রভু) কহে গুরু মোর পুরাহ মন সাধ,/ কৃষ্ণমতি হউক এই দেহ আশীর্বাদ।”/ ভারতী কাঁদিয়া বলে মোর গুরু তুমি,/ আশীর্বাদ কি করিব কৃষ্ণ দেখি আমি। ভুবন ভুলাও তুমি, সব নাটের গুরু,/ রাখিতে লৌকিক মান_ মোরে কহে গুরু ।/ আমার সন্ন্যাস আজি হইল সফল,/ বাসু কহে_ দেখিলাম চরণ কমল।।”/ পদকর্তা বাসুদেব ঘোষ গৌরাঙ্গলীলা একবার বুঝতে পারছেন_ আবার পরক্ষণেই ভুলে যাচ্ছেন ! “কি লাগিয়া দন্ড ধরে অরুণ বসন পরে, কি লাগিয়া মুড়াইলা কেশ।/ কি রাখিয়া মুখ চাঁদে, রাধা রাধা বলি কাঁদে,/ কি লাগিয়া ছাড়িল নিজ বেশ।”/ এরপর বাসুদেব বর্ণনা করছেন মহাপ্রভুর সন্ন্যাসের পরবর্তী অবস্থা! তখন নিত্যানন্দ আদি ভক্তগণ প্রভুকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে শান্তিপুরে নিয়ে এসেছেন_ অদ্বৈত আচার্যের গৃহে! শচীমাতা খবর পেয়ে দেখা করতে এলেন । সন্ন্যাসীর বেশে পুত্রকে দেখে শচীমাতার কি অবস্থা _ তা বাসু বর্ণনা করেছেন__” এ মতো হইল কেনে, শিরে কেশ দেখি হীনে,পরিয়াছে কৌপিন সে বাস ।/ নদীয়ার ভোগ ছাড়ি, মায়েরে অনাথ করি _কার বোলে করিলা সন্ন্যাস।” মা শচীমাতা ঘনঘন মূর্ছা যাচ্ছেন । শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ধীরে ধীরে মায়ের কাছে এলো। মায়ের পদধূলি মাথায় নিলো। তারপর জননীর মাথা কোলে নিয়ে স্থির শান্তকণ্ঠে বললো_ মাগো! এ বিধির নির্বন্ধ ! আর বিধির বিধান কেউ খন্ডাতে পারে না! তুমি কেঁদোনা _মা ! মন স্থির করো। জীবের কল্যাণে এবার আমার এই শরীরধারণ ! আমার স্মৃতি জাগরিত হয়ে গেছে ! আমি এখন জানি_ কি জন্য আমার শরীরধারণ ! মাগো__সময় সংক্ষিপ্ত! তাই সেই কাজ করার জন্য আমাকে সংসারের বাঁধন কাটাতেই হোতো ! আর তাই হয়েছে, এখন থেকে আমি শুধু তোমার গোরা নই, আমি জীব জগতের সকলের শ্রী শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু।। কৃষ্ণলীলা মণ্ডল শুদ্ধ শঙ্খকুণ্ডল গড়িয়াছে শুক কারিকর। সেই কুণ্ডল কানে পরি, তৃষ্ণা-লাউথালি-ধরি আশা-ঝুলি স্কন্ধের উপর।৷ চিন্তা-কান্থা উড়ি গায়, ধূলি বিভূতি মলিন কায়। হা হা কৃষ্ণ প্রলাপ উত্তর। উদ্বেগ দ্বাদশ হাতে লােভ ঝুঁটি নিল মাথে, ভিক্ষাভাবে ক্ষীণ কলেবর। ব্যাস-শুকাদি যোগিগণ কৃষ্ণ আত্মা নিরঞ্জন ব্রজে তার যত লীলাগণ। ভাগবতাদি শাস্ত্রগণে করিয়াছেন বর্ণনে সেই তর্জা পড়ে অনুক্ষণ।৷ দশেন্দ্রিয় শিষ্য করি মহাবাউল নাম ধরি। শিষ্য লইয়া করিল গমন। মাের দেহ স্বসদন বিষয়ভােগ মহাধন সব ছাড়ি গেলা বৃন্দাবন ৷৷