” নদীয়া উদয়গিরি, পূর্ণচন্দ্র গৌরহরি / কৃপা করি হইল উদয় ।/ পাপতমো হইল নাশ, ত্রিজগতের উল্লাস_/ জগভরি হরি ধ্বনি হয় ।”_আদিলীলা 13 পরিচ্ছেদ।।
“রাধা কৃষ্ণ এক আত্মা _দুই দেহ ধরি/ অনন্য বিলাসে রস আস্বাদন করি।।/ সেই দুই এক এবে চৈতন্য গোঁসাই/ ভাব আস্বাদিতে দোঁহে হইলা এক ঠাঁই।/ সচ্চিদানন্দ-পূর্ণ কৃষ্ণের স্বরূপ / একই চিচ্ছক্তি তাঁর ধরে তিন রূপ । / আনন্দাংশে হ্লাদিনী,সৎ অংশে সন্ধিনী / চিৎ অংশে সম্বিত, যারে জ্ঞান করি মানি।।”
“অন্তঃকৃষ্ণ বহিঃরাধা”_ গৌরহরি মর্তধামে লীলা করেছিলেন আজ থেকে মাত্র কমবেশি সাড়ে পাঁচশো বছর আগে। সঙ্গে ছিল লীলা সহচরের দল। তাঁদেরই কথা ক্ষুদ্রাকারে এখন এই পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে চলেছে। আলোচ্য প্রবন্ধে এখন বণিককুলশ্রেষ্ঠ ভক্ত উদ্ধারণের কথা বলা হচ্ছিলো। বিগত সংখ্যাগুলোতে শ্রীমন্মহাপ্রভু ও নিত্যানন্দের সাথে উদ্ধারণের সাক্ষাৎ ও কিছু কিছু লীলার বিবরণ দেওয়া হয়েছে, এখন তার বাকি অংশ !
নিত্যানন্দ কয়েকদিন ধরেই লীলাচ্ছলে সপ্তগ্রামে অবস্থান করেছিলেন । উদ্ধারণের বাড়িসংলগ্ন দেবালয়ের উত্তরে যে পুষ্করিণী রয়েছে, সেখানে প্রত্যহ স্নান করতেন নিত্যানন্দ । আহা !সেই পুষ্করিণীর শীতল জলও হয়ে উঠেছিল জাহ্নবীর সমতুল_নিত্যানন্দের স্পর্শে ! নিত্যানন্দের জলক্রীড়া দেখে ভক্ত উদ্ধারণেরও ভাব এসে গেল _তিনিও লাফিয়ে পড়লেন জলে ! শুরু হলো নতুন জলক্রীড়া! অনেকক্ষণ জলক্রীড়া শেষে পাড়ে উঠে দেখা গেল_ নিত্যানন্দের একপাটি নূপুর পায়ে নেই, জলে পড়ে গেছে ! নিত্যানন্দ, উদ্ধারণকে বললেন _”উদ্ধারণ ! জল থেকে আমার নূপুর খুঁজে এনে দাও ।” উদ্ধারণ রাজি হলেন না, বললেন _”হে প্রভু! আপনার শ্রীচরণের সঙ্গে সম্বন্ধ যাতে আছে, সেই জিনিস যদি কেউ পায় _প্রাণ থাকতে তা কি কেউ দিতে চায় ? আপনার নূপুর_ আমার এই পুকুরেই থাক্! আমার এই পুকুর পবিত্র তীর্থে পরিণত হোক!” সেই থেকে ওই পুকুরের নাম হলো “নূপুর পুকুর” বা “নুপুরকুন্ড” ! একদিন এক শাঁখারি সপ্তগ্রামের পথ দিয়ে_ “শাঁখা চাই”, “শাঁখা চাই” _বলে যাচ্ছিল । হঠাৎ একটি বালিকা এসে তাকে বললো_” আমি শাঁখা কিনবো, ভালো করে একজোড়া শাঁখা আমাকে দাও!” শাঁখারী বালিকার সুন্দর হাতে শাঁখা পরিয়ে দিয়ে দাম চাইলো। বালিকা বললো_” আমার বাবা উদ্ধারণ দত্তের কাছে যাও ! সেই দাম দিয়ে দেবে !” কত দাম__ তিনি বিশ্বাস করবেন কী করে__ তাই বালিকা নিজেই সমাধান করে দিলো_ ” যদি বাবা নিতান্তই দাম দিতে না চায়, তাহলে বলবে_ পূর্ব দিকের ঘরে যে পশ্চিমের কুলুঙ্গি আছে, তাতে পাঁচটি স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে_ তাই যেন দিয়ে দেয় ! বাবাকে বোলো আমি সরস্বতী নদীতে স্নান করতে যাচ্ছি!”_ এই বলে বালিকা চলে গেল ! শাঁখারী উদ্ধারণের কাছে এসে সব ঘটনা বলে শাঁখার দাম চাইলো। উদ্ধারণ অবাক ! তার মেয়ে ? তার তো কোনো কন্যাসন্তানই নাই! শাঁখারী বললো_”এমন কথা মুখে আনবেন না! এমন সুন্দর সরল দেবীর মত মেয়ে _সে কখনো মিছে কথা বলবে না! আপনি পূর্বদিকের ঘরে পশ্চিমের কুলুঙ্গি খুঁজুন_ দেখুন ঠিকই পাঁচটি স্বর্ণমুদ্রা পেয়ে যাবেন!” উদ্ধারণ পূর্বদিকের ঘরে গিয়ে দেখে কুলুঙ্গিতে পাঁচটি স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে ! আশ্চর্যান্বিত উদ্ধারণ শাঁখারীকে এসে বললো_ “আমার মেয়ের পরিচয় দিয়ে যে বালিকা শাঁখা নিয়েছে সে কই ?” শাঁখারী বললো_” সে তো সরস্বতী নদীতে নাইতে গেছে!” ‘চলো নদীর ধারে’_ ছুটলো দুজনে নদীর তীরের দিকে ! কিন্তু কোথায় কে? কোথায় সে স্নানে নেমেছে? “মা_ মাগো! তুই কোথায় _দেখা দিয়ে আমার মান রাখ্ মা ! নাহলে যে আমি ঠক, প্রবঞ্চক হয়ে যাবো মা ! আমি যে তোকেই শাঁখা পড়িয়েছি _এটা দত্ত ঠাকুর বিশ্বাস করতে চায় না যে ! একবার দেখা দিয়ে আমার লাজ রাখ্, আমার মান বাঁচা মা !” _ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো শাঁখারী ! তখনই সরস্বতীর জল থেকে দু’খানি নিটোল হাত উঠে এলো দুইহাতে দুগাছা শাঁখা শোভা পাচ্ছে _তাতে! শাঁখারি আর উদ্ধারণ দুজনেই কাঁদতে লাগলো! উদ্ধারণ বললেন_” শাঁখারী তুমি মহাভাগ্যবান ! তুমি সাক্ষাৎ মা জগৎজননী কে দর্শন করেছো_ আর তোমার ভক্তির শক্তিতে আমারও কিঞ্চিৎ দর্শন হোলো! তাছাড়া মা নিজের পরিচয় দিয়েছেন আমার মেয়ে বলে ! ‘যে মা জগজ্জননী, সে আমার মেয়ে!’ __আমার আর কি চাই !! নাও_ নাও _তুমি স্বর্ণমুদ্রা নাও!” শাঁখারি আর মূল্য নিতে চায় না ! বললো_” মনি ফেলে, আমি কাঁচের টুকরো নেব! তখন কেনো মাকে চিনতে পারলাম না! আমি ভাগ্যবান তো নয়ই বরং আমি হতভাগা!”_ এই বলে শাঁখারী ও কাঁদতে লাগলো।
এই রকম নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে উদ্ধারণ দত্ত ধীরে ধীরে লোকসমাজে আদৃত হয়ে উঠেছিলেন । কিন্তু মহাপ্রভু তাঁকে দিয়ে আরও অনেক কাজ করিয়ে নেবেন। মহাপ্রভুর আদেশ হোল _নিত্যানন্দকে সংসারী হোতে হবে! নিত্যানন্দ সেই আদেশ শুনে হাসলেন_ যে কিনা আজন্ম ব্রহ্মচারী-অবধূত, তাকে সংসার করতে হবে! আর যার দু-দুটো বিবাহ (স্ত্রী লক্ষীদেবী ও বিষ্ণুপ্রিয়া),সে হোল নিমাই সন্ন্যাসী ! বাহা রে! ভালো বিচার! কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতের বিচিত্র বিধান! মহাপ্রভুর অভিন্ন কলেবর, লীলা সহচর নিত্যানন্দ সে কথা ভালোই জানেন । তাই মহাপ্রভুর আদেশ শিরোধার্য করে প্রথমেই ভক্ত কমলাকান্তকে সেকথা জানালেন । তিনি আবার উদ্ধারণ দত্তকে তা জানালেন_ শুনে উদ্ধারণের স্ফূর্তি দেখে কে ! “গুরুদেবের বিবাহ দিতে হবে ? আমি দেবো! যত খরচ হয় _আমি করবো!”__ মনে মনে এই কথা ভেবে, কন্যার সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন উদ্ধারণ । চারিদিকে লোক লাগানো হোল__ রূপে লক্ষ্মী– গুণে সরস্বতী কন্যা কোথায় রয়েছে ? অবশেষে খবর পাওয়া গেলো_ অম্বিকা কালনার সূর্যদাস পন্ডিতের ঘরে দুটি উপযুক্ত কন্যা রয়েছে বসুধা ও জাহ্নবী !
উদ্ধারণকে সঙ্গে নিয়ে নিজে গেলেন নিত্যানন্দ কালনায় ! উদ্ধারণ সূর্যদাসের বাড়ির ভেতরে ঢুকে বললেন _”তোমার কন্যার জন্য উপযুক্ত পাত্র এনেছি, উত্তম ঘর, ব্রাহ্মন, সর্ব শাস্ত্রে পণ্ডিত, রাঢ় চূড়ামণি_নাম নিত্যানন্দ,প্রেমানন্দে বাস!” কিন্তু অজ্ঞাতকুলশীল আগন্তুক বরের সাথে বিবাহ দিতে নিমরাজি সূর্যদাস । পাড়াপড়শীরাও সায় দিল না।নিত্যানন্দ উদ্ধারণকে নিয়ে গঙ্গাতীরে বেলা গাড়লেন।
কিছুদিন যেতে না যেতেই সূর্যদাস ও তার প্রতিবেশী লোকজন সূর্যের কন্যার মৃতদেহ নিয়ে গঙ্গাতীরে সৎকারের জন্য এসে হাজির হোলো । নিত্যানন্দ উদ্ধারণকে ইঙ্গিত করে দেখালেন _তারপর সেখানে গিয়ে সূর্যদাসকে বললেন _”এ মেয়ে বেঁচে যাবে, কিন্তু এর সাথে আমার বিবাহ দিতে হবে !” শোকাহত বৃদ্ধ পিতা রাজি হয়ে গেল! মহাসাধক নিত্যানন্দ মহামৃত্যুঞ্জয় মৃতসঞ্জীবনী মহামন্ত্র হরিনাম তেই বসুধার কানে দিলেন_অমনি সে উঠে বসে পড়লো! সেখানে উপস্থিত সকলে “ধন্য_ ধন্য ” করে উঠলো। সূর্যদাস দেখল এই পাত্র একজন মহাত্মা! সুতরাং তিনি সমাজ, আত্মীয়দের তোয়াক্কা না করে বসুধা এবং তার অন্য কন্যা জাহ্নবীকে ও যৌতুক হিসাবে নিত্যানন্দের সাথে বিবাহ দিয়ে দিলেন। তার দুই কন্যা-ই নিত্যানন্দের স্ত্রীর মর্যাদা পেলো। বিবাহ মহাসমারোহে হয়েছিল, আর এই বিবাহের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেছিলেন উদ্ধারণ স্বয়ং।
এইভাবে শ্রীমন্মহাপ্রভু নিত্যানন্দ বেশ কিছুকাল সপ্তগ্রামে বণিককুল উদ্ধারের মানসে উদ্ধারণের সাথে লীলা করে কাটিয়ে ছিলেন।।
