__মহাপ্রভুর এই সর্বত্যাগী বাউল ভাবকে আশ্রয় করে পরবর্তীতে যে কয়জন মহাজন ভক্তপ্রবর মহাপ্রভুর লীলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন_ তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন মহাসাধক উদ্ধারন দত্ত ঠাকুর।
হুগলি জেলার গঙ্গার তীরবর্তী তীর্থস্থান ত্রিবেনীর অনতিদূরে সপ্তগ্রাম । এই সপ্তগ্রাম ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান । কারণ এটি বহু পূর্বে বাংলার নামকরা বন্দর ছিল, আর সেই সুবাদে বহুকাল থেকেই এখানে বণিককুলের বাস ! শ্রীকর দত্ত নামে সুবর্ণবণিক কুলে জাত একজন বণিক এখানে দীর্ঘদিন ধরে বাস করতেন, যাকে সবাই একডাকে চিনতো! কারণ শ্রীকর দত্ত ছিলেন সেখানকার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বণিক! অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিলেন তিনি! এমন শোনা যায় যে, গৌড়ের রাজা প্রয়োজনে অর্থ ধার করতো তাঁর কাছে ! তবে প্রকৃতপক্ষে শ্রীকর দত্ত ও তার স্ত্রী ভদ্রাবতীর কোলজুড়ে যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছিল সেই পিতা-মাতার নাম ইতিহাসে প্রসিদ্ধ করেছিল ! আর তা অর্থ বা প্রতিপত্তি দিয়ে নয়_ অর্থ প্রতিপত্তি তো অনেকেরই থাকে_ কিন্তু এমন ছেলে কজনের থাকে ! যে ছেলে হয় বৈষ্ণবকুল শিরোমণি, ভক্তজনের মহা উদ্ধারকর্তা__হ্যাঁ, তিনিই উদ্ধারণ দত্ত!
বাল্যকালে এই ছেলের নাম রাখা হয়েছিল দিবাকর দত্ত! কিন্তু পরবর্তীকালে নিত্যানন্দ প্রভুর সান্নিধ্যে যখন দিবাকরের মধ্যে দিব্যভাব প্রকাশিত হোলো, তখন নিত্যানন্দ প্রভু নিজেই সমস্ত বণিকদের উদ্ধারকর্তা হিসাবে দিবাকরের নাম দিলেন _মহাউদ্ধারন উদ্ধারণ দত্ত । ‘বাসুদেব ঘোষের করচা’ _বইটিতে উল্লেখ রয়েছে__ “প্রভু হাসি হাসি কহে, বণিক কুমার /বণিককুল তোমা হইতে হইল উদ্ধার । দিবাকর করি নাম না পুছিবে কেহ /আজি হইতে মোর দত্ত নাম তুমি লহ। বণিককুল উদ্ধার করিলে বটে সে কারণ / আজি হইতে তোর নাম রহুঁ উদ্ধারণ।।”
__পিতার সমস্ত ঐশ্বর্যের মালিক হোলেন উদ্ধারণ। তাছাড়া তিনি কাটোয়ার দুই মাইল উত্তরে নৈহাটি গ্রামের রাজার দেওয়ান ছিলেন। নৈহাটির কাছাকাছি যে পল্লীতে উনি থাকতেন পরবর্তীকালে সেই স্থানের নাম হয় উদ্ধারনপুর । কালিকানন্দ অবধূতের লেখা যে কয়টি জনপ্রিয় গ্রন্থ রয়েছে তার মধ্যে এই উদ্ধারনপুর ও গঙ্গাতীর সংলগ্ন শ্মশানকে নিয়ে লেখা “উদ্ধারণপুরের ঘাট” গ্রন্থটি অন্যতম ।
এই উদ্ধারণপুরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুও এসেছিলেন । যে নিম গাছের নিচে নিমাই সন্ন্যাসী বসেছিলেন_ লোকমুখে কথিত রয়েছে যে, সেটি এখনও বিদ্যমান ! মহাপ্রভুর আগমন উপলক্ষে প্রতিবছর মকর সংক্রান্তিতে আজও মেলা বসে উদ্ধারণপুরে! হয় বহুবিধ বাউল, বৈষ্ণব, সাধুসন্তের আগমন। আর সহস্র সহস্র মানুষের ভিড়ে মেলাপ্রাঙ্গন হয় জমজমাট !
প্রথমদিকে উদ্ধারন-ই মেলার সব ব্যয়ভার বহন করতেন । তাঁর বিপুল অর্থ তিনি সৎকার্যে, দেবসেবায় অকাতরে ব্যয় করেছিলেন । আর এক সুবর্ণবণিক হলধর সেন, যে প্রথম জীবনে উদ্ধারণের অধীনে কাজ করতো! কে এই হলধর__ইনি লোকপ্রবাদ খ্যাত গৌরীসেনের পূর্বপুরুষ! যে গৌরীসেনের দান-খয়রাত এতটাই ইতিহাস প্রসিদ্ধ যে, কথায় কথায় বলা হোত _”লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন!” সেই গৌরীসেনের পূর্বপুরুষ হলধরের বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল __উদ্ধারণ দত্তের হাত ধরেই!
হলধরের বোন সুপ্রসন্নাকে বিবাহ করেছিলেন উদ্ধারণ । বেশিদিন বাঁচে নি সুপ্রসন্না! একমাত্র পুত্র শ্রীনিবাসকে রেখে দিয়ে অকালে দেহত্যাগ করে সে! স্ত্রী বিয়োগের পর থেকেই উদ্ধারণের অন্তরে বৈরাগ্যের তীব্র অনল জ্বলতে থাকে ! সংসারে থাকেন কিন্তু মন সর্বদা সেই ঈশ্বরে ! ঐশ্বর্য প্রচুর কিন্তু মাৎসর্য নাই, মায়ার সংসারে থেকেও মায়াতীত! গভীর পাঁকের মধ্যে থেকেও পাঁকাল মাছের মত পাঁকমুক্ত। সংসার পঙ্কের কোনো দাগ তাঁর গায়ে লেগে ছিল না । এই অবস্থায় গুরুর সাথে দেখা হয়েছিল উদ্ধারণের__ আসছি সেই কথায় !
মহাপ্রভুর নির্দেশে নিত্যানন্দ হরিনাম আর প্রেম বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন! প্রথমে পানিহাটি, তারপরে খড়দহ, সেখান থেকে সপ্তগ্রাম । সপ্তগ্রামে যাবার আগে নিত্যানন্দ প্রভু তার দলবল নিয়ে ত্রিবেণীর পুন্যতীর্থে স্নান সেরে নিলেন । আর সেখানেই নিত্যদিনের মতো সেদিনও হাজির ছিলেন পরম ভাগবত দিবাকর (উদ্ধারণ)! স্নানরত নিত্যানন্দকে দেখে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রয়েছেন দিবাকর! কে এই পরম দয়ালু আর করুনার প্রতিমূর্তি, প্রেমময় তরুণ সন্ন্যাসী ! আনমনে স্নান করছেন আর মুখে হরিধ্বনির হুংকারে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলছেন ! সেই হরিধ্বনি শুনে সঙ্গের লোকেরা ভাবোন্মত্ত হয়ে উঠছে !কেউ হাঁসছে, কেউ কাঁদছে, কেউ আবার দুই হাত তুলে নৃত্য করছে ! সেই হুংকারে প্রেমের সঞ্চার দিবাকরের মধ্যেও হয়েছে । তারও শরীর কম্পিত হচ্ছে, স্বেদ, অশ্রু, পূলকাদি অষ্টসাত্বিক ভাবাবস্থায় শরীর অবশ হয়ে আসছে ! দিবাকর দেখলেন সেই পরম পাবন স্নানান্তে গঙ্গাতীরে এক অশত্থতলে বিরাজমান হোলেন। স্নানান্তে সেই দিকে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন দিবাকর, তারপর নিকটস্থ হোতেই নতজানু হয়ে তাঁর মস্তক সেই শ্রীকমল-চরণযুগলে ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন দিবাকর। আহ্_ কি শান্তি! কি অনাবিল আনন্দ! চোখের জলের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে দিবাকরের, প্রভুর বদনমন্ডল দেখা যাচ্ছেনা_ কণ্ঠও রুদ্ধ হয়ে গেছে ! কি করেন, আর কি-ই বা বলেন ! কিছুই করতে হোলো না, আর কিছুই বলতে হোলো না _নিত্যানন্দ প্রভুই যা করার করলেন, যা বলার বললেন! পরম স্নেহে দু’হাত দিবাকরের মস্তকে রেখে, পরম দয়াল নিত্যানন্দ বললেন_ “ওঠো, কেঁদোনা _আজ থেকে তুমি আমার কিঙ্কর হোলে।”
এর থেকে বড় পাওয়া আর কি হোতে পারে নিত্যানন্দের কিঙ্কর, নিত্যানন্দের দাস! যে সে কি পায় এই চান্স ! শুধু শুধুই কি এই পদ লাভ করেছিলেন দিবাকর ? না, তা করেননি ! পুজোর আগে যেমন হয় বোধন, হরিবাসর শুরুর আগে যেমন হয় অধিবাস__ তেমনি নিত্যানন্দের সাথে দেখা হওয়ার আগে সেইসময় তীব্র সাধন-ভজনের মধ্যে ছিলেন দিবাকর । দিন রাত কিভাবে কাটতো হুঁশ থাকতো না তাঁর! একদিন হঠাৎ তাঁর খেয়াল হোলো_ তিনদিন কিছু না খেয়ে পারণের উপবাস করবেন, আর তিনদিন পর স্নানান্তে বৈষ্ণবসেবা কোরে জলগ্রহণ করবেন! সেই সংকল্পের উদযাপন হোলো _নিত্যানন্দ প্রভুর সাক্ষাতে, গুরু-শিষ্যের মিলনে, মহাউদ্ধারণে!
নিত্যানন্দকে বললেন দিবাকর_” আজ তিনদিন উপবাসের পর আমার পারণ, আমি আপনাকে ভোগ নিবেদন করবো, আপনি প্রসাদ করে দেবেন!” নিত্যানন্দ বললেন _”বেশ, তাহলে তোমার মন্দিরে চলো!” ভক্তের গৃহই তো প্রভুর মন্দির ! নিত্যানন্দ বৃক্ষতল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, চলতে শুরু করলেন ভক্ত মন্দিরের উদ্দেশ্যে । তার আগেই নিত্যানন্দ দিবাকরকে বক্ষে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করে বললেন_” ভক্তের হৃদয়ই তো শ্রেষ্ঠ মন্দির! তোমার এই বক্ষমাঝে যে প্রভুকে বসিয়ে রেখেছো, আগে সেই মন্দিরের স্পর্শ গ্রহণ করি, এসো !” বাসুদেব ঘোষ লিখলেন_” উদ্ধারণ দত্ত ভাগ্যবন্তের মন্দিরে, রহিলেন তাঁহা প্রভু ত্রিবেনীর তীরে।” ভক্ত দিবাকরের গৃহে রাত্রিযাপন করলেন নিত্যানন্দ। তারপর মাঘমাসের সপ্তমী তিথিতে দিবাকরকে রাধাকৃষ্ণ মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে বললেন _”আজ থেকে তোমার নাম উদ্ধারণ ! তোমার থেকে সমস্ত বণিককুল উদ্ধার হয়ে গেল।”
_”যতেক বণিককুল উদ্ধারণ হইতে/ পবিত্র হইল দ্ধিধা নাহিক ইহাতে।।” ভক্তসেবা অন্তে নিত্যানন্দ প্রভু আসল সত্যটি প্রকাশ করলেন, বললেন _”এই স্থানে আগমনের আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, শুধুমাত্র তোমাকে আর তোমার মাধ্যমে সমস্ত বণিককুলকে উদ্ধার করার জন্যই আমার আগমন।”
__” বণিক তারিতে নিত্যানন্দের অবতার/ বণিকেরে দিলা প্রেম-ভক্তি অধিকার।।”_সপ্তগ্রামের সমস্ত বণিকসমাজ কৃষ্ণভক্ত গৌরভক্ত হয়ে গেল _”সপ্তগ্রাম হইল যেন নব বৃন্দাবন”!
বণিকসভার সদস্যদের অর্থচিন্তা ছেড়ে কৃষ্ণভজনা দেখে তৎকালীন সমাজের লোকেরা অবাক হয়ে গিয়েছিল ! এদের এতো ভক্তি! এতোদিন এতো ভক্তি ছিল কোথায় ! আসলে বণিকসমাজ অর্থের জন্য যে কোনো জিনিস নিয়ে ব্যবসা কোরতো, কর্মচারী, কুলি, শ্রমিকদের ভালো বেতন দিতো না, সম্মান দিতো না! তাই ধার্মিক ব্যক্তিরা এই সমাজকে এড়িয়ে চলতো__ পাপী, পামর বলতো ! নিত্যানন্দ প্রভু সকলকে কোল দিলেন, হরিনাম ও প্রেম বিতরণ করলেন। সপ্তগ্রামের সমগ্র বণিকসমাজ গৌরভক্ত, কৃষ্ণভক্ত হয়ে গেল । উদ্ধারণকে দেখে, তারাও দান-ধ্যান করতে লাগলো । বিভিন্ন ছত্র তৈরি হোলো_ সেখানে অন্নদান, বস্ত্রদান করা হোতে লাগলো। ধর্মজগতে কেউ ছোট-বড় নয়। মহাপ্রভু স্বয়ং বলেছেন__ “ভক্তের কোন জাত নাই, চন্ডালও যদি হরিভক্ত হয়_ তাহলে সে শ্রেষ্ঠ, আর ব্রাহ্মণও যদি ভক্তিহীন হয়_ তাহলে সে অধমাধম।।
“শ্রীচৈতন্য গোঁসাই রসের সদন।/ বিশেষ বিশেষে কৈল রস-আস্বাদন ।।/ সেই দ্বারে প্রবর্ত্তাইলা কলিযুগধর্ম । চৈতন্যের দাসে জানে এইসব মর্ম ।/ অদ্বৈত আচার্য নিত্যানন্দ শ্রীনিবাস / গদাধর দামোদর মুরারি হরিদাস।।/ আর যত চৈতন্য কৃষ্ণের ভক্তগণ / ভক্তিভাবে শিরে ধরি সবার চরণ।।/ এই সংখ্যায় এতদুর পর্যন্ত __পরবর্তীতে উদ্ধারণ দত্তের লীলাকাহিনীর বাকি অংশ শোনানো যাবে । গৌরহরির কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক্_ কল্যাণ হোক, এই প্রার্থনা করি।। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।
হুগলি জেলার গঙ্গার তীরবর্তী তীর্থস্থান ত্রিবেনীর অনতিদূরে সপ্তগ্রাম । এই সপ্তগ্রাম ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান । কারণ এটি বহু পূর্বে বাংলার নামকরা বন্দর ছিল, আর সেই সুবাদে বহুকাল থেকেই এখানে বণিককুলের বাস ! শ্রীকর দত্ত নামে সুবর্ণবণিক কুলে জাত একজন বণিক এখানে দীর্ঘদিন ধরে বাস করতেন, যাকে সবাই একডাকে চিনতো! কারণ শ্রীকর দত্ত ছিলেন সেখানকার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বণিক! অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিলেন তিনি! এমন শোনা যায় যে, গৌড়ের রাজা প্রয়োজনে অর্থ ধার করতো তাঁর কাছে ! তবে প্রকৃতপক্ষে শ্রীকর দত্ত ও তার স্ত্রী ভদ্রাবতীর কোলজুড়ে যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছিল সেই পিতা-মাতার নাম ইতিহাসে প্রসিদ্ধ করেছিল ! আর তা অর্থ বা প্রতিপত্তি দিয়ে নয়_ অর্থ প্রতিপত্তি তো অনেকেরই থাকে_ কিন্তু এমন ছেলে কজনের থাকে ! যে ছেলে হয় বৈষ্ণবকুল শিরোমণি, ভক্তজনের মহা উদ্ধারকর্তা__হ্যাঁ, তিনিই উদ্ধারণ দত্ত!
বাল্যকালে এই ছেলের নাম রাখা হয়েছিল দিবাকর দত্ত! কিন্তু পরবর্তীকালে নিত্যানন্দ প্রভুর সান্নিধ্যে যখন দিবাকরের মধ্যে দিব্যভাব প্রকাশিত হোলো, তখন নিত্যানন্দ প্রভু নিজেই সমস্ত বণিকদের উদ্ধারকর্তা হিসাবে দিবাকরের নাম দিলেন _মহাউদ্ধারন উদ্ধারণ দত্ত । ‘বাসুদেব ঘোষের করচা’ _বইটিতে উল্লেখ রয়েছে__ “প্রভু হাসি হাসি কহে, বণিক কুমার /বণিককুল তোমা হইতে হইল উদ্ধার । দিবাকর করি নাম না পুছিবে কেহ /আজি হইতে মোর দত্ত নাম তুমি লহ। বণিককুল উদ্ধার করিলে বটে সে কারণ / আজি হইতে তোর নাম রহুঁ উদ্ধারণ।।”
__পিতার সমস্ত ঐশ্বর্যের মালিক হোলেন উদ্ধারণ। তাছাড়া তিনি কাটোয়ার দুই মাইল উত্তরে নৈহাটি গ্রামের রাজার দেওয়ান ছিলেন। নৈহাটির কাছাকাছি যে পল্লীতে উনি থাকতেন পরবর্তীকালে সেই স্থানের নাম হয় উদ্ধারনপুর । কালিকানন্দ অবধূতের লেখা যে কয়টি জনপ্রিয় গ্রন্থ রয়েছে তার মধ্যে এই উদ্ধারনপুর ও গঙ্গাতীর সংলগ্ন শ্মশানকে নিয়ে লেখা “উদ্ধারণপুরের ঘাট” গ্রন্থটি অন্যতম ।
এই উদ্ধারণপুরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুও এসেছিলেন । যে নিম গাছের নিচে নিমাই সন্ন্যাসী বসেছিলেন_ লোকমুখে কথিত রয়েছে যে, সেটি এখনও বিদ্যমান ! মহাপ্রভুর আগমন উপলক্ষে প্রতিবছর মকর সংক্রান্তিতে আজও মেলা বসে উদ্ধারণপুরে! হয় বহুবিধ বাউল, বৈষ্ণব, সাধুসন্তের আগমন। আর সহস্র সহস্র মানুষের ভিড়ে মেলাপ্রাঙ্গন হয় জমজমাট !
প্রথমদিকে উদ্ধারন-ই মেলার সব ব্যয়ভার বহন করতেন । তাঁর বিপুল অর্থ তিনি সৎকার্যে, দেবসেবায় অকাতরে ব্যয় করেছিলেন । আর এক সুবর্ণবণিক হলধর সেন, যে প্রথম জীবনে উদ্ধারণের অধীনে কাজ করতো! কে এই হলধর__ইনি লোকপ্রবাদ খ্যাত গৌরীসেনের পূর্বপুরুষ! যে গৌরীসেনের দান-খয়রাত এতটাই ইতিহাস প্রসিদ্ধ যে, কথায় কথায় বলা হোত _”লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন!” সেই গৌরীসেনের পূর্বপুরুষ হলধরের বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল __উদ্ধারণ দত্তের হাত ধরেই!
হলধরের বোন সুপ্রসন্নাকে বিবাহ করেছিলেন উদ্ধারণ । বেশিদিন বাঁচে নি সুপ্রসন্না! একমাত্র পুত্র শ্রীনিবাসকে রেখে দিয়ে অকালে দেহত্যাগ করে সে! স্ত্রী বিয়োগের পর থেকেই উদ্ধারণের অন্তরে বৈরাগ্যের তীব্র অনল জ্বলতে থাকে ! সংসারে থাকেন কিন্তু মন সর্বদা সেই ঈশ্বরে ! ঐশ্বর্য প্রচুর কিন্তু মাৎসর্য নাই, মায়ার সংসারে থেকেও মায়াতীত! গভীর পাঁকের মধ্যে থেকেও পাঁকাল মাছের মত পাঁকমুক্ত। সংসার পঙ্কের কোনো দাগ তাঁর গায়ে লেগে ছিল না । এই অবস্থায় গুরুর সাথে দেখা হয়েছিল উদ্ধারণের__ আসছি সেই কথায় !
মহাপ্রভুর নির্দেশে নিত্যানন্দ হরিনাম আর প্রেম বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন! প্রথমে পানিহাটি, তারপরে খড়দহ, সেখান থেকে সপ্তগ্রাম । সপ্তগ্রামে যাবার আগে নিত্যানন্দ প্রভু তার দলবল নিয়ে ত্রিবেণীর পুন্যতীর্থে স্নান সেরে নিলেন । আর সেখানেই নিত্যদিনের মতো সেদিনও হাজির ছিলেন পরম ভাগবত দিবাকর (উদ্ধারণ)! স্নানরত নিত্যানন্দকে দেখে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রয়েছেন দিবাকর! কে এই পরম দয়ালু আর করুনার প্রতিমূর্তি, প্রেমময় তরুণ সন্ন্যাসী ! আনমনে স্নান করছেন আর মুখে হরিধ্বনির হুংকারে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলছেন ! সেই হরিধ্বনি শুনে সঙ্গের লোকেরা ভাবোন্মত্ত হয়ে উঠছে !কেউ হাঁসছে, কেউ কাঁদছে, কেউ আবার দুই হাত তুলে নৃত্য করছে ! সেই হুংকারে প্রেমের সঞ্চার দিবাকরের মধ্যেও হয়েছে । তারও শরীর কম্পিত হচ্ছে, স্বেদ, অশ্রু, পূলকাদি অষ্টসাত্বিক ভাবাবস্থায় শরীর অবশ হয়ে আসছে ! দিবাকর দেখলেন সেই পরম পাবন স্নানান্তে গঙ্গাতীরে এক অশত্থতলে বিরাজমান হোলেন। স্নানান্তে সেই দিকে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন দিবাকর, তারপর নিকটস্থ হোতেই নতজানু হয়ে তাঁর মস্তক সেই শ্রীকমল-চরণযুগলে ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন দিবাকর। আহ্_ কি শান্তি! কি অনাবিল আনন্দ! চোখের জলের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে দিবাকরের, প্রভুর বদনমন্ডল দেখা যাচ্ছেনা_ কণ্ঠও রুদ্ধ হয়ে গেছে ! কি করেন, আর কি-ই বা বলেন ! কিছুই করতে হোলো না, আর কিছুই বলতে হোলো না _নিত্যানন্দ প্রভুই যা করার করলেন, যা বলার বললেন! পরম স্নেহে দু’হাত দিবাকরের মস্তকে রেখে, পরম দয়াল নিত্যানন্দ বললেন_ “ওঠো, কেঁদোনা _আজ থেকে তুমি আমার কিঙ্কর হোলে।”
এর থেকে বড় পাওয়া আর কি হোতে পারে নিত্যানন্দের কিঙ্কর, নিত্যানন্দের দাস! যে সে কি পায় এই চান্স ! শুধু শুধুই কি এই পদ লাভ করেছিলেন দিবাকর ? না, তা করেননি ! পুজোর আগে যেমন হয় বোধন, হরিবাসর শুরুর আগে যেমন হয় অধিবাস__ তেমনি নিত্যানন্দের সাথে দেখা হওয়ার আগে সেইসময় তীব্র সাধন-ভজনের মধ্যে ছিলেন দিবাকর । দিন রাত কিভাবে কাটতো হুঁশ থাকতো না তাঁর! একদিন হঠাৎ তাঁর খেয়াল হোলো_ তিনদিন কিছু না খেয়ে পারণের উপবাস করবেন, আর তিনদিন পর স্নানান্তে বৈষ্ণবসেবা কোরে জলগ্রহণ করবেন! সেই সংকল্পের উদযাপন হোলো _নিত্যানন্দ প্রভুর সাক্ষাতে, গুরু-শিষ্যের মিলনে, মহাউদ্ধারণে!
নিত্যানন্দকে বললেন দিবাকর_” আজ তিনদিন উপবাসের পর আমার পারণ, আমি আপনাকে ভোগ নিবেদন করবো, আপনি প্রসাদ করে দেবেন!” নিত্যানন্দ বললেন _”বেশ, তাহলে তোমার মন্দিরে চলো!” ভক্তের গৃহই তো প্রভুর মন্দির ! নিত্যানন্দ বৃক্ষতল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, চলতে শুরু করলেন ভক্ত মন্দিরের উদ্দেশ্যে । তার আগেই নিত্যানন্দ দিবাকরকে বক্ষে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করে বললেন_” ভক্তের হৃদয়ই তো শ্রেষ্ঠ মন্দির! তোমার এই বক্ষমাঝে যে প্রভুকে বসিয়ে রেখেছো, আগে সেই মন্দিরের স্পর্শ গ্রহণ করি, এসো !” বাসুদেব ঘোষ লিখলেন_” উদ্ধারণ দত্ত ভাগ্যবন্তের মন্দিরে, রহিলেন তাঁহা প্রভু ত্রিবেনীর তীরে।” ভক্ত দিবাকরের গৃহে রাত্রিযাপন করলেন নিত্যানন্দ। তারপর মাঘমাসের সপ্তমী তিথিতে দিবাকরকে রাধাকৃষ্ণ মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে বললেন _”আজ থেকে তোমার নাম উদ্ধারণ ! তোমার থেকে সমস্ত বণিককুল উদ্ধার হয়ে গেল।”
_”যতেক বণিককুল উদ্ধারণ হইতে/ পবিত্র হইল দ্ধিধা নাহিক ইহাতে।।” ভক্তসেবা অন্তে নিত্যানন্দ প্রভু আসল সত্যটি প্রকাশ করলেন, বললেন _”এই স্থানে আগমনের আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, শুধুমাত্র তোমাকে আর তোমার মাধ্যমে সমস্ত বণিককুলকে উদ্ধার করার জন্যই আমার আগমন।”
__” বণিক তারিতে নিত্যানন্দের অবতার/ বণিকেরে দিলা প্রেম-ভক্তি অধিকার।।”_সপ্তগ্রামের সমস্ত বণিকসমাজ কৃষ্ণভক্ত গৌরভক্ত হয়ে গেল _”সপ্তগ্রাম হইল যেন নব বৃন্দাবন”!
বণিকসভার সদস্যদের অর্থচিন্তা ছেড়ে কৃষ্ণভজনা দেখে তৎকালীন সমাজের লোকেরা অবাক হয়ে গিয়েছিল ! এদের এতো ভক্তি! এতোদিন এতো ভক্তি ছিল কোথায় ! আসলে বণিকসমাজ অর্থের জন্য যে কোনো জিনিস নিয়ে ব্যবসা কোরতো, কর্মচারী, কুলি, শ্রমিকদের ভালো বেতন দিতো না, সম্মান দিতো না! তাই ধার্মিক ব্যক্তিরা এই সমাজকে এড়িয়ে চলতো__ পাপী, পামর বলতো ! নিত্যানন্দ প্রভু সকলকে কোল দিলেন, হরিনাম ও প্রেম বিতরণ করলেন। সপ্তগ্রামের সমগ্র বণিকসমাজ গৌরভক্ত, কৃষ্ণভক্ত হয়ে গেল । উদ্ধারণকে দেখে, তারাও দান-ধ্যান করতে লাগলো । বিভিন্ন ছত্র তৈরি হোলো_ সেখানে অন্নদান, বস্ত্রদান করা হোতে লাগলো। ধর্মজগতে কেউ ছোট-বড় নয়। মহাপ্রভু স্বয়ং বলেছেন__ “ভক্তের কোন জাত নাই, চন্ডালও যদি হরিভক্ত হয়_ তাহলে সে শ্রেষ্ঠ, আর ব্রাহ্মণও যদি ভক্তিহীন হয়_ তাহলে সে অধমাধম।।
“শ্রীচৈতন্য গোঁসাই রসের সদন।/ বিশেষ বিশেষে কৈল রস-আস্বাদন ।।/ সেই দ্বারে প্রবর্ত্তাইলা কলিযুগধর্ম । চৈতন্যের দাসে জানে এইসব মর্ম ।/ অদ্বৈত আচার্য নিত্যানন্দ শ্রীনিবাস / গদাধর দামোদর মুরারি হরিদাস।।/ আর যত চৈতন্য কৃষ্ণের ভক্তগণ / ভক্তিভাবে শিরে ধরি সবার চরণ।।/ এই সংখ্যায় এতদুর পর্যন্ত __পরবর্তীতে উদ্ধারণ দত্তের লীলাকাহিনীর বাকি অংশ শোনানো যাবে । গৌরহরির কৃপায় সকলের মঙ্গল হোক্_ কল্যাণ হোক, এই প্রার্থনা করি।। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।
