২০১৪/২
।। ভগবৎ তত্ত্বকথা।।
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
“সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্যং মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।”__শ্রীমদ্ভাগবত গীতা ১৮/৬৬ ।
___ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন _সর্বধর্ম পরিত্যাগ পূর্বক একমাত্র আমার শরণ গ্রহণ করো, আমি তোমাকে সর্বপাপ হতে মুক্ত কোরবো, তুমি শোক করো না।
সুতরাং সেই শ্রী হরির শরণ-ই জীবের ভরসা ও আশ্রয়স্থল জেনে তাঁকে স্মরণ করেই এই লেখার প্রয়াস ! পূর্বে শ্রীজীব গোস্বামীর লীলাকাহিনীর অনেকাংশই পরিবেশিত হয়েছে, এই সংখ্যায় অন্তিম অংশ পরিবেশিত হবে। পূর্ব সংখ্যায় বর্ণিত হয়েছে যে, শ্রীরূপ ও সনাতনের ন্যায় অভিভাবক, পিতা, গুরু ও বৈষ্ণব সমাজের নেতৃস্থানীয়দের হারিয়েও কি অসাধারণ জ্ঞান ভক্তির সহায়তায় শ্রীজীব গোস্বামী তৎকালীন বৃন্দাবনের বৈষ্ণব সমাজকে ধরে রেখেছিলেন এবং ধীরে ধীরে মহাপ্রভুর আরব্ধ কর্মকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় ঈশ্বরের ইচ্ছায় তাঁকে সাহায্য করতে তিনজন পরম বৈষ্ণব বৃন্দাবনে এসেছিলেন, তাদের নাম ছিল_ শ্রীনিবাস, নরোত্তম ও শ্যামানন্দ।
কাটোয়ার কাছে চাকুন্দি গ্রামে ভক্ত প্রবর শ্রীনিবাসের জন্মস্থান। কিশোর বয়স থেকেই এই দিব্যকান্তি তরুণের প্রাণে জেগে ওঠে কৃষ্ণভক্তি ও কৃষ্ণপদ-প্রাপ্তির তৃষ্ণা! সেই তীব্র আকাংখার ফলস্বরূপ তিনি গৌর-পরিজন নরহরি সরকার ঠাকুরের কাছে কৃপা প্রাপ্ত হ’ন। এরপর তিনি ভক্তিবিহ্বল হৃদয়ে ছুটতে ছুটতে পৌঁছে যান বৃন্দাবনে। গোবিন্দ মন্দিরে আরতি দর্শনের সময় শ্রীজীবের দর্শন হয় তাঁর, তিলার্ধকাল দেরি না করে লুটিয়ে পড়লেন তিনি শ্রীজীবের চরণে! হাত দিয়ে ধরে তুলতে গিয়েই তাঁর চোখে ধরা পড়ে গেল_ পরম সম্ভাবনাময় এই তরুন সাধকের ভাবী রূপটি! শ্রীজীব গোস্বামী বর্ষীয়ান গোপাল ভট্রের কাছে শ্রীনিবাসের দীক্ষার ব্যবস্থা করে দিলেন, আর স্বয়ং তাঁকে শিক্ষা দিতে লাগলেন ভক্তিশাস্ত্র।
শ্রীনিবাসের আগমনের কিছুকালের মধ্যেই বৃন্দাবনে এসে উপস্থিত হ’ন নরোত্তম! তিনি ছিলেন উত্তরবঙ্গের গরানহাটি পরগনার প্রতাপশালী জমিদার কৃষ্ণানন্দের একমাত্র পুত্র । ছোটবেলা থেকেই তীব্র কৃষ্ণ অনুরাগ তাঁকে ভোগৈশ্বর্য ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ফলে তিনিও কৃষ্ণ সাক্ষাৎকারের নিমিত্ত বৃন্দাবনে চলে আসেন । সেখানে তিনি লোকনাথ গোস্বামীর নিকট দীক্ষাপ্রাপ্ত হ’ন, তবে শিক্ষার ভার শ্রীজীবের উপরেই পড়ে।
তৃতীয় যে ভক্তের কথা আমরা উপস্থাপিত কোরবো_ তাঁর নাম ছিল “দুঃখী কৃষ্ণদাস”, বৃন্দাবনে এসে দেখা গ্রহণের পর তার নাম হয় শ্যামানন্দ গোস্বামী । উড়িষ্যার ধারেন্দা-বাহাদুরপুর গ্রামের এক দরিদ্র সদগোপ পরিবারের সন্তান এই কৃষ্ণদাস। বিষয় বৈরাগ্য এলে তিনিও বৃন্দাবনে চলে আসেন এবং সেখানে ভাগ্যবলে রঘুনাথ দাসের কৃপাপ্রাপ্ত হ’ন । রঘুনাথ দাস যুবককে দেখেই বুঝলেন যে, ইনি মহাপ্রভুর আন্দোলনের এক চিহ্নিত নেতা । পরবর্তীকালের কাজের জন্য এখন প্রয়োজন সুতীব্র সাধনা আর তত্ত্বদর্শনের জ্ঞান। তাই রঘুনাথ অনেক ভাবনা চিন্তা করার পর তাকে শ্রীজীবের কাছে পাঠালেন। কৃপাময় শ্রীজীব স্বয়ং রঘুনাথ পাঠিয়েছেন তাকে পাঠিয়েছেন শুনে তৎক্ষণাৎ যুবককে স্থান দিলেন। আর শুধু স্থান দেওয়াই নয় তিনি নিজে যুবককে দীক্ষাদান করলেন এবং শিক্ষার ব্যবস্থাও করে দিলেন, অর্থাৎ এককথায় দিলেন পরম আশ্রয়! ইতিমধ্যে তৎকালীন বৃন্দাবনে রচিত গ্রন্থের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকলো। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যকে বাংলার বৈষ্ণব সমাজে পৌঁছে দিতে হবে! মহাপ্রভুর নির্দেশক্রমে রূপ সনাতন ভাগবতশাস্ত্রের ব্যাখ্যা সম্বলিত বহু গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। শ্রীজীবও রচনা করেছেন বেশ কয়েকটি গ্রন্থ । এছাড়া তৎকালে বহু বৈষ্ণব সাধক তাঁদের সাধনা-লব্ধ তত্ত্বাদি ও লীলাকাহিনী রচনা করে পাঠাতেন বৃন্দাবনে _অনুমোদনের জন্য । এইভাবে তখন হস্তলিখিত পান্ডুলিপির বিপুল ভান্ডার তৈরি হয়েছিল শ্রীজীবের কাছে!
তাহলে এখন কে নিয়ে যাবে এই গ্রন্থরাজি বঙ্গদেশে ? আর সেখানে কেই বা করবে এর প্রচার? শ্রীজীব ভার দিলেন মহাভক্ত, সুপন্ডিত, কর্মকুশল শ্রীনিবাসকে। প্রচারের যোগ্যতম ব্যক্তি এই শ্রীনিবাস । গুরু গোপাল ভট্রের অনুমতিক্রমে স্থির হোল যে, শ্রীনিবাসের হাতেই দায়িত্ব অর্পিত হবে । তবুও বৃন্দাবনের বৈষ্ণব সমাজের মতামতও জানা দরকার। তাই যেদিন সন্ধ্যায় গোবিন্দ-মন্দিরে বৈষ্ণবসমাজ ভাগবত পাঠ শ্রবণের জন্য সমবেত হয়েছেন, সেদিন শ্রীজীবের ইঙ্গিতে কয়েকজন বৈষ্ণব প্রস্তাবটি উত্থাপন করায় সকলেই খুব উৎসাহের সঙ্গে ওই তিন জন তরুন বৈষ্ণবের অর্থাৎ শ্রীনিবাস,নরোত্তম এবং শ্যামানন্দের নাম নির্বাচন করেছিলেন।
বৈষ্ণব সমাজের এই সিদ্ধান্তে ঐ তিন বন্ধুর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। বেশ তাঁরা নীরবে সাধন-ভজন করছিলেন, ভজনসিদ্ধ গোস্বামীদের সঙ্গ করছিলেন, মনের আনন্দে লীলাস্থলগুলি দর্শন করে বেড়াচ্ছিলেন __কখনো যমুনাতটে, কখনো গিরি গোবর্ধনে, কখনো রাধাকুণ্ড তীরে! বৃন্দাবনে থাকা একজন বৈষ্ণবের কাছে এইগুলোই তো বিরাট প্রাপ্তি! সাধের বৃন্দাবন ত্যাগ করতে হবে_ এ দুঃখ তাঁরা রাখবেন কোথায় ! কিন্তু করার কিছু নেই__ প্রবীণ গোস্বামীদের সমবেত সিদ্ধান্ত, সর্বোপরি তাদেরকে বলা হয়েছিল ‘এ নাকি মহাপ্রভুর আদিষ্ট কর্ম’! এ তো মহাব্রত উদযাপন_ তাঁরা একথা ফেলতে পারলেন না। একটা মজবুত কাঠের সিন্দুকের মধ্যে সব গ্রন্থগুলি থরে থরে সাজানো হোলো, তারপর সমবেত গোস্বামীদের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে তাঁরা যাত্রা করলেন নতুন কর্মক্ষেত্র গৌড়ের দিকে। দীর্ঘ পথযাত্রার পর অবশেষে তাঁরা যখন বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের সীমান্তে প্রায় পৌঁছে গেছেন __এমন সময় ঘটলো এক দুর্ঘটনা ! রানা হাম্বীরের সৈন্যদল _সযত্নে ও সতর্কতার সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সিন্দুকের মধ্যে রত্নাদি আছে মনে করে, সিন্দুকটি লুট করে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। এই অমূল্য গ্রন্থরাজির লোকে শ্রীনিবাসের আহার-নিদ্রা ত্যাগ হয়ে গেল, তাড়াতাড়ি এই দুঃসংবাদ পৌঁছে দেওয়া হোলো বৃন্দাবনে শ্রীজীব গোস্বামীর নিকট । বৈষ্ণবসমাজের বুকে নেমে এলো গভীর শোকের ছায়া । কিছুদিন পর শ্রীনিবাসের চেষ্টায় বহু গ্রন্থ পুনরায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। অবশ্য এর পিছনেও একটু ইতিহাস আছে_!
একদিন বিষ্ণুপুর-রাজ, শ্রীনিবাসের নিকট ভাগবত পাঠ ও তার ব্যাখ্যা শুনছিলেন । শ্রীনিবাসের মধুর ব্যাখ্যায় সকলে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় বসেছিলেন । ব্যাখা শুনে রাজা হয়ে পড়েছিলেন ভক্তিবিহ্বল ! রাজা তখন শ্রীনিবাসকেই গুরুপদে বসিয়ে তাঁর নির্দেশে ‘প্রেমভক্তি’-র প্রচার শুরু করে দিলেন । ফলে রাজার চেষ্টাতে বৃন্দাবন থেকে পাঠানো অপহৃত গ্রন্থগুলি পুনরায় উদ্ধার হয়েছিল । গ্রন্থপ্রাপ্তির সংবাদ পৌঁছানোমাত্র শ্রীজীবের আনন্দের আর সীমা থাকলো না ! তিনি বুঝলেন যোগ্য লোকের হাতেই কাজের ভার সমর্পিত হয়েছে । রাধামাধবজী ও মহাপ্রভুর কৃপায় গ্রন্থলুটের মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল এই প্রেম ধর্ম প্রচার ও প্রসারের বীজ!
নরোত্তম ঠাকুর গেলেন উত্তরবঙ্গে, সেখানে তিনি ভক্তির বন্যা বইয়ে দিলেন । তাঁর কীর্তনের তরঙ্গে সেদিন সারা বাংলাদেশ উদ্বেল হয়ে উঠেছিল। শ্যামানন্দ গোস্বামী উড়িষ্যায় যান সেটাই ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র! সেখানকার লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই পরম বৈষ্ণবের আশ্রয় পেয়ে ধন্য হয়ে গিয়েছিল !
এই তিন তরুণ বৈষ্ণব ছিলেন শ্রীজীবের ভক্তি সাম্রাজ্যের প্রধান প্রতিনিধি! এঁরাও _যে কোন কর্ম সম্পাদনের আগে শ্রীজীবের মতামত নিয়ে তবে কাজটি সম্পন্ন করতেন। এইভাবে সুশৃংখলরূপে বৈষ্ণবসমাজের কর্মপদ্ধতি গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল । সুদূর বঙ্গ ও উড়িষ্যার সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ রেখে জীব গোস্বামী এমনি করেই শ্রীচৈতন্যের কর্মধারাকে দীর্ঘদিন উজ্জীবিত করে রেখেছিলেন ।
শ্রীনিবাস, নরোত্তম ও শ্যামানন্দ তিনজনের ছিল অবিচ্ছিন্ন প্রীতি! যেন গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী মিলে ত্রিবেণী সঙ্গম ! তৎকালীন মানুষেরা বলতো_শ্রীনিবাস যেন শ্রীচৈতন্য,নরোত্তম_ নিত্যানন্দ, আর অদ্বৈত _শ্যামানন্দ! ওই তিনের অপ্রকটের পর যেন এই তিনজন আবির্ভূত হয়েছেন ! মহাজনপদে বলা হয়েছে_ “নিত্যানন্দ ছিল যেই _নরোত্তম হইল সেই ,
শ্রীচৈতন্য হৈলা শ্রীনিবাস , শ্রীঅদ্বৈত যারে কয়_ শ্যামানন্দ তেঁহো হয় __ঐছে হৈলা তিনের প্রকাশ।।
সে তিনের অপ্রকটে, এ তিনের আবির্ভাব_ সর্বদেশ কৈলা ধন্য দিয়া অভিলাষ।।”
বৈষ্ণবধর্মের বিস্তারের অনেকটাই শ্রীজীব গোস্বামী জীবনে দেখে গিয়েছিলেন! তাঁরি প্রেরণায় মানসিংহের দ্বারা প্রস্তুত হয় গোবিন্দজীর বিরাট মন্দির । বৃন্দাবনের দিকে দিকে রাধাকৃষ্ণের নয়নাভিরাম দেব-দেউল নির্মিত হয়েছিল।গড়ে উঠেছিল এক সুসমৃদ্ধ বৈষ্ণবসমাজ। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের ভিত্তিমূল যখন দৃঢ়তর হয়ে উঠলো, তখন শ্রীজীব গোস্বামীর জীবনের ভূমিকা সমাপ্তির মুখে পৌঁছে গেলো। সুদীর্ঘ 85 বছরের কর্মময় মহাজীবন এবার যেন চাইছেন বিশ্রাম! 1596 খ্রিস্টাব্দে তাঁর নিত্যলীলা প্রবেশের চিহ্নিত দিনটি ধীরে ধীরে এসে গেল _পৌষ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথি তাঁর তিরোধান দিবস । প্রাণপ্রিয় রাধা দামোদর মন্দির প্রাঙ্গণে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়েছিল । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আপনার জন মৃত্যুর পর চৈতন্যলোকে গমন করলেন ! পড়ে রইল তাঁর বৈষ্ণবসমাজ, বৃন্দাবনবাসী, আর আপামর ভক্তজন, যারা আজও প্রেমে ও ভক্তিতে সেই পরম বৈষ্ণবের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও হৃদয়ের ভালোবাসা জানিয়ে আসছে। যতদিন গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজ থাকবে, ততদিন অম্লান থাকবে শ্রীরূপ, সনাতন ও শ্রীজীব গোস্বামীর নাম!
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।