।। ভাগবত-কথা।।
” শ্রীগৌরাঙ্গের দুটি পদ, যার প্রেমসম্পদ,সে জানে ভকতি রস সার / শ্রী গৌরাঙ্গের মধুর লীলা, তার কর্ণে প্রবেশিলা, হৃদয় নির্মল ভেদ তার।।”
মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ পার্ষদ বৈষ্ণব গোঁসাই-এর মহিমা বর্ণনের প্রয়াসে এবার আমাদের আলোচ্য বিষয় মহাজন “শ্রীজীব গোস্বামী”-র লীলা কাহিনী! রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামীর ভাতুষ্পুত্র শ্রীজীব প্রেমভক্তির পরম পরাকাষ্ঠা ছিলেন । এই তিনজন মহাজনের ভক্তিভাবকে ফুটিয়ে তুলতেই হয়তো শ্রী শ্রী প্রভু জগদ্বন্ধুসুন্দর মধুর পদ রচনা করেছিলেন _”হা রাধাগোবিন্দ বলে কবে ব্রজে যাবো/ অতুল অমূল্য রজে এ দেহ লুকাবো। ধ্বজবজ্রাঙ্কুশচিহ্ন দেখিয়া ধূলায়/ কাঁদিতে কাঁদিতে বক্ষ পাতিব তাহায়।।
…………………..
আনন্দে বসিব কেলিকদম্ব ছায়ায়/ আঁখিজল উপহার দিব যমুনায়।।
পরম ভাগবত বৈষ্ণব শিরোমণি শ্রীজীব গোস্বামীর ভাবটি ছিল উক্ত পদের সমার্থক। আলোচনার শুরুতে শ্রীজীবের বাল্যকাল কেমন কেটেছে, তার একটু খোঁজখবর নেওয়া যাক্! বৃন্দাবন যাবার পথে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু যখন রামকেলিতে আসেন রূপ-সনাতনকে কৃপা করেন, তখন তাঁদের আর এক ভ্রাতা অনুপম ও তার পুত্র শ্রীজীব সেখানে উপস্থিত ছিল। শ্রীজীবের বয়স তখন পাঁচ বছর, ঐ বয়সেই সে তার আরাধ্য ইষ্টকে সংগোপনে দেখে নিয়েছিল আর নিরুপম হেম-কান্তিকে হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছিল । প্রথম দর্শনেই তার শরীরে খেলে গিয়েছিল এক অপার্থিব শিহরণ ! তখন থেকেই শ্রীজীব চোখ বন্ধ করলেই মহাপ্রভুর দিব্যকান্তি শরীর দর্শন করতে পারতেন। মহাপ্রভু রামকেলি ত্যাগ করার পর থেকে বালক শ্রীজীবের এই ছিল ভাব! আর কৃষ্ণভক্তি তার যেন জন্মলব্ধ! সমবয়সী বালকদের সাথে তার ছিল কৃষ্ণ-বলরাম খেলা । তার ছিল পাঠশালার পড়াশোনায় অসাধারণ মনোযোগ, যে কোনো বিদ্যায় রুচি, তবে ভাগবত সর্ব বিদ্যার সার বলে _ভাগবত পাঠে তার অধিক রুচি! ভাগবত গ্রন্থ যেন তার প্রাণ।
জীবের পিতার নাম ছিল বল্লভ, মহাপ্রভু তার নাম রেখেছিলেন অনুপম ! আগেই বলা হয়েছে তিনি ছিলেন রূপ সনাতনের ছোট ভাই । অনুপম ছিলেন রঘুনাথ রামচন্দ্রের উপাসক। রামায়ণ পাঠ, রামকথা শ্রবণ আর রামমন্ত্র জপ _এই ছিল অনুপমের নিত্যকর্ম । রূপ-সনাতন কায়মনোবাক্যে কৃষ্ণভক্ত ছিলেন। তাই একদিন তিনি অনুপমকে ডেকে বললেন _”এসো আমরা তিন ভাই মিলে একসাথে কৃষ্ণভজনা করি, তাহলে আমরা সকলে একসাথে আনন্দ করতে পারবো। অনুপম রামের উপাসক_ কৃষ্ণ উপাসক নয় কিন্তু জ্যেষ্ঠভ্রাতার আদেশ অমান্য করারও নয় । করজোড়ে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার কাছে আবেদন করলেন অনুপম_”তোমরা তাহলে আমাকে প্রথমে কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত করো, তারপর থেকে না হয় আমি কৃষ্ণমন্ত্র জপ করবো।” কৃষ্ণের উপাসনা করবে_ দাদারা খুশি হয়ে ভাইকে কৃষ্ণমন্ত্র দিল, অনুপম সেই মন্ত্রও জপ করতে লাগলো। কিন্তু সেদিন রাত্রে স্বপ্নে সে শুধু রঘুনাথকেই দেখতে থাকলো। কোথাও ভুল হয়েছে বুঝতে পেরে সে চোখের জলে রঘুনাথের কাছে প্রার্থনা জানাতে লাগলো। শেষ রাত্রে আর থাকতে না পেরে রূপ-সনাতনের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে অনুপম বলল_ “তোমরা তোমাদের দেওয়া মন্ত্র ফিরিয়ে দাও, রঘুনাথকে ছেড়ে আমি বাঁচতে পারবো না ! তোমরা আমায় আশীর্বাদ করো, যাতে শ্রীরঘুনাথের চরনে আমার সারা জীবন অচলা ভক্তি থাকে!” রঘুনাথের প্রতি অনুপমের এই প্রচন্ড ভক্তি দেখে সনাতন আদেশ-মন্ত্র ফিরিয়ে নিলেন এবং আশীর্বাদ করে বললেন _”তোমার ইষ্টভক্তি ও নিষ্ঠাকে আমরা সাধুবাদ জানাই।” এই পরম নৈষ্ঠিক রঘুনাথ(রাম) উপাসকের পুত্র শ্রীজীব গোস্বামী।
নরহরি ঠাকুরের ‘ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থ’_ থেকে জানা যায় যে, বালক শ্রীজীব কৃষ্ণলীলা শুনে এবং তা অনুসরণ করে তার ছোট ছোট সঙ্গীদের সাথে খেলা কোরতো ! শ্রীকৃষ্ণ যেমন রাখালগণের সঙ্গে লুকোচুরি, এক একজনের কাঁধে চড়ে ছোটাছুটি__ ইত্যাদি ক্রীড়া করতেন, শ্রীজীবও বাল্যকালে সেইরূপ ক্রীড়া কোরতো। আর যখন একা থাকতো তখন সে তৈরি করত মাটি দিয়ে কৃষ্ণ বলরামের মূর্তি । তারপর সেই মূর্তিকে শুকিয়ে নিয়ে তাকে চন্দন, ফুলের মালা দিয়ে সাজাতো__ আর অকারণ আনন্দে উচ্ছল হয়ে পড়তো। জন্ম-জন্মান্তরের পুণ্যফলের সংস্কার আর দুর্লভ ভক্তিরসের অধিকার নিয়েই যেন তার জন্ম হয়েছিল।
শ্রীজীবের জননীও কম যান না। তিনি সময় সময় পুত্রের কাছে তার পিতৃব্যদের অসাধারণ ত্যাগ-বৈরাগ্যের কথা, তাঁদের ভক্তি-সাধনার কথা প্রকাশ করতেন। এইভাবে কোন্ অজ্ঞাতসারে বালকের অন্তঃকরণে বৈরাগ্যের বীজ ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হতে থাকে । তথাপি মায়ের মন মাঝে মাঝে শঙ্কিত হয় _বালকের বৈরাগী মন কখন কি করে বসে কে জানে ! হয়তো বংশের পূর্বজদের ধারা অনুসরণ করে কন্থা-করঙ্গধারী হয়ে গৃহত্যাগী চলে যায় ! মায়ের মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা_ যেদিন মহাপ্রভু প্রথম রামকেলিতে এসেছিলেন রূপ এবং সনাতনকে কৃপা করার জন্য ! জননী যখন শিশুপুত্র(শ্রীজীব)-কে নিয়ে মহাপ্রভুর চরণ স্পর্শ করালেন, প্রভু স্মিত হেসে শিশুটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। জননীর গভীর বিশ্বাস সেই দৃষ্টিতেই তার সন্তানের জীবনের এই অনন্য রূপান্তর!
মা যাই ভাবুন, বাল্যকাল থেকেই শ্রীজীবের মধ্যে ভক্তিভাবের খুবই প্রাবল্য ছিল, তাছাড়া সে ছিল স্বভাবে উদাসীন। সংসারে বা সাংসারিক কর্মে বড়ই বিরাগ। ছোট বয়স থেকেই ডোর-কৌপীন ও সন্ন্যাস জীবনের প্রতি তার একান্ত টান । সুযোগ পেলেই বৈষ্ণবের বেশে সেজে থাকে, কারণ এই বেশে সাজতে নাকি তার খুব ভালো লাগে ! একদিন এই ব্যাপারটির চূড়ান্তরূপ ঘটে গেল এবং ব্যাপারটা সকলের গোচরে চলে এলো! হয়েছে কি_ সেদিনও শ্রীজীব অন্যান্য খেলার সঙ্গীদের নিয়ে বৈষ্ণব সেজে খেলা করছেন_ এমন সময় হঠাৎ সে ভাবে নৃত্য করতে করতে “শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য” বলতে বলতে মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল ! বাড়ির সকলে ছুটে এসে দেখল জীবের চেতনা ফিরেছে বটে কিন্তু ধুলায় পড়ে সে ঈশ্বরের নাম নিয়ে অঝোরে কাঁদছে! মায়ের বুক ধক্ করে উঠলো_ এই অল্প বয়সে এত বৈরাগ্য! এও পিতৃব্যদের মতো গৃহত্যাগ করে চলে যাবে না তো?
শিশু বয়সে শ্রীজীবের আর একটা চমৎকার ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। একদিন রাত্রে শ্রীজীব স্বপ্ন দেখলেন কৃষ্ণ বলরাম অপূর্ব মূর্তিতে তার সামনে আবির্ভূত হলেন আর সমস্ত ঘর যেন আলোয় ঝলমল করে উঠলো। শিশু বয়স থেকে যাঁদের আরাধনায় সে নিয়োজিত_ তাঁদের দর্শন পেয়ে হৃদয়-মন উল্লাসে ভরে গেল তাঁর ! কিন্তু একি আশ্চর্য! মুর্তিদ্বয় ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হোতে হোতে গৌর-নিতাই এ পরিণত হোল । তাঁরা বালক শ্রীজীবের মাথায় পা রাখলেন । গৌরসুন্দর মধুর কন্ঠে শ্রীজীবকে উদ্দেশ্য করে বললেন_ “আজ হতে তোমাকে নিত্যানন্দের চরণে সমর্পণ করে দিলাম।” পরদিন সকাল হোলো _বালক কিন্তু স্বপ্নের কথা ভুলল না ।।
বালককে পাঠশালায় ভর্তি করা হোল । কিছুদিনের মধ্যে গুরুমশাই বুঝতে পারলেন_ এই বালক আর পাঁচজনের মতো নয়_ এ অনন্যসাধারণ ! তার সুন্দর ব্যবহার এবং বিদ্যাভ্যাসে গভীর মনোযোগের জন্য অচিরেই তিনি সহপাঠীদের এবং গুরুমশায়ের প্রিয় হয়ে উঠলো। অতি অল্প বয়সেই ব্যাকরণ, অলংকার, কাব্য ও স্মৃতিশাস্ত্র আয়ত্ত করে ফেললো সে। ওই বালকের বুদ্ধির প্রখরতা দেখে সকলে অবাক হয়ে গেল। কুড়ি বছর বয়সের মধ্যে সে তৎকালীন স্থানীয় টোল চতুষ্পাঠীর সমস্ত পাঠ শেষ করে ফেলেছিল।
তখন নবদ্বীপ ছিল বাংলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাকেন্দ্র । উচ্চতর শিক্ষার জন্য শ্রীজীব এল নবদ্বীপে। শিক্ষালাভের ব্যাপারে তার উৎসাহের কোনো সীমা নাই। ফলে রামকেলির পাঠ চুকিয়ে পুঁথিপত্র নিয়ে তাকে নবদ্বীপে আসতেই হোল।
ইতিমধ্যে শ্রীজীব স্থির করে নিয়েছিলো যে, সে আর সংসারধর্ম পালন করবে না, ভক্তি সাধনায় জীবন উৎসর্গ করবে, আর চিরকুমার থাকবে ! তার এই সংকল্প কিন্তু সে চারিত্রিক দৃঢ়তায় সিদ্ধ করেছিল । কারণ যে বৈরাগ্যসাধনের সংকল্প সে ছোটবেলাতেই করেছিল, সেই বৈরাগ্যের ঝুলি কাঁধে নিয়ে এই যে সে ঘরের বাইরে এলো _পরবর্তী জীবনে আর সে কখনো গৃহে ফেরে নি।
নবদ্বীপে পৌঁছে তার থাকার ব্যবস্থা মহাপ্রভুর ইচ্ছায় জুটে গেল । নতুন করে পঠন-পাঠনের ব্যবস্থায় যখন সে প্রস্তুত হতে চলেছে, এমন সময় তার কানে এক সুসংবাদ এসে পৌঁছালো । খড়দহ থেকে নিত্যানন্দ মহাপ্রভু নবদ্বীপে এসে পৌঁছেছেন এবং তিনি কয়েক দিন সেখানে অবস্থান করবেন। কোথায় উঠেছেন নিত্যানন্দ প্রভু? _ কেন শ্রীবাস পন্ডিতের গৃহে! শ্রীবাস-অঙ্গন কি গৌরভক্তরা কখনো ভুলতে পারে? কত লীলা, কত ঘটনার সাক্ষী _এই অঙ্গন ! নিত্যানন্দের সাথে গৌরের প্রথম মিলন এখানে_ তাই নিত্যানন্দ উঠেছেন শ্রীবাসের গ্যহে। ছুটে পৌঁছে গেল শ্রীজীব। মহাপ্রভু স্বয়ং যে তাকে নিত্যানন্দের চরণে সমর্পণ করেছেন! দর্শন পাওয়া মাত্র শ্রীজীব নিত্যানন্দের পায়ে লুটিয়ে পড়লো।
শুধু রূপ-সনাতনের ভাতুষ্পুত্র বলে নয় _কেন জানিনা নিত্যানন্দের হৃদয়ে এই নবীন যুবককে দেখে, ও তার স্পর্শ পেয়ে যেন তাঁর আনন্দ-সাগর উথলে উথলে করতে লাগলো! আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হলো নৃত্য _ নিত্যানন্দ প্রভূ আনন্দে আবেশে নৃত্য করতে শুরু করলেন। ভক্তরাও মহাসমারোহে এই দুজনকে ঘিরে মহা নৃত্য শুরু করে দিল। একে তো শ্রীবাস অঙ্গন, তাতে আবার নিত্যানন্দের নর্তন ! মহাপ্রভু স্বমুখে বলেছিলেন_” চারটি স্থানে তাঁর নিত্য আবির্ভাব _শচীর মন্দিরে, রাঘবের ভবনে, শ্রীবাস অঙ্গনে অর্থাৎ কীর্তনে, আর নিত্যানন্দের নর্তনে।” মহাপ্রভুর অপ্রকট হওয়ার এতো দিন পর নবদ্বীপের বৈষ্ণবগণ আবার যেন পূর্বের স্বাদ ফিরে পেল! মহাপ্রভুর উপস্থিতিও যেন সকলে বুঝতে পারছিল ! আনন্দের এই মহাপ্লাবনে শ্রীজীব কিন্তু উঠতেই পারে নি_ সে ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ে ছিল ! নিত্যানন্দ তার দক্ষিণপদের প্রান্ত ভূলুণ্ঠিত শ্রীজীবের মাথায় ঠেকাতেই_ জীবের সম্বিৎ ফিরে এলো ! নয়ন জলে বুক ভাসিয়ে গুরুর চরণ যুগল অভিসিঞ্চিত করলো শ্রীজীব! সার্থক গুরুর সার্থক শিষ্য পরবর্তী কালের বৈষ্ণব শিরোমনি শ্রীজীব গোস্বামী ।।
নবীন শিষ্যকে কাছে পেয়ে নিত্যানন্দের আনন্দের সীমা নেই ! বিংশবর্ষীয় যুবক হোলে কি হবে_ শিশুর মত নিষ্পাপ মুখ, সরলতা ভরা চোখ আর তাতে বুদ্ধির দীপ্তি শ্রীজীবকে আলাদা সৌন্দর্য এনে দিয়েছিল। নিত্যানন্দের ন্যায় মহাপুরুষের তাই এই যুবককে চিনতে একটুও দেরী হয়নি । প্রত্যহ বৈকালে নিত্যানন্দ নিজে নবদ্বীপের রাস্তাঘাট, দর্শনীয় স্থান, মহাপ্রভুর লীলার স্থান _এই সবকিছু তাকে দেখিয়ে বেড়াতেন। মহাপ্রভূর লীলাভূমি দর্শন এবং সেই স্থানগুলিতে মহাপ্রভুর সাথে নিত্যানন্দের বিভিন্ন ঘটনাসমূহের কথা শ্রবণ কোরে_ শ্রীজীবের ভাবাবস্থার সৃষ্টি হতো। একদিন ভাবাবস্থায় শ্রীজীব কাতর কণ্ঠে নিত্যানন্দকে নিবেদন করলো_” প্রভু তোমার পুন্যময় সঙ্গে মহাপ্রভূর আদিলীলার পবিত্র স্থানগুলি দর্শন করলাম, এবার আমার অন্তর বড়ই ব্যাকুল হয়েছে অন্তলীলা দর্শন করার জন্য। তুমি আমাকে আজ্ঞা দাও প্রভু_ আমি নীলাচলে মহাপ্রভুর অন্তঃস্মৃতি বুকে করে সাধন-ভজনে রত হই। আরো একটা বাসনা আমার রয়েছে, তুমি আমাকে আর একটা অনুমতি দাও_ যাতে নীলাচল থেকে ফিরে আমি যেন জীবনের অন্তিম লগ্ন পর্যন্ত তোমার কাছে কাছে থেকে, সদাসর্বদা তোমার সেবা করতে পারি _তোমার প্রকৃত সেবক হয়ে উঠতে পারি! এখন তুমি আমায় কৃষ্ণনামামৃতরূপ সুধারস প্রদান করো।” আগামীদিনের বৈষ্ণবজগতের চিহ্নিত এই নায়ক আর তার বিপুল সম্ভাবনার কথা বুঝে নিতে নিত্যানন্দ প্রভুর সেদিন ভুল হয়নি । তিনি বুঝেছিলেন এই তরুনের মধ্যে যে সম্ভাবনা রয়েছে, যে শক্তির উৎস রয়েছে_ তা একদিন ভারতবর্ষের সমগ্র বৈষ্ণবসমাজের বুকে ঢেলে দেবে ভক্তিরসের প্লাবন! রূপ-সনাতনের উত্তর সাধক শ্রীবৃন্দাবনে ভাবী নিয়ামক এই জীব গোস্বামী।
সপ্রেমে তাকে আলিঙ্গন দিয়ে নিত্যানন্দ বললেন _না_না শ্রীজীব ! নীলাচলে গিয়ে ভাবস্থ হয়ে বসে থাকলে তোমার চলবে না, তোমার এই শরীর দিয়ে প্রভু অন্যান্য কাজ করিয়ে নেবেন_ তোমাকে সেই কাজ করতে হবে! এখানে বর্তমানে আমার শরীর যতদিন থাকবে, ততদিন আর অন্য কারো আমাকে সহযোগিতা করার প্রয়োজন নেই। তুমি চলে যাও বৃন্দাবনে, রূপ-সনাতনের বয়স হয়েছে, তাঁদের অপ্রকট অবস্থায় উত্তরভারতের বৈষ্ণবসমাজকে তুমি নিয়ন্ত্রণ করবে। মহাপ্রভু তোমাদের বংশকেই তো বৃন্দাবন দান করে গেছেন_. তাই সেখানে গিয়ে তুমিও ভক্তি ধর্ম প্রচারের অংশীদার হও। তোমার পিতৃব্যদ্বয় বৃন্দাবনে থেকে ওই কার্যই করে চলেছেন_তুমিও তাঁদের সাহায্যকারী হও। তোমার স্থান আজ থেকে _তাঁদের পাশে! সেখানে থেকে তুমি ঐশ্বরীয় কর্মে সদাসর্বদা নিযুক্ত থাকো_ এই আমার অভিলাষ!” শ্রীজীব এত সব কথা শুনে কাঁদতে লাগলো, বলল _”প্রভু আমি যে দীনাতিদীন, হীনাতিহীন_ এই ভার গ্রহণের যোগ্যতা কি আমার আছে ? প্রভু বললেন _”বৎস ! সে ভাবনা তুমি ভাবছো কেন? ও ভাবনা তো মহাপ্রভুর, কারণ মহাপ্রভুর আদেশেই এই কাজ তোমরা বংশপরম্পরায় করতে প্রবৃত্ত হয়েছো_ তাই তিনিই সব কাজ করিয়ে নেবেন । তবে এক্ষুনি সরাসরি তুমি বৃন্দাবনে যাবে না_ প্রথমে তুমি যাবে কাশীধামে, সেখানে গিয়ে বেদাদি শাস্ত্র অধ্যয়ন করে, সর্বশাস্ত্র-বিশারদ হয়ে _তবেই তুমি বৃন্দাবনে যাবে, তার আগে নয় ! তুমি শুধু রূপ-সনাতনের পান্ডিত্যের উত্তরাধিকার নিয়েই জন্মাওনি, অসাধারণ প্রতিভারও অধিকারী তুমি! আর সেই প্রতিভার স্ফুরণ আমি আজ তোমার চোখে মুখে দেখতে পাচ্ছি! তুমি আর দেরি না করে রওনা হও, কাশীতে গিয়ে বেদান্তের পাঠ নাও!”
কাশীতে তখন মধুসূদন বাচস্পতির প্রবল প্রতাপ । বিখ্যাত পন্ডিত বাসুদেব সার্বভৌমের তিনি প্রিয়তম শিষ্য। মহাপ্রভুর কৃপাধন্য হবার পর সার্বভৌমের জীবনে ঘটেছিল রূপান্তর। অদ্বৈত তত্ত্ব ও ভক্তিসিদ্ধান্ত অনুসরণ করে বেদান্তের ব্যাখ্যা তিনি প্রচার করতে থাকেন । গুরুর কাছে এই নিগূঢ় বিদ্যাশিক্ষা করে মধুসূদন বাচস্পতি কাশীধামের শ্রেষ্ঠ আচার্য রূপে পরিগণিত হয়েছিলেন । গুরুর নিকট বিদায় নিয়ে শ্রীজীব গোস্বামী হাজির হোলেন মধুসূদনের কাছে। নিত্যানন্দ প্রভু তাকে পাঠিয়েছেন শুনেই তাকে শিক্ষাদানে রাজি হোলেন বাচস্পতি মশাই। পাঠ শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই এই তরুণ বিদ্যার্থীর অদ্ভুত মনীষা দেখে যুগপৎ বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে গেলেন আচার্যদেব । মাত্র পঁচিশ বছরের মধ্যেই এই মহা প্রতিভাধর বেদান্ত শাস্ত্রে পারঙ্গম হয়ে উঠলো এবং তখন থেকেই তার শাস্ত্রজ্ঞানের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। শাস্ত্রপাঠ ও বিদ্যার্জনের পর্ব শেষ করে বেদ-বেদান্তে কৃতি হয়ে __এই তরুন তাপস কাঙালের বেশে অর্থাৎ আদর্শ বৈষ্ণবের বেশে শুধুমাত্র কন্থা-করঙ্গ ও মাধুকরী বৃত্তি অবলম্বন করে কাশীধাম থেকে বৃন্দাবনে এসে উপস্থিত হোলো।।
