২০১৩/১
।।ভাগবত-কথা।।
“বন্দে গুরুনীশ ভক্তানীশমীশাবতারকান্। তৎ প্রকাশংশ্চ তচ্ছক্তিঃ কৃষ্ণচৈতন্যসংজ্ঞকম্।।”__কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে সকল গুরুদের, ভগবৎ ভক্তদের, অবতার সকলের এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে বন্দনা করে তাঁর গ্রন্থ শুরু করেছিলেন । তিনি লিখেছিলেন _”মন্ত্রগুরু আর যত শিক্ষাগুরুগণ / তা সবার আগে করি চরণ বন্দন।/ শ্রীরূপ, সনাতন, ভট্র রঘুনাথ/ শ্রীজীব, গোপাল ভট্র, দাস রঘুনাথ । /এই ছয় গুরু শিক্ষাগুরু যে আমার/ ইহা সবার পাদপদ্মে কোটি নমস্কার।।
গুরুর মহিমা বোঝাতে কবিরাজ মহাশয় আবার বলেছেন _”গুরু কৃষ্ণরূপ হ’ন, শাস্ত্রের প্রমাণে /গুরুরূপে কৃষ্ণ কৃপা করেন ভক্তগণে ।।” শ্রীমদ্ ভাগবতের 11/17/27 শ্লোকে আছে__” আচার্যং মা বিজানীয়ান্নাবমন্যেত কর্হিচিৎ । ন মর্ত্ত্যবুদ্ধ্যাসূয়েত সর্বদেবময়ো গুরুঃ।।” __ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উদ্ধবকে বলেছিলেন_” উদ্ধব গুরুকে আমার স্বরূপ বলে জানবে । মনুষ্য জ্ঞান করে তদীয় অবমাননা করা কর্তব্য নহে । কারণ গুরুদেব সর্বদেবময় ।”
চৈতন্যচরিতামৃতকার কৃষ্ণদাসের এক গুরু ছিলেন এই ভট্র রঘুনাথ । প্রায় প্রতিটি পরিচ্ছেদে গুরুদেরকে স্মরণ, মনন এবং তাঁদের প্রতি বিনীত ভাব প্রকাশ করেছেন এই মহান লেখক ! ধন্য তাঁর গুরুপ্রেম,গুরুভক্তি ! যার জন্য তিনি সাধারণ মানুষের কাছে আজও স্মরণীয় বরণীয় হয়ে রয়েছেন ! তবে গুরুভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে ইতিহাসে নিজেকে অমর করে রেখেছে __এমন অনেক নাম রয়েছে! তার মধ্যে রামানুজ সম্প্রদায়ের রামানুজগোস্বামীর শিষ্য-দম্পতি আচার্য কার্পাসরাম ও তার স্ত্রী লক্ষীদেবীর নাম প্রথমদিকেই রাখা যেতে পারে । ‘বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ’-এর প্রবক্তা রামানুজ আচার্য শংকরের ‘অদ্বৈতবাদ’কে খন্ডন করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । ফলে বোঝাই যাচ্ছে, শ্রীরামানুজও ঈশ্বরকল্প মহাপুরুষ ছিলেন । অষ্টসহস্র গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মন দম্পতি_তাঁর কাছে দীক্ষাগ্রহণ করে ধন্য হয়েছিলেন। কিন্তু তারা এতই গরীব ছিল যে, ব্রাহ্মণকে প্রতিদিন ভিক্ষায় বের হতে হতো ঠাকুরের ভোগের জোগাড় করার জন্য ! কিন্তু প্রাণে সাধু __একদিন না একদিন তারা সশিষ্য গুরুদেবের সেবা করাবেন ! সাধ আছে সাধ্য নাই ! দিন যায় ব্রাহ্মনের অবস্থা দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয় । বাড়ির গৃহিণী লক্ষীদেবীর গহনা ছাড়াও বাড়ির বাসনপত্র ইত্যাদি সবই অভাবের তাড়নায় একে একে চলে যায় !
পাশের বাড়ির ধনী ব্যবসায়ীর বহুদিনের দৃষ্টি ছিল লক্ষ্মীদেবীর সৌন্দর্যের উপর! অভাবের সুযোগ নিতে চাইলো ব্যবসায়ী ! শাড়ি, গহনা, টাকা-পয়সা__ দাস-দাসীর হাত দিয়ে পাঠাতে লাগলো । কিন্তু লক্ষ্মীদেবীর আত্মমর্যাদা কখনো ক্ষুন্ন হয়নি! উনি যথারীতি সেসব প্রত্যাখ্যান করতেন । একদিন কন্দর্প-পীড়িত ধনী ব্যক্তিটি সরাসরি লক্ষ্মীদেবীর কাছে গিয়ে তার মনের ভাব ব্যক্ত কোরলো। ব্রাহ্মণের অনুপস্থিতিতে এই ঘটনা ঘটায়_ অনন্যোপায় হয়ে সতী নারী পুকুরে ডুবে আত্মহত্যায় প্রবৃত্ত হচ্ছেন দেখে _ব্যবসায়ী সেদিন ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
এমন সময় একদিন বারোজন শিষ্য নিয়ে গুরুদেব রামানুজ হাজির হোলেন লক্ষ্মীদেবীর বাড়ী। একমাত্র শতজীর্ণ বস্ত্র পড়ে লোকের সামনে বেরোতে পারছিলেন না লক্ষীদেবী! তাই ঘর থেকে হাততালি দিয়ে সংকেত করছিলেন গুরুদেবকে ! অন্তর্যামী গুরুদেব মাথার পাগড়ির কাপড়খানা ছুঁড়ে দিলেন ভগ্নঘরে। সেটি পড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে গুরুদেবকে দরিদ্রের পর্ণকুটিরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নয়নজলে তার চরণ দুখানি ধুয়ে_ চুল দিয়ে গুরুদেবের চরণ মুছে দিলেন লক্ষীদেবী ! মুখে বললেন_ “আপনার এত দয়া ঠাকুর! আমরা হতদরিদ্র জেনেও আমাদের বাড়ি এসেছেন সেবার অধিকার দিতে!” গুরুদেব প্রসন্নমুখে হাসলেন এবং কুশল জিজ্ঞাসা করলেন । জানতে পারলেন গৃহস্বামী কার্পাসরাম ভিন্ন গ্রামে গেছে! তিনি বললেন_ “মা ! তুমি ভোগ ও সেবার আয়োজন করো_ আমরা পাশের নদীতে স্নানান্হিকাদি সেরে আসছি! অকুল দরিয়ায় পড়লেন লক্ষীদেবী ! ওদের স্বামী-স্ত্রী দুজনের জন্য খাবারের আয়োজন নেই, সেখানে 12/ 14 _জনের জন্য সেবা ? তায় গুরুদেবের জন্য বিশেষ সেবা ! সেবা হবে কি করে? তার কত ইচ্ছা ছিল _গুরুদেবকে পঞ্চ-ব্যঞ্জন সহকারে সেবা করবেন_ তাহলে কি হবে ? হটাৎ তার মনে পড়ে গেল _পাশের ধনী ব্যবসায়ীর কথা! তার দেহ বা রূপ-যৌবনের বিনিময় ওই ব্যবসায়ী সেবার আয়োজন করে দিতে পারে তো! ছুটলেন তিনি প্রতিবেশীর বাড়িতে! বিস্মিত, হতচকিত ব্যবসায়ী যখন শুনলো যে, তার প্রস্তাবে রাজি হয়েছে লক্ষীদেবী এবং গুরুসেবার পর আজ সন্ধ্যাতেই লক্ষ্মী আসবে তার কাছে, তার কামনা পুরনের জন্য ! তখন সে 14 /15 জনের মতো শুধু চাল, ডাল, নুন, তেল, শাকসবজি,মিষ্টান্নাদিই নয়, জ্বালানি- বাসনপত্র সহ, সমস্ত রকম দ্রব্য এবং রান্নার লোক জোগাড়ের লোক__ সব পাঠিয়ে দিলো। লক্ষীদেবী স্নান সেরে মনের আনন্দে ঠাকুরের ভোগ ও গুরুদেবের সেবার নিমিত্ত পঞ্চ-ব্যঞ্জন সহকারে অন্ন প্রস্তুত করে ফেললেন ! যথাসময়ে গুরুদেব এসে ঠাকুরকে ভোগ নিবেদন করে আহারে বসলেন এবং পরিতৃপ্তি সহকারে ভোজন সমাপ্ত করে বাড়ির বাইরে এক বৃক্ষতলে চলে গেলেন বিশ্রামের নিমিত্ত (কারণ বাড়িতে তেমন কোনো জায়গা ছিল না)! কিছুক্ষণ পরে কার্পাসরাম এসে গুরুদেবকে বিশ্রামরত অবস্থায় দেখে এবং তাঁর পরিতৃপ্তি সহকারে ভোজন সমাপ্ত হয়েছে শুনে হতবাক হয়ে গেলেন। ছুটতে ছুটতে স্ত্রীর কাছে এসে এই চমৎকার ব্যবস্থা কিভাবে সম্পন্ন হয়েছে_ তার বৃত্তান্ত শুনলেন ! সব শুনে দুঃখিত না হয়ে, গুরুসেবা সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং সর্বোপরি সেই সেবায় গুরু প্রসন্ন হয়েছেন শুনে _কার্পাসরাম স্ত্রীকে ও সেই ধনী ব্যক্তি দুজনকেই ধন্যবাদ জানাতে লাগলেন । তিনি স্ত্রীকে বললেন _’তিনি সন্ধ্যার সময় নিজে গিয়ে ওই ধনীর বাড়িতে তাকে দিয়ে আসবেন, আর ওই ব্যবসায়ীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে আসবেন!’ সন্ধ্যার সময় লক্ষ্মীদেবী স্বামীর সাথে গুরুদেবের ভূক্তাবশিষ্ট প্রসাদ নিয়ে সেই ধনী ব্যক্তির প্রাসাদে গিয়ে হাজির হোলেন । সেই ব্যক্তি সন্ধ্যার অন্ধকারে লক্ষীকে একলা তার ঘরে পেয়ে আনন্দে অধীর! লক্ষীদেবী শান্তকণ্ঠে বললেন _”আমি আপনার জন্য গুরুদেবের প্রসাদ এনেছি একটু গ্রহণ করুন, আর আমার স্বামী আপনাকে ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন_ তাও গ্রহণ করুন!” এতো বড় একটা ঘটনায় স্বামী ক্রুদ্ধ না হয়ে ধন্যবাদ দিতে এসেছে এবং স্ত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে __ এক কামুক, নারীদেহলোভী ব্যক্তির হাতে তুলে দিতে এইটা দেখে ব্রাহ্মন পরিবারের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেলো সেই ধনী ব্যবসায়ী! এরপর গুরুদেবের প্রসাদ মুখে গ্রহন করতেই__ শুরু হোল তার মধ্যে ভাবান্তর ! হঠাৎ সে যেন বুঝতে পারলো যে, সে মহা ভুল করতে যাচ্ছিল! বাস্তবেও এই রকমটাই হয় _মানুষের ভুল হটাৎ-ই ভাঙে ! এক ঝটকায় সবকিছু ওলোট-পালট হয়ে যায়। ধ্যানের গভীরে জ্ঞানলাভ‌ও এইরকম‌ই হঠাৎ করেই হয় । ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন_ “হাজার বছরের অন্ধকার, আলো জ্বাললেই আলোয় আলোয় ঝলমল !”
ঠিক তেমনি চেতনার আলোয়, বিবেকের আলোয় ঝলমল করে উঠল ওই ধনী ব্যবসায়ীর অন্তঃকরণ ! ব্রাহ্মনকে ডেকে লক্ষ্মীদেবীর পাশে দাঁড় করালো সে! দুজনকে পিতৃ ও মাতৃজ্ঞানে প্রণাম ও আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করলো চোখের জল ফেলে । ক্ষমা প্রার্থনা করলো তার পূর্ব কৃতকর্মের জন্য। হেনকালে সমস্ত ঘটনার নির্মাণকারী গুরুদেব রামানুজ সেখানে সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই ত্যাগের মাহাত্ম্য স্বচক্ষে দেখলেন। সেই ধনীর ভাবান্তর হয়েছে দেখে তাকেও চরণে স্থান দিলেন। আর এই দম্পতির গুরুভক্তির পরাকাষ্ঠাকে চিরস্থায়ী করার জন্য তাঁর রামানুজ সম্প্রদায়ের নাম রাখলেন ওই লক্ষীর নাম অনুসারে “শ্রী সম্প্রদায়”!
ইষ্টসেবা,গুরু সেবা, পিতা মাতার সেবাকে এই ভাবেই ইতিহাসে মহিমান্বিত করা হয়েছে। আমাদের আলোচ্য ভট্র রঘুনাথ করে চলেছেন পিতা মাতার সেবা মহাপ্রভুর নির্দেশে ! যেমন পান্ডুরপুরের পুন্ডরীক করেছিলেন পিতা মাতার সেবা আর দুখানি ইট ছুড়েছে দিয়েছিলেন ভগবানকে ! আজও পান্ডুরপুরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণ চিহ্ন আঁকা রয়েছে। কথিত আছে__ যে সময় ঠাকুর পুন্ডরীকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন _সে সময় নাকি দ্বারকায় ভগবানের মন্দিরে সাময়িকভাবে বিগ্রহ ছিল না ! পুন্ডরীকের সাথে লীলা সম্পন্ন হওয়ার পর আবার মন্দিরে মূর্তি বিরাজিত হয় । পান্ডুরপুরের বিটঠলজীর মুর্তি আর চরণচিহ্ন স্বয়ং মহাপ্রভু দেখে এসেছিলেন ।
মহাপ্রভু রঘুনাথকে বলেছিলেন__ ‘যে সন্তান পিতা-মাতার সেবা করে তার কৃষ্ণলাভ হয় এবং এইরূপ সুযোগ্য পুত্রের পিতা-মাতারও পরম গতি লাভ হয় । সুতরাং একনিষ্ঠ হয়ে পিতামাতার সেবা করেন রঘুনাথ । চার বছর সেবা নেওয়ার পর তাঁর পিতামাতার দেহান্ত হয় । তাঁদের শ্রাদ্ধাদিকর্ম সম্পন্ন হোলে গৃহত্যাগ করে রঘুনাথ চললেন নীলাচলের উদ্দেশ্যে_ যেথায় রয়েছে তাঁর ইষ্ট, তাঁর মনের শান্তি- প্রাণের আরাম ! এখানে মোট আট মাস প্রভূর সঙ্গ করার সুযোগ পেয়েছিলেন রঘুনাথ। চুটিয়ে প্রভূর সঙ্গ, ভক্ত সঙ্গ করা আর দারুব্রহ্ম দর্শনে দিনগুলি মহানন্দে কাটছিল তার ! কিন্তু দিন কি একভাবে যায়__ যায় না !
এক সুন্দর সকালে মহাপ্রভু বিধান দিলেন _ “রঘুনাথ ! তুমি বৃন্দাবনে যাও, সেখানে গিয়ে রূপ সনাতনের সঙ্গ করো, ভাগবত পাঠ করো আর সদাসর্বদা কৃষ্ণ নামে মত্ত থাকো । প্রভুসঙ্গ বিচ্যুতির কথা ভেবে চোখের জল ফেলতে লাগলেন রঘুনাথ। কিন্তু মহাপ্রভুর আদেশ পালন _সেটাই বা কম কি? বৃন্দাবন যাবার দিন স্থির হোল । মহাপ্রভু নিজের হাতে জগন্নাথদেবের প্রসাদী চৌদ্দ হাত তুলসীর মালা এবং দারুব্রহ্মের প্রসাদী পানের খিলি রঘুনাথকে উপহার হিসেবে দিলেন। আর সেই উপহারের স্পর্শে রঘুনাথের মধ্যে শক্তি সঞ্চার হোলো । রঘুনাথ এসে পৌঁছালেন বৃন্দাবনে। রূপ-সনাতনের আশ্রয়লাভ হোল_সেও কি কম ভাগ্যের কথা ! ভাগবত পাঠ চলতে লাগলো, আর চলতে লাগলো গোবিন্দজীর সেবা! ভাগবত পাঠ করতে করতে তাঁর মধ্যে অষ্টসাত্বিক ভাবের উদয় হোত । সুমধুর কন্ঠের অধিকারী ছিলেন রঘুনাথ। সেই মধুর সুরে, সুললিত ছন্দে তিনি যখন ভাগবত পাঠ করতেন বা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন করতেন_ তখন তিনি নিজেও যেমন তন্ময় হয়ে যেতেন, আর যারা শুধতো_ তারাও মোহিত হোত। গান গাইতে গাইতে_ যে মহাজনপদে শ্রীকৃষ্ণের রূপ-মাধুর্যের বর্ণনা থাকে, তাতে রঘুনাথ যেন কেমন আত্মহারা,আত্মস্থ হয়ে যেতেন ! তখন তিনি কি দেখছেন, কি বলছেন _কিছুই ঠিক থাকতো না। যা বলতে চাইতেন যা বোঝাতে চাইতেন _তা বলতে পারতেন না ! শোতৃমন্ডলীকে তা বোঝাতেও পারেন না । আর বোঝার বা বোঝাবার প্রয়োজনটাই বা কি ? গোবিন্দের চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়া বা আত্মসমর্পণ‌ই তো মানবজীবনের উদ্দেশ্য__ তা যখন হয়ে গেছে তখন ধন্য ধন্য ভক্ত চূড়ামণি রঘুনাথ _তুমি ধন্য ! এই সংসারে গোবিন্দ পাদ-পদ্ম‌ই তো ভক্তের প্রাণের প্রাণ_ প্রাণারাম ! আরাধ্য গোবিন্দজী মন্দির নেই, ভালো বেশভূষা অলংকারাদি নেই, ভক্তদের এই বাণ্ছাও রঘুনাথ পূর্ণ করলেন । একজন ধনী বনিককে অনুরোধ করতেই সে এই সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিল ।
যতদিন যায়, রঘুনাথ আরো বেশি করে অন্তর্মুখী হয়ে যান । শ্রী গোবিন্দের নামগান ছাড়া অন্য কিছু মুখে জানেন না- কানেও শোনেন না । কৃষ্ণকথাতেই তার সারা দিবস-রজনী কেটে যায় । সকলেই কৃষ্ণভজন করছে_ এই বিশ্বাসে কোনো বৈষ্ণবনিন্দা শুনতে চান না তিনি । বৃন্দাবনে আগমনকালে প্রভূর দেওয়া চৌদ্দ হাত তুলসীমালা সযত্নে সর্বদাই ধারণ করে নিরন্তর জপ করেন কৃষ্ণনাম! শ্রীমদ্ভাগবতে রঘুনাথের অসামান্য অধিকার ! তিনি যখন ভাগবত পাঠ ও ব্যাখ্যা করেন _তখন উপস্থিত শোতৃমন্ডলী মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যান । যেমন সুমধুর কন্ঠের স্বর তেমনি উচ্চারণের নির্মলতা, আবার তদুপরি সংযোজন অপূর্ব সঙ্গীতকৌশল ! মহাপ্রভু বলেছিলেন _”বেদান্তের প্রাঞ্জল ভাষ্যই ভাগবত।” রঘুনাথ ভাগবতের ব্যাখ্যায় সেই মত‌ই অনুসরণ করতেন। রঘুনাথ নিজে কোনোদিন কোনো গ্রন্থ লেখেন নি। তাঁর নিত্যকর্ম ছিল কৃষ্ণভজন ও ভাগবত পাঠ। শেষের দিকে জগত থেকে তার নেওয়ার তো আর কিছুই ছিল না _শুধুই দেবার ছিল ! অপটু শরীরের জন্য আর যখন সেই দেওয়ায় কমতি পড়তে লাগলো_ রঘুনাথ নিজেকে প্রস্তুত করলেন কৃষ্ণচরণে চিরলীন করার জন্য । প্রত্যুষে স্নানান্তে মহাপ্রভুর প্রসাদ সেই চৌদ্দ হাত তুলসী মালা কন্ঠে ধারণ করে মহানাম জপ করতে করতে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে চলে গেলেন চৈতন্যলোকে ।।