২০১২/৪
।।ভাগবত-কথা।।
“অন্তঃকৃষ্ণং বহির্গৌরং দর্শিতাঙ্গাদিবৈভবম্। কলৌ সংকীর্ত্তনাদ্যৈঃ স্মঃ কৃষ্ণচৈতন্যমাশ্রিতাঃ।।”__যিনি অন্তরে কৃষ্ণ ও বাহিরে গৌর, যাঁর মহিমা অন্তরঙ্গ ভক্তবৃন্দে সুপ্রকাশিত, সেই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে কলিযুগে সংকীর্তনাদির দ্বারা ভজনা করি।
আমরা পরম প্রেমময় ঠাকুর শ্রীচৈতন্য গোঁসাইয়ের পার্ষদদের প্রসঙ্গ বর্ণনা করতে করতে ছয় গোঁসাইকে পরপর আনার চেষ্টা করছি । কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর অমূল্য গ্রন্থ, যা গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজের আকরগ্রন্থ বললেও অত্যুক্তি হয়না _সেই গ্রন্থের ভনিতায় ছত্রে ছত্রে বলেছেন _ ” শ্রীরূপ রঘুনাথ পদে যার আশ/ চৈতন্যচরিতামৃত কহে কৃষ্ণদাস।।”_ চৈতন্যলীলায় রঘুনাথ দুজন ছিলেন । দু’জনকেই কৃষ্ণদাস গুরুবৎ মান্য করতেন _একজন ভট্র রঘুনাথ ও অন্যজন দাস রঘুনাথ। আমাদের আজকের আলোচনা ভট্র রঘুনাথকে নিয়ে।
মহাজন কথায় বলা যায় __”শ্রীকৃষ্ণের যত লীলা, সর্বোত্তম নরলীলা”! আর ভক্তের কাছে ভগবান সাক্ষাৎ প্রেমস্বরূপ, কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখেছেন _” কৃষ্ণপ্রেম সুনির্মল, যেন শুদ্ধ গঙ্গাজল _ সেই প্রেম অমৃতের সিন্ধু। নির্মল সে অনুরাগে, না লুকায় অন্য দাগে/ শুক্লবস্ত্রে যৈছে মসীবিন্দু। শুদ্ধপ্রেম সুখসিন্ধু_ পাই তার এক বিন্দু/ সেই বিন্দু জগৎ ডুবায়।কহিবার যোগ্য নহে তথাপি বাউলে কহে/কহিলেও কে বা পাতি চায়।।”
আর ভগবানের নরলীলাই যে শ্রেষ্ঠ লীলা তা বোঝা যায়, কারণ দেব-ঋষি ইত্যাদিরাও নরদেহ ধারণ করে আসেন ভগবৎ প্রেম আস্বাদনের জন্য। এবার রাধার বিরহ ব্যথা প্রকাশ ও আস্বাদনের জন্য গৌরহরির আবির্ভাব । মহাপ্রভু যখন পূর্ববঙ্গ সফর করছিলেন তখন তার সাথে তপন মিশ্র নামে এক ভক্তের দেখা হয়। মহাপ্রভু তাকে আদেশ করেন _”তুমি কাশীধামে গিয়ে বসবাস করো, সেখানে তোমার সাথে আমার দেখা হবে।” প্রভুর আদেশ শিরোধার্য করে তপন মিশ্র সপরিবারে কাশীধামে গিয়ে বসবাস করতে লাগলেন । কাশীধামে পৌঁছানোর দু’বছরের মধ্যেই তপন মিশ্রের পুত্ররূপে জন্ম নেন রঘুনাথ।
মহাপ্রভু নীলাচল থেকে বৃন্দাবনে যাবার পথে কাশীতে এসে পৌঁছালেন। মণিকর্ণিকা ঘাটে প্রভু একদিন স্নান করছেন_ তখন তপন মিশ্রের সাথে দেখা হয়ে গেল তাঁর। প্রথমবার যখন প্রভুর সাথে তপনের দেখা হয়েছিল, তখন তপন দেখেছিলেন গৃহস্থী নিমাই পণ্ডিতকে। এখন দেখলেন এক দিব্য সন্ন্যাসীরূপে শ্রীচৈতন্যকে! দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না ভক্ত তপন মিশ্র _লুটিয়ে পড়লেন তাঁর রাতুল চরণে! প্রভু সস্নেহে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন বিশ্বেশ্বর ও বিন্দুমাধবের মন্দিরে ! নানা কথার পর তপন মিশ্রের আন্তরিক আমন্ত্রণে প্রভু গেলেন তার বাড়ি । ভগবান আজ অতিথি! কিভাবে তাঁর সেবা করবেন_ কূলকিনারা পাচ্ছেন না গৃহস্বামী! সকলে ভগবানের পদধৌত জল পান করে ধন্য হলেন। আর প্রভুর ভোজনান্তে গ্রহণ করলেন উচ্ছিষ্ট মহাপ্রসাদ! আহার্য গ্রহণের পর মধ্যাহ্নের বিশ্রাম। এই সময় চুপিসারে মহাপ্রভুর বিশ্রামাগারে ঢুকে পড়েছেন কিশোর রঘুনাথ। প্রভুর চরণকমল দুটি বক্ষে ধরে শুরু করেছেন পদসেবন এবং কি আশ্চর্য ! প্রভু পরম তৃপ্তিতে সেবা গ্রহণ করছেন ! কিন্তু কে এই কিশোর __এই সেই রঘুনাথ ! পরবর্তীতে যার স্থান হয়েছিল শ্রীবৃন্দাবনে রূপ ও সনাতন গোস্বামীর মন্দিরে। আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল বৈষ্ণব শিরোমনি রূপে।ওই সময় মহাপ্রভু কাশীতে টানা দশদিন ছিলেন । সারাদিন ঘোরাঘুরি, তীর্থদর্শন, ধর্মালোচনা ইত্যাদি সবকিছু হোলেও মধ্যাহ্ন ভিক্ষা বা সেবা হোত তপন মিশ্রের বাড়িতে। আর প্রভু গৃহে আসার পরই শুরু হোতো রঘুনাথের সেবা। প্রভূকে স্নানের জোগাড় করে দেওয়া, প্রভুর গাত্রমার্জন করা, প্রভুর সেবার উপাচার জোগান দেওয়া, আর বিশ্রামকালে পদসেবন । কিন্তু প্রভু যখন চোখের আড়ালে থাকতেন তখন সবার অলক্ষ্যে চলত মানস-পূজা । প্রভুর লীলা কে বুঝতে পারে ! বৃন্দাবন থেকে ফেরার পথে আবার দু মাসের জন্য কাশীতে থেকে গেলেন মহাপ্রভু । তবে কি রঘুনাথের সেবার লোভে না রঘুনাথকে ধন্য কোরতে! মহাপ্রভুর ভোজন শেষে তাঁর বাসন মাজা, গাত্রমর্দন ও পদসেবায়_ মহানন্দে দিন কাটে রঘুনাথের। তবু আশা মেটে না, মনে হয় কত দিনে সর্বক্ষণের জন্য সে প্রভুর সেবক হতে পারবে।
প্রভুর কাশীধাম ত্যাগ করার সময় আসন্ন হোল, চোখের জলে কাশীর ভক্তরা প্রভুকে বিদায় জানালো, কিন্তু তপন এবং রঘুনাথ জিদ ধরলেন _তারাও প্রভুর সঙ্গে যাবেন ! প্রভু নিরস্ত করলেন তাদের, বললেন_ “যদি তোমরা যেতে চাও তো পরে এসো! এখন আমার সাথে তোমাদের যাওয়া হবে না !” প্রভুর আদেশ শিরোধার্য ! ক্রমে রঘুনাথ বড় হলেন । প্রভুর বিরহবেদনা তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠল । একদিন সমস্ত কাজকর্ম ফেলে তিনি যাত্রা করলেন নীলাচলের পথে । প্রভুর সেবা ভোগের জন্য নানা উপকরণ সাজিয়ে একজন সেবকের মাথায় তা চাপিয়ে প্রভুর নাম স্মরণ করতে করতে এগিয়ে চললেন রঘুনাথ। রঘুনাথ প্রসঙ্গে শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতকার কি লিখেছেন তা দেখা যাক_”বারানসী মধ্যে প্রভুভক্ত তিনজন/ চন্দ্রশেখর বৈদ্য আর মিশ্র তপন।/ রঘুনাথ ভট্টাচার্য মিশ্রের নন্দন / প্রভু যবে কাশী আইলা দেখি বৃন্দাবন।/ চন্দ্রশেখর গৃহে খৈল দুই মাস বাস,/ তপন মিশ্রের ঘরে ভিক্ষা দুই মাস।/ রঘুনাথ বাল্যে কৈল প্রভূর সেবন, উচ্ছিষ্টমার্জন আর পাদ-সংবাহন।।”
এই সেই কৃপাধন্য রঘুনাথ! চলেছেন নীলাচলের পথে। পথ চলতে চলতে আলাপ হলো রামদাস নামে এক ভক্ত পন্ডিতের সঙ্গে । তিনি পরম বৈষ্ণব রামচন্দ্রের উপাসক। অষ্টপ্রহর রামনাম জপ করেন । রঘুনাথের মধুর ব্যবহারে তিনি খুবই সন্তুষ্ট হোলেন । মহাপ্রভুর লীলাকথা শুনে তাঁর সেবা-পূজার উপাচার রঘুনাথের মাথা থেকে নিয়ে নিজের বুকে ধারণ করে পথ চলতে লাগলেন । রঘুনাথ বললেন_”আপনি এটা কি করছেন? আপনি একে পন্ডিত,তায় আবার মহাভাগবত ! আপনি এই ভার মাথায় নিয়ে দীর্ঘ পথ কেন চলতে চাইছেন ?” রামদাস শুনলেন না, প্রভুর উপাচার মস্তকে ধারণ করে মহানন্দে ভগবৎ প্রসঙ্গ করতে করতে পথ হাঁটতে লাগলেন। ___”জগন্নাথ স্বামী নয়নপথগামী, ভবতু মে!” নীলাচলে পৌঁছে মহাপ্রভুর চরণে লুটিয়ে পড়লেন রঘুনাথ! ভাবাবেশে প্রভু রঘুনাথকে আলিঙ্গন করলেন, আবেশ কাটিয়ে বললেন _”ভালোই হয়েছে তুমি এখানে এসেছো! তুমি আমার এখানেই প্রসাদ পাবে!” ভক্ত গোবিন্দকে পাঠিয়ে প্রভু__ রঘুনাথের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন । তবে নীলাচলে পৌঁছানোর পর থেকে প্রভূর রন্ধনাদির দায়িত্ব নিলেন সুনিপন রাঁধুনি রঘুনাথ ! অমৃতময় বিভিন্ন ব্যন্জনসহ সুখাদ্য রান্না কোরে রঘুনাথ মনের আনন্দে প্রভুকে খাওয়াতে লাগলেন। আর ভক্তবৎসল ভোজনরসিক মহাপ্রভু ভক্তবাঞ্ছা পুরণ করার জন্য আনন্দে সেবা গ্রহণ করতে লাগলেন । ওই সময় রঘুনাথ প্রভুর দর্শন, স্পর্শন ও সেবার মানসে প্রায় আট মাস নীলাচলে অর্থাৎ পুরীধামে থেকে গিয়েছিলেন । যখন বিদায় নেবার সময় হোল _প্রভুর চরণ ধরে কাঁদতে লাগলেন রঘুনাথ__” প্রভু আদেশ করুন, কিভাবে জীবন পথে এগিয়ে চলবো!” প্রভু বললেন _”রঘুনাথ গৃহে ফিরে যাও, বৃদ্ধ পিতামাতার সেবা করো । বিবাহ কোরনা, কোনও বৈষ্ণবের কাছে ভাগবত পাঠ নিও, আর একবার নীলাচলে এসো।” ভাবে বিগলিত প্রভু নিজের কন্ঠমালা রঘুনাথকে পরিয়ে দিলেন । উপস্থিত বৈষ্ণবগণ হরিধ্বনি দিয়ে উঠলো। রঘুনাথ কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে পড়ে গেলেন।
পিতা-মাতার সেবার জন্য রঘুনাথকে গৃহে পাঠালেন মহাপ্রভু ! পিতা-মাতার সেবাই জগতের মহান কাজ, মহান আদর্শ পালন ! জগতে মত মহৎ ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছেন__ সকলেই তাদের নিজ নিজ পিতামাতার প্রতি কর্তব্যপরায়ন ছিলেন। পিতা-মাতার সেবাই শ্রেষ্ঠ সেবা –“মাতৃ ভক্ত গনের প্রভু শিরোমনি / সন্ন্যাস করিয়া সদা সেবেন জননী।।”
পিতামাতার সেবা করলে ভগবান সেই পিতা-মাতার সেবক ভক্তের প্রতি অধিক কৃপাপরায়ন হ’ন ! পিতা-মাতার একনিষ্ঠ সেবক পুণ্ডরীক আর বিটঠলজীর ঘটনা এ ব্যাপারে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি_ তাই উল্লেখ করছি!__ পুণ্ডরীক তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঙ্গে মহারাষ্ট্রে, ভীমা নদীর তীরে পান্ডুরপুর গ্রামে বাস করতেন । তার একনিষ্ঠভাবে পিতামাতার সেবাকার্য দেখে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং নারায়ন ভক্তের সঙ্গে লীলা করতে মনস্থ করলেন । ভাবলেন_” যাই ভক্তকে একবার দেখে আসি !” পুণ্ডরীকের গৃহদ্বারে এসে তাকে ডেকে ভগবান বললেন _”পুন্ডরীক! বাইরে এসো, আমি তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি !” পুণ্ডরীক ঘরের ভেতর থেকেই বলল_” আমার এখন সময় নেই, আমি পিতা-মাতার সেবায় ব্যস্ত!” “আমি দ্বারকাধীশ ! দ্বারকা থেকে আসছি, তোমার সাথে আলাপ করতে চাই!” _আগন্তুক বললেন। ভেতর থেকে কঠিন উত্তর ভেসে এলো_” দ্বারকা থেকেই আসো, আর গোলোক থেকেই আসো__ আমি এখন বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবায় ব্যস্ত ! আমার সাথে আলাপ করতে হলে বাইরে অপেক্ষা করতে হবে !” “কিন্তু কতক্ষন?” __ আগন্তুকের জিজ্ঞাসা! পুণ্ডরীক দৃঢ় কন্ঠে উত্তর দিলেন_ বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবাকার্য সমাধা করে, যখন আমার অবসর মিলবে, তখন নাহয় আলাপ হবে!” আগন্তুক বলল_” তাই নাহয় হবে, কিন্তু ততক্ষণ আমি বসবো কোথায়?” পুণ্ডরীক তখন দুটি ইঁট ছুঁড়ে দিল বাইরে এবং বলল_ “এর উপরে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করো!”
পিতা মাতাকে খাইয়ে বিশ্রামের ব্যবস্থা কোরে তাদেরকে পুন্ডরীক বললেন _”আপনারা একটু বিশ্রাম করুন, দ্বারকাধীশ এসেছেন আমার সাথে দেখা করতে, বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন _আমি একটু দেখা করে আসি!” “বলিস কি রে ! দ্বারকাধীশ! কোথায় তিনি ?” _বাবা-মা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন! ” ওই তো বাইরে! দুখানা ইঁট দিয়েছি _তাতেই বসে আছেন হয়তো !”_ পুত্রের শান্তকণ্ঠে উত্তর! “কতক্ষণ এসেছেন? আগে বলতে হয়? চল্ চল্ দেখে আসি_আছেন না চলে গেলেন !” বাবা-মা ব্যগ্র হয়ে বাইরে এসে দেখলেন_ দুখানি ইঁটের উপর দণ্ডায়মান প্রস্তরমূর্তি চতুর্ভুজ নারায়ণ ! ও দেশের ভাষায় ইঁটকে বলে ‘বিট’, আর ‘ঠল’ মানে দণ্ডায়মান! তাই ওই চতুর্ভূজ দেবতার নাম হোল “বিটঠলজী”!
।।ভাগবত-কথা।।
“অন্তঃকৃষ্ণং বহির্গৌরং দর্শিতাঙ্গাদিবৈভবম্। কলৌ সংকীর্ত্তনাদ্যৈঃ স্মঃ কৃষ্ণচৈতন্যমাশ্রিতাঃ।।”__যিনি অন্তরে কৃষ্ণ ও বাহিরে গৌর, যাঁর মহিমা অন্তরঙ্গ ভক্তবৃন্দে সুপ্রকাশিত, সেই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে কলিযুগে সংকীর্তনাদির দ্বারা ভজনা করি।
আমরা পরম প্রেমময় ঠাকুর শ্রীচৈতন্য গোঁসাইয়ের পার্ষদদের প্রসঙ্গ বর্ণনা করতে করতে ছয় গোঁসাইকে পরপর আনার চেষ্টা করছি । কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর অমূল্য গ্রন্থ, যা গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজের আকরগ্রন্থ বললেও অত্যুক্তি হয়না _সেই গ্রন্থের ভনিতায় ছত্রে ছত্রে বলেছেন _ ” শ্রীরূপ রঘুনাথ পদে যার আশ/ চৈতন্যচরিতামৃত কহে কৃষ্ণদাস।।”_ চৈতন্যলীলায় রঘুনাথ দুজন ছিলেন । দু’জনকেই কৃষ্ণদাস গুরুবৎ মান্য করতেন _একজন ভট্র রঘুনাথ ও অন্যজন দাস রঘুনাথ। আমাদের আজকের আলোচনা ভট্র রঘুনাথকে নিয়ে।
মহাজন কথায় বলা যায় __”শ্রীকৃষ্ণের যত লীলা, সর্বোত্তম নরলীলা”! আর ভক্তের কাছে ভগবান সাক্ষাৎ প্রেমস্বরূপ, কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখেছেন _” কৃষ্ণপ্রেম সুনির্মল, যেন শুদ্ধ গঙ্গাজল _ সেই প্রেম অমৃতের সিন্ধু। নির্মল সে অনুরাগে, না লুকায় অন্য দাগে/ শুক্লবস্ত্রে যৈছে মসীবিন্দু। শুদ্ধপ্রেম সুখসিন্ধু_ পাই তার এক বিন্দু/ সেই বিন্দু জগৎ ডুবায়।কহিবার যোগ্য নহে তথাপি বাউলে কহে/কহিলেও কে বা পাতি চায়।।”
আর ভগবানের নরলীলাই যে শ্রেষ্ঠ লীলা তা বোঝা যায়, কারণ দেব-ঋষি ইত্যাদিরাও নরদেহ ধারণ করে আসেন ভগবৎ প্রেম আস্বাদনের জন্য। এবার রাধার বিরহ ব্যথা প্রকাশ ও আস্বাদনের জন্য গৌরহরির আবির্ভাব । মহাপ্রভু যখন পূর্ববঙ্গ সফর করছিলেন তখন তার সাথে তপন মিশ্র নামে এক ভক্তের দেখা হয়। মহাপ্রভু তাকে আদেশ করেন _”তুমি কাশীধামে গিয়ে বসবাস করো, সেখানে তোমার সাথে আমার দেখা হবে।” প্রভুর আদেশ শিরোধার্য করে তপন মিশ্র সপরিবারে কাশীধামে গিয়ে বসবাস করতে লাগলেন । কাশীধামে পৌঁছানোর দু’বছরের মধ্যেই তপন মিশ্রের পুত্ররূপে জন্ম নেন রঘুনাথ।
মহাপ্রভু নীলাচল থেকে বৃন্দাবনে যাবার পথে কাশীতে এসে পৌঁছালেন। মণিকর্ণিকা ঘাটে প্রভু একদিন স্নান করছেন_ তখন তপন মিশ্রের সাথে দেখা হয়ে গেল তাঁর। প্রথমবার যখন প্রভুর সাথে তপনের দেখা হয়েছিল, তখন তপন দেখেছিলেন গৃহস্থী নিমাই পণ্ডিতকে। এখন দেখলেন এক দিব্য সন্ন্যাসীরূপে শ্রীচৈতন্যকে! দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না ভক্ত তপন মিশ্র _লুটিয়ে পড়লেন তাঁর রাতুল চরণে! প্রভু সস্নেহে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন বিশ্বেশ্বর ও বিন্দুমাধবের মন্দিরে ! নানা কথার পর তপন মিশ্রের আন্তরিক আমন্ত্রণে প্রভু গেলেন তার বাড়ি । ভগবান আজ অতিথি! কিভাবে তাঁর সেবা করবেন_ কূলকিনারা পাচ্ছেন না গৃহস্বামী! সকলে ভগবানের পদধৌত জল পান করে ধন্য হলেন। আর প্রভুর ভোজনান্তে গ্রহণ করলেন উচ্ছিষ্ট মহাপ্রসাদ! আহার্য গ্রহণের পর মধ্যাহ্নের বিশ্রাম। এই সময় চুপিসারে মহাপ্রভুর বিশ্রামাগারে ঢুকে পড়েছেন কিশোর রঘুনাথ। প্রভুর চরণকমল দুটি বক্ষে ধরে শুরু করেছেন পদসেবন এবং কি আশ্চর্য ! প্রভু পরম তৃপ্তিতে সেবা গ্রহণ করছেন ! কিন্তু কে এই কিশোর __এই সেই রঘুনাথ ! পরবর্তীতে যার স্থান হয়েছিল শ্রীবৃন্দাবনে রূপ ও সনাতন গোস্বামীর মন্দিরে। আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল বৈষ্ণব শিরোমনি রূপে।ওই সময় মহাপ্রভু কাশীতে টানা দশদিন ছিলেন । সারাদিন ঘোরাঘুরি, তীর্থদর্শন, ধর্মালোচনা ইত্যাদি সবকিছু হোলেও মধ্যাহ্ন ভিক্ষা বা সেবা হোত তপন মিশ্রের বাড়িতে। আর প্রভু গৃহে আসার পরই শুরু হোতো রঘুনাথের সেবা। প্রভূকে স্নানের জোগাড় করে দেওয়া, প্রভুর গাত্রমার্জন করা, প্রভুর সেবার উপাচার জোগান দেওয়া, আর বিশ্রামকালে পদসেবন । কিন্তু প্রভু যখন চোখের আড়ালে থাকতেন তখন সবার অলক্ষ্যে চলত মানস-পূজা । প্রভুর লীলা কে বুঝতে পারে ! বৃন্দাবন থেকে ফেরার পথে আবার দু মাসের জন্য কাশীতে থেকে গেলেন মহাপ্রভু । তবে কি রঘুনাথের সেবার লোভে না রঘুনাথকে ধন্য কোরতে! মহাপ্রভুর ভোজন শেষে তাঁর বাসন মাজা, গাত্রমর্দন ও পদসেবায়_ মহানন্দে দিন কাটে রঘুনাথের। তবু আশা মেটে না, মনে হয় কত দিনে সর্বক্ষণের জন্য সে প্রভুর সেবক হতে পারবে।
প্রভুর কাশীধাম ত্যাগ করার সময় আসন্ন হোল, চোখের জলে কাশীর ভক্তরা প্রভুকে বিদায় জানালো, কিন্তু তপন এবং রঘুনাথ জিদ ধরলেন _তারাও প্রভুর সঙ্গে যাবেন ! প্রভু নিরস্ত করলেন তাদের, বললেন_ “যদি তোমরা যেতে চাও তো পরে এসো! এখন আমার সাথে তোমাদের যাওয়া হবে না !” প্রভুর আদেশ শিরোধার্য ! ক্রমে রঘুনাথ বড় হলেন । প্রভুর বিরহবেদনা তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠল । একদিন সমস্ত কাজকর্ম ফেলে তিনি যাত্রা করলেন নীলাচলের পথে । প্রভুর সেবা ভোগের জন্য নানা উপকরণ সাজিয়ে একজন সেবকের মাথায় তা চাপিয়ে প্রভুর নাম স্মরণ করতে করতে এগিয়ে চললেন রঘুনাথ। রঘুনাথ প্রসঙ্গে শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতকার কি লিখেছেন তা দেখা যাক_”বারানসী মধ্যে প্রভুভক্ত তিনজন/ চন্দ্রশেখর বৈদ্য আর মিশ্র তপন।/ রঘুনাথ ভট্টাচার্য মিশ্রের নন্দন / প্রভু যবে কাশী আইলা দেখি বৃন্দাবন।/ চন্দ্রশেখর গৃহে খৈল দুই মাস বাস,/ তপন মিশ্রের ঘরে ভিক্ষা দুই মাস।/ রঘুনাথ বাল্যে কৈল প্রভূর সেবন, উচ্ছিষ্টমার্জন আর পাদ-সংবাহন।।”
এই সেই কৃপাধন্য রঘুনাথ! চলেছেন নীলাচলের পথে। পথ চলতে চলতে আলাপ হলো রামদাস নামে এক ভক্ত পন্ডিতের সঙ্গে । তিনি পরম বৈষ্ণব রামচন্দ্রের উপাসক। অষ্টপ্রহর রামনাম জপ করেন । রঘুনাথের মধুর ব্যবহারে তিনি খুবই সন্তুষ্ট হোলেন । মহাপ্রভুর লীলাকথা শুনে তাঁর সেবা-পূজার উপাচার রঘুনাথের মাথা থেকে নিয়ে নিজের বুকে ধারণ করে পথ চলতে লাগলেন । রঘুনাথ বললেন_”আপনি এটা কি করছেন? আপনি একে পন্ডিত,তায় আবার মহাভাগবত ! আপনি এই ভার মাথায় নিয়ে দীর্ঘ পথ কেন চলতে চাইছেন ?” রামদাস শুনলেন না, প্রভুর উপাচার মস্তকে ধারণ করে মহানন্দে ভগবৎ প্রসঙ্গ করতে করতে পথ হাঁটতে লাগলেন। ___”জগন্নাথ স্বামী নয়নপথগামী, ভবতু মে!” নীলাচলে পৌঁছে মহাপ্রভুর চরণে লুটিয়ে পড়লেন রঘুনাথ! ভাবাবেশে প্রভু রঘুনাথকে আলিঙ্গন করলেন, আবেশ কাটিয়ে বললেন _”ভালোই হয়েছে তুমি এখানে এসেছো! তুমি আমার এখানেই প্রসাদ পাবে!” ভক্ত গোবিন্দকে পাঠিয়ে প্রভু__ রঘুনাথের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন । তবে নীলাচলে পৌঁছানোর পর থেকে প্রভূর রন্ধনাদির দায়িত্ব নিলেন সুনিপন রাঁধুনি রঘুনাথ ! অমৃতময় বিভিন্ন ব্যন্জনসহ সুখাদ্য রান্না কোরে রঘুনাথ মনের আনন্দে প্রভুকে খাওয়াতে লাগলেন। আর ভক্তবৎসল ভোজনরসিক মহাপ্রভু ভক্তবাঞ্ছা পুরণ করার জন্য আনন্দে সেবা গ্রহণ করতে লাগলেন । ওই সময় রঘুনাথ প্রভুর দর্শন, স্পর্শন ও সেবার মানসে প্রায় আট মাস নীলাচলে অর্থাৎ পুরীধামে থেকে গিয়েছিলেন । যখন বিদায় নেবার সময় হোল _প্রভুর চরণ ধরে কাঁদতে লাগলেন রঘুনাথ__” প্রভু আদেশ করুন, কিভাবে জীবন পথে এগিয়ে চলবো!” প্রভু বললেন _”রঘুনাথ গৃহে ফিরে যাও, বৃদ্ধ পিতামাতার সেবা করো । বিবাহ কোরনা, কোনও বৈষ্ণবের কাছে ভাগবত পাঠ নিও, আর একবার নীলাচলে এসো।” ভাবে বিগলিত প্রভু নিজের কন্ঠমালা রঘুনাথকে পরিয়ে দিলেন । উপস্থিত বৈষ্ণবগণ হরিধ্বনি দিয়ে উঠলো। রঘুনাথ কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে পড়ে গেলেন।
পিতা-মাতার সেবার জন্য রঘুনাথকে গৃহে পাঠালেন মহাপ্রভু ! পিতা-মাতার সেবাই জগতের মহান কাজ, মহান আদর্শ পালন ! জগতে মত মহৎ ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেছেন__ সকলেই তাদের নিজ নিজ পিতামাতার প্রতি কর্তব্যপরায়ন ছিলেন। পিতা-মাতার সেবাই শ্রেষ্ঠ সেবা –“মাতৃ ভক্ত গনের প্রভু শিরোমনি / সন্ন্যাস করিয়া সদা সেবেন জননী।।”
পিতামাতার সেবা করলে ভগবান সেই পিতা-মাতার সেবক ভক্তের প্রতি অধিক কৃপাপরায়ন হ’ন ! পিতা-মাতার একনিষ্ঠ সেবক পুণ্ডরীক আর বিটঠলজীর ঘটনা এ ব্যাপারে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি_ তাই উল্লেখ করছি!__ পুণ্ডরীক তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঙ্গে মহারাষ্ট্রে, ভীমা নদীর তীরে পান্ডুরপুর গ্রামে বাস করতেন । তার একনিষ্ঠভাবে পিতামাতার সেবাকার্য দেখে মুগ্ধ হয়ে স্বয়ং নারায়ন ভক্তের সঙ্গে লীলা করতে মনস্থ করলেন । ভাবলেন_” যাই ভক্তকে একবার দেখে আসি !” পুণ্ডরীকের গৃহদ্বারে এসে তাকে ডেকে ভগবান বললেন _”পুন্ডরীক! বাইরে এসো, আমি তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি !” পুণ্ডরীক ঘরের ভেতর থেকেই বলল_” আমার এখন সময় নেই, আমি পিতা-মাতার সেবায় ব্যস্ত!” “আমি দ্বারকাধীশ ! দ্বারকা থেকে আসছি, তোমার সাথে আলাপ করতে চাই!” _আগন্তুক বললেন। ভেতর থেকে কঠিন উত্তর ভেসে এলো_” দ্বারকা থেকেই আসো, আর গোলোক থেকেই আসো__ আমি এখন বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবায় ব্যস্ত ! আমার সাথে আলাপ করতে হলে বাইরে অপেক্ষা করতে হবে !” “কিন্তু কতক্ষন?” __ আগন্তুকের জিজ্ঞাসা! পুণ্ডরীক দৃঢ় কন্ঠে উত্তর দিলেন_ বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবাকার্য সমাধা করে, যখন আমার অবসর মিলবে, তখন নাহয় আলাপ হবে!” আগন্তুক বলল_” তাই নাহয় হবে, কিন্তু ততক্ষণ আমি বসবো কোথায়?” পুণ্ডরীক তখন দুটি ইঁট ছুঁড়ে দিল বাইরে এবং বলল_ “এর উপরে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করো!”
পিতা মাতাকে খাইয়ে বিশ্রামের ব্যবস্থা কোরে তাদেরকে পুন্ডরীক বললেন _”আপনারা একটু বিশ্রাম করুন, দ্বারকাধীশ এসেছেন আমার সাথে দেখা করতে, বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন _আমি একটু দেখা করে আসি!” “বলিস কি রে ! দ্বারকাধীশ! কোথায় তিনি ?” _বাবা-মা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন! ” ওই তো বাইরে! দুখানা ইঁট দিয়েছি _তাতেই বসে আছেন হয়তো !”_ পুত্রের শান্তকণ্ঠে উত্তর! “কতক্ষণ এসেছেন? আগে বলতে হয়? চল্ চল্ দেখে আসি_আছেন না চলে গেলেন !” বাবা-মা ব্যগ্র হয়ে বাইরে এসে দেখলেন_ দুখানি ইঁটের উপর দণ্ডায়মান প্রস্তরমূর্তি চতুর্ভুজ নারায়ণ ! ও দেশের ভাষায় ইঁটকে বলে ‘বিট’, আর ‘ঠল’ মানে দণ্ডায়মান! তাই ওই চতুর্ভূজ দেবতার নাম হোল “বিটঠলজী”!
