।।ভাগবত-কথা।।
“বন্দে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যং কৃষ্ণভাবামৃতং হি যঃ।আস্বাদ্যাস্বাদয়ন্ ভক্তান্ প্রেমদীক্ষামশিক্ষয়ৎ।।”__যিনি স্বয়ং কৃষ্ণভাবসুধা আস্বাদনপূর্বক ভক্তবৃন্দকে আস্বাদন করাইয়া, তাহাদিগকে প্রেমদীক্ষা উপদেশ করিয়াছিলেন, আমি সেই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে বন্দনা করি।।
জয় জয় শ্রীচৈতন্য জয় নিত্যানন্দ / জয়াদ্বৈতচন্দ্র জয় গৌরভক্তবৃন্দ ।। __ত্যাগ-তিতিক্ষা -বৈরাগ্য সাধনে ও কৃষ্ণপ্রেমের পরানুভূতির সাথে সনাতনের জীবনে আরও মিলিত হয়েছিল অসাধারণ প্রতিভা, অগাধ শাস্ত্রজ্ঞান ও শ্রমের প্রতি নিষ্ঠা । বিগ্রহ ভজনের সময় এই মহাসাধকের শ্রীমুখ হতে অজস্রধারে নির্গত হতো_ লীলা মাহাত্ম্য স্তব ও প্রার্থনা। তাঁর নিজস্ব গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে লীলাস্তব, বৈষ্ণবীয় স্মৃতি হরিভক্তিবিলাসের টীকা, বৃহৎ ভাগবতামৃত, ভাগবতামৃতের টীকা ও বৈষ্ণবতোষনী টীকা । তাঁর বৈষ্ণবতোষনী ভক্তিশাস্ত্রের জগতে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রেখেছে । এই গ্রন্থের রচনার সময় তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ, চলচ্ছক্তিহীন। ওই সময়ে তার দুই সেবক রঘুনাথভট্র ও রঘুনাথ দাস_ এই গ্রন্থ রচনায় তাঁকে খুবই সাহায্য করেছিলেন ।এই গ্রন্থটি সনাতনের শেষ রচনা । যে বৎসর এই গ্রন্থ রচনা শেষ হয়, সেই বছরই তার জীবন দীপ নির্বাপিত হয়।
সমকালীন পরিমণ্ডলে সনাতন গোস্বামী ছিলেন বয়ঃবৃদ্ধ। তাছাড়া তাঁর কৃচ্ছসাধন, ত্যাগ-বৈরাগ্য, প্রগাঢ় শাস্ত্রজ্ঞান_ ইত্যাদির দিক থেকেও তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিলনা । ফলে সেই সময়কালীন যে কেউ কোন ভক্তিগ্রন্থ রচনা করতো_ সেগুলি সনাতন গোস্বামীর সম্মতি বা সমর্থন ছাড়া ভক্তসমাজে গৃহীত হোতো না । যাইহোক, ভগবান পরমপ্রেমিক শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নীলাচলে অপ্রকট হবার পর থেকেই সনাতনের বহিরঙ্গ জীবনে বাহ্যলীলার ছেদ পড়ে । মহাপ্রভুর লীলা অবসানে _সনাতন এতদূর শোক পেয়েছিলেন যে, তাঁর শরীর সর্বদা এত উত্তপ্ত হয়ে থাকতো যে, বৃষ্টির জল পড়লে তা সাথে সাথে বাষ্প হয়ে যেতো। এরপর ধীরে ধীরে তিনি প্রবেশ করেন সাধনজগতের গভীরতম স্তরে । দূরদূরান্ত থেকে বৈষ্ণবভক্তের দল বৃন্দাবনে ভিড় জমাতে শুরু করেছিল। কিন্তু শুধু চোখের দেখা ছাড়া এই মহাসাধকের আর কোনো লীলার প্রকাশ তারা দেখতে পেতো না । ভক্তদের হৃদয়ে দুঃখের কারণ হয়ে উঠছেন দেখে _তিনি বৃন্দাবন ছেড়ে গোপনে নন্দিকেশ্বর মানসগঙ্গা নামক স্থানে,এক নির্জন সরোবরের তীরে এসে সাধন-ভজন করতে থাকেন। এক বৃক্ষতলে অনিকেত, অজগরবৃত্তি গ্রহণ করে দিবারাত্র চোখের জলে শুধু প্রভুর লীলা স্মরণ-কীর্তন ও দর্শনে তাঁর দিন কাটতে লাগলো । কথিত আছে __ভক্তের এই অবস্থা দেখে শ্রী ভগবান স্বয়ং গোপালকের বেশে আহার্য নিয়ে এসে, স্বহস্তে তাঁকে খাইয়ে যেতেন। সনাতনের বয়স তখন প্রায় 90 বছর_ ভক্তরা ঠিক তাঁর সন্ধান বের করে ফেললো । তাঁকে ওইখানে একটি কুটির নির্মাণ করে দিলো_ তার বসবাসের জন্য । এই কুটির ছেড়ে সনাতন আর বৃন্দাবনে ফিরে যাননি । জীবনের শেষ কদিন সনাতন ঐ কুটিরেই সাধন-ভজন আর লীলা-দর্শনে দিন অতিবাহিত করে দিয়েছিলেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের সাধুরা সেই সময় তাঁর দর্শন অভিলাষে ওই স্থানে ছুটে ছুটে আসতেন । কারণ সারা জীবন সাধন-ভজন করে তাঁর শরীর তখন কৃষ্ণময় হয়ে গেছিলো, তাই সেই শরীর দর্শনে, স্পর্শনে ভক্তের আধ্যাত্মিক সঞ্চার তো হবেই!
সনাতনের সাধন-ঐশ্বর্যের যে নানা কথা শোনা যায়, তার মধ্যে দু’একটি বলার চেষ্টা করি! বর্ধমান জেলার মানকর গ্রামে জীবন ঠাকুর নামে এক ব্রাম্ভন সন্তান বাস করতেন । দারিদ্র্যের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে ওই নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ তার ইষ্ট বিশ্বনাথের কাছে আকুল প্রার্থনা করতে লাগলেন । একরাত্রে ঈশ্বর দর্শন দিয়ে তাকে বললেন _’বৃন্দাবনে সনাতন গোস্বামীর কাছে গেলেই তার মনস্কামনা পূরণ হবে । কবির ভাষায়__”যাও যমুনার তীর, সনাতন গোস্বামীর ধরো দুটি পায়/ তারে পিতা বলি মেনো, তারই কাছে আছে জেনো ধনের উপায় ।।” আনন্দে অধীর জীবন পদব্রজে ছুটলো বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে। সেখানে উপস্থিত হয়ে সনাতন গোস্বামীর খোঁজ করে তার নিকট উপস্থিত হলো ব্রাহ্মণ। সনাতনের দুটি পা ধরে তার সেকি আকূতি ! ধনলাভের আকূতি! পরমার্থিক সম্পদ যাঁর পাদস্পর্শে লাভ হয়, তাঁর কাছে ঐহিক সম্পদ আর কি ! তবু ব্রাহ্মণের কাতর প্রার্থনায় ক্ষণিকের জন্য চঞ্চল হলেন সনাতন ঠাকুর! ভাবলেন কার কাছে যাবেন, কাকেই বা অনুরোধ করবেন _এই ব্রাহ্মণের অভাব পূরণের জন্য! হঠাৎ তাঁর স্মরণে এলো _বহুদিন আগে যমুনায় স্নান করতে যাওয়ার পথে তিনি একটি বহুমূল্য রত্ন লাভ করেছিলেন এবং সেটি কারো কাজে লাগতে পারে_ এই ভেবে তিনি বালিতে একস্থানে রেখেছিলেন ! তাহলে তো সমস্যার সমাধান হয়েই গেল! জীবন ঠাকুরকে নিয়ে তিনি যমুনার তীরে একটি স্থান দেখিয়ে বললেন _’ওই স্থানটি খনন করলে একটি বহুমূল্য রত্ন পাওয়া যাবে, সেটি নিয়ে যেন সে ঐ স্থান ত্যাগ করে চলে যায়!’ এই বলে তিনি আবার তার ভজন কুটিরে ফিরে গেলেন। পাগলের মতো জীবন দুই হাত দিয়ে বালি সরাতে লাগলো। কিছুটা গর্ত করতেই হাতে কি যেন শক্ত মতো ঠেকলো_ তুলে দেখলো ঝকঝক করছে সেই সাত রাজার ধন মানিক রতন ! হঠাৎ করে রত্ন পেয়ে দরিদ্র জীবনের সে কি আনন্দ ! কিছুক্ষণ সেই রত্নটি হাতের মুঠোয় ধরে যমুনার তীর বরাবর খানিক ছুটোছুটি করে বেড়ালো । সে এখন বড়লোক_ ধনী লোক_ এই ভেবে খুব খানিক আনন্দ করলো। তারপর যখন ক্লান্ত হোলো, তখন সে যমুনার তীরে গিয়ে বসলো। দেখল __দূরে রাখালের দল গরুর পাল নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, পাখির দল কলতানে মুখর হয়ে বাসায় ফিরছে, দিনমণি ধীরে ধীরে অস্তাচলে ঢলে পড়েছে, কেমন যেন একটা বিশ্রামের ভাব আসছে ! গোটা বৃন্দাবন জুড়ে হঠাৎ চারিদিকে কাঁসর-ঘন্টার আওয়াজে মুখরিত হয়ে গেল বৃন্দাবনের আকাশ-বাতাস, মন্দিরে মন্দিরে দেবতার আরতি শুরু হয়েছে, কোথাও চলছে ভজন-কীর্তন-প্রার্থনা ! যমুনার শীতল বাতাসে জীবনের চোখে ঘুম ঘুম ভাব ! সারাদিনের ক্লান্তিতে জীবন কখন যেন রত্নধন মুঠিতে চেপে বুকের সঙ্গে ধরে যমুনার তটে ঘুমিয়ে পড়েছে ! ঘুমের মধ্যে অন্তরাত্মা তার চেতনায় নাড়া দিল! চমকে উঠে বসল জীবন ! তার মধ্যে ভাবনা এলো__ যে পার্থিব সম্পদলাভের জন্য এতদিন ঠাকুরের কাছে সে কেঁদেছে, সেই সাধনার ধন আজ তার করায়ত্ত ! কিন্তু সনাতন ঠাকুরের কাছে কি সম্পদ রয়েছে _যার জন্য এহেন মূল্যবান মণিরত্নকেও তিনি অবহেলায় ফেলে রেখেছিলেন এতোকাল ! চেতনার জগতে দ্রুত পটপরিবর্তন হয়ে চলল তার! উঠে পড়ল জীবন, ধীরে ধীরে আবার চলে এলো সনাতন গোস্বামীর কুটিরে । তাঁর পা দুটি ধরলো তার আপন বক্ষে, চোখের জলে তাঁর পা ধুয়ে দিলো! তারপর সেই সম্পদ যা সনাতনের সাধনলব্ধ, তাই যাচাঞা করলো সনাতনের কাছে। তার এই অদ্ভুত দেখে সনাতন অভিভূত হয়ে গেলেন ! তাকে স্পর্শ করে যমুনার তীরে এসে দাঁড়ালেন তিনি। জীবন তখন সেই বহুমূল্য রত্নটিকে যমুনার জলে নিক্ষেপ করে কায়মনোবাক্যে সনাতনের চরণে শরনাগত হোলো ।
কবি লিখেছিলেন,_” যে ধনে হইয়া ধনী, মনিরে মানোনা মনি_ তাহারি খানিক / মাগি আমি নতশিরে, এতবলি নদী নীরে ফেলিলো মানিক।।”
শরণাগত ভক্তকে কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত করলেন সনাতন। শুরু হলো জীবন ঠাকুরের অধ্যাত্মজীবন । ভগবত চিন্তার গভীরে প্রবেশ করে লাভ করলেন এক নতুন জীবন । পরবর্তীকালে এই জীবন ঠাকুরও বৈষ্ণবসমাজের এক আদৃত সাধক রূপে পরিচিত হ’ন, আর তার বংশ “কাঠ মাগুরার গোস্বামী বংশ”_ নামে প্রসিদ্ধিলাভ করে ।
এই বিখ্যাত ভক্ত সাধক সনাতন গোস্বামীর অসংখ্য লীলার মধ্যে আরেকটি কথা উল্লেখ করে এই কাহিনীর ইতি টানবো। বৃন্দাবনে বসবাসকালে গিরি গোবর্ধন পরিক্রমা ছিল তাঁর জীবনের এক অন্যতম প্রধান সাধনা। বয়সকালে অশক্ত দেহ নিয়েও তিনি যতদিন পেরেছেন__ ততদিন গিরি গোবর্ধন পরিক্রমা করেছেন। কিন্তু শেষের দিকে আর পারছিলেন না ! ভক্তপ্রবরের আকুল ক্রন্দনে, না পারার অক্ষমতার ব্যথা ও প্রাণভরা আর্তিতে __গিরিধারী নয়নাভিরাম মূর্তিতে আবির্ভূত হোলেন সনাতনের সম্মুখে ! প্রসন্ন মধুর হাসিতে ভরিয়ে তুলে তিনি বললেন_” সনাতন তুমি আমায় পরিক্রমা করতে পারছোনা বলে দুঃখ করছো, একান্তে চোখের জল ফেলছো_ তাই আমি থাকতে না পেরে তোমার কাছে ছুটে এলাম ! এই দেখো, আমার হাতে রয়েছে গিরি গোবর্ধনের শিলাখণ্ড! এতে অঙ্কিত রয়েছে আমার চরণচিহ্ন, এই চরণপাহাড়ি ভক্তিভরে তোমার কুটিরে স্থাপন করো । রোজ পূজা-পাঠের শেষে এটিকে একবার প্রদক্ষিণ করলেই তোমার গিরি-গোবর্ধন পরিক্রমা সম্পূর্ণ হবে । এতে এই বৃদ্ধ বয়সে অশক্ত দেহে তোমার যেমন শ্রম লাঘব হবে, তেমনি তোমার কষ্ট হচ্ছেনা দেখে_ আমারও প্রভূত আনন্দ হবে! মধুর মুর্তি ধীরে ধীরে আলোর রেশ টেনে অন্তর্হিত হোল । সনাতন জেগে উঠেই দেখলেন_ সেই স্থানে ভগবানের স্বহস্তে দেওয়া চরণ-পাহাড়ি রাখা আছে। মহাসমারোহে সেই শিলাখণ্ড কুটিরে স্থাপন করলেন সনাতন। একদিন যেমন মদনগোপাল দর্শনের জন্য হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয়েছিল, তেমনি আজও বহু মানুষ ওই অপূর্ব শিলাখণ্ড “চরণ পাহাড়ি” দেখে ধন্য হোলো ।
বৃদ্ধ সনাতন তার জীবনের শেষ ভাগে অন্তর্মুখী অবস্থাতেই বেশি থাকতেন । তারপর ধীরে ধীরে সমাগত হল ১৫৫৪_ খ্রিস্টাব্দের আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথি! সনাতনের জীবন দ্বারে ধ্বনিত হলো নওলকিশোরের আহ্বান_ এসো সনাতন_ এসো! আর কেনো_ মর্তের লীলা তোমার শেষ! এবার চলো নিত্যলীলার অমর্ত্যলোকে !”
তবু ভক্তের শেষ অভিলাষ জ্যোতির্ময় মূর্তিতে একবার দেখা দিতে হবে ! তাই হোলো! শ্রীভগবান ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু ! ভক্তের অভীষ্ট মূর্তিতে দর্শন দিলেন সনাতনকে । মহাসাধকের মৃত্যুশয্যায় উপস্থিত ভক্তরা দেখলো সনাতনের চোখ দুটি যেন আনন্দে চিকচিক্ করে উঠলো, আর মুখমন্ডলে ছড়িয়ে পড়লো অপূর্ব স্মিত হাসি। সনাতন ধীরে ধীরে প্রবিষ্ট হলেন চৈতন্যলোকে।।
