চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থে শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী মহাশয় মধ্যলীলায় এক শ্লোকে লিখেছেন _”ধর্মচারী মধ্যে বহুৎ কর্মনিষ্ঠ, কোটি কর্মনিষ্ঠ মধ্যে এক জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ/ কোটি জ্ঞানী মধ্যে হয় একজন মুক্ত, কোটি মুক্ত মধ্যে দুর্লভ এক কৃষ্ণভক্ত।” সেই দেবদুর্লভ কৃষ্ণভক্তের আলেখ্য এখানে পরিবেশিত করার প্রয়াস __বামন হয়ে চাঁদ ছোঁয়ার প্রচেষ্টা মাত্র। তবু এই চেষ্টায় সহৃদয় ভক্ত পাঠকগনের কিছুটা হোলেও যদি অন্তরের চাহিদা পূরণ হয় _তাহলেই এই লেখার সার্থকতা।
আমরা বৈষ্ণব শিরোমণি সনাতন গোস্বামীর সাথে মহাপ্রভুর লীলা কাহিনীর কথা এখানে বর্ণনা করছিলাম। সনাতন তখন নীলাচলে মহাপ্রভুর সঙ্গলাভে ধন্য ! সেই সময় একদিন আহারান্তে মহাপ্রভু বিশ্রাম করছেন, এমন সময় সনাতন সেখানে গিয়ে হাজির। সকলে একসাথে প্রসাদ পেলেন আহার শেষে ডাক পড়লো সনাতনের। প্রভূ জিজ্ঞাসা করলেন_”কোন পথে এলে সনাতন?” সনাতন উত্তর দিলেন_”সমুদ্রপথে।”
“সে কি! জগন্নাথ মন্দিরের পথ দিয়ে সিংহদ্বার এর পাশ দিয়ে এলে না কেনো ? এতো ঘোরা পথে তপ্ত বালুকাময় প্রান্তর দিয়ে কেনো এলে সনাতন ?” __ প্রভুর কন্ঠে বিস্ময় এবং সন্তানসম শিষ্যের জন্য যেন করুণা ঝরে পড়লো। সনাতন জোড়হাতে অপরাধীর ন্যায় বলতে লাগলেন_ “ওপথে জগন্নাথদেবের সেবকেরা যাতায়াত করেন, বৈষ্ণব সাধু-ভক্তেরা গমনাগমন করেন ! ও পথে আমি কি করে যাই প্রভু ! যদি আমার গায়ের কন্ডুক্লেদ ওনাদেরকে স্পর্শ করে_ তাহলে যে আমার অপরাধের শেষ থাকবেনা!” সনাতনের দৈন্যতা ও মর্যাদাবোধ দেখে সন্তুষ্ট হলেন মহাপ্রভু, বললেন _”সে কি সনাতন! তুমি নিজেকে অপবিত্র ভাবছো? তুমি কি জানো, দেবতা-মুনি-ঋষি আদি মহা মহা মনিষীগণ তোমাকে ছুঁলে পবিত্র হয় !” এই বলে মহাপ্রভু সনাতনকে আলিঙ্গন করলেন ! সনাতনের গায়ের কন্ডুক্লেদ প্রভুর গায়ে লাগবে জেনে সনাতন সরে যাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু প্রভু শুনলেন না, তাকে নিবিড় আলিঙ্গন করে তবেই ছাড়লেন ! পরে সনাতন এই ঘটনা বন্ধুস্থানীয় গৌড় পরিজন জগদানন্দকে জানালে জগদানন্দ তাকে উপদেশ করলেন _ ‘যেন সনাতন নীলাচল ত্যাগ করে বৃন্দাবনে চলে যায়। তাহলে আর প্রভু তাকে স্পর্শ করতে পারবে না, আর প্রভুর গায়ে ওই বিষাক্ত কন্ডুক্লেদ লাগবেনা !’ কিভাবে যেন এই কথা মহাপ্রভুর কর্ণগোচর হয়ে গেল, তিনি জগদানন্দ কে তীব্র ভৎসনা করলেন ভাবাবেশে বলতে লাগলেন_ “জগার এত আস্পর্ধা সনাতন কে উপদেশ দেয় ! জগা কি জানে সনাতন কত মানী, তার কত গুণ ! তাইতো তাকে স্তুতি না করে পারা যায় না । সনাতনের শরীরে যে বীভৎস ঘা, এগুলি আমার কাছে শান্তিদায়িনী সুধা! সনাতনের দেহ_ ভক্ত দেহ, ওই শরীর অপ্রাকৃত চিন্ময়_ শুধু মানুষ ওই দেহকে প্রাকৃত মনে করছে! চন্দন আর পাঁকে যার সমবুদ্ধি_ তার কাছে আবার কন্ডুক্লেদ কি ? __তাই সনাতনকে ত্যাগ করলে সন্ন্যাস ধর্ম আমার ক্ষুন্ন হবে না ? আর মানুষ কি জানে যে, বৈষ্ণবদেহ প্রাকৃত নয়_ দীক্ষাকালে পরমবৈষ্ণব ভক্ত যেইমাত্র কৃষ্ণপদে নিজেকে সমর্পণ করে, অমনি সেই দেহ -সেই শরীর চিন্ময়ত্ব লাভ করে ! তাইতো সনাতনের শরীর, তার দেহ __চির পবিত্র! তাকে আলিঙ্গন করে আমি চিরতৃপ্ত – চিরসুখী হ‌ই! এই কথা বলতে বলতে মহাপ্রভু পুনরায় ভাবাবেশে সনাতনকে আলিঙ্গন করলেন!, প্রেমের ঐকান্তিক আবেশে আলিঙ্গনাবদ্ধ সনাতন‌ও আবিষ্ট। অপ্রাকৃত পরাপ্রেমের প্রবাহ বইছে যেন চারিদিকে ! উপস্থিত জনেরাও সেই প্রেমের স্পর্শ‌ই শুধু পাচ্ছেন না, তারাও প্রেমে যেন আপ্লুত হচ্ছেন ! সবার ভাবাবিষ্ট অবস্থা ! এই অবস্থায় সকলে অবাক হয়ে দেখলেন _মহাপ্রভু সনাতনকে আলিঙ্গন করছেন কিন্তু মহাপ্রভুর শরীরে কোন রস-রক্ত লাগেনি! আর লাগবে কোথা থেকে_ সনাতনের শরীরে আর কুষ্ঠের কোনো ঘা নেই, সর্বশরীর মসৃণ, সোনার মত ঝলমল করছে ! প্রভু তোমার এই লীলারহস্য কে বুঝবে ! ঝাড়খণ্ডের জল খাইয়ে সনাতনের শরীরে বিষ তুমিই ঢুকালে, তারপর তার শরীরে ভীষণ ব্যাধি প্রদান করে যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দগ্ধে দগ্ধে তার অন্তরের শ্রদ্ধা ভক্তির পরীক্ষা নিলে, আবার নিজেই কৃপা ভরে তার ব্যাধির নিরাময় করলে ! এইগুলা কি সাধারণে ধরতে পারে! উপযুক্ত পাত্রের সাথেই ভগবানের কঠিন লীলাসমূহ সংঘটিত হয়_ যা পরবর্তীকালে মানুষ দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরে রাখে !
সেই সময় রথযাত্রা উপস্থিত হওয়ায় দলে দলে গৌড় ভক্তগণ নীলাচলে সমবেত হতে লাগল। সকলে সনাতনের এই অত্যাশ্চর্য ঘটনার কথা শুনে মহাপ্রভুর সাথে সাথে সনাতনের‌ও গুনগান করতে লাগল। সমগ্র ভারতবর্ষের বৈষ্ণব সমাজের কাছে সনাতনের পরিচিতির দ্রুত প্রসার ঘটে গেল। রথযাত্রার দিন রথের আগে আগে মহাপ্রভুর ভাবাবেশে নর্তনের দৃশ্য যে একবার প্রত্যক্ষ করেছে_ সেই মজেছে! সনাতন সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ব্যাধিমুক্ত দেহে নেচে আকুল হলেন!
‘হরিভক্তি শুবোদয়’ গ্রন্থে বলা হয়েছে সংসারে ভাগবতগণের সাক্ষাৎকার দুর্লভ, কেননা তৎসদৃশ ভক্তদর্শনই নেত্রের সার্থকতা বা ফল, তাঁদের গাত্রসঙ্গই দেহধারনের সার্থকতা বা ফল এবং তাঁদের গুনবর্ণনাই জিহ্বার সার্থকতা বা ফল ।।
বারাণসীতে থাকাকালে বৈষ্ণবতত্ত্ব ও সাধনতত্ত্বের যে শিক্ষা প্রভু সনাতনকে দিয়েছিলেন __নীলাচলে ধীরে ধীরে তার পরবর্তী অধ্যায়ের শিক্ষা দিতে লাগলেন । বৃন্দাবনে যে নতুন ভক্তির প্লাবন বইবে, তার ভিত্তি নির্মাণ করলেন মহাপ্রভু ! আর সেই মহান কাজের দায়িত্ব দিলেন সনাতনকে । দোলযাত্রা পর্যন্ত নীলাচলে রয়ে গেলেন সনাতন। এরপর অশ্রুপূর্ণ নয়নে প্রভুর নিকট থেকে বিদায় নিয়ে, সমস্ত বৈষ্ণবসমাজের আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা মাথায় নিয়ে সনাতন নীলাচল ত্যাগ করে _ভক্তি সাম্রাজ্যের নতুন ভূমি বৃন্দাবনধামের দিকে রওনা হোলেন । বৃন্দাবনের আদিত্যটিলার পর্ণকুটিরে বসে শুরু হোলো তার আগের মতোই ভজন কীর্তন এবং প্রভুর আদিষ্ট কর্ম-সাধন । আদিত্যটিলা স্থানটি সাধন-ভজনের অনুকূল। দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ, আর নিম্নে প্রবাহিণী কৃষ্ণপ্রিয়া যমুনা, সমগ্র পরিবেশ যেন শ্যামলমন্ডিত শ্যামসুন্দরে ওতপ্রোত। এই পবিত্র নির্জন রমণীয় স্থানের সাধনাই সনাতনকে আধ্যাত্মিক জগতের অন্তস্থলে পৌঁছে দিল।
তখনকার বৃন্দাবন ছিল জঙ্গলাকীর্ণ, লোকবসতি প্রায় নেই বললেই চলে! ফলে সাধু বৈষ্ণবদের ভিক্ষা করতে হলে প্রয়োজনে মথুরা পর্যন্ত যেতে হোতো । ফলে সনাতন প্রায়ই ঐসব অঞ্চলে যেতেন । একদিন মাধুকরী করতে গিয়ে মথুরায় দামোদর চৌবের বাড়িতে গিয়ে সনাতন দেখলেন এক অপূর্ব প্রস্তর নির্মিত মদনগোপাল বিগ্রহ। মদনগোপালকে দেখেই তাঁর মনে হোল এ মুর্তি যেন তার কত আপন, কত কাছের, যেন কত পরিচিত ! প্রথম দর্শনে গৃহস্বামীকে কিছু বলতেও পারছেন না, আবার শুধু বারবার চেয়ে চেয়ে দেখছেন সেই নয়নাভিরাম মদনগোপাল মূর্তিকে! ভিক্ষাগ্রহণ পর্ব শেষ করে সেদিনের মতো চলে আসতে হোল সনাতনকে! ফিরে এসে ধ্যানে বসলেন সনাতন! কিন্তু সেই মদনগোপালের মূর্তিই শুধু বারবার তার ধ্যানজগতে ফিরে ফিরে আসছে_ একি হোলো ! তাহলে কি ওই মূর্তির সাথে তার পূর্ব পূর্ব সম্পর্ক রয়েছে ? ধীরে ধীরে চৌবে পরিবারে যাতায়াত বাড়তে লাগলো সনাতনের! তৈরি হোল অন্তরঙ্গতা, ঘনিষ্ঠতা ! চৌবে পরিবারের বড় গৃহিণী বিধবা , আর তারই আদরের ধন এই মদনগোপাল । তার পুত্রের নাম সদন আর বিগ্রহের নাম মদন। দু’জনকেই সমান আদরে পালন করেন তিনি নিজের পুত্র জ্ঞানে! বিগ্রহকে সাজান, নাওয়ান, খাওয়ান, স্নান করান! সদন তার আদরের পুত্র, আর মদন তার আদরের গোপাল । সনাতন ঐ বাড়িতে যাওয়া আসা করেন বটে কিন্তু কখনও মুখ ফুটে তাঁর অন্তরের কথাটি বলতে পারেন না ! একদিন তিনি মথুরায় গেছেন মদনগোপাল দর্শনের জন্য চৌবের বাড়িতে _কিন্তু অঙ্গনে প্রবেশ করতেই চৌবে গৃহিণী ছুটে এসে সনাতনকে বললেন _”ঠাকুর তোমার প্রাণের আশা বুঝি মিটলো না । কাল রাত্রে গোপাল আমাকে স্বপ্নে বলেছে যে, আমার ছেলে হয়ে থাকতেই তার বেশি আনন্দ ! তোমার কাছে ঠাকুর হয়ে থাকার তার এখন কোন ইচ্ছা নাই! গোপাল বলেছে_ সদন আর মদনের মধ্যে তফাৎ কি?” একথা শুনে সনাতন বিস্মিত হলেন __গোপালের সেবা করেই ইনি অপরের অন্তরের বাসনারও সন্ধান রাখার ক্ষমতা অর্জন করেছেন ! আর হবে নাই বা কেনো_ গোপাল তো প্রেমেরই বশ ! শ্রীভগবানের প্রেমের কথা স্মরণ হওয়াতে সনাতনের নয়ন দুটি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো।
কিন্তু মদনগোপালের আকর্ষণ দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠতে লাগলো তাঁর। অন্তরের অন্তস্থল থেকে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা ধ্বনিত হতে লাগলো_ “হে দয়াল প্রভু ! তোমার বিরহ যে আমি আর সহ্য করতে পারছিনা! তুমি এই দীনহীন কাঙালের অন্তরে বসেছো, এবার নয়ন সম্মুখে বসে আমার অভিলাষ পূরণ করো প্রভু!” প্রভু ভক্ত বাঞ্ছাকল্পতরু ভক্তের অভিলাষ তিনি পূরণ করবেন না ? নিশ্চয়ই করবেন ! একদিন দামোদর চৌবের বাড়িতে গেছেন সনাতন, চৌবে গৃহিণী সনাতনকে প্রণাম করে বললেন_ “ঠাকুর ! এবার থেকে আমার গোপালের ভার তুমি নাও। আমার গোপাল তো এখন আর ছোট নেই, আমার যেমন সদন বড় হয়েছে সেও তেমনি বড় হয়েছে। কাল রাতে স্বপ্নে আমাকে গোপাল বলেছে _’ও তোমার কুটিরে গিয়ে থাকবে, ওর আর এখানে থাকতে ভালো লাগছে না! তা গোপালের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবার তো আমার জো নেই! ওর সুখেই আমার সুখ ! তুমি গোপালকে নিয়ে যাও বাবাজী!” এতদিনে সনাতনের মনের আকাঙ্ক্ষা, প্রাণের অভিলাষ পূর্ণ হোল ! শ্রীবিগ্রহ বুকে করে নিয়ে সনাতনের কুটিরের পানে যে কি স্ফূর্তির দৌড় ! বৃন্দাবনের ভজনকুটিরে স্থাপন করলেন সেই চির কাঙ্ক্ষিত শ্রীবিগ্রহ মদনগোপাল । এই সেই মদনগোপাল বিগ্রহ যা সনাতন-রূপ-শ্রীজীব গোস্বামীর পূজিত । পরে দাস রঘুনাথ এবং ভট্র রঘুনাথ এই মদনগোপালের সেবা করেছিলেন ।
এই মদনগোপালের আজ্ঞা নিয়েই পরবর্তীতে কৃষ্ণদাস কবিরাজ মহাশয় বৈষ্ণবসমাজের আকরগ্রন্থ শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত রচনা শুরু করেছিলেন। কবিরাজ গোস্বামী লিখেছেন_
“বৈষ্ণবের আজ্ঞা পাইয়া চিন্তিত অন্তরে / মদন গোপাল গেলাম আজ্ঞা মাগিবারে। দর্শন করিয়া কইনু চরণ বন্দন/ গোঁসাই দাস বাবাজী করেন চরণ সেবন ।। প্রভুর চরণে যদি আজ্ঞা মাগিল / প্রভুকন্ঠ হইতে মালা খসিয়া পড়িল ।। সর্ব বৈষ্ণবগণ হরিধ্বনি দিল / গোঁসাইদাস আনি মালা মোর গলে দিল।। আজ্ঞা মালা পাইয়া মোর হইল আনন্দ / তাহাই করিনু এই গ্রন্থের আরম্ভ ।।”
এই সেই বিখ্যাত মদনগোপাল ! মদনগোপালের মূর্তিলাভ করলেন সনাতন, তার আবার পূর্ব পূর্ব ইতিহাস রয়েছে । সেই ইতিহাসের কথা আগামী সংখ্যায় পাঠককে শোনানোর ইচ্ছা রইল।