‘’বন্দেহনন্তাদ্ভুতৈশ্বৰ্য্যং শ্রীনিত্যানন্দমীশ্বর।
যস্যেচ্ছয়া তৎস্বরূপমজ্ঞেনাপি নিরূপ্যতে।৷”
(চৈঃ চঃ আদিলীলা)
–যাঁর ইচ্ছায় মূঢ় ব্যক্তিও তাঁর স্বরূপ নির্ণয় করতে পারে, সেই অনন্ত অদ্ভুতৈশ্বৰ্য্যবান ঈশ্বর নিত্যানন্দ প্রভুকে বন্দনা করি।
কথিত আছে রাধাকে না ধরলে কৃষ্ণদরশন হয় না আর নিত্যানন্দের কৃপালাভ না করলে গৌরাঙ্গের কৃপালাভ হয় না। তাই নিত্যানন্দ বন্দনা করে আজকের প্রবন্ধ শুরু করতে প্রবৃত্ত হয়েছি। আমরা আগের সংখ্যায় জেনেছিলাম যে, সনাতন ও অনুচর ঈশান নদী পার হতে গিয়ে বিপদের মধ্যে পড়েছেন। সেখানকার ‘ নাইয়া ’ বা ডাকাত পথিকের সর্বস্ব লুট করে তাদের প্রাণে মেরে জলে লাশ ভাসিয়ে দেয়, প্রমাণ রাখে না। হরিভক্তপরায়ণ সনাতন বিপদের গন্ধ পেয়েই ঈশানকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন যে, তার কাছে সাতটা মােহর রয়েছে। সনাতন ধমক দিলেন ঈশানকে — এই কাল যম আবার সঙ্গে আনে? মােহরগুলি নিয়ে সনাতন গেলেন ভূঁইয়ার কাছে, বললেন, আমাদের সাথে এই মােহরগুলি ছিল আপনার সম্মানমূল্য হিসাবে এগুলি আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি। আপনি আমাদের পার করে দিন — ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য আপনার মঙ্গল করবেন। আর এ কাজে নিশ্চয়ই আপনার পূণ্য হবে। ভূঁইয়া ছিল গুণীন, সে বলল— “ সাতটা নয়, আটটা মােহর আছে। তবে তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি সজ্জন ব্যক্তি! আমার জীবনে অনেক পাপ, আর তােমাকে হত্যা করলে পাপ আরও বাড়তাে। তুমি নিজেই মােহর দিয়ে আমার সম্মান জানালে, এতে আমি মহাপাপ থেকে রক্ষা পেলাম। এ মােহর আমি নেব না, তােমার কথায় আমার চৈতন্য হয়েছে। পাপের থেকে পুণ্য সঞ্চয়ই যে জীবনের উদ্দেশ্য তা আমি বুঝতে পেরেছি। ” সনাতন বললেন, “ না ভাই, এ মােহর তােমাকে নিতেই হবে, কারণ পথে এর জন্য আবার বিপদে পড়তে হবে, দয়া করে তুমি এগুলি গ্রহণ করে আমার মুস্কিল আসান করাে। আর ঈশান! তুমি আমার কাছে সত্য গােপন করেছ, তােমার কাছে যে মােহর এখনও রয়েছে। সেটি নিয়ে তুমি বাড়ী ফিরে যাও। সঞ্চয়ের প্রবৃত্তি থাকলে এবং সত্যের আঁট না থাকলে ত্যাগ বা বৈরাগ্য অবলম্বন করা যায় না। ”
এরপর ঈশানের ফেরার ব্যবস্থা হল এবং ভূঁইয়া শুধু নদী পার করেই দিল না, গুরুবৎ ভক্তপ্রবরকে নিরাপদে পৌঁছে দেবার জন্য চারজন রক্ষী নিযুক্ত করে দিল। যাবার প্রাক্কালে ঈশান কাঁদতে লাগল। প্রভু বললেন — “ঈশান, আমি কৃষ্ণনামে কাঙাল, অকিঞ্চন, অসঙ্গ। দেখছাে না আমার হাতে শুধু করঙ্গ, গায়ে জীর্ণ কাঁথা, আমি কৃষ্ণপদে আত্মসমর্পণ করেছি, তাই তােমরা সকলেই নিজ নিজ গৃহে ফিরে গিয়ে আপন আপন কর্ম কর। তবে সর্বদা মনে রেখ, কৃষ্ণই সব জীবজগতের রক্ষাকর্তা, তাই কৃষ্ণনাম, কৃষ্ণগুণগান সবসময় করবে। তাকে মনে রাখলেই দেখবে সে তােমায় মনে রাখবে।
যাত্রাপথে হাজীপুরে এসে পৌঁছাল সনাতন। সেখানে তাঁর ভগ্নীপতি শ্রীকান্ত তাঁকে আশ্রয় দিল। শ্রীকান্ত বাদশা হােসেন শাহের ঘােড়া জোগান দেবার কাজ করে। সনাতন তাকে বললেন গৌররূপী কৃষ্ণ পাবার আশায় হােসেন শাহের কারাগার থেকে পালিয়ে আসার ঘটনা। তাছাড়া যেহেতু শ্রীকান্ত গৌড়েশ্বরের সঙ্গে যুক্ত ফলে সনাতনকে আশ্রয় দিলে তার বিপদের সম্ভাবনা। সুতরাং সনাতন শ্রীকান্তের আতিথেয়তা অগ্রাহ্য করে কাশী অভিমুখে রওনা দিলেন। কিন্তু শ্রীকান্ত কি দেখল ! দেখলাে যে সনাতনকে সে জানতাে, এতাে সে সনাতন নয় ! বেশ-বাসে স্পৃহা নেই, ঈশ্বর ভাবনাই তাঁর একমাত্র আচ্ছাদন, ঈশ্বর চিন্তাই তাঁর একমাত্র আহার, ঈশ্বর নির্ভরতাই তার একমাত্র আনন্দ।
হাঁটতে হাঁটতে চলে এল সনাতন, গায়ে শুধু শ্রীকান্তের দেওয়া একটি শীতবস্ত্র আর হাতে করঙ্গ, মুখে কৃষ্ণনাম। পৌঁছে গেল কাশী। তখন মহাপ্রভু কাশীতে চন্দ্রশেখরের বাড়ীতে অবস্থান করছেন। একথা শুনে সনাতনের আনন্দের আর অবধি রইল না। চন্দ্রশেখরের বাড়ীর দরজায় এসে বসলেন সনাতন, অন্তর্যামী প্রভু ভক্তদের বললেন–“দ্যাখােতাে, দুয়ারে যেন কোন বৈষ্ণব এসে বসে আছে, তাঁকে ভিতরে নিয়ে এস।” চন্দ্রশেখর বাইরে এসে দেখেন একজন বসে আছে চুল-দাড়ি ওয়ালা, কিন্তু বৈষ্ণবের বেশ অর্থাৎ মালা, চন্দন এসব তাে নেই। প্রভুকে বললেন—“না প্রভু ! কোন বৈষ্ণব নেই তবে একজন দরবেশ বসে আছে।” প্রভু বললেন—“তাকেই ডেকে নিয়ে এস।” সনাতন এসে দাঁড়াতেই প্রভু উঠে তাঁকে আলিঙ্গন করতে গেলেন। সনাতন কেঁদে উঠলেন, বললেন—”আমাকে ছুঁয়ােনা, প্রভু ! আমি অস্পৃশ্য-পতিত, হীন ব্যক্তির সাথে হীন কাজ করে আমি পতিত হয়ে গেছি, আমি তােমার স্পর্শের অযােগ্য।” প্রভু বললেন-“ও কি কথা বলছ সনাতন ! আমি নিজে পবিত্র হবার জন্য তােমাকে স্পর্শ করছি। তােমার যা ভক্তি, সেই ভক্তির বলে তুমি সমগ্র বিশ্বকে পবিত্র করতে পারাে। এই সংসারে যার ভক্তি নেই, সেই কেবল অধম, কারণ ভক্তির অভাবে সে নিজেকেও পবিত্র করতে পারে না। আর তুমি স্বয়ং ভক্তির পরাকাষ্ঠা, তাই তুমি পবিত্র। তােমাকে স্পর্শ করতে দাও, তােমাকে ভালাে করে দেখতে দাও — গাইতে দাও তােমার গুণগান। ভক্তের দর্শনেই চক্ষুর সার্থকতা, ভক্ত গাত্রম্পর্শে দেহের সার্থকতা। আর ভক্ত গুণকীর্তনে জিহ্বার সার্থকতা। জগতে ভক্তই দুর্লভ। তুমি কেঁদো না সনাতন, তােমার ভয় কি, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তােমার ভার নিয়েছেন — তিনিই তােমাকে উদ্ধার করবেন।” সনাতন কাঁদতে কাঁদতে বললেন— “ আমি কৃষ্ণ জানি না, আমি শুধু তােমাকেই জানি প্রভু ! আমি প্রত্যক্ষ করেছি কারাগার থেকে তুমিই আমাকে মুক্ত করেছ, তুমিই আমাকে এখানে এনেছ, এবার তুমি আমার বাকি জীবনের ভার গ্রহণ কর।” প্রভু চন্দ্রশেখরকে আদেশ দিলেন সনাতনকে ক্ষৌরকর্ম করিয়ে, গঙ্গাস্নান করিয়ে, ভদ্র বেশ পরিয়ে তাঁর সামনে আনতে। চন্দ্রশেখর প্রভুর কথামতাে সবকিছু করে যখন বস্ত্র দিতে গেলেন — তখন কিন্তু সনাতন নিলেন না, একটা পুরােনাে বস্ত্রকেই ছিঁড়ে বহির্বাস ও ডাের-কৌপিন বানিয়ে নিলেন।
সেখানে তখন তপন মিশ্র নামে একজন ব্রাহ্মণ থাকতেন। তিনি মহাপ্রভু আর সনাতন সহ ভক্তবৃন্দকে একদিন তাঁর বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করে খাইয়ে দিলেন। সেখানে প্রভুর ভুক্তাবশিষ্ট সনাতন গ্রহণ করে ধন্য হলেন। সনাতনের প্রকৃত বৈষ্ণববাচিত আচরণে মুগ্ধ হয়ে তপন সনাতনকে অনুরােধ করলেন — যে’কদিন তিনি কাশীতে থাকবেন যেন তার বাড়ীতেই ভিক্ষা করেন। কিন্তু সনাতন তা প্রত্যাখ্যান করলেন দেখে প্রভু প্রীত হয়ে সনাতনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। কিন্তু প্রভু সনাতনের গায়ে শ্রীকান্তের দেওয়া কম্বলের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। লজ্জা পেয়ে সনাতন পরের দিন গঙ্গার ঘাটে এক ভিখারিকে কম্বলটি দান করে তাঁর গায়ের জীর্ণকাঁথাখানি নিজের গায়ে দিয়ে আবার প্রভুর কাছে এসে তাঁকে প্রণাম করে বসলেন। তা দেখে প্রভু খুবই খুশি হলেন, বললেন– “সনাতন প্রকৃত বৈষ্ণব, কৃষ্ণ স্বয়ং এর বিষয়ভােগ দূর করে দিয়েছেন, যেমন উত্তম বৈদ্য রােগের অবশেষ মাত্র রাখে না, এর ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটি হয়েছে।”
সনাতন শিক্ষার্থীর ভঙ্গিতে প্রভুর ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলেন, বললেন— “প্রভু ! এতদিন বিষয়-আশয়, রাজকর্মাদি ইত্যাদি নানান কর্মে দিন কাটিয়েছি। এখন আপনি আমায় পায়ে ঠাঁই দিয়েছেন। এখন বলে দিন আমার কর্তব্য কি?” প্রভু জিজ্ঞাসা করলেন– “সনাতন, তােমার মনে আর কি কোন জিজ্ঞাসা রয়েছে? তাহলে অনায়াসে আমায় তা জানাতে পারাে।” সনাতন বললেন— “আমার মনে বহুদিন থেকে তিনটি জিজ্ঞাসা জমে আছে — প্রথমত, আমি কে — আমার স্বরূপ কি ? দ্বিতীয়ত, তাপত্রয় কেন আমাকে জীর্ণ করছে ? আর তৃতীয়ত কিসে আমার মঙ্গল ?”
এককথায় সব জিজ্ঞাসার উত্তর দিলেন গৌরহরি, বললেন– “জীবের স্বরূপ কি জানাে–জীব হ’ল কৃষ্ণের নিত্যদাস। এই নিত্যদাসত্ব ভুলে জীব যখন কর্তৃত্বাভিমানে বহির্মুখী হয়, তখনই তাকে ত্রিতাপ জ্বালা জীর্ণ করে। আর মঙ্গল? –শাস্ত্ৰকৃপা, সাধুর কৃপা হলেই ঈশ্বরের কৃপা হয় — এটাই জীবের মঙ্গল। অন্য আর কি মঙ্গল আছে? যদি শাস্ত্রপাঠে ও সাধুর কৃপায় জীব অন্তর্মুখী হয়, কৃষ্ণমুখী হয় তাহলে সে মায়ার বন্ধন কাটিয়ে এই জীবদশা থেকে মুক্তিলাভ করতে পারে। তাই কৃষ্ণ ভজনই সার কথা। যদি বল — কৃষ্ণ কে? উত্তরে বলতে হয় — কৃষ্ণ জগতের প্রভু, জীবের ত্রাতা, কৃষ্ণপদই একমাত্র প্রাপ্তি, আর সেই প্রাপ্তির, সাধনই ভক্তি।”