“প্রত্যক্ষ তাঁহার তপ্তকাঞ্চনের দ্যুতি।
যাঁহার ছটায় নাশে অজ্ঞান-তমস্ততি৷৷
জীবের কল্মষ-তমাে নাশ করিবারে।
অঙ্গ-উপাঙ্গ-নাম নানা অস্ত্র ধরে।৷
ভক্তির বিরােধী কর্ম-ধর্ম বা অধর্ম।
তাহার ‘কল্মষ’ নাম, সেই মহাতম।৷
বাহু তুলি ‘হরি বলি’ প্রেমদৃষ্ট্যে চায়।
করিয়া কল্মষ নাশ প্রেমেতে ভাসায়।৷” – শ্রীল কৃষ্ণদাস
—ভগবৎ লীলা, গৌরলীলা ভক্ত ছাড়া কে প্রকাশ করতে পারে ! ভক্তের কাছে ভগবান সরল থেকে সরলতর বা সরলতম হয়ে থাকেন। যিনি এই সমগ্র বিশ্বচরাচরকে আকর্ষণ করেন, তিনিই আবার ভক্তের দ্বারা আকৃষ্ট হন লীলাবিলাসের নিমিত্ত। ঈশ্বরের রাজ্যে তাই বিচিত্র বিধান। গৌরলীলার পার্ষদের লীলা বর্ণনায় প্রয়াসী হয়ে আমরা রূপ গােস্বামীর লীলাময় জীবনের উপর আলােকপাতের চেষ্টা করেছি। রূপ গােস্বামীর কথা বলতে গেলেই তার প্রাণাধিক জ্যেষ্ঠ সনাতনের কথা চলেই আসে—তাই সনাতন গােস্বামীর জীবনের অনেক লীলাকথাও ইতিমধ্যে আলােচনা হয়ে গেছে। তবু আরও কিছু না বলা কথা নিয়ে হুসেন শাহের ‘খাস’ অর্থাৎ বিশেষ বা উচ্চপদস্থ কর্মচারী—যাঁরা রাজার একান্ত কাছের অমাত্য সেই ‘দবির খাস’ ওরফে সনাতন গােস্বামীর লীলাকাহিনী শুরু করা যাক।
পূর্বে আলােচিত হয়েছে যে, দাক্ষিণাত্যের বৈষ্ণবীয় সাধনার ধারায় অবগাহিত পরিবারের এক শাস্ত্রবিদ মুকুন্দদেব গৌড়বঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। কুমারদেবের জ্যেষ্ঠ পুত্র অমরদেব বা সনাতন। কুমারদেব অকালে মারা যাওয়ায় মুকুন্দদেবই এদের প্রতিপালন করেন, ইনি গৌড়রাজের একজন উচ্চপদস্থ ও বিশ্বস্ত কর্মচারী ছিলেন। ব্যবহারিক জীবনে ইনি সুপ্রতিষ্ঠিত, দানশীল ও ভক্তিমান সাধক ছিলেন। গৌড়ে প্রাথমিক পাঠ শেষ হলে মুকুন্দদেব পৌত্রদের উচ্চশিক্ষার জন্য তৎকালীন বিদ্যার প্রাণকেন্দ্র নবদ্বীপে পাঠান এবং সেখানে সনাতন বিভিন্ন পণ্ডিতের কাছে পাঠগ্রহণ করেন। যাঁদের মধ্যে তৎকালীন বিখ্যাত পণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌম একজন। ফলে মেধাবী ছাত্র সনাতনের (অমরদেব) পাঠ সমাপন করতে বেশী সময় লাগল না। এরপর তিনি আরবী ও ফার্সি শিখে নিয়ে গৌড়রাজের অধীনে চাকরীতে যােগদান করলেন। তাঁর কর্মনিষ্ঠা, সততা, নৈপুণ্য ইত্যাদির মাধ্যমে তিনি অচিরেই গৌড়রাজের প্রিয় সচিব বা ‘দবির খাস’ হয়ে ওঠেন।
বাহ্যজীবনে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী রাজঅমাত্য কিন্তু অন্তর্জগতে তিনি ছিলেন পরম বৈষ্ণব। তাঁর অন্তর্জগতে ধীরে ধীরে জমা হচ্ছিল অধ্যাত্ম সাধনার পরম সঞ্চয়, একান্তভাবে তিনি গ্রহণ করেছিলেন ভক্তি ও প্রেমধর্মের আদর্শ। তাঁর এই গােপন প্রস্তুতিই সেদিন আকর্ষণ করেছিল প্রেমাবতার শ্রীচৈতন্যদেবকে। তাই প্রভু রামকেলিতে ছুটে এসেছিলেন—ভবিষ্যৎ জীবনের চিহ্নিত পার্ষদ ও লীলা-পরিকরদের অবলীলায় করেছিলেন আত্মসাৎ। মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ পাবার পর দুই ভাই রূপ-সনাতনের সে কি দৈন্যতা! প্রভু বললেন —“ওঠো দৈন্য সংবরণ করাে।” কিন্তু দুই ভাইয়ের মাটিতে লুটিয়ে সে কি কান্না আর বলছেন—“আমরা পতিতাধম, আমাদের মার্জনা করাে—এমন প্রার্থনা করতেও আমাদের লজ্জা করছে। আমরা সদাসর্বদা নীচসঙ্গ করেছি তাই আমরা পতিত হয়ে গেছি।” তারা আরও বললেন–জগাই-মাধাই এর উদ্ধার সহজ ছিল। কারণ তাদের বাড়ি নবদ্বীপ, তারা জাতিতে ব্রাহ্মণ, তাদের দোষ ছিল একমাত্র পাপাচার। কিন্তু তারা তােমার নামে নিন্দা করতে গিয়ে—তােমার নাম করে লাভবান হয়েছে। শুধু নামে কি নামাভাসেও পাপ চলে যায়। কিন্তু আমরা গাে-ব্রাহ্মণ-দ্রোহীদের সাথে নিত্যসঙ্গ করেছি—আমাদের কি উপায় হবে ? তুমি ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই, আমাদের উদ্ধার করে তুমি তােমার পতিতপাবন নাম সার্থক করাে প্রভু !
প্রভু বললেন–তােমাদের দৈনদশা দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। আমি বলছি—মাভৈঃ, তােমাদের কোন ভয় নেই ! রাজকার্যে লিপ্ত থেকেও শ্রীভগবানের চরণে মন রেখেছ —এই ঈশ্বরের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন নিবিষ্টতাই তােমাদের সংসারাসক্তি কাটিয়ে দেবে। তােমাদের জন্যই তাে আমি রামকেলিতে এসেছি। কোন ভয় নেই, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তােমাদের কৃপা করবেন। আজ থেকে সন্তোষদেব ও অমরদেব তােমরা হলে রূপ ও সনাতন। এরপরে তিনি কৃষ্ণমন্ত্রের পুরশ্চরণ করে দিলেন যাতে নির্বিঘ্নে কৃষ্ণপ্রাপ্তি ঘটতে পারে। মন্ত্রের সিদ্ধিলাভের জন্য যে প্রাথমিক অনুষ্ঠান তাকে পুরশ্চরণ বলে। আপামর জীবকুলের জন্য মহাপ্রভু নাম দিয়ে গেলেন—কৃষ্ণমন্ত্রের পুরশ্চরণ হ’ল, ঐ গৌরহরিই স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। যাইহােক বিদায়কালে মহাপ্রভু বলে গেলেন —পরপুরুষে আসক্ত রমণী যেমন গৃহকর্মে ব্যস্ত থেকেও সর্বদা অন্তরে তার কান্তাকে স্মরণ করে নবনব রস আস্বাদন করে, তেমনি ভক্তজন বাইরে বিষয়ীর মত ব্যবহার করলেও অনুক্ষণ অন্তর্জগতে সে শ্রীকৃষ্ণসঙ্গ- সুধা লাভ করে থাকে। তাই রাজকার্য করছ করাে, কিন্তু মনকে সদা-সর্বদা ভগবৎ শ্রীচরণে নিযুক্ত রাখাে।
পিতামহ মুকুন্দদেবের লােকান্তরের পর তাঁরই পদে সনাতন রাজদরবারে নিযুক্ত হন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর। তাঁর কর্মদক্ষতার গুণেই অল্প বয়সে তিনি হােসেন শাহের একান্ত সচিব হন বা ‘দবির খাস’ উপাধি পান। তিনি আরবী ও ফার্সীতে অনর্গল কথা বলতে পারতেন, রাজদরবারে তাঁর বেশভূষা এবং চালচলন দেখে সাধারণ মানুষ ভাবতাে যে, তিনি ছিলেন মুসলমান। কিন্তু এই ব্যক্তিই কর্মাবসরে রামকেলিতে গ্রামের বাড়ি যখন যেতেন তখন তিনি অন্য মানুষ। প্রত্যহ প্রত্যুষে স্নান-তর্পণ শেষ করে শুরু করতেন দান-ধ্যান, পূজা, শাস্ত্রপাঠ ও ধর্ম আলােচনা। এইভাবে সারাদিন অতিবাহিত করতেন ভগবৎ কর্মে। শ্রীচৈতন্য দর্শনের পর এঁরা দুইভাই এতই অভিভূত হয়েছিলেন যে, পরমপদ প্রাপ্তির আশায় তাঁরা সংসার-ঐশ্বর্য, পদমর্যাদা এমনকি নিজের জীবনকেও উৎসর্গ করতে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। রাজকার্য ধীরে ধীরে বােঝাস্বরূপ হয়ে উঠল, সনাতন ছলছুতাে করে রাজকার্যে ছুটি নিয়ে শরীর খারাপের অজুহাতে ঘরে বসে বসে মহাপ্রভুর শ্রীচরণ স্মরণ করে বসে রইলেন। একদিন যায়—দুদিন যায়, সপ্তাহ—পক্ষকাল, তখন রাজা রাজবৈদ্য পাঠালেন পরীক্ষা করার জন্য। রাজবৈদ্য কোন রােগ পেল না। রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে সনাতনকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন।
ভগবৎ কর্মে সকল অকর্মই কর্ম। তাই রূপ যখন গােপনে লিখে পাঠান যে, “রামকেলির মুদির দোকানে দশ হাজার মুদ্রা রয়েছে, সেটাকে কাজে লাগিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে এস” তখন সনাতন শ্রীচৈতন্য স্মরণ করে কাজে লেগে গেলেন। তিনি কারাগারে থেকে প্রহরীর প্রশংসা, গুণগান গাইতে লাগলেন। বলতে লাগলেন—প্রহরী হলেও ইনি সাচ্চা মুসলমান, প্রায় পীরের ন্যায়, কিতাব-কোরানে কি অগাধ জ্ঞান, ইনি আল্লার কৃপাপ্রাপ্ত ! রাজমন্ত্রী এত বড় বড় প্রশংসা করছে—প্রহরীর চিত্ত বিগলিত হ’ল। দু’জনার মধ্যে ভাব জন্মে গেল। কিছুদিন এরূপ কাটার পর সনাতন আসল কথা পাড়লেন, বললেন, “যদি আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দাও, তাহলে আল্লাহ তােমার ভববন্ধন থেকে মুক্তি দিয়ে দেবেন।” এছাড়া মন্ত্রী থাকাকালীন সনাতন এই প্রহরীর কিছু উপকারও করেছিলেন, সেগুলিও স্মরণ করাল। সর্বোপরি টাকার কথাও তুললেন, বললেন—“দ্যাখো, এতে তােমার অর্থ ও পুণ্য দুই-ই হবে, তাহলে এ সুযােগ ছেড়ে আর লাভ কি ?” কিন্তু প্রহরীর ভয় বাদশাকে। সনাতন বললেন : “বাদশা তাে এখন রাজ্যের বাইরে, যুদ্ধে মত্ত, ফিরবে কিনা তাই বা কে জানে! যদি ফেরে বলবে—দবির খাস প্রাতঃকৃত্য করতে গঙ্গাতীরে গেল আর অতর্কিতে ঝাঁপ দিল নদীতে। অনেক খুঁজলাম কিন্তু সন্ধান পাইনি। হাতে-পায়ে বেড়ি বাঁধা, সাঁতার কাটতে পারেনি, অবশ্যই জলে ডুবে মারা গেছে। আর আমার মৃত্যুর খবর শুনে নিশ্চয়ই রাজা তােমাকে শাস্তি দেবে না। আর তােমার ধরা পড়ার কোন ভয় নেই। কারণ আমি তাে দরবেশের বেশে সােজা মক্কা চলে যাব। এত কথাতেও প্রহরীর যেন কেমন একটা ভয় ভয় ভাব। সনাতন বললেন ঠিক আছে কারাগার থেকে বের করে মুদির দোকানে তাে চল, টাকা গুনে নেবে তারপর ছাড়বে। সাতসহস্র মুদ্রা—রাশীকৃত টাকা ! প্রহরীর মন টলল, হাত-পায়ের বেড়ি কেটে মুক্ত করে দিল সনাতনকে। রাতারাতি গঙ্গাপার হয়ে বৃন্দাবনের দিকে রওনা দিলেন সনাতন।
এখানে একটা জিজ্ঞাসা আসে, সনাতন যা করলেন এটা কি সত্যের অপলাপ ? না, তা নয়, এ সংসারে চৈতন্যচরণই সত্য, ঈশ্বরে শরণাগত হওয়াই কাম্য। তাই সেই সত্যলাভের জন্য যা কিছু প্রতিকূল তা যে কোন উপায়েই হােক—ছলে, বলে অথবা কৌশলে দূর করাই সত্য বা ধর্ম। সেই অর্থে সনাতন যথার্থ ধার্মিক ও সত্যপরায়ণ। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন —সত্যের জন্য সবকিছুকে ত্যাগ করা যায় কিন্তু কোনকিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করা যায় না। সুতরাং চৈতন্যপার্ষদ সনাতন কি করে অসত্য বা অধর্মের রাস্তায় যেতে পারেন—যিনি ভাবীকালের সনাতন ধর্মের অন্যতম এক পথিকৃৎ। তিনি যথার্থই ধার্মিক ও সত্যপরায়ণ।
বৃন্দাবনের পথে সনাতন, সঙ্গে চাকর ঈশান। লােকালয় বর্জিত, নিরিবিলি পথের পথিক এঁরা। বলা তাে যায় না রাজার অনুচরেরা যদি কেউ চিনতে পারে ! তাই এই নিরিবিলি পথ, নির্জনতা। সাধনপথ তাে নিরিবিলিই হয়। আবার শ্রীরামকৃষ্ণের কথা– “নির্জনে, নিরালয়ে দই পাততে হয়, না হলে ঠিক জমে না !” যাইহােক সাধনপথে যেমন বিঘ্ন আছে, চলার পথেও নানান বিঘ্ন। পাতড়া পাহাড়ের কাছে এসে থামলেন দু’জনে। এবার আবার গঙ্গা পার হয়ে গাজীপুরে যাবেন। সেখানকার ‘নাইয়া’-রা গুনিন। ওরা গুণতে জানতাে, গুণে দেখল যে, পথিকদু’য়ের কাছে মােহর রয়েছে। তারা বলল—এখন দুপুর, খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম করাে, বেলাবেলি পার করে দেব, প্রয়ােজনে লােক দিয়ে এগিয়েও দেব। স্নানাহার সারলেন দুজনে। কিন্তু তাঁদের প্রতি এত যত্ন কেন, যেন একটু বেশী বেশী আদর ! বাদশার মহামন্ত্রী ধুরন্ধর বুদ্ধিমান সনাতনের বুঝতে দেরি হল না “ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।” একবার ভাবলেন ‘নাইয়া’-রা কি তাঁকে রাজকর্মচারী হিসাবে চিনে ফেলেছে আবার ভাবলেন তা কি করে হয়, গৌড়বঙ্গ থেকে এতদূরে, তাছাড়া তাঁর দরিদ্রমলিন বেশ, দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্তিভরা দেহ, মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য রৌদ্র-জলে আর গোঁফ-দাড়ির দঙ্গলে ম্লান হয়ে গিয়েছে—এ অবস্থায় তাঁকে চেনা তাে সম্ভব নয় ! তাহলে নিশ্চয়ই ‘নাইয়া’-দের কোন বদ মতলব রয়েছে !
