জিজ্ঞাসু:—ইউরোপের দার্শনিক স্পিনোজাকে, আচার্য শঙ্করের সঙ্গে তুলনা করা হয় কেন?
গুরু মহারাজ:–তুমি কি দর্শনশাস্ত্রের ছাত্র ছিলে ? ও আচ্ছাআর সেইজন্যই এই ধরণের কথা জিজ্ঞাসা করছো, তাই তো ! তবে কথাটা তুমি ঠিকই বলেছো স্পিনোজা কে ইউরোপের শঙ্করাচার্য বলা হয় ! এর কারণ স্পিনোজার যে দর্শন(philosophy), তাতে আচার্য শঙ্করের দর্শনের তত্ত্বের অনেক সাদৃশ্য পাওয়া যায় ! স্পিনোজার থেকেও শঙ্করাচার্য অনেক প্রাচীন_ তাই এটা ধরেই নেওয়া যায় যে, স্পিনোজার দর্শনে, আচার্য শংকরের প্রভাব পড়েছিল ! ইউরোপীয় বণিকদের দ্বারা ভারতবর্ষের বহু পুঁথি-পত্র বা শাশ্ত্রাদি বহুকাল থেকেই পৌঁছে যেত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাজারে ! সেখান থেকে তৎকালীন ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা ভারতীয় শাশ্ত্রগুলি collection করতো ! আর সেইগুলি পড়াশোনা করে এবং সেখান থেকে বিভিন্ন তথ্য আহরণ করে_ সেগুলোর সাথে নিজের মতামত সংযোজন করে ওরা নতুন নতুন গ্রন্থ রচনা করতো ! এইগুলিই পরবর্তীতে ইউরোপীয় ঐ পন্ডিতদের এক একজনের নাম যোগ করে_ অমুক-philosophy, তমুক-philosophy নামে পরিচিত হয়েছে ! এই ভাবেই স্পিনোজা শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদকে, হেগেল materialistic idealism নামে ভারতীয় দর্শনের দ্বৈতবাদকে নিজেদের নামে চালিয়ে দিয়েছিল ! হেগেল তার দর্শনে(philosophy) বলেছে_ যে কোনো ক্ষুদ্র material থেকে মহাবিশ্ব পর্যন্ত_ সবকিছুই একই সূত্রে বাঁধা ! কিন্তু এই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা_ তার সৃষ্টি থেকে পৃথক ! আর স্পিনোজার দর্শনের মূল কথায়, আচার্য শঙ্করের অদ্বৈতবাদেরই repeatation পাওয়া যায় ! তিনি বলতে চেয়েছেন সবকিছুই সেই এক থেকেই সৃষ্ট, অর্থাৎ সবই ‘তিনি’ অথবা ‘তিনি’-ই সব হয়েছেন !
যাইহোক, ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ যাই বলুক না কেন, আর যতই দর্শন লিখে থাকুক না কেন_ সে সবই ভারতীয় শাস্ত্রাদি থেকেই ধার করা ! কেন এসব কথা বলছি বলোতো_ এর কারণ হোলো, ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ইউরোপীয় পন্ডিতদের কেউই আত্মজ্ঞানসম্পন্ন বোধিব্যক্তি ছিল না ! তাই এদের দর্শনে কোথাও ‘বোধে’-র কথা পাবে না ! সবই যেন hypothesis বা কল্পনা !
দ্যাখো, একমাত্র বোধি ব্যক্তিরাই কোনো মৌলিক তত্ত্বকে বা পরম সত্যকে প্রকাশ করতে পারেন ! তত্ত্বজ্ঞান না হোলে পরম সত্যকে বা পরম তত্ত্বকে কে জানতে পারে ? সেই জন্য কোনো ইউরোপীয় পণ্ডিতের দর্শনেই সেই চরম-তত্ত্বের কোনো ধারণা পাওয়া যায় না।
এদিকে দ্যাখো, একমাত্র ভারতীয় ঋষিরাই বলতে পেরেছিলেন,_ “শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা। আ যে ধামাণি দিব্যানি তস্থু….।” অর্থাৎ ‘হে অমৃতের পুত্রগণ, দিব্যধামবাসীগণ, তোমরা শোনোতমসার পারে থাকা সেই জ্যোতির্ময় মোহান্ত পুরুষকে আমি জেনেছি!” তাঁরা সেই পরমকে বোধে বোধ করেছিলেন। তাই তাঁরা আরও বলেছিলেন_ ” পরমের বোধ করা যায় শুধুমাত্র জ্ঞানের দ্বারা, প্রেমের দ্বারা এবং সেবার দ্বারা !” কিন্তু কোনো বিদেশী দার্শনিক, ভারতীয় সত্যদ্রষ্টা ঋষিদের মতো এই ধরনের স্বীকারোক্তি কখনও করতে পারে নি। ভারতবর্ষের বাইরে কয়েকজন অবতার কল্প মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছিলেন(মুসা,যীশু– প্রমুখেরা) এবং তাঁদের কথায় ‘বোধের কথা’ অবশ্যই পাওয়া যায় কিন্তু কোনো দার্শনিকের তত্ত্বের কথায় বোধের প্রকাশ কোথায় পাবে ? আর পাবেই বা কি করে !! কারণ তারা তো কেউই বোধি ব্যক্তি ছিলই না !!
