[ জিজ্ঞাসু:–আচ্ছা গুরু মহারাজ যেকোনো পরম্পরায় গুরু যদি বোধি ব্যক্তি নাও হ’ন, তাহলেও কি তাঁর কোনো শিষ্যের পূর্ণত্ব লাভ সম্ভব হয় ?? এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছিলেন গুরু মহারাজ। সেই প্রসঙ্গে উনি এক রাজার বাড়ির দাসীর গল্প উদাহরণ হিসাবে বলেছিলেন–আজ ঐ আলোচনার শেষাংশ] … এই গল্পটির তাৎপর্য এবার বলছি শোনো, এখানে কি দেখা গেল দাসী-রূপী ঐ মহিলাটি রাজার কাছাকাছিই থাকতো, কিন্তু কখনোই তার রাজদর্শন হয়নি ! সহজ-সরল (অর্থাৎ সাধনার দ্বারা সিদ্ধ অবস্থার সাধক) শিশুটির কিন্তু রাজাকে দর্শন-স্পর্শন সবই হয়ে গেল ! তাছাড়াও রাজার ঘরে অবাধে যাতায়াতের permission-ও লাভ করল সে ! আর এর একমাত্র কারণ ছিল শিশুটির সরলতা ! শিশুটির একান্তভাবে ধারণা ছিল যে, তার মা-ই পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী ! তার সমস্ত আপদ-বিপদের রক্ষাকারী তার মা ! দেশের রাজার জোর কতো, তাঁর রক্ষীরা কতো শক্তিশালী বা তুলনায় তার মা কতো কম শক্তিশালী এসব সে জানেই না বা জানার চেষ্টাও কখনো করেনি ! সে শুধু জানে_ তার মা সব পারে ! মায়ের উপরেই তার একান্ত বিশ্বাস– সম্পূর্ণ নির্ভরতা ! তাই সে রক্ষীদেরকে, এমনকি রাজামশাইকেও একটুও ভয় পায়নি ! সে বারবার শুধু একটা কথাই বলেছিল_ “মাকে বলে দেবো!” এই সহজতা ও সরলতাই রাজাকে মুগ্ধ করেছিল!
সাধন জগতেও এইরকমটাই হয় ! কোনো গুরু পরম্পরায় একজন গুরু আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল হোলেও, যেহেতু তিনি সাধন-পথেই রয়েছেন_ তাই তিনি রাজার দাসীর মতো রাজার কাছাকাছিই রয়েছেন ! তাঁর রাজদর্শন হয় নি ঠিকই কিন্তু সালোক্য বা সামীপ্যে রয়েছেন ! এবার যদি ঐরূপ কোনো গুরুর উপযুক্ত শিষ্য তৈরি হয়ে যায় এবং যদি তার, গুরুর(গুরু যেমন‌ই হোক না কেন) প্রতি একান্ত নির্ভরতা ও বিশ্বাস থাকে আর থাকে অকপট সারল্য ও সহজতা(যেটা সাধন-ভজন করতে করতেই সাধকের জীবনে আপনা-আপনিই এসে যায়)_ তাহলে গুরুর আত্মদর্শন না হোলেও শিষ্যের হোতে পারে ! এ ব্যাপারে কোনো অসুবিধা হয় না !
“গুরু পরম্পরা”র কথা যেটা তোমাদেরকে বলছিলাম, সেটা দু-রকমের হোতে পারে ! একটা লোকপরম্পরা এবং অপরটি লোকোত্তর পরম্পরা ! সাধারণ গৃহীগুরু বা গোঁসাইগুরু পরম্পরাকে বলা হয় লোকপরম্পরা কিন্তু যখনই কোনো প্লাস ওয়ার্ল্ডের গুরুরা(অবতরিত আধার) এসে পৃথিবীতে নতুন কোনো পরম্পরার সৃষ্টি করেন_ সেটাই “লোকোত্তর পরম্পরা” ! সেইরকম শক্তিশালী পরম্পরার কথাই এতক্ষণ বলা হচ্ছিলো ! এই রকম “গুরু পরম্পরা” যেন একটা বড় মালার মতো, যেন অনেক ফুল থরে থরে সাজিয়ে ঐ মালাটি গাঁথা হয়েছে ! ওই মালায় কোনোটি ছোট ফুল, কোনোটি বড়ফুল_ আবার সবার মাঝখানেরটি হয়তো সবচাইতে বড় এবং সবচাইতে সুন্দর ফুল ! কিন্তু একটি কথা খেয়াল রাখবে যে, ওই মালাটির ছোট ফুল হোক বা বড় ফুল_ যে কোনো একটি ফুলে যদি টান দেওয়া হয়, তাহলে পুরো মালাতেই একটা কাঁপন লাগে অর্থাৎ সেই পরম্পরার অন্যান্য সমস্ত গুরুর নজর পড়ে যায় ওই বিশেষ সাধকটির দিকে__ যে তাদের সকলকে নাড়া দিতে পেরেছে ! ফলে সেই সাধক, পুরো পরম্পরার দৃষ্টিপথে এসে যায় এবং তাঁদের কৃপা লাভ করে থাকে ! এইভাবে লোকোত্তর গুরু-পরম্পরার অনুসারীদের মধ্যে কোনো গুরুর না হোলেও, ঐ পরম্পরার আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী কোনো শিষ্যের আত্মদর্শন নিশ্চয়ই হোতে পারে !!