জিজ্ঞাসু:—ছোটবেলায় আপনি যে প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষ এবং ভারতবর্ষের বাইরের কিছু দেশে ঘুরে ছিলেন_ তার সবটাই কি পায়ে হেঁটে?

গুরু মহারাজ:—না-না ! সবটাই পায়ে হেঁটে কেন হবে_ যেখানে হাঁটা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকতো না, সেখানে হাঁটতেই হয়েছে_ আর যেখানে transportation-এর সুযোগ পেয়েছি, সেখানে transport ব্যবহার করেছি ! ট্রেন, বাস, মালগাড়ি যখন যা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছি তাই avail করেছি ! তবে সেই অবস্থায় সবসময় ট্রেনে বা বাসে টিকিট কাটতে পারিনি_ ফলে যখন টিকিট-চেকাররা আমাকে নামিয়ে দিয়েছে তখন নেমে পড়েছি ! আবার হাঁটা, আবার পথ চলা ! কতো জায়গায় কতো মানুষের কাছে খারাপ ব্যবহার পেয়েছি, আবার অনেক সময় কতো ভালো ব্যবহার‌ও পেয়েছি ! ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঘোরার সময়_ বিভিন্ন মঠ-মিশন, দেবালয়, আখড়ায় গেছি ! সেখানে সাধু-সন্ন্যাসীর বেশে কতো ভন্ড-কপটদেরকে দেখেছি, আবার অনেক সময় প্রকৃত সাধু-মহাত্মাদের‌ও দর্শন পেয়েছি ! আমার ছোটোবেলার ঘুরে বেড়ানোর কথাই যখন হোলো তখন তোমাদেরকে আজ বৃন্দাবনের একটা ঘটনা বলি শোনো ! তখন আমি উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বৃন্দাবনে রয়েছি_ সারাদিন কিছু খাবার জোটে নি, প্রচন্ড খিদে পেয়েছিল আমার ! রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে আমি সামনে তাকিয়ে দেখলাম_ একটা বড়সড় আশ্রম ! সেখানকার যিনি মূল মোহান্ত বা মন্ডলেশ্বর_ তাঁর সম্বন্ধে আমি আগেই কিছু কথা শুনেছিলাম ! বৃন্দাবনে তাঁর বেশ নামডাক ছিল তাই আমি সোজা ঢুকে গেলাম ওই আশ্রমের একেবারে ভিতরে ! ‘ভিতরে’– বলতে একেবারে ওই মন্ডলেশ্বরের কাছে ! তাঁর কাছে গিয়েই আমি আমার ক্ষুধার কথা বা কিছু খাবারের প্রয়োজনীয়তার কথা বললাম ! সব শুনে উনি আমাকে বললেন_ “এখন তো খাবারের সময় শেষ হয়ে গেছে ! এখন আর খাবার দেওয়া যাবে না !” এরপর আমি ওনাকে বললাম_ “তাহলে আপনি আমাকে কিছু পয়সা দিন ! আমি কিছু খাবার কিনে খেয়ে নেব!” আমার এই কথাগুলো বলার পিছনে কারণ যেটা ছিলো, সেটা হোলো এই যে_ ‘আমার তখন কম বয়স ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি নিজেকে ভারতীয় সন্ন্যাসী-পরম্পরার‌ই একজন ভাবতাম ! আর একজন সন্ন্যাসীর প্রয়োজনে, অন্য একজন সন্ন্যাসীই তার পাশে দাঁড়াবে_ এটাই তো হওয়া উচিত’ ! এই ভাবনা থেকেই আমি সেদিন সেই আশ্রমের মোহান্তের কাছে খাবার বা পয়সা চেয়েছিলাম ! কিন্তু জানোসেই মোহান্ত আমাকে গালাগালি দিয়ে আশ্রম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো ! কেমন ধরনের কথা বলেছিল জানো ? বলেছিল “তোর বাবা আমার কাছে তোর জন্য পয়সা গচ্ছিত করে রেখে গেছে নাকি_ যে তোকে তার থেকে কিছু দান করবো ?” ওনার এই কথার পর আমি কি আর করবো ! চলে এলাম সেখান থেকে ! ঐ বড় আশ্রম থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে এসেছি দেখি একটি ছোট্ট ভাঙাচোরা কুটিয়া ! কুটিয়াটি থেকে অদ্ভুত রকমের কথাবার্তার আওয়াজ আসছিল ব’লে আমি কৌতুহলী হয়ে একটু সেখানে দাঁড়ালাম ! শুনলাম_ যেন একজন ব্যক্তি ঘরে থাকা অন্যদেরকে খুবই বকাবকি করছে, শাসন করছে এবং তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য খুবই পীড়াপীড়ি করছে ! আমি ভাবছিলাম এই ছোট্ট কুটিয়ায় কত লোকজন ভরা রয়েছে যে, ঐ ব্যাক্তি তাদেরকে শাসন করছে ! এটা ভাবতে ভাবতেই ভিতরকার সাধুটি বলে উঠলো__ “বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন, ভিতরে এসে দেখোই না কারা আমাকে জ্বালাতন করছে !” ঘরের মালিকের অনুমতি পেয়ে আমি ভিতরে ঢুকলাম ! ……. (ক্রমশঃ)