শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত এবং কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা গুরুমহারাজের স্বহস্তে লেখা দ্বিতীয় গ্রন্থ *বাউলের মর্মকথা*-র ষষ্ঠ পরিচ্ছেদের একেবারে শেষ ভাগে ছিলাম। আমরা আগের দিন গুরুমহারাজের যে কথাগুলি তুলে ধরেছিলাম – সেগুলি খুব সাধারণভাবে বোঝা বা হৃদয়ঙ্গম করা সত্যিই খুবই দুষ্কর বা দুরূহ। সাধক-সাধিকার প্রেমের গাঢ় থেকে গাঢ়তর অবস্থা প্রাপ্ত হোলে উভয়েরই শারীরিক বাহ্যচেতনা লুপ্ত হোতে থাকে, ফলে তাদের আর কোনো দেহজ আকর্ষণ থাকে না অর্থাৎ তাদের প্রাকৃত কামচেতনা বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর এই অবস্থাকেই বাউলগণ “জ্যান্তে মরা”- অবস্থা বলেন। গুরুমহারাজ এটিকে বলেছেন ‘নিরভিমানিক পূর্ণ প্রেমের অবস্থা’, আর এই অবস্থাতেই বাউলসাধকের ‘মনের মানুষ’ বা ‘সহজ মানুষে’র বোধ হয়ে থাকে।৷
এরপর গুরুমহারাজ ‘বর্তমান’ বাউল মতের সাধন পদ্ধতিকে খুব সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করেছেন। উনি বলেছেন – ‘বর্তমান’ মতের বাউল সাধকগণ তাদের সাধনপদ্ধতিতে যে যে ক্রমগুলি আচরণ করেন সেগুলি হোলো – কামবীজ-কামগায়ত্রী (এগুলি বাউলগুরুর কাছ থেকে শিখে নিতে হয়), জপ করা, এরপরে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তির ধ্যান করতে হয়। এরপরে যা করতে হয় সেটাই সাংঘাতিক বা সর্বাপেক্ষা দুরূহ, আর সেটা হোলো – নারী-পুরুষের স্থূল মিলন অবস্থায় মদনানুভূতিকে উত্তেজিত করে (কামভাবকে উদ্দীপ্ত করে) সেই অবস্থায় যোগ পদ্ধতির দ্বারা ঐ অনুভূতিকে সুষুম্নাপথে ঊর্ধ্বগামী করতে হয় এবং সেই শক্তির (কুলকুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগ্রত করে) সাহায্যে মানব দেহের অভ্যন্তরস্থ শরীরের নিম্নপ্রদেশ থেকে ঊর্ধ্বদিকে অবস্থিত ষটচক্র অর্থাৎ মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মনিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ হয়ে আজ্ঞাচক্রে বা দ্বিদল পদ্মে উন্নীত করতে হয়।
এরপরে গুরুমহারাজ যে কথা বলেছেন, সেটা দেহতত্ত্বের এক গুঢ়তম তত্ত্ব, আর সেটি হোলো – ‘প্রত্যেক মানবদেহের মধ্যেই পিতৃশক্তি (অর্থাৎ বীর্য্য বা পুরুষতত্ত্ব) এবং মাতৃশক্তি (অর্থাৎ রজঃ বা নারীতত্ত্ব) বিদ্যমান রয়েছে। এই দুই তত্ত্বকেই সাধক (বা সাধিকা) তাঁর আপন শরীরে জাগ্রত করে সহস্রারে যুগলতত্ত্বের অপার্থিব রসমাধুর্য্যের আস্বাদন করতে পারেন। আবার বাহ্যিকভাবে প্রকৃতি-আশ্রয় করে, একে অপরের সহযোগী হয়ে – বাউল সাধকগণ আপাত স্থূল মিলনজাত আনন্দকে যোগ-সাধনার দ্বারা চরম অবস্থায় নিয়ে গিয়ে একইভাবে পরমানন্দ লাভ অথবা সহজস্থিতি বা মনের মানুষের অপরোক্ষ অনুভূতি লাভ করে থাকেন।
যাইহোক, এবার আমরা “বাউলের মর্মকথা” গ্রন্থের সপ্তম পরিচ্ছেদে প্রবেশ করতে চলেছি। যেখানে জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে গুরুমহারাজ বাউলদের সহজিয়া রাগমার্গের ‘বর্তমান’ ভজন সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। উনি বলেছেন – ” প্রিয় আত্মন্‌ – সহজিয়া বর্তমান সাধকগণ বলেন – রতিরূপ না হোতে পারলে রস-কে আস্বাদন করা যায় না। রস রতি-কে আশ্রয় করে নিজেই নিজেকে আস্বাদন করে। এটাই ভগবৎলীলার রহস্য ! এই রস এবং রতি – শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধা বা পুরুষ ও প্রকৃতি – পূর্বেই তা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
এই তত্ত্ব ইন্দ্রিয়গ্রামের চেতনা দ্বারা কখনোই অধিগম্য নয়। এই তত্ত্ব অপ্রাকৃত, যা বোধে-বোধের (বোধের) বিষয়। যেমন কালার সহিত বোবার কথা বলার মতো অপরোক্ষ অনুভূতিসাপেক্ষ।
প্রাকৃত কামচেতনাকে পরিহার করে মৃতবৎ আচরণ করলেই অপ্রাকৃত প্রেমের বাতাস লাগে। বাউলেরা একেই “জ্যান্তে মরা” বলেন, অর্থাৎ প্রাকৃত দেহ ভোগাকাঙ্ক্ষা বর্জিত যে মিলন – তাই প্রেমস্বরূপ সহজ মিলন।৷”
প্রিয় পাঠকবৃন্দ ! পৃথিবীর জীবসকল বংশের ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য স্থূল রসকে কাজে লাগায় এবং সেখান থেকেই তারা স্থূল আনন্দের স্বাদ পেয়ে থাকে। কিন্তু যোগসাধনার দ্বারা এই স্থূল রস যখন ঊর্ধ্বগামী হয় এবং গাঢ় থেকে গাঢ়তর বা প্রগাঢ় হয় – তখন তাকেই ‘রতি’ বলা হয়েছে বৈষ্ণবশাস্ত্রে। কিন্তু গুরুমহারাজ বলেছেন – ‘শ্রীকৃষ্ণতত্ত্বই ‘রস’ এবং হ্লাদিনীস্বরূপিণী রাধাতত্ত্বই ‘রতি’।’ উনি আরও বলেছেন – ‘কামের শক্তিই হোলো রতি।’ আবার বলেছেন – ‘মানবিক প্রেম যতই গাঢ় হবে, ততই রতিনিষ্ঠা সংঘটিত হোতে থাকবে।’ তাছাড়াও বলেছেন – ‘রস ও রতির একীভূত অবস্থাতেই উল্লাসময় লীলামাধুর্য্যরস আস্বাদন হয়।’ আর এখন উনি বললেন – ‘রতি-রূপ না হোতে পারলে রস-কে আস্বাদন করা যায় না, এবং বললেন – ‘রস রতি-কে আশ্রয় করে নিজেই নিজেকে আস্বাদন করে। – এটাই ভগবৎলীলার রহস্য।’ তার মানে হোলো – শ্রীকৃষ্ণ (রস) ও শ্রীরাধা (রতি)-র যুগলমিলনতত্ত্ব যা বৈষ্ণবমতে ভগবৎলীলা !
এই প্রসঙ্গে গুরুমহারাজ বলেছেন (যা উনি বারবার আমাদেরকে স্মরণ করিয়েছেন) যে, এই যে রস-রতি তত্ত্ব – এটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় নয়, এটি অপরোক্ষ অনুভূতি বা বোধের বিষয়। যে কোনভাবে (প্রকৃতি-আশ্রিত অথবা প্রকৃতি-বর্জিত সাধনার দ্বারা) সাধককে অন্তর্জগতের শক্তিকে জাগ্রত করে নিম্নগামী শক্তির ধারাকে ঊর্ধ্বগামী করতে পারলে সাধক বাধ্যজ্ঞানরহিত অবস্থা প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ মৃতবৎ হয়ে যায়। তখন ওই মানবদেহে প্রাকৃত কামচেতনা ক্রিয়াশীলতা হারায় এবং তার মধ্যে ‘কাম’ প্রেমে রূপ পায়। ঐ অবস্থাই বাউলমতে “জ্যান্তের মরা” অবস্থা ! প্রকৃতি-আশ্রিত বাউল সাধকগণ বাহ্যমিলনের দ্বারা শুরু করে ধীরে ধীরে যোগ সাধনার দ্বারা এই অবস্থা প্রাপ্ত হ’ন। এই অবস্থাকেই বলা হয়েছে ‘প্রেমস্বরূপ সহজ মিলন’।৷